WBBSE Madhyamik Answer Script Checking Rules: পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী এবং অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা আনা এবং পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরে যাতে কোনো প্রকার ত্রুটি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে পর্ষদের তরফ থেকে খাতা দেখা বা মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য ৪টি কড়া নিয়ম বা গাইডলাইন জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি হলো ‘কেজিং’ (Caging) সিস্টেমে বদল, যেখানে উত্তরপত্রের প্রথম পাতার বদলে দ্বিতীয় পাতায় বিস্তারিতভাবে নম্বর ভেঙে দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, জনসমক্ষে খাতা দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে খাতা জমা দেওয়া এবং মূল্যায়নে গাফিলতি প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক পরীক্ষা হলো একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করেই তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের শিক্ষাগত দিকনির্দেশনা তৈরি হয়। তাই খাতা দেখার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুলভ্রান্তি কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না বলে কড়া বার্তা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। এই আর্টিকেলে আমরা পর্ষদের এই নতুন নির্দেশিকা, শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব এবং প্রাসঙ্গিক সমস্ত তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে পর্ষদের নতুন পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট
বিগত কয়েক বছরে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে যে, বহু পরীক্ষার্থী তাদের প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্ক্রুটিনি (Post Publication Scrutiny – PPS), রিভিউ (Post Publication Review – PPR) এবং তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই (RTI) করার পর পরীক্ষার্থীদের নম্বর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নম্বর ৫ থেকে ১৫ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গিয়েছে, যা পর্ষদের খাতা দেখার প্রক্রিয়া নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছিল।
বিশেষ করে উত্তরপত্রের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়া, কেজিংয়ে (Caging) ভুল নম্বর তোলা বা উত্তরপত্র থেকে মার্কস ফয়েলে নম্বর তোলার ক্ষেত্রে নানা ত্রুটি সামনে এসেছিল। এছাড়াও, অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে লোকাল ট্রেন বা বাসে যাতায়াতের পথে জনসমক্ষে খাতা দেখতে দেখা যেত, যা খাতার গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড়সড় ঝুঁকি তৈরি করে। এই সমস্ত অভিযোগ এবং সমস্যাগুলোকে চিরতরে দূর করতেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) এবার আগেভাগেই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজ্যে প্রায় ৪০,০০০-এর বেশি পরীক্ষক (Examiner) এবং ১,১০০-এর বেশি প্রধান পরীক্ষক (Head Examiner) মাধ্যমিকের খাতা দেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এত বড় কর্মযজ্ঞে কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাইছে না শিক্ষা দপ্তর।
মাধ্যমিকের খাতা দেখা নিয়ে পর্ষদের ৪টি কড়া নিয়ম
পরীক্ষকদের জন্য মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যে নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, তার মূল নির্যাস হলো এই ৪টি কড়া নিয়ম। প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে এই নিয়মগুলো বাধ্যতামূলকভাবে পালন করতে হবে।
১. কেজিং সিস্টেমে বড়সড় বদল (Major Changes in Caging System)
পর্ষদের নতুন নির্দেশিকার সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি হলো ‘কেজিং’ (Caging) পদ্ধতিতে বদল আনা। এতদিন পর্যন্ত খাতা দেখে নম্বর দেওয়ার জন্য উত্তরপত্রের একদম প্রথম পাতায় ছোট করে কেজিংয়ের জায়গা থাকত। শিক্ষক-শিক্ষিকারা প্রশ্নের সাপেক্ষে সেখানেই সংক্ষেপে নম্বর দিয়ে দিতেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এবার থেকে উত্তরপত্রের দ্বিতীয় পাতায় কেজিংয়ের জন্য অনেক বড় জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এখন থেকে বিস্তারিতভাবে নম্বর ‘ভেঙে’ দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ১ নম্বরের প্রশ্নে ‘ক’, ‘খ’ করে একাধিক উপবিভাগ থাকে, তবে প্রতিটি উপবিভাগের জন্য প্রাপ্ত নম্বর আলাদা আলাদা করে কেজিং শিটে উল্লেখ করতে হবে। কোনো উত্তর আংশিক ঠিক হলে তার জন্য কত নম্বর দেওয়া হলো, সেটাও স্পষ্টভাবে লিখতে হবে। এর ফলে পরীক্ষার্থীরা ঠিক কোন প্রশ্নের কোন অংশে কত নম্বর পেল, তা একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। যোগ করার ক্ষেত্রে কোনো ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও এর ফলে প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।
২. জনসমক্ষে খাতা দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (Complete Ban on Checking Scripts in Public Spaces)
খাতা দেখার গোপনীয়তা বজায় রাখতে পর্ষদ অত্যন্ত কড়া নির্দেশ দিয়েছে যে, কোনোভাবেই জনসমক্ষে বা পাবলিক প্লেসে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা যাবে না। অনেক সময় দেখা যেত, সময়ের অভাব বা যাতায়াতের সুবিধার জন্য পরীক্ষকরা ট্রেন, বাস বা স্কুলের স্টাফরুমে বসে খাতা দেখছেন। পর্ষদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই প্রথা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং নিষিদ্ধ।
উত্তরপত্র অত্যন্ত গোপনীয় একটি বিষয়। পাবলিক প্লেসে খাতা দেখলে তা হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির নজরে আসার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। খাতার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে। তাই পরীক্ষকদের নিজেদের বাড়িতে বা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং নিরিবিলি পরিবেশে বসে মনোযোগ সহকারে খাতা দেখতে হবে। খাতার বিষয়বস্তু নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে আলোচনা করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৩. নির্দিষ্ট সময়ে খাতা ও নম্বর জমা দেওয়া (Strict Timeline for Submission of Scripts)
মাধ্যমিকের মতো বড় পরীক্ষার ফলাফল একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা পর্ষদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পরীক্ষকদের জন্য সময়সীমা বা ডেডলাইন অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। খাতা পাওয়ার পর নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেই মূল্যায়ন শেষ করে হেড এক্সামিনার বা প্রধান পরীক্ষকের কাছে খাতা এবং মার্কস ফয়েল (Marks Foil) জমা দিতে হবে।
দেরিতে খাতা জমা দেওয়া কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। পাশাপাশি, নম্বর জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন অনলাইনের ব্যবহার বাড়ছে, তাই মার্কস ফয়েলে নম্বর তোলার সময় যাতে কোনো ধরনের করণিক ভুল (Clerical Error) না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ভুলভাবে কাজ সম্পন্ন করাই হলো এই নিয়মের মূল লক্ষ্য।
৪. মূল্যায়নে ত্রুটি হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (Strict Disciplinary Action for Evaluation Errors)
সবচেয়ে কড়া নিয়মটি হলো জবাবদিহিতা বা অ্যাকাউন্টেবিলিটি। পর্ষদ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, খাতা দেখার ক্ষেত্রে যদি কোনো পরীক্ষকের চরম গাফিলতি প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যদি ফলাফল প্রকাশের পর কোনো ছাত্র বা ছাত্রী আরটিআই (RTI) করে খাতার প্রতিলিপি বা সার্টিফায়েড কপি বের করে এবং দেখা যায় যে কোনো প্রশ্নের মূল্যায়নই করা হয়নি (Unmarked Answer) বা নম্বর যোগ করতে বড়সড় ভুল হয়েছে, তবে তার দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক এবং হেড এক্সামিনারকে নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, সঠিক উত্তর লেখা সত্ত্বেও পরীক্ষক নম্বর দিতে ভুলে গেছেন। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ হলে পর্ষদ সংশ্লিষ্ট পরীক্ষককে শোকজ (Show Cause) করতে পারে, এমনকি নিয়মানুযায়ী তার ইনক্রিমেন্ট বা সুযোগ-সুবিধাও স্থগিত করা হতে পারে।
নতুন নিয়মের ফলে পরীক্ষার্থীদের সুবিধা
পর্ষদের এই নতুন ৪টি নিয়মের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তাদের সুবিধার দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
-
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: কেজিং সিস্টেমে নম্বর ভেঙে দেখানোর ফলে মূল্যায়নে অভাবনীয় স্বচ্ছতা আসবে। একজন পরীক্ষার্থী সহজেই বুঝতে পারবে তার দুর্বলতা কোথায় বা সে কোথায় নম্বর কম পেয়েছে।
-
নম্বর যোগে ভুলের অবসান: অনেক সময় খাতার ভেতরে নম্বর দেওয়া হলেও প্রথম পাতার কেজিংয়ে সেই নম্বর তুলতে ভুলে যেতেন পরীক্ষকরা। বড় কেজিং শিট থাকায় এবং বিস্তারিত নম্বর দেওয়ায় এই ধরনের যোগের ভুল বা ‘টোটালিং মিস্টেক’ আর হবে না।
-
সঠিক বিচার পাওয়া: মনোযোগ দিয়ে সুরক্ষিত পরিবেশে খাতা দেখার ফলে পরীক্ষকরা প্রতিটি উত্তরের প্রতি সুবিচার করতে পারবেন। তাড়াহুড়ো করে নম্বর দেওয়ার প্রবণতা কমবে।
-
স্ক্রুটিনির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস: প্রথমবারেই নির্ভুলভাবে নম্বর যোগ হলে পরীক্ষার্থীদের অকারণে পিপিএস (PPS) বা পিপিআর (PPR) করার জন্য হয়রানির শিকার হতে হবে না।
শিক্ষক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া এবং শিক্ষকদের উপর চাপ
পর্ষদের এই কড়া নির্দেশিকা নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এবং শিক্ষকমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক সমিতি এবং অন্যান্য একাধিক সংগঠন পর্ষদের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই ধরনের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন অত্যন্ত জরুরি।
তবে, এর পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপর তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাপের বিষয়টিও অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনিতেই রাজ্যে অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। একজন পরীক্ষককে অনেক বেশি খাতা দেখতে হয়। তার ওপর প্রতিটি খাতার দ্বিতীয় পাতায় বিস্তারিত কেজিং করতে গিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় হবে। শিক্ষকদের বক্তব্য, নির্ভুল মূল্যায়নের স্বার্থে তারা এই নিয়ম মেনে চলবেন ঠিকই, তবে পর্ষদের উচিত খাতা দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করা এবং প্রয়োজনে পরীক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
পর্ষদের নির্দেশিকা ও পরিসংখ্যান একনজরে
নিচের টেবিলে মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং খাতা মূল্যায়নের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো, যা পর্ষদের নির্দেশিকার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করবে:
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত তথ্য (Data & Statistics) |
| নতুন কেজিং নিয়ম | উত্তরপত্রের ২য় পাতায় বিস্তারিতভাবে নম্বর ভেঙে লিখতে হবে। |
| মোট পরীক্ষার্থী | প্রতি বছর গড়ে ১০ থেকে ১২ লক্ষ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। |
| মোট পরীক্ষক (আনুমানিক) | প্রায় ৪১,০০০ জন পরীক্ষক খাতা মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকেন। |
| প্রধান পরীক্ষক (Head Examiner) | প্রায় ১,১৫৩ জনের বেশি প্রধান পরীক্ষক থাকেন। |
| নম্বর পুনরায় চেক করার নিয়ম | প্রধান পরীক্ষকদের ১৫% খাতা এবং স্ক্রুটিনিয়ারদের ৭% খাতা পুনরায় চেক করতে হয়। |
| পিপিএস (PPS) ফি | স্ক্রুটিনির জন্য প্রতি বিষয়ে ফি ৮০ টাকা। |
| পিপিআর (PPR) ফি | রিভিউর জন্য প্রতি বিষয়ে ফি ১০০ টাকা। |
| আরটিআই (RTI) প্রসেসিং ফি | খাতার প্রতিলিপি পেতে কোর্ট ফি ১০ টাকা এবং প্রতি পেজের জন্য ২ টাকা প্রসেসিং ফি লাগে। |
উত্তরপত্র মূল্যায়নে হেড এক্সামিনারদের (Head Examiners) ভূমিকা
মাধ্যমিকের খাতা দেখার ক্ষেত্রে সাধারণ পরীক্ষকদের পাশাপাশি হেড এক্সামিনার বা প্রধান পরীক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্ষদের নিয়ম অনুযায়ী, খাতা মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি করেন হেড এক্সামিনাররা।
-
১৫ শতাংশ খাতা পুনরায় দেখা: সাধারণ পরীক্ষকরা খাতা দেখার পর তা হেড এক্সামিনারের কাছে জমা দেন। নিয়ম অনুযায়ী, হেড এক্সামিনারকে সেই খাতাগুলোর মধ্যে থেকে অন্তত ১৫ শতাংশ খাতা পুনরায় মূল্যায়ন (Re-evaluate) করে দেখতে হয় যে পরীক্ষক সঠিকভাবে নম্বর দিয়েছেন কি না।
-
স্ক্রুটিনির দায়িত্ব: স্ক্রুটিনিয়াররা অন্তত ৭ শতাংশ খাতা মিলিয়ে দেখেন যাতে কোনো নম্বর যোগ করতে বা কেজিংয়ে তুলতে ভুল না হয়।
-
নিরাপদ সংরক্ষণ: খাতাগুলো বোর্ড থেকে রিসিভ করা এবং পরীক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করার সময় চরম গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্ব হেড এক্সামিনারের কাঁধেই থাকে।
পিপিএস (PPS), পিপিআর (PPR) এবং আরটিআই (RTI) নিয়মাবলী
যদি কোনো পরীক্ষার্থী তার প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে সন্তুষ্ট না হয়, তবে পর্ষদ তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আইনি এবং অফিশিয়াল পথ খোলা রেখেছে।
১. পিপিএস (Post Publication Scrutiny): যারা পরীক্ষায় পাস করে কিন্তু নম্বর নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, তারা পিপিএস করতে পারে। এর জন্য অনলাইনে নির্দিষ্ট ফি (প্রতি বিষয় ৮০ টাকা) জমা দিতে হয়। পিপিএস-এ মূলত খাতার নম্বরগুলো ঠিকমতো যোগ করা হয়েছে কি না এবং কোনো উত্তর দেখতে বাদ পড়েছে কি না, তা চেক করা হয়।
২. পিপিআর (Post Publication Review): যে সমস্ত পরীক্ষার্থী কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য (Fail) হয়, তারা পিপিআর-এর আবেদন করতে পারে (প্রতি বিষয় ১০০ টাকা)। পিপিআর-এর ক্ষেত্রে খাতাটি পুনরায় অন্য একজন পরীক্ষককে দিয়ে মূল্যায়ন করানো হয়।
৩. আরটিআই (RTI Act 2005): পরীক্ষার্থীরা চাইলে ২০০৫ সালের তথ্য জানার অধিকার আইন অনুযায়ী নিজেদের খাতার সার্টিফায়েড ফটোকপি (Certified Photocopy) বা প্রতিলিপি নিজের চোখে দেখার জন্য আবেদন করতে পারে। ফলাফল প্রকাশের নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে (সাধারণত ৭৫ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে) রিজিওনাল অফিসে আবেদন করতে হয়। এর জন্য ১০ টাকার কোর্ট ফি এবং প্রতি পাতার জন্য ২ টাকা প্রসেসিং ফি জমা দিতে হয়। আরটিআই-এর মাধ্যমে খাতা হাতে পাওয়ার পর যদি পরীক্ষার্থী প্রমাণ করতে পারে যে তার নম্বর কম দেওয়া হয়েছে বা কোনো ভুল হয়েছে, তবে পর্ষদ তা বিনামূল্যে সংশোধন করে দেয়।
নতুন নির্দেশিকার ফলে এই পিপিএস, পিপিআর বা আরটিআই-এর মাধ্যমে যে ভুলগুলো আগে সামনে আসত, তা অনেকাংশেই কমে যাবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। কারণ, নতুন কেজিং সিস্টেম এবং কড়া নজরদারির ফলে প্রথমবারেই খাতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখা হবে।
মাধ্যমিক ২০২৬: এক নজরে পরিসংখ্যান
চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| মোট পরীক্ষার্থী | প্রায় ৯.৫ লক্ষ (আনুমানিক) |
| পরীক্ষা শুরু | ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |
| পরীক্ষা শেষ | ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |
| পাস মার্ক | ৩৪% (প্রতিটি বিষয়ে এবং মৌখিক মিলিয়ে) |
| খাতা দেখার সময়সীমা | মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত (সম্ভাব্য) |
| ফলাফল প্রকাশের লক্ষ্য | মে মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ |
পরিশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) এই ৪টি কড়া নির্দেশিকা মাধ্যমিকের খাতা দেখার ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কেজিং সিস্টেমে বদল থেকে শুরু করে জনসমক্ষে খাতা দেখায় নিষেধাজ্ঞা—প্রতিটি নিয়মই পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। যদিও এই নিয়মগুলো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওপর কাজের চাপ কিছুটা বৃদ্ধি করবে, তবুও সামগ্রিকভাবে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে এবং মূল্যায়নে স্বচ্ছতা আনতে এর অবদান অনস্বীকার্য। এর ফলে পরীক্ষার্থীরা তাদের যোগ্য নম্বর পাবে এবং মেধার সঠিক বিচার হবে, যা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনে সাহায্য করবে। পর্ষদের এই কঠোর মনোভাব আগামী দিনে রাজ্যের অন্যান্য বোর্ডগুলোর কাছেও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আপনার কি মনে হয় এই নতুন নিয়মগুলো খাতা দেখার ভুলভ্রান্তি পুরোপুরি দূর করতে সক্ষম হবে, নাকি শিক্ষকদের ওপর অকারণে চাপ বাড়াবে? নিচে কমেন্ট করে আপনার মতামত জানাতে পারেন, অথবা আপনার যদি মাধ্যমিক পরীক্ষার রুটিন বা সিলেবাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আমি কি আপনাকে মাধ্যমিকের সিলেবাস বা পরীক্ষার অন্যান্য গাইডলাইন সম্পর্কে আরও কোনো তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারি?











