মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, বিশেষ করে মাংস খাওয়ার সূচনা। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন যে আদি মানুষ বা হোমিনিনরা ঠিক কখন থেকে নিয়মিতভাবে মাংস খাওয়া শুরু করেছিল। সাম্প্রতিক গবেষণা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে নিয়মিত মাংসাশী খাদ্যাভ্যাসের সূচনা ঘটেছিল আনুমানিক ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে, যখন ‘হোমো’ (Homo) গোষ্ঠীর উদ্ভব হচ্ছিল। টাইমস অফ ইন্ডিয়া এবং নেচার জার্নালে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে ‘অস্ট্রালোপিথেকাস’ (Australopithecus) নামক প্রাচীনতম হোমিনিনরা প্রধানত উদ্ভিদভোজী ছিল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার স্টার্কফন্টেইন গুহায় প্রাপ্ত ৩.৪ মিলিয়ন বছরের পুরনো দাঁতের এনামেল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে তারা বেশিরভাগ সময় গাছপালা খেতেন এবং তাদের খাদ্যতালিকায় মাংসের উপস্থিতি ছিল খুবই সামান্য বা অনিয়মিত। এই আবিষ্কারটি মানুষের বিবর্তনে মাংস খাওয়ার ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
মাংস খাওয়া শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক কাঠামো এবং টিকে থাকার কৌশলের পরিবর্তনেও বড় ভূমিকা রেখেছিল। প্রাণীজ আমিষ মানুষকে ঘন ক্যালরি এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করেছে, যা জটিল মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অপরিহার্য ছিল। নিচে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব কখন এবং কীভাবে মানুষ মাংস খাওয়া শুরু করল এবং এটি মানব ইতিহাসে কী প্রভাব ফেলেছিল।
প্রাচীন হোমিনিনদের খাদ্যাভ্যাস: উদ্ভিদ থেকে মাংসের দিকে
মানুষের বিবর্তনের শুরুর দিকে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারণা করা গেছে বিভিন্ন জীবাশ্ম এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। বর্তমান সময়ের শিম্পাঞ্জি এবং বনমানুষদের খাদ্যাভ্যাসের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে প্রাচীন হোমিনিনরাও মূলত ফল, পাতা, ফুল, ছাল এবং পোকামাকড় খেতেন। তবে সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ পরিবর্তন এবং জলবায়ুর প্রভাবে তাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে থাকে।
অস্ট্রালোপিথেকাস, যারা প্রায় ৪ মিলিয়ন থেকে ২ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত, তারা ছিল প্রধানত উদ্ভিদভোজী। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার স্টার্কফন্টেইন গুহায় আবিষ্কৃত অস্ট্রালোপিথেকাসের দাঁতের নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে তাদের দাঁতের এনামেলে নাইট্রোজেন-১৫ (Nitrogen-15) এর মাত্রা ছিল খুব কম। প্রাণীজগতে যারা মাংস খায় তাদের শরীরে এই নাইট্রোজেন আইসোটোপের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। অস্ট্রালোপিথেকাসদের দাঁতে এর কম মাত্রা প্রমাণ করে যে তারা খাদ্য শৃঙ্খলের নিচের দিকে অবস্থান করত, অর্থাৎ তারা সরাসরি মাংস খায়নি বরং গাছপালা থেকে খাদ্য গ্রহণ করত।
দাঁতের গঠন এবং ক্ষয়ের প্রমাণ
দাঁতের আকৃতি এবং তার গায়ের ক্ষয়ের চিহ্ন (dental microwear) বিশ্লেষণ করেও বিজ্ঞানীরা অনেক তথ্য পান। অস্ট্রালোপিথেকাসদের দাঁতের গঠন ছিল এমন যা শক্ত এবং তন্তুযুক্ত উদ্ভিদ খাওয়ার জন্য উপযুক্ত। তাদের দাঁতের ক্ষয়ের চিহ্ন থেকে বোঝা যায় তারা বীজ, বাদাম এবং শিকড় জাতীয় খাবার খেতেন। এই ধরনের খাবার সেই সময়ে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত এবং এটি তাদের প্রধান শক্তির উৎস ছিল। তবে এটিও সত্য যে, আধুনিক শিম্পাঞ্জিরা মাঝে মাঝে ছোট প্রাণী শিকার করে বা পচা মাংস খায়, তাই অস্ট্রালোপিথেকাসরাও হয়তো খুব কম পরিমাণে বা সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে পোকামাকড় বা ছোট প্রাণী খেতে পারে। কিন্তু নিয়মিত এবং বৃহৎ প্রাণীর মাংস খাওয়ার কোনো প্রমাণ তাদের জীবাশ্মে পাওয়া যায়নি।
বিবর্তনের মোড়: মাংস খাওয়ার সূচনা
মানুষের খাদ্যাভ্যাসে প্রথম বড় পরিবর্তন ঘটে আনুমানিক ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে। এই সময়ে পৃথিবীতে ‘হোমো’ (Homo) গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গবেষক ব্রিয়ানা পোবিনার (Briana Pobiner) মতে, এই সময় থেকেই হোমিনিনরা ছোট থেকে বড় আকারের প্রাণীর মাংস এবং মজ্জা (marrow) তাদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। এই পরিবর্তনটি ছিল একটি বিবর্তনীয় লাফ, কারণ এটি তাদের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের পথ সুগম করে।
প্রস্তর যুগের হাতিয়ার এবং শিকার
মাংস খাওয়ার ইতিহাসের সাথে প্রস্তর যুগের হাতিয়ার বা ‘পাথরের হাতিয়ার’ (stone tools) এর উদ্ভব গভীরভাবে জড়িত। প্রায় ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় প্রথম পাথরের হাতিয়ারের ব্যবহার শুরু হয়, যা ওল্ডোওয়ান প্রযুক্তি নামে পরিচিত। এই হাতিয়ারগুলো ছিল মূলত চোঙা এবং কোদালের মতো, যা দিয়ে প্রাণীদের মাংস কেটে আলাদা করা এবং হাড় ভেঙে তার ভেতরের মজ্জা বের করা যেত।
নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে হেনরি টি. বান (Henry T. Bunn) তানজানিয়ার ওল্ডুভাই গর্জ (Olduvai Gorge) এবং কেনিয়ার কুবি ফোরা (Koobi Fora) থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন হাড় এবং পাথরের হাতিয়ারের ওপর গবেষণা করেন। তিনি দেখান যে ২ থেকে ১.৫ মিলিয়ন বছর আগের হাড়গুলোতে স্পষ্ট কাটা দাগ (cut marks) রয়েছে। এই দাগগুলো কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাংস কাটার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে প্রাচীন মানুষ শুধুমাত্র মৃত প্রাণী খায়নি, বরং তারা পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করে সক্রিয়ভাবে প্রাণীদের মাংস কেটে খেত। এই কাটা দাগ এবং হাড় ভাঙার দাগগুলো (percussion marks) একসাথে ‘বুচারি মার্কস’ (butchery marks) নামে পরিচিত, যা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মাংস খাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে নির্ধারণ করছেন খাদ্যাভ্যাস?
মানুষ কখন মাংস খাওয়া শুরু করেছে, তা নির্ধারণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো জীবাশ্ম দাঁতের রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং প্রস্তর যুগের হাড়ের গায়ের দাগ পরীক্ষা করা।
নাইট্রোজেন আইসোটোপ বিশ্লেষণ (Nitrogen Isotope Analysis)
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন যার মাধ্যমে জীবাশ্ম দাঁতের এনামেলে নাইট্রোজেন আইসোটোপের মাত্রা মাপা যায়। এটি আগে সমুদ্রিক অণুজীবের ওপর প্রয়োগ করা হলেও এখন এটি মানুষের পূর্বপুরুষদের দাঁতের ওপর ব্যবহার করা হচ্ছে। খাদ্য শৃঙ্খলে যত উপরে ওঠা যাবে, নাইট্রোজেন-১৫ (¹⁵N) এর পরিমাণ তত বেশি পাওয়া যায়। উদ্ভিদভোজী প্রাণীদের শরীরে এই আইসোটোপের মাত্রা কম থাকে এবং মাংসাশী প্রাণীদের শরীরে তা বেশি থাকে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ৩.৪ মিলিয়ন বছরের পুরনো অস্ট্রালোপিথেকাসের দাঁতের এনামেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে তাদের শরীরে নাইট্রোজেন-১৫ এর মাত্রা ছিল খুবই কম, যা তাদের উদ্ভিদভোজী হওয়ার প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে, ২ মিলিয়ন বছর আগের প্রাথমিক ‘হোমো’ প্রজাতির নমুনাগুলোতে এই মাত্রা বেশি পাওয়া যায়, যা তাদের মাংস খাওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরে। এই পদ্ধতিটি প্রাচীন খাদ্যাভ্যাস নির্ণয়ে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
হাড়ের গায়ের কাটা দাগ এবং প্রস্তর হাতিয়ার
নাইট্রোজেন আইসোটোপ বিশ্লেষণের পাশাপাশি, হাড়ের ওপর পাওয়া কাটা দাগও মাংস খাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রমাণ। বিজ্ঞানীরা আধুনিক হাতিয়ার দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাণীর হাড় কেটে এবং ভেঙে দেখেছেন যে প্রাচীন হাড়ের গায়ের দাগগুলোর সাথে তার কতটা মিল রয়েছে। কুবি ফোরা থেকে প্রাপ্ত ১.৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো একটি হরিণ জাতীয় প্রাণীর পায়ের হাড়ে স্পষ্ট কাটা দাগ রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আদি মানুষ ধারালো পাথর দিয়ে মাংস কেটে আলাদা করেছিল।
এছাড়াও, হাড়ের গায়ে প্রচুর আঘাতের চিহ্ন বা পারকাশন মার্কস (percussion marks) পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা শুধুমাত্র মাংস নয়, হাড়ের ভেতরের পুষ্টিকর মজ্জাও বের করে খেয়েছিল। মজ্জা ছিল সেই সময়ের অত্যন্ত মূল্যবান এবং ঘন শক্তির উৎস। এই আবিষ্কারগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ (butchery) আদি মানুষের মধ্যে একটি পরিকল্পিত এবং নিয়মতান্ত্রিক কাজ ছিল।
শিকার নাকি ভুঁইফোঁড়? বিতর্ক এবং সত্য
মানুষ যখন মাংস খাওয়া শুরু করল, তখন তারা নিজেরা শিকার করত নাকি অন্য কোনো শিকারী প্রাণীর শিকার চুরি বা ভুঁইফোঁড় (scavenging) করত—এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। প্রাথমিকভাবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করতেন, আদি মানুষ যেহেতু শক্তিশালী শারীরিক গঠনের অধিকারী ছিল না এবং তাদের হাতিয়ারগুলোও ছিল অপরিশীলিত, তাই তারা সম্ভবত বাঘ, সিংহ বা দাঁতাল হায়নার মতো বড় শিকারী প্রাণীদের শিকার চুরি করে খেত। তারা বড় শিকারী প্রাণীগুলো তাদের খাবার শেষ করে চলে গেলে বাকি থাকা মাংস বা হাড় নিয়ে যেত।
তবে, বর্তমান প্রমাণগুলো ভিন্ন কথা বলে। হেনরি বান এবং অন্যান্য গবেষকদের মতে, পুরাতন প্রস্তর যুগের হাড়ের সংগ্রহে এমন অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে যা দেখায় যে মানুষ প্রথমেই প্রাণীটিকে হত্যা করেছিল এবং মাংস কেটেছিল। হাড়ের ওপর পাওয়া কাটা দাগ এবং দাঁতের দাগের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে মানুষের তৈরি দাগগুলো অন্য শিকারী প্রাণীদের দাগের আগে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষ প্রথমে শিকারটিকে মেরে ফেলেছিল এবং তারপর অন্য কোনো প্রাণী সেই বাকি মাংস খায়নি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আদি মানুষ কেবল ভুঁইফোঁড় ছিল না, তারা ছিল সক্রিয় শিকারী এবং কৌশলগতভাবে মাংস আহরণে সক্ষম ছিল।
ক্যানিবালিজম: মানুষ কি মানুষকেও খেয়েছে?
মাংস খাওয়ার ইতিহাসে একটি ভীতিপ্রদ এবং রহস্যময় অধ্যায় হলো ক্যানিবালিজম বা একে অপরের মাংস খাওয়া। ২০২৩ সালের জুন মাসে নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন একটি জীবাশ্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা এই ধারণাকে সমর্থন করে। গবেষকরা একটি প্রাচীন হোমিনিন পায়ের হাড়ের ওপর পাথরের হাতিয়ার দিয়ে করা কাটা দাগ আবিষ্কার করেছেন। এই কাটা দাগগুলো এতটাই স্পষ্ট যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত এটি পাথর দিয়ে করা এবং উদ্দেশ্য ছিল মাংস কেটে আলাদা করা।
যদিও এই একটি আবিষ্কার থেকে এটা বলা সম্ভব নয় যে সেই সময় মানুষ নিয়মিতভাবে একে অপরকে খেত, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে মানুষ মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের প্রজাতির মাংসও খেয়েছে। এটি হতে পারে খাদ্যের অভাবে, কোনো আচার হিসেবে, নাকি শত্রুপক্ষকে দমন করার জন্য—তার সঠিক কারণ এখনও রহস্য হয়ে রয়েছে। তবে এই আবিষ্কারটি আমাদের জানান দেয় যে আদি মানুষের মধ্যে মাংসাশী প্রবৃত্তি কতটা তীব্র ছিল এবং তারা খাদ্যের জন্য কী পর্যন্ত যেতে পারত।
মাংস খাওয়া মানুষের বিবর্তনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
নিয়মিত মাংস খাওয়া শুরু করা মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এটি শুধুমাত্র পেট ভরানোর মাধ্যম ছিল না, বরং এটি মানুষের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের চাবিকাঠি ছিল।
মস্তিষ্কের বিকাশ এবং শক্তি
মানুষের মস্তিষ্ক শরীরের অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি ব্যয় করে। প্রাচীনকালে মানুষ যখন প্রধানত উদ্ভিদ খাচ্ছিল, তখন তাদের পরিপাকতন্ত্রকে বড় এবং শক্তিশালী রাখতে হতো যাতে তারা কঠিন উদ্ভিদ হজম করতে পারে। কিন্তু মাংস এবং মজ্জা উদ্ভিদের চেয়ে অনেক বেশি ক্যালরি সমৃদ্ধ এবং সহজেই হজমযোগ্য। যখন মানুষ নিয়মিত মাংস খাওয়া শুরু করল, তাদের পরিপাকতন্ত্রের ওপর চাপ কমে আসে। ফলে, শরীরের বাকি অতিরিক্ত শক্তি মস্তিষ্কের বিকাশের কাজে ব্যয় হতে থাকে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মাংস খাওয়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্কের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মাংসে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, চর্বি এবং প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যা নিউরন বা স্নায়ুকোষের বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যক। আধুনিক মানুষের মস্তিষ্ক যে আকারের, তা সম্ভব হয়েছে ঘন ক্যালরিযুক্ত খাবার যেমন মাংসের প্রাপ্যতার কারণে।
সামাজিক কাঠামো এবং সহযোগিতা
শিকার এবং মাংস ভাগাভাগি করার প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক চুক্তির সূচনা করেছিল। বড় শিকার ধরা সহজ ছিল না, এবং একবার শিকার ধরলে তা দ্রুত পচে যেত। তাই শিকারীদের দলটি তাদের পরিবার বা গোষ্ঠীর সবাইকে নিয়ে দ্রুত খেতে হতো। এই ভাগাভাগির প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যে আস্থা এবং সহযোগিতার ভাব তৈরি করে। অনেক গবেষক মনে করেন, এই সামাজিক বন্ধনই পরবর্তীতে ভাষা এবং সংস্কৃতির বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
নিচের সারণীতে আমরা মানুষের খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তন এবং তার প্রভাবগুলো এক নজরে দেখে নিতে পারি:
| সময়কাল (আনুমানিক) | প্রজাতি/গোষ্ঠী | প্রধান খাদ্যাভ্যাস | মূল প্রমাণ বা হাতিয়ার | বিবর্তনীয় প্রভাব |
| ৪ – ২ মিলিয়ন বছর আগে | অস্ট্রালোপিথেকাস | প্রধানত ফল, পাতা, শিকড়, বীজ | দাঁতের এনামেল বিশ্লেষণ (নিম্ন নাইট্রোজেন-১৫), দন্ত ক্ষয় | বৃহৎ পরিপাকতন্ত্র, ছোট মস্তিষ্ক; উদ্ভিদ খাওয়ার উপযোগী দাঁত। |
| ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে | প্রাথমিক হোমো (Homo habilis) | উদ্ভিদ + নিয়মিত মাংস ও মজ্জা | ওল্ডোওয়ান পাথরের হাতিয়ার, হাড়ের কাটা দাগ (cut marks) | মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি শুরু, পাথরের হাতিয়ার ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি। |
| ১.৫ মিলিয়ন বছর আগে | হোমো ইরেকটাস (Homo erectus) | উচ্চ মাত্রার মাংসাশী ও শিকারী | উন্নত এশিয়ুলিয়ান হাতিয়ার, বড় শিকারের প্রমাণ | আরও বড় মস্তিষ্ক, আগুনের ব্যবহার (রান্না শুরু), দূরবর্তী অঞ্চলে বিস্তার। |
রান্নার সূচনা: মাংস খাওয়ার ধরনে আরেকটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন
মাংস খাওয়া শুরু করার পর, মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছিল আগুনের ব্যবহার এবং রান্না আবিষ্কারের মাধ্যমে। যদিও আগুনের সঠিক সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে ধারণা করা হয় প্রায় ১ মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেকটাসরা আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল। কাঁচা মাংস হজম করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ, কিন্তু রান্না করা মাংস নরম হয় এবং দ্রুত হজম হয়। এর ফলে মানুষের শরীরে কম শক্তি ব্যয় হয় খাবার হজম করতে এবং বেশি শক্তি শোষিত হয়।
রান্না করা খাবার মানুষকে আরও বেশি ক্যালরি এবং পুষ্টি গ্রহণে সক্ষম করেছে, যা মস্তিষ্কের বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এছাড়াও, রান্না করা খাবারে ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু থাকে না, ফলে মানুষ রোগমুক্ত এবং সুস্থ থাকতে পেরেছে। এই সবই মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়াতে সাহায্য করেছে।
মানুষ কখন প্রথম মাংস খাওয়া শুরু করল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটি মানুষের বিবর্তনের এক চমকপ্রদ গল্প বলে। প্রাচীন অস্ট্রালোপিথেকাসদের উদ্ভিদভোজী জীবনধারা থেকে শুরু করে, হোমো গোষ্ঠীর উদ্ভব এবং প্রস্তর হাতিয়ারের ব্যবহার—প্রতিটি ধাপ মানুষকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা এখন জানতে পেরেছি যে নিয়মিত মাংস খাওয়া শুরু হয়েছিল আনুমানিক ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে। এই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শুধুমাত্র পেট ভরানোর মাধ্যম ছিল না, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক কাঠামো গঠন এবং প্রযুক্তির উন্নতিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। মাংস খাওয়া মানুষকে শিকারী থেকে সমাজ বিনির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে এবং এটিই আজকের সভ্য মানুষের ভিত্তি স্থাপন করেছে।











