সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে ১.২৫ কোটি ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি’ এবং ৩১.৬৮ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ ভোটারদের তালিকা ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে প্রকাশ্যে প্রকাশ করেছে। রাজ্যের গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিস এবং ওয়ার্ড অফিসে এই তালিকা দেখা যাবে। বিশেষ সংশোধনী রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়ার অধীনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং নির্ভুলতা নিশ্চিত করা যায়।
লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি বলতে ভোটার তালিকায় থাকা এমন তথ্যগত অসামঞ্জস্য বোঝায় যা যৌক্তিক বিশ্লেষণে খাপ খায় না। নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট প্যারামিটারের ভিত্তিতে এই অসঙ্গতিগুলি চিহ্নিত করে। পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়া চলাকালীন প্রোজেনি-ম্যাপিং পদ্ধতির মাধ্যমে ৯৪.৪৯ লক্ষ ভোটারের মধ্যে এই ধরনের অসঙ্গতি শনাক্ত করা হয়েছিল, যা পরে বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) যাচাইয়ের পর কমিয়ে প্রায় ১.২৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।
লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির প্রধান কারণ
ভোটারদের নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চারটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, পিতা-মাতার নামের বানান বা রেকর্ডে গরমিল পাওয়া গেলে। দ্বিতীয়ত, ভোটার এবং তাঁর পিতা-মাতার মধ্যে বয়সের ব্যবধান যৌক্তিকভাবে অসম্ভব হলে – বিশেষত যদি বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম বা ৫০ বছরের বেশি হয়। তৃতীয়ত, পারিবারিক বংশবৃক্ষের তথ্যে অস্বাভাবিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ রেকর্ড থাকলে। চতুর্থত, ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্যে কোনো ডাটাবেস ত্রুটি বা দ্বৈততা পাওয়া গেলে।
আনম্যাপড ভোটার কারা
আনম্যাপড ভোটার হলেন তাঁরা যাঁরা নিজেদের বা নিজেদের বংশধরদের মাধ্যমে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে লিঙ্ক করতে পারেননি। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩১.৬৮ লক্ষ। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ১.৬৭ কোটি মানুষকে লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির আওতায় চিহ্নিত করা হয়েছিল, যা বুথ লেভেল অফিসারদের বাড়ি বাড়ি পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রথমে ১.৩৬ কোটি এবং পরবর্তী যাচাইয়ের পর ৯৪.৫ লক্ষে নামিয়ে আনা হয়। যেসব ভোটারের ক্ষেত্রে BLO সন্দেহ দূর করতে পারেননি, তাঁদের শুনানির জন্য ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং কমিশনের পদক্ষেপ
২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেয়। শীর্ষ আদালত সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য জোর দেয় এবং নির্দেশ দেয় যে ডিস্ট্রিক্ট ইলেক্টোরাল অফিসার (DEO) কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট থেকে নির্দিষ্ট তালিকা ডাউনলোড করে জনসাধারণের দেখার জন্য প্রদর্শন করবেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই তালিকা প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল।
নির্বাচন কমিশনের সেক্রেটারি পবন শর্মা বুধবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক মনোজ অগরওয়ালকে একটি চিঠিতে স্পষ্ট করে জানান যে, শুধুমাত্র লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সিই নয়, আনম্যাপড ভোটারদের তালিকাও প্রকাশ করা হবে। এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই তালিকা আপলোড করেছে।
কোথায় এবং কীভাবে তালিকা দেখা যাবে
অফলাইন পদ্ধতি: স্থানীয় অফিসে দেখুন
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি এবং আনম্যাপড ভোটারদের নাম বিভিন্ন সরকারি অফিসে প্রদর্শিত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে ভোটাররা গ্রাম পঞ্চায়েত ভবনে এবং প্রতিটি তালুকা বা সাবডিভিশনের ব্লক অফিসে গিয়ে তালিকা দেখতে পারবেন। শহরাঞ্চলে পৌরসভা এবং পৌর এলাকার ওয়ার্ড অফিসে এই তালিকা প্রদর্শন করা হচ্ছে।
জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং ERO (Electoral Registration Officer) দের কাছে সম্পূর্ণ তালিকা রয়েছে। নাগরিকরা তাঁদের নিজ নিজ স্থানীয় অফিস পরিদর্শন করে যাচাই করতে পারবেন যে তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম এই তালিকায় রয়েছে কিনা। এছাড়াও বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) কাছে রাখা ভোটার তালিকা থেকেও এই তথ্য পাওয়া যাবে।
অনলাইন পদ্ধতি: ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ
নির্বাচন কমিশন অনলাইনেও তালিকা উপলব্ধ করেছে, যাতে ভোটাররা ঘরে বসেই তাঁদের স্থিতি যাচাই করতে পারেন। ন্যাশনাল ভোটার্স সার্ভিসেস পোর্টাল (NVSP) ওয়েবসাইট voters.eci.gov.in-এ গিয়ে ভোটাররা তাঁদের নাম খুঁজে দেখতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ceowestbengal.nic.in থেকেও SIR সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে।
ECINET মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমেও ড্রাফট ভোটার তালিকা চেক করা সম্ভব। ভোটারদের তাঁদের EPIC নম্বর (ভোটার আইডি নম্বর) বা ব্যক্তিগত বিবরণ যেমন নাম, পিতা/স্বামীর নাম, জেলা, বিধানসভা কেন্দ্র ইত্যাদি দিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। নিরাপত্তার জন্য ক্যাপচা কোড প্রবেশ করানোর পর ‘সার্চ’ বাটনে ক্লিক করলে ভোটারের রেজিস্ট্রেশন বিবরণ দেখা যাবে।
কী করবেন যদি আপনার নাম তালিকায় থাকে
শুনানির প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় নথি
যদি আপনার নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি বা আনম্যাপড তালিকায় পাওয়া যায়, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। নির্বাচন কমিশন শুনানির ব্যবস্থা করেছে যেখানে ভোটাররা তাঁদের নথিপত্র জমা দিয়ে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে, মাধ্যমিকের সার্টিফিকেটের পাশাপাশি মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডও জন্ম তারিখের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
আনম্যাপড ভোটারদের ক্ষেত্রে, স্ব-সত্যায়িত পরিচয় প্রমাণপত্র যেমন আধার কার্ড, পাসপোর্ট বা জন্ম সার্টিফিকেট নোটিশ পর্যায়ে জমা দিতে হবে। অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথির মধ্যে রয়েছে রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, PAN কার্ড, ব্যাংক পাসবুক এবং ইউটিলিটি বিল যাতে ঠিকানার প্রমাণ রয়েছে। ভোটারদের মূল নথি এবং তার ফটোকপি উভয়ই সাথে আনতে হবে।
অনুমোদিত প্রতিনিধি নিয়োগের সুবিধা
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA) নিয়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এখন থেকে ভোটারের অনুমোদিত প্রতিনিধি হতে পারেন বুথ লেভেল এজেন্ট বা পরিবারের যে কোনো সদস্য। এই সুবিধা বিশেষত বয়স্ক, অসুস্থ বা দূরত্বের কারণে স্বশরীরে উপস্থিত হতে অক্ষম ভোটারদের জন্য খুবই কার্যকর।
প্রতিনিধি নিয়োগের জন্য ভোটারকে একটি অনুমোদন পত্র লিখতে হবে যাতে প্রতিনিধির নাম, সম্পর্ক এবং ভোটারের স্বাক্ষর বা টিপসই থাকবে। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে নথি বা আপত্তি সংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়া যাবে। প্রতিনিধিকে তাঁর নিজের পরিচয়পত্র এবং ভোটারের অনুমোদন পত্র সাথে নিয়ে যেতে হবে।
SIR প্রক্রিয়া এবং এর উদ্দেশ্য
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) হল নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটার তালিকা পরিশোধন এবং হালনাগাদ করার একটি বিশেষ উদ্যোগ। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি যোগ্যতার তারিখ ধরে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। এর প্রধান লক্ষ্য হল নতুন যোগ্য ভোটারদের যুক্ত করা এবং স্থানান্তর, অপ্রতিবেদিত মৃত্যু বা অন্যান্য অসঙ্গতির কারণে নাম বাদ দেওয়া।
প্রোজেনি-ম্যাপিং পদ্ধতি SIR-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে ভোটারদের ২০০২ সালের মূল ভোটার তালিকার সাথে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোটারকে তাঁর পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষের মাধ্যমে ২০০২ সালের তালিকার সাথে যুক্ত হতে হয়। যাঁরা এই লিঙ্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, তাঁরা ‘আনম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে যে, প্রাথমিকভাবে ৯১.৪৬ লক্ষ লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির কেস চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার সাথে রয়েছে ৫৮.২০ লক্ষ ‘এক্সক্লুডেড ভোটার’ এবং ৩০ লক্ষ আনম্যাপড ভোটার। বর্তমানে যাচাই ও পুনর্মূল্যায়নের পর লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.২৫ কোটি এবং আনম্যাপড ভোটারের সংখ্যা ৩১.৬৮ লক্ষ।
নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশাবলী
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু কঠোর নির্দেশ জারি করেছে। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পশ্চিমবঙ্গের সকল নাগরিককে আশ্বস্ত করেছেন যে, SIR প্রক্রিয়ায় কাউকে আইন হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না। শুনানির সময় বিশৃঙ্খলা, অশান্তি বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিটি জেলা কালেক্টর এবং পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্টকে SIR-এর কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী এবং নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি থেকে শুরু করে কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার এবং জেলাশাসককে কোনও স্থানে যাতে কোনও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা না হয় সে দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
শুনানির কেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, পানীয় জলের সুবিধা এবং সহায়তা ডেস্ক স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বয়স্ক এবং দিব্যাঙ্গ ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে, যাতে তাঁরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে সহজেই তাঁদের নথি জমা দিতে পারেন।
ভোটার তালিকা যাচাই: ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
অনলাইন যাচাইয়ের বিস্তারিত পদক্ষেপ
অনলাইনে ভোটার তালিকা যাচাই করা অত্যন্ত সহজ এবং কয়েক মিনিটের ব্যাপার। প্রথমে National Voters’ Services Portal (NVSP) ওয়েবসাইট voters.eci.gov.in-এ প্রবেশ করুন। হোম পেজে ‘Search Your Name in Electoral Roll’ মেনু খুঁজে বের করুন এবং সেখানে ক্লিক করুন।
তিনটি বিকল্প পাওয়া যাবে – ‘Search by EPIC’, ‘Search by Details’ বা ‘Search by Mobile’। যদি আপনার EPIC নম্বর (ভোটার আইডি নম্বর) মনে থাকে, তাহলে প্রথম বিকল্পটি নির্বাচন করুন, রাজ্য সিলেক্ট করুন, EPIC নম্বর এবং ক্যাপচা কোড প্রবেশ করান এবং ‘Search’ বাটনে ক্লিক করুন। যদি EPIC নম্বর না থাকে, ‘Search by Details’ নির্বাচন করে আপনার নাম, পিতা/স্বামীর নাম, জেলা, বিধানসভা কেন্দ্র দিয়ে অনুসন্ধান করতে পারেন।
মোবাইলের মাধ্যমে যাচাইয়ের জন্য প্রথমে NVSP পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। হোম পেজের ওপরের ডান কোণে ‘Sign-Up’ অপশনে ক্লিক করে আপনার মোবাইল নম্বর, ইমেল আইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করুন। OTP ভেরিফিকেশনের পর লগইন করে ‘Search in Electoral Roll’ অপশন ব্যবহার করে নিজের স্থিতি দেখতে পারবেন।
অফলাইন যাচাই এবং বুথ লেভেল অফিসারের ভূমিকা
অফলাইনে যাচাইয়ের জন্য আপনার নিকটস্থ বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-এর সাথে যোগাযোগ করুন। প্রতিটি ভোটিং বুথের জন্য একজন BLO নিয়োগ করা আছে যিনি ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন। BLO-এর কাছে ASD লিস্ট (Absent, Shifted, Dead) রয়েছে যেখানে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত বা মৃত ভোটারদের নাম থাকে।
স্থানীয় পোলিং স্টেশনেও ড্রাফট ভোটার লিস্টের ফিজিক্যাল কপি রাখা হয় যা জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উপলব্ধ। গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিস এবং পৌর ওয়ার্ড অফিসেও সম্পূর্ণ তালিকা প্রদর্শিত হচ্ছে। আপনি সরাসরি এই অফিসগুলিতে গিয়ে আপনার নাম বা পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম তালিকায় আছে কিনা যাচাই করতে পারবেন।
আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া এবং সময়সীমা
যদি আপনি মনে করেন যে ভুলবশত আপনার নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি বা আনম্যাপড তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাহলে আপনার আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। তালিকা প্রকাশের পর থেকে এক মাস সময় দেওয়া হয় আপত্তি এবং নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আপত্তি জানাতে আপনাকে নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট ERO অফিসে জমা দিতে হবে। অনলাইনেও NVSP পোর্টালের মাধ্যমে আপত্তি জানানো যায়। আপত্তির সাথে সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথিপত্রের স্ব-সত্যায়িত কপি সংযুক্ত করতে হবে। নথি জমা দেওয়ার পর একটি acknowledgement receipt প্রদান করা হবে যা সংরক্ষণ করা উচিত।
শুনানির তারিখ নোটিশের মাধ্যমে জানানো হবে। নির্দিষ্ট তারিখে উপস্থিত হয়ে মূল নথিপত্র দেখিয়ে নিজের দাবি প্রমাণ করতে হবে। শুনানি কমিটি নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং সেই অনুযায়ী ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর SMS এবং ইমেলের মাধ্যমে ভোটারকে অবহিত করা হবে।
তালিকা প্রকাশের তাৎপর্য এবং রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গে লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি এবং আনম্যাপড ভোটারদের তালিকা প্রকাশ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী বিজেপির মধ্যে SIR নিয়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। তৃণমূল অভিযোগ করেছে যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে বিজেপি দাবি করেছে যে, ভোটার তালিকায় অবৈধ এবং ভুয়া নাম রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ এই বিতর্কিত পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আদালত স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য তালিকা প্রকাশ এবং যথাযথ শুনানির ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন আশ্বাস দিয়েছে যে, কোনো প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়া হবে না এবং প্রত্যেকে নিজের পরিচয় প্রমাণের সুযোগ পাবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রক্রিয়া ভোটার তালিকার মান উন্নত করবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করবে। তবে একই সঙ্গে, এটি একটি বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ কারণ প্রায় ১.৫৭ কোটি ভোটারকে যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় শুনানি আয়োজন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন পর্যাপ্ত সময় এবং সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যাতে কোনো যোগ্য ভোটার বঞ্চিত না হন।
পরিসংখ্যান এবং তথ্য এক নজরে
| বিষয় | সংখ্যা/তথ্য |
|---|---|
| লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি ভোটার | প্রায় ১.২৫ কোটি |
| আনম্যাপড ভোটার | ৩১.৬৮ লক্ষ |
| প্রাথমিক লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি শনাক্তকরণ | ১.৬৭ কোটি |
| প্রথম যাচাইয়ের পর | ১.৩৬ কোটি |
| BLO যাচাইয়ের পর | ৯৪.৪৯ লক্ষ |
| তালিকা প্রকাশের তারিখ | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ |
| সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ | ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ |
| আপত্তি জানানোর সময়সীমা | তালিকা প্রকাশের পর ১ মাস |
সকল ভোটারদের উচিত নিয়মিতভাবে নিজেদের ভোটার তালিকায় নাম এবং বিবরণ যাচাই করা। যদি আপনার নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি বা আনম্যাপড তালিকায় থাকে, তাহলে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করুন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিন। দেরি করলে আপনার ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সকল নথিপত্রের স্পষ্ট এবং পাঠযোগ্য ফটোকপি তৈরি করে রাখুন। মূল নথি এবং স্ব-সত্যায়িত কপি উভয়ই শুনানির সময় সাথে নিয়ে যান। যদি আপনি নিজে উপস্থিত হতে না পারেন, তাহলে একজন অনুমোদিত প্রতিনিধি নিয়োগ করুন এবং যথাযথ অনুমোদন পত্র প্রদান করুন।
অনলাইন পোর্টালে নিয়মিত লগইন করে আপনার আবেদনের স্থিতি চেক করুন। শুনানির তারিখ এবং স্থান সম্পর্কে সতর্ক থাকুন এবং সময়মতো উপস্থিত হন। যদি কোনো সমস্যা বা সন্দেহ থাকে, তাহলে BLO, ERO বা হেল্পলাইনের সাথে যোগাযোগ করুন। নির্বাচন কমিশনের টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৯৫০ নম্বরে ফোন করে সহায়তা পেতে পারেন।
প্রযুক্তির ভূমিকা এবং ডিজিটাল সুবিধা
নির্বাচন কমিশন SIR প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করেছে, যা এই বিশাল কাজকে আরও স্বচ্ছ এবং দক্ষ করে তুলেছে। প্রোজেনি-ম্যাপিং-এর জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারিবারিক সম্পর্ক এবং বয়সের ব্যবধান বিশ্লেষণ করে লজিক্যাল অসঙ্গতি শনাক্ত করতে পারে। এই প্রযুক্তি ম্যানুয়াল যাচাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত এবং নির্ভুল।
NVSP পোর্টাল এবং ECINET মোবাইল অ্যাপ ভোটারদের ঘরে বসে তাঁদের তথ্য যাচাই করার সুবিধা দিয়েছে। ডিজিটাল ভোটার আইডি বা e-EPIC এর প্রচলন কাগজের ভোটার কার্ডের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। ভোটাররা এখন তাঁদের স্মার্টফোনে ভোটার আইডি ডাউনলোড করে রাখতে পারেন এবং প্রয়োজনে দেখাতে পারেন।
অনলাইন আবেদন এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করেছে। ভোটাররা যেকোনো সময় তাঁদের আবেদনের স্ট্যাটাস দেখতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন। SMS এবং ইমেল নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ভোটারদের প্রতিটি পর্যায়ে আপডেট জানানো হচ্ছে। এই ডিজিটাল উদ্যোগ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের একটি উদাহরণ।
অন্যান্য রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া এবং তুলনা
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও উত্তরপ্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া চলছে। উত্তরপ্রদেশে ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে SIR ড্রাফট ভোটার লিস্ট প্রকাশিত হয়েছে যেখানে ২.৮৯ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং মোট ১.২৫ কোটি আনম্যাপড ভোটার চিহ্নিত হয়েছে। প্রাথমিক তালিকার ৮১.৩% নাম ধরে রাখা হয়েছে।
প্রতিটি রাজ্যে একই ধরনের প্যারামিটার এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি পাওয়া গেছে, যা ঐতিহাসিক ভোটার তালিকায় তথ্যগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশে আনম্যাপড ভোটারের সংখ্যা অনুপাতিকভাবে কম।
সব রাজ্যেই নির্বাচন কমিশন একই রকম স্বচ্ছতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্ব না থাকে। সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য নির্বাচন অফিস এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটার সচেতনতা এবং শিক্ষা কর্মসূচি
নির্বাচন কমিশন এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের অফিস SIR সম্পর্কে ভোটারদের সচেতন করতে বিভিন্ন প্রচার কর্মসূচি পরিচালনা করছে। স্থানীয় মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং কমিউনিটি লিডারদের মাধ্যমে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় যেখানে ডিজিটাল সুবিধা সীমিত, সেখানে BLO-দের সরাসরি ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করে তথ্য প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
হেল্পডেস্ক এবং সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে যেখানে ভোটাররা বিনামূল্যে পরামর্শ এবং সহায়তা পেতে পারেন। বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মীরা ভোটারদের অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার, ফর্ম পূরণ এবং নথি প্রস্তুতিতে সাহায্য করছেন। বয়স্ক এবং কম শিক্ষিত ভোটারদের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পোস্টার, লিফলেট এবং ভিডিও বার্তা প্রস্তুত করা হয়েছে যা সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। স্থানীয় ভাষায় তথ্য প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে প্রতিটি ভোটার বুঝতে পারেন। কমিউনিটি মিটিং এবং জনসচেতনতা শিবিরের আয়োজন করা হচ্ছে যেখানে ভোটাররা সরাসরি প্রশ্ন করতে এবং উত্তর পেতে পারেন।
চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এত বিশাল সংখ্যক ভোটারের শুনানি আয়োজন করা একটি বিরাট লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত শুনানি কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং সময় ব্যবস্থাপনা একটি জটিল কাজ। নির্বাচন কমিশন একাধিক পর্যায়ে শুনানি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে যাতে সকল ভোটার সুযোগ পান। বিভিন্ন জেলায় একযোগে শুনানি চলবে এবং প্রয়োজনে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও শুনানির ব্যবস্থা থাকবে।
নথি যাচাইয়ের জটিলতাও একটি চ্যালেঞ্জ, বিশেষত যেখানে পুরনো রেকর্ড বা হারিয়ে যাওয়া নথি জড়িত। নির্বাচন কমিশন বিকল্প নথি এবং সাক্ষী সাক্ষ্য গ্রহণের নমনীয়তা দেখাচ্ছে। যেসব ভোটারের কাছে কোনো নথি নেই, তাঁদের জন্য গ্রাম প্রধান বা স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তার সার্টিফিকেট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে ভোটার তালিকা আরও নির্ভুল এবং হালনাগাদ রাখার জন্য নিয়মিত যাচাই এবং পরিশোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। আধার লিঙ্কেজ এবং অন্যান্য সরকারি ডাটাবেসের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় আপডেট সিস্টেম তৈরির প্রস্তাব করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিন ভোটিং এবং ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের প্রযুক্তি আরও উন্নত করা হবে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিশাল সংশোধনের প্রয়োজন না হয়।
লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি এবং আনম্যাপড ভোটারদের তালিকা প্রকাশ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে যে প্রতিটি যোগ্য নাগরিক তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং ভোটার তালিকা নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য থাকে। ভোটারদের উচিত সক্রিয়ভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা, নিজেদের তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সময়মতো জমা দেওয়া। নির্বাচন কমিশনের সাথে সহযোগিতা করে আমরা একটি শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারি।











