What is Ukraine’s currency?: প্রতিটি দেশের মুদ্রা তার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির একটি প্রতিচ্ছবি। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, ইউক্রেনের মতো একটি সমৃদ্ধ ইতিহাসের দেশ কোন মুদ্রা ব্যবহার করে? আজ আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব এবং ইউক্রেনের মুদ্রার গল্পে ডুব দিয়ে দেখব এর পেছনের আকর্ষণীয় বিবরণ। এই লেখায় আমরা শুধু মুদ্রার নামই জানব না, বরং এর উৎপত্তি, গুরুত্ব এবং বর্তমান অবস্থাও সহজ ভাষায় আলোচনা করব। তাহলে চলুন, শুরু করা যাক এই তথ্যবহুল যাত্রা!
ইউক্রেনের মুদ্রার নাম হলো হ্রিভনিয়া (ইউক্রেনীয়: гривня, উচ্চারণ: Hryvnia)। এটি ইউক্রেনের অফিসিয়াল মুদ্রা এবং এর প্রতীক হলো ₴। প্রতিটি হ্রিভনিয়া ১০০ কোপেক (kopecks) দিয়ে বিভক্ত। ১৯৯৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর এই মুদ্রা প্রথম চালু হয়, যখন ইউক্রেন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে চায়। এই সূচনা থেকেই হ্রিভনিয়া ইউক্রেনের জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
ইউক্রেনের মুদ্রা হ্রিভনিয়ার গল্প শুরু হয় অনেক আগে, মধ্যযুগীয় কিয়েভান রুসের সময় থেকে। তখন “হ্রিভনা” শব্দটি একটি ওজনের একক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা মূলত রৌপ্য দিয়ে তৈরি একটি ধাতব বারকে বোঝাত। এই ধাতব বার ব্যবসা-বাণিজ্যে মুদ্রার মতোই কাজ করত। আধুনিক হ্রিভনিয়ার নামটি এই ঐতিহাসিক শিকড় থেকেই এসেছে, যা ইউক্রেনের সমৃদ্ধ অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভ করে। তখন প্রথমে তারা “কার্বোভানেটস” (Karboanets) নামে একটি অস্থায়ী মুদ্রা ব্যবহার করে। কিন্তু এই মুদ্রার মূল্য দ্রুত হ্রাস পায় এবং মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছে যায়। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জাতীয় ব্যাংক ১৯৯৬ সালে হ্রিভনিয়া চালু করে, যা দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার একটি বড় পদক্ষেপ ছিল।
ইউক্রেনে হ্রিভনিয়া চালু হওয়ার সময়টি ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬ সালের আগে কার্বোভানেটসের মূল্য এতটাই কমে গিয়েছিল যে, একটি হ্রিভনিয়ার বিনিময়ে ১,০০,০০০ কার্বোভানেটস দেওয়া হতো। এই পরিবর্তন জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। হ্রিভনিয়ার নোট ও মুদ্রা ডিজাইন করা হয় ইউক্রেনের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, নোটগুলোতে ইউক্রেনের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব যেমন ভলোদিমির দ্য গ্রেট বা ইয়ারোস্লাভ দ্য ওয়াইজের ছবি দেখা যায়।
আজকের দিনে হ্রিভনিয়া ইউক্রেনের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কাগজের নোট এবং ধাতব মুদ্রা—দুই রূপেই পাওয়া যায়। নোটগুলোর মূল্যমান হলো ১, ২, ৫, ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০ এবং ১০০০ হ্রিভনিয়া। অন্যদিকে, কোপেকগুলো ১, ২, ৫, ১০, ২৫ এবং ৫০-এর মতো ছোট এককে বিভক্ত। তবে, ছোট মূল্যের কোপেকগুলো এখন কম ব্যবহৃত হয়, কারণ মুদ্রাস্ফীতির কারণে এদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
ইউক্রেনের বাজারে কেনাকাটা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং লেনদেন—সবকিছুতেই হ্রিভনিয়া ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, ডিজিটাল লেনদেনের যুগে এটি অনলাইন পেমেন্টেও গ্রহণযোগ্য। তবে, দেশের বাইরে এর বিনিময় মূল্য খুব বেশি নয়, কারণ এটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেমন শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হয় না।
হ্রিভনিয়ার প্রতিটি নোট ও মুদ্রা ইউক্রেনের গৌরবময় অতীতের গল্প বলে। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ হ্রিভনিয়ার নোটে ইউক্রেনীয় কবি তারাস শেভচেঙ্কোর ছবি রয়েছে, যিনি দেশের সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের একটি বড় প্রতীক। আবার ৫০০ হ্রিভনিয়ার নোটে দেখা যায় দার্শনিক হ্রিহোরি স্কোভোরোদার ছবি। এই ডিজাইনগুলো শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং ইউক্রেনীয়দের তাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইউক্রেনের অর্থনীতিতে হ্রিভনিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দৈনন্দিন লেনদেনের মাধ্যম। তবে, ইউক্রেনের অর্থনীতি বিগত কয়েক দশকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংকট এবং পূর্ব ইউক্রেনে সংঘর্ষের পর হ্রিভনিয়ার মূল্য অনেক কমে যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে হ্রিভনিয়ার মূল্য প্রায় ৫০% কমে গিয়েছিল।
বর্তমানে (২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত), হ্রিভনিয়ার বিনিময় হার মার্কিন ডলারের তুলনায় ওঠানামা করে। উদাহরণস্বরূপ, ১ USD = প্রায় ৩৯-৪০ UAH (ইউক্রেনীয় হ্রিভনিয়া) এর মধ্যে থাকে। এই অস্থিরতা সত্ত্বেও, ইউক্রেন সরকার এবং জাতীয় ব্যাংক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হ্রিভনিয়ার উপর বড় ধরনের চাপ পড়ে। যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রপ্তানি কমে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পায়। ফলে হ্রিভনিয়ার মূল্য আরও অস্থির হয়ে ওঠে। তবে, ইউক্রেনের জাতীয় ব্যাংক বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য গ্রহণ।
ইউক্রেনের মুদ্রা হ্রিভনিয়া শুধু একটি অর্থনৈতিক মাধ্যম নয়, এটি দেশের ইতিহাস, সংগ্রাম এবং আশার প্রতীক। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এর যাত্রা ইউক্রেনীয় জনগণের স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ। যদিও যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে হ্রিভনিয়া কঠিন সময় পার করছে, তবুও এটি ইউক্রেনের পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।