ঘরের কোণে বা সিলিংয়ে মাকড়সার জাল দেখে আমরা অনেকেই চমকে উঠি বা ভয় পাই। কিন্তু আপনি কি জানেন যে এই ছোট্ট প্রাণীটি আপনার ঘরের জন্য একটি প্রাকৃতিক পোকা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে? বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মাকড়সারা প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন পোকামাকড় খেয়ে ফেলে, যা মানুষের বার্ষিক মাছ ও মাংস খাওয়ার পরিমাণের দ্বিগুণ। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো ঘরে মাকড়সা থাকলে আসলে কী হয়, এর উপকারিতা, ক্ষতি এবং সাথে জড়িত কুসংস্কার ও বৈজ্ঞানিক তথ্য।
মাকড়সার উপস্থিতি: প্রকৃতির বিনামূল্যে পেস্ট কন্ট্রোল সেবা
সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রকাশ করেছেন যে পৃথিবীতে প্রায় ২৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ওজনের মাকড়সা বাস করে। এই আর্থ্রোপোডগুলি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পাওয়া যায় – আর্কটিকের শীতল অঞ্চল থেকে শুরু করে উষ্ণ মরুভূমি পর্যন্ত।
গবেষণা অনুসারে, একটি গড় ঘরের মাকড়সা বছরে প্রায় ২০০০টি পোকামাকড় খেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
মশা এবং মাছি
-
তেলাপোকা
-
মথ (কাপড় খাওয়া পোকা)
-
পিঁপড়া
-
মশা
-
কানপোকা
-
বিছা
সিটি ইউনিভার্সিটি লন্ডনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১১৮ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৭৫% মানুষ মাকড়সাকে ভয় পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রাণীগুলি আপনার ঘরের অদৃশ্য রক্ষক হিসেবে কাজ করছে।
মাকড়সা ভীতি দূর করুন: ঘরে Spider প্রবেশ রোধের ৫টি কার্যকর উপায়
ঘরে মাকড়সা থাকলে কী কী উপকার হয়?
রোগ বহনকারী পোকা নিয়ন্ত্রণ
মাকড়সার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা হলো রোগ ছড়ায় এমন পোকামাকড়ের সংখ্যা কমানো। মশা ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু জ্বর এবং জিকা ভাইরাস ছড়াতে পারে। মাছি টাইফয়েড, ই. কোলাই এবং সালমোনেলা ছড়াতে সক্ষম। বিছা ফ্লি-বর্ন টাইফাস এবং বার্টোনেলোসিস রোগের বাহক।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় মাকড়সার সংখ্যা বেশি, সেখানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কম। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কিছু মাকড়সা প্রজাতি ম্যালেরিয়া পরজীবী বহনকারী মশা খেতে পছন্দ করে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা
মাকড়সার উপস্থিতি একটি স্বাস্থ্যকর বাস্তুতন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। ওয়ান আর্থ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাকড়সার বৈচিত্র্য একটি সুস্থ ও সুষম পরিবেশের লক্ষণ। তাদের উপস্থিতি ভালো বায়ুর মানও নির্দেশ করতে পারে।
মাকড়সারা শুধু পোকামাকড় খেয়েই নয়, বরং ইকোসিস্টেমের খাদ্য শৃঙ্খলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা পাখি, টিকটিকি এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে।
কৃষি ক্ষেত্রে উপকারিতা
মাকড়সারা ফসলের ক্ষতিকারক পোকা যেমন ফড়িং, বিটল এবং মিলিবাগ খেয়ে কৃষকদের সাহায্য করে। এতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন কমে যায়, যা পরিবেশের জন্য ভালো।
ঘরের সাধারণ মাকড়সা প্রজাতি এবং তাদের বৈশিষ্ট্য
আমেরিকান হাউস স্পাইডার
এই প্রজাতির মাকড়সারা সবচেয়ে বেশি ঘরে দেখা যায়। তাদের রঙ সাধারণত হলুদ-বাদামি এবং লম্বা পেট থাকে। একটি স্ত্রী হাউস স্পাইডার তার জীবনকালে ৩৫০০টিরও বেশি ডিম পাড়তে পারে।
সেলার স্পাইডার (লম্বা পায়ের মাকড়সা)
এদের “ড্যাডি লংলেগস” নামেও ডাকা হয়। গ্যারেজ, গুদাম, বা অন্ধকার জায়গায় এদের বেশি দেখা যায়। তাদের শরীর ছোট কিন্তু পা খুব লম্বা।
জাম্পিং স্পাইডার
এই মাকড়সারা দিনের আলোতে সক্রিয় থাকে এবং রোদ পছন্দ করে। তাদের দৃষ্টিশক্তি সব মাকড়সার মধ্যে সবচেয়ে ভালো – তারা ১৮ ইঞ্চি দূর পর্যন্ত নড়াচড়া সনাক্ত করতে পারে।
উলফ স্পাইডার
বড় এবং লোমশ এই মাকড়সারা শিকারের জন্য জাল বোনে না। তারা অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গা পছন্দ করে।
Indoor Plant: এই পাঁচ প্রকার গাছ বাড়িকে রাখবে ঝকঝকে, অক্সিজেনে ভরপুর
মাকড়সার কামড়: কতটা বিপজ্জনক?
পেস্ট ওয়ার্ল্ডের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ঘরের মাকড়সা মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক ডাটাবেস অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৮১টি দেশে মানুষ-মাকড়সার মুখোমুখি হওয়ার ২৬৪৪টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১২১টি কামড়ের ঘটনা এবং মাত্র ১৪৭টি মারাত্মক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নিরাপদ প্রজাতি
বেশিরভাগ ঘরের মাকড়সা যেমন ব্ল্যাক হাউস স্পাইডার, হান্টসম্যান এবং ড্যাডি লংলেগস মানুষের জন্য নিরাপদ। তারা সাধারণত অনুভূত হুমকির মুখে আত্মরক্ষার জন্য কামড়ায়, এবং তাদের বিষ বিষাক্ত নয়।
সতর্কতা প্রয়োজন এমন প্রজাতি
দুটি বিপজ্জনক প্রজাতি হলো:
ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার: এদের কামড় অত্যন্ত শক্তিশালী বিষযুক্ত এবং মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
ব্রাউন রিক্লুস স্পাইডার: এদের পিঠে বেহালার মতো চিহ্ন থাকে এবং কামড় থেকে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।
তবে এই মাকড়সারা সাধারণত লাজুক এবং আক্রমণাত্মক নয়। তারা শুধুমাত্র ভুলবশত বিরক্ত হলেই কামড়ায়।
মাকড়সার কামড় থেকে সুরক্ষা
| প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা | কার্যকারিতা |
|---|---|
| পোশাক, তোয়ালে এবং জুতা ব্যবহারের আগে ঝাড়া | উচ্চ |
| বিছানা দেয়াল থেকে দূরে রাখা | মধ্যম |
| ঘরের ফাটল ও ছিদ্র বন্ধ করা | উচ্চ |
| অব্যবহৃত জিনিসপত্র কমানো | উচ্চ |
| কাঠের স্তূপ বা গোডাউনে কাজ করার সময় গ্লাভস ব্যবহার | উচ্চ |
মাকড়সা নিয়ে সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও কুসংস্কার
প্রাচীন বিশ্বাস
মাকড়সা হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রতীকী অর্থ বহন করে আসছে। গ্রীক, রোমান, আফ্রিকান, প্রাক-কলম্বিয়ান, ভারতীয় এবং এশীয় পুরাণে মাকড়সাকে পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল এবং বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নেটিভ আমেরিকান সংস্কৃতিতে “স্পাইডার গ্র্যান্ডমাদার” সৃষ্টি পুরাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হোপি উপজাতির বিশ্বাস অনুসারে, স্পাইডার গ্র্যান্ডমাদার তার জাল বুনে এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।
জনপ্রিয় কুসংস্কার
বি স্মার্ট পেস্ট কন্ট্রোলের গবেষণা অনুযায়ী, মাকড়সা নিয়ে কিছু প্রচলিত কুসংস্কার হলো:
-
মাকড়সার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটার লক্ষণ
-
সুতোয় ঝুলন্ত মাকড়সা দেখলে গুরুত্বপূর্ণ চিঠি আসার সম্ভাবনা
-
ড্রয়ারে মাকড়সা পেলে নতুন পোশাক পাওয়ার ইঙ্গিত
-
জালে দৌড়ানো মাকড়সা ভ্রমণের আগাম খবর
-
খাবার টেবিলে মাকড়সা শত্রুর উপস্থিতি নির্দেশ করে
তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন যে এসব কুসংস্কারের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মাকড়সা কেবল একটি পোকামাকড় যার কোনো রহস্যময় শক্তি নেই।
মাকড়সার আচরণ ও জীবনযাত্রা
শিকার পদ্ধতি
অধিকাংশ মাকড়সা জাল বুনে শিকার ধরে। অর্ব ওয়েভার মাকড়সারা বৃত্তাকার জাল বোনে এবং উড়ন্ত পোকা ধরে – মাছি, মশা, পতঙ্গ এবং আরও অনেক কিছু হাজার হাজার সংখ্যায়। ফানেল ওয়েভার মাকড়সারা ফানেলের মতো জাল বোনে এবং পিঁপড়া পর্যন্ত খেয়ে ফেলে।
জীবনকাল
ঘরের মাকড়সার জীবনকাল প্রজাতির উপর নির্ভর করে। সাধারণত স্ত্রী মাকড়সা ১ থেকে ৩ বছর বাঁচে, যখন পুরুষ মাকড়সা কয়েক মাস থেকে এক বছর বাঁচে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মাকড়সার অবদান
চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহার
মাকড়সার বিষ এবং সিল্ক চিকিৎসা বিজ্ঞানে গবেষণার বিষয়। স্কর্পিয়ন (আর্থ্রোপোড পরিবারের সদস্য) নিয়ে গবেষণা থেকে মস্তিষ্কের টিউমার চিহ্নিতকারী “পেইন্ট” আবিষ্কৃত হয়েছে যা ক্যান্সার কোষগুলিকে আলোকিত করে।
রোবোটিক্সে প্রয়োগ
মাকড়সার চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা কঠিন ভূখণ্ডে চলতে সক্ষম রোবট তৈরি করছেন। মাকড়সার সিল্কের শক্তিমত্তা টেক্সটাইল এবং মেডিকেল সিউচারে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
মাকড়সা রাখবেন নাকি সরাবেন?
কখন রাখা উচিত
যদি ঘরে সাধারণ হাউস স্পাইডার থাকে এবং তারা কোণে শান্তভাবে থাকে, তাহলে তাদের রেখে দিন। তারা আপনার জন্য বিনামূল্যে পেস্ট কন্ট্রোল সেবা দিচ্ছে।
কখন সরানো প্রয়োজন
যদি মাকড়সার সংখ্যা অত্যধিক হয়ে যায় বা বিপজ্জনক প্রজাতি (ব্ল্যাক উইডো বা ব্রাউন রিক্লুস) দেখা যায়, তাহলে পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সেবা নেওয়া উচিত।
মাকড়সা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্ব
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মাকড়সার বিশ্বব্যাপী ইকোলজিক্যাল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পিংটেইল এবং অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীসহ তারা বছরে ৪০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন টন শিকার খায়, যা তিমিদের দ্বারা মহাসাগরে ভক্ষিত শিকারের পরিমাণের (২৮০-৫০০ মিলিয়ন টন) চেয়েও বেশি।
বিশেষত বন এবং তৃণভূমিতে মাকড়সা পোকামাকড়ের জনসংখ্যার উপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
সঠিক পদক্ষেপ: ভয় নয়, সহাবস্থান
মাকড়সাকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তাদের উপকারিতা বোঝা জরুরি। পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে খাবার আছে কিন্তু মাকড়সা নেই। তারা আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ, উষ্ণতম মরুভূমি, সর্বোচ্চ উচ্চতা, জলাভূমি এবং বালিয়াড়িতে পাওয়া গেছে।
মাকড়সার এই অভিযোজন ক্ষমতা এবং ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তারা প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা উচিত, যদি না তারা বিপজ্জনক প্রজাতির হয়।
ঘরে মাকড়সা থাকা আসলে একটি আশীর্বাদ, অভিশাপ নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে এই ছোট্ট আর্থ্রোপোডগুলি প্রাকৃতিক পেস্ট কন্ট্রোল, রোগ প্রতিরোধ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি গড় হাউস স্পাইডার বছরে ২০০০টি পর্যন্ত ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে ফেলে, যা রাসায়নিক কীটনাশকের প্রয়োজন কমায় এবং আপনার ঘরকে স্বাস্থ্যকর রাখে। যদিও ব্ল্যাক উইডো এবং ব্রাউন রিক্লুসের মতো কিছু প্রজাতি থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, বেশিরভাগ ঘরের মাকড়সা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং উপকারী। কুসংস্কার ছেড়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এবং মাকড়সার সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা আমাদের এবং পরিবেশ উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। মনে রাখবেন, পরের বার যখন আপনি ঘরের কোণে একটি মাকড়সা দেখবেন, তখন এটি আপনার জন্য নীরবে কাজ করে যাচ্ছে – মশা, মাছি এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক পোকামাকড় থেকে আপনাকে রক্ষা করছে।











