পেট গরম হওয়ার ভয়ংকর লক্ষণগুলো জানুন – না বুঝলে মারাত্মক বিপদ!

পেট গরম বা অ্যাসিডিটি বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক স্বাস্থ্য সমস্যা যা প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষকে ভোগায়. গবেষণা অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ১৫.৬% মানুষ গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)…

Debolina Roy

 

পেট গরম বা অ্যাসিডিটি বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক স্বাস্থ্য সমস্যা যা প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষকে ভোগায়. গবেষণা অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ১৫.৬% মানুষ গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) বা দীর্ঘস্থায়ী অ্যাসিডিটিতে ভুগছেন. বাংলাদেশে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং মানসিক চাপের কারণে পেটের সমস্যা একটি বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে. পেট গরম হলে পেটে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হয় যা পেটের আস্তরণ এবং খাদ্যনালীতে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে.

পেট গরম কী এবং কেন হয়

পেট গরম বা অ্যাসিডিটি হলো এমন একটি অবস্থা যখন পেটে অতিরিক্ত পরিমাণে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি হয়. সাধারণত পাকস্থলী খাদ্য হজমের জন্য অ্যাসিড নিঃসরণ করে, কিন্তু যখন এই অ্যাসিডের পরিমাণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন তা পেটের আস্তরণ এবং খাদ্যনালীতে জ্বালা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে ঝাল ও তৈলাক্ত খাবার, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং দূষিত পানি পানের কারণে এই সমস্যা ব্যাপকভাবে দেখা যায়.

পেট গরম হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

পেট গরম হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ দায়ী থাকতে পারে. অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা, অতিরিক্ত ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া পেট গরমের অন্যতম কারণ। এছাড়া স্ট্রেস বা মানসিক চাপও পেটে অ্যাসিড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়. হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বাংলাদেশে পেটের সমস্যার একটি বড় কারণ.

অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল সেবন, ধূমপান, স্থূলতা এবং গর্ভাবস্থায় পেটে অতিরিক্ত চাপ. কিছু ওষুধ যেমন ব্যথানাশক, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং উচ্চ রক্তচাপের ওষুধও পেট গরম সৃষ্টি করতে পারে. ফাস্ট ফুড এবং রাস্তার খাবার যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হয়, তাও পেটের সমস্যা বাড়ায়.

পেট গরমের প্রধান লক্ষণসমূহ

পেট গরমের লক্ষণগুলো চিনতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে এটি গুরুতর জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে. নিচে পেট গরমের সাধারণ লক্ষণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

পেটে জ্বালাপোড়া ও বুক জ্বালা

পেট গরমের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পেটে তীব্র জ্বালাপোড়া এবং বুক জ্বালা যাকে ইংরেজিতে হার্টবার্ন বলা হয়. এই জ্বালাপোড়া সাধারণত বুকের মাঝখানে অনুভূত হয় এবং কখনো কখনো গলা পর্যন্ত উঠে আসে। খাওয়ার পর বা রাতে শোয়ার সময় এই সমস্যা বেড়ে যায়. অনেকে এই অনুভূতিকে বুকে আগুন জ্বলার মতো বর্ণনা করেন।

গরমে পেট ঠান্ডা রাখার ৭টি কার্যকরী ঘরোয়া উপায়

পেট ফাঁপা ও গ্যাসের সমস্যা

পেট গরম হলে পেটে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হয় যার ফলে পেট ফুলে যায় এবং ফাঁপা ফাঁপা লাগে. এই অবস্থায় পেটে টান টান ভাব অনুভূত হয় এবং পেটের ভেতরে গুড়গুড় শব্দ হয়. ঢেঁকুর ওঠা এবং মুখ দিয়ে গ্যাস বের হওয়া পেট গরমের একটি সাধারণ লক্ষণ. কখনো কখনো এই গ্যাস পেটে তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।

বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া

অ্যাসিডিটির কারণে অনেকের বমি বমি ভাব হয় এবং কখনো কখনো বমি হয়ে যায়. খাবার খাওয়ার পর এই সমস্যা বেশি হয়. গরমকালে পেট খারাপের সাথে বমির সমস্যা আরও বেড়ে যায়. কিছু ক্ষেত্রে বমির সাথে টক স্বাদ অনুভূত হয় যা মূলত পেটের অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসার কারণে হয়।

পেটে ব্যথা ও খিঁচুনি

পেট গরম হলে পেটে তীব্র ব্যথা এবং খিঁচুনি হতে পারে. এই ব্যথা সাধারণত পেটের উপরের অংশে বা নাভির চারপাশে অনুভূত হয়. ব্যথা কখনো ক্র্যাম্পিং বা মোচড়ানোর মতো হতে পারে. দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা থাকলে পেটের আস্তরণে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে যা পেপটিক আলসার নামে পরিচিত.

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ

পেট গরমের আরও কিছু লক্ষণ রয়েছে যেগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। এর মধ্যে রয়েছে:

  • হঠাৎ খিদে কমে যাওয়া বা ক্ষুধামন্দা

  • মুখে টক বা তেতো স্বাদ অনুভব করা

  • কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া

  • মাথাব্যথা এবং মাথা ঘোরা

  • হালকা জ্বর হতে পারে

  • শরীরে ব্যথা এবং জয়েন্টে ব্যথা

  • হেঁচকি উঠা

পেট গরমের লক্ষণ ও তীব্রতা – একনজরে

লক্ষণ হালকা অবস্থা মাঝারি অবস্থা গুরুতর অবস্থা
বুক জ্বালা মাঝে মাঝে, খাবারের পর সপ্তাহে ২-৩ বার প্রায় প্রতিদিন, রাতে ঘুম ভাঙে
পেটে ব্যথা হালকা অস্বস্তি মাঝারি ব্যথা, কিছুক্ষণ থাকে তীব্র ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী
বমি ভাব কদাচিৎ নিয়মিত, খাবারের পর ঘন ঘন, বমি হয়ে যায়
গ্যাস ও ফাঁপা সামান্য পেট ফুলে যায় অতিরিক্ত ফুলে যায়, ব্যথা হয়
খাবারে অরুচি সামান্য কম লক্ষণীয় হ্রাস উল্লেখযোগ্য ওজন হ্রাস

পেট গরমের ঝুঁকিপূর্ণ কারণসমূহ

কিছু বিশেষ কারণ পেট গরম হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়. বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা পেটে চাপ সৃষ্টি করে যা অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়ায়. মাংসাহারী খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চা-কফি পান, তামাক ও অ্যালকোহল সেবন পেট গরমের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়.

জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসজনিত কারণ

অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া, দেরিতে রাতের খাবার খাওয়া এবং খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া পেট গরমের প্রধান কারণ. ঝাল, তৈলাক্ত, ভাজাপোড়া এবং ফাস্ট ফুড পেটে অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ায়. রসুন, পেঁয়াজ, টমেটো, সাইট্রাস ফল এবং মসলাদার খাবারও কিছু মানুষের জন্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করে.

মানসিক চাপ ও অন্যান্য কারণ

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও উদ্বেগ পেটে অ্যাসিড উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত করে. স্ট্রেস হরমোন পেটের পরিবেশ পরিবর্তন করে যা অ্যাসিডিটি বাড়ায়. গর্ভাবস্থায় পেটে চাপ বৃদ্ধি পায় যা হার্টবার্ন সৃষ্টি করে. হাইয়াটাল হার্নিয়া নামক একটি অবস্থা যেখানে পেটের উপরের অংশ ডায়াফ্রামের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে, তাও অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়ায়.

পেট গরমের সম্ভাব্য জটিলতা

দীর্ঘদিন ধরে পেট গরম বা অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে এবং সঠিক চিকিৎসা না নিলে বেশ কিছু গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে. এই জটিলতাগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

পেপটিক আলসার

দীর্ঘস্থায়ী অ্যাসিডিটির কারণে পেটের আস্তরণে ক্ষত সৃষ্টি হয় যাকে পেপটিক আলসার বলা হয়. বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার ৫% থেকে ১০% মানুষ জীবদ্দশায় পেপটিক আলসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে. এই রোগে পেটে তীব্র ব্যথা, রক্তক্ষরণ, ছিদ্র এবং পেটের বাধা সৃষ্টি হতে পারে.

খাদ্যনালীর ক্ষতি ও ক্যান্সার ঝুঁকি

দীর্ঘদিন অ্যাসিড রিফ্লাক্স থাকলে খাদ্যনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি হয় যাকে ইসোফেগাইটিস বলা হয়. এটি চিকিৎসা না করলে খাদ্যনালীর কোষের পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়. রক্তক্ষরণ পেপটিক আলসারের সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা যেখানে রক্ত বমি বা কালো পায়খানা হতে পারে.

শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা

কিছু ক্ষেত্রে পেটের অ্যাসিড খাদ্যনালী দিয়ে উপরে উঠে শ্বাসনালীতে প্রবেশ করতে পারে যা দীর্ঘস্থায়ী কাশি, গলা বসে যাওয়া এবং হাঁপানি বাড়িয়ে দিতে পারে. এই কারণে কিছু মানুষের রাতে ঘুম থেকে উঠে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

গাড়িতে উঠলেই বমি হয়? বমি হবার সবচেয়ে বড় কারন এবং তার প্রতিকারের

কখন ডাক্তার দেখাবেন – জরুরি সংকেত

পেট গরমের কিছু লক্ষণ এমন রয়েছে যেগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত. সপ্তাহে দুইবারের বেশি হার্টবার্ন হলে বা ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ খাওয়ার পরও সমস্যা না কমলে ডাক্তার দেখানো জরুরি. খাবার গিলতে অসুবিধা হলে বা খাবার গলায় আটকে যাচ্ছে মনে হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত.

রক্ত বমি হওয়া, কালো বা রক্তাক্ত পায়খানা, অব্যাখ্যাত ওজন হ্রাস এবং খাবারে সম্পূর্ণ অরুচি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত. বুকে ব্যথার সাথে ঘাড়, চোয়াল, হাত বা পায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা ঘাম হলে তৎক্ষণাৎ জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে কারণ এগুলো হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে. লক্ষণ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটালে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে.

পেট গরমের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

পেট গরমের চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যার তীব্রতার উপর. হালকা ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ঘরোয়া উপায়ে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে ওষুধ এবং কখনো কখনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে.

ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা

অ্যাসিডিটির জন্য সবচেয়ে সাধারণ ওষুধ হলো অ্যান্টাসিড যা দ্রুত পেটের অ্যাসিড নিরপেক্ষ করে এবং হার্টবার্ন উপশম করে. প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (পিপিআই) পেটে অ্যাসিড উৎপাদন কমায় এবং পেটের আস্তরণ সারাতে সাহায্য করে. যদি হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স দিয়ে ব্যাকটেরিয়া নির্মূল করা হয়.

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন পেট গরম নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ কারণ অতিরিক্ত ওজন পেটে চাপ সৃষ্টি করে. খাবার খাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা পর শুতে যাওয়া উচিত. ঘুমানোর সময় মাথা উঁচু রাখলে অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসা কমে. নিয়মিত ব্যায়াম, যোগব্যায়াম এবং মেডিটেশন মানসিক চাপ কমায় যা পরোক্ষভাবে পেট গরম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে.

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

সঠিক খাদ্যাভ্যাস পেট গরম প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি. ঝাল, তৈলাক্ত, ভাজাপোড়া, ফাস্ট ফুড, চকলেট, ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে. পরিবর্তে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, পুরো শস্য, সবুজ শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন এবং অ-সাইট্রাস ফল খাওয়া উচিত. ছোট ছোট করে ঘন ঘন খাওয়া এবং পেট কখনো এক-তৃতীয়াংশের বেশি ভরা না রাখা ভালো. কলা, দই, মৌরি, তরমুজ এবং ফুলকপির মতো ক্ষারীয় খাবার পেট ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে

পেট গরম প্রতিরোধের ঘরোয়া উপায়

বাংলাদেশে বহু প্রাচীনকাল থেকে পেট গরমের জন্য বিভিন্ন ঘরোয়া উপায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে. এই প্রাকৃতিক প্রতিকারগুলো নিরাপদ এবং কার্যকর।

দই ও প্রোবায়োটিক

দইয়ের প্রোবায়োটিক বৈশিষ্ট্য পেটের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী. দই পেটের তাপ কমানোর একটি নিশ্চিত উপায় এবং এটি দ্রুত অম্বল উপশম করে. প্রতিদিন দই খাওয়া বা গরম ভাতের সাথে মিশিয়ে খেলে পেট ঠান্ডা থাকে.

পুদিনা ও মৌরি

পুদিনায় উচ্চ পরিমাণে মেন্থল থাকে যার শীতল বৈশিষ্ট্য রয়েছে. পুদিনা চা পেটের তাপ শান্ত করতে এবং পেট ফাঁপা ও বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে. মৌরি বীজ হজমে সহায়তা করে এবং অ্যাসিডিটির লক্ষণ যেমন বুকজ্বালা কমায়. এক গ্লাস উষ্ণ পানিতে এক চা চামচ মৌরি পাউডার মিশিয়ে খেলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়.

আদা ও মেথি

আদা হজম শক্তি বাড়ায় এবং পেটের ব্যথা কমায়. আদার চা বা আদার রস পেট গরমে বিশেষ উপকারী. মেথি বীজের পানি পেটের তাপ ঠান্ডা করতে বিশেষভাবে কার্যকর. এক গ্লাস পানিতে মেথির বীজ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে সেই পানি পান করলে তাৎক্ষণিক আরাম পাওয়া যায়.

ঠান্ডা পানিতে পা রাখা ও অ্যালোভেরা

পেটে তাপ লাগলে একটি বালতিতে ঠান্ডা পানির সাথে কিছু বরফের টুকরো রেখে সেই পানিতে পা ডুবিয়ে রাখলে তাৎক্ষণিক আরাম পাওয়া যায়. প্রায় ২০ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখতে হবে. পেটে তাজা অ্যালোভেরা জেল লাগালে পেটের তাপ তাৎক্ষণিকভাবে ঠান্ডা হয় কারণ অ্যালোভেরা জেলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে

কালো জিরা ও অন্যান্য ঘরোয়া প্রতিকার

কালো জিরা অ্যাসিডিটি দূর করতে বেশ কার্যকর. নারকেল পানি, শসা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা পেট ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। খাবার খাওয়ার পর হাঁটাহাঁটি করা এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে.

পেট গরম বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

পেট গরম নিয়ে সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকে মনে করেন দুধ খেলে অ্যাসিডিটি কমে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুধ সাময়িকভাবে আরাম দিলেও পরে আরও বেশি অ্যাসিড উৎপাদন বাড়াতে পারে। আরেকটি ভুল ধারণা হলো মসলাযুক্ত খাবার সবসময় পেট গরম সৃষ্টি করে – আসলে এটি ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হতে পারে। কিছু মানুষ ভাবেন যে অ্যাসিডিটি একটি ছোটখাটো সমস্যা যা চিকিৎসার প্রয়োজন নেই, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অ্যাসিডিটি গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।

পেট গরম এবং মানসিক স্বাস্থ্য

মানসিক চাপ এবং পেট গরমের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে. দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস পেটে অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ায় এবং হজম প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে. তাই শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও পেট গরম নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান এবং যোগব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে এবং পাচনতন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করতে কার্যকর.

সমাপনী

পেট গরম বা অ্যাসিডিটি একটি সাধারণ কিন্তু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা যা সঠিক জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব। পেট গরমের লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে সহায়ক। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখার মূল চাবিকাঠি। মনে রাখবেন, পেট গরমের লক্ষণ যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় বা গুরুতর হয়, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক যত্ন এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে পেট গরম থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব এবং একটি স্বাস্থ্যকর, আরামদায়ক জীবনযাপন করা যায়।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন