ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়: বাংলায় আগত হুনদের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল?

ভারতবর্ষের ইতিহাসে হুন আক্রমণ একটি যুগান্তকারী এবং রক্তাক্ত অধ্যায়। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে মধ্য এশিয়া থেকে আগত এই যাযাবর যোদ্ধা গোষ্ঠী গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে, যে…

মনীষা মুখার্জী

 

ভারতবর্ষের ইতিহাসে হুন আক্রমণ একটি যুগান্তকারী এবং রক্তাক্ত অধ্যায়। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে মধ্য এশিয়া থেকে আগত এই যাযাবর যোদ্ধা গোষ্ঠী গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে, যে হুনরা একসময় উত্তর ভারত দাপিয়ে বেড়িয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল? বিশেষ করে, বাংলার প্রেক্ষাপটে তাদের অস্তিত্ব কতটা ছিল এবং তাদের চূড়ান্ত পরিণতি কী হয়েছিল? সত্যি কথা হলো, হুনদের সরাসরি বাংলা জয়ের কোনো জোরালো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাদের সাম্রাজ্য মূলত উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্য ভারতকেন্দ্রিক ছিল। তবে তাদের আক্রমণের পরোক্ষ প্রভাবে গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে, যা বাংলায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। হুনদের “হারিয়ে যাওয়া” আসলে কোনো অন্তর্ধান নয়, বরং তা ভারতীয় সমাজের মূল স্রোতে এক জটিল ও ধীর আত্মীকরণের প্রক্রিয়া, যা ভারতের পরবর্তী যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

 

হুন কারা ছিল? এক ঐতিহাসিক পরিচয়

 

“হুন” নামটি শুনলেই এক দুধর্ষ, অদম্য এবং নৃশংস যোদ্ধা জাতির কথা মনে আসে। কিন্তু ঐতিহাসিক দিক থেকে, এই পরিচয়টি বেশ জটিল।

 

হুনদের একাধিক শাখা: হুন, শ্বেত হুন এবং হেফথালাইট

 

সাধারণভাবে “হুন” বলতে আমরা যে গোষ্ঠীকে বুঝি, তারা চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে ইউরোপে অ্যাটিলার নেতৃত্বে রোমান সাম্রাজ্যে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ভারতে যারা আক্রমণ করেছিল, তারা ছিল ভিন্ন একটি শাখা। এদের শ্বেত হুন (White Huns) বা হেফথালাইট (Hephthalites) বলা হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (Encyclopedia Britannica) অনুসারে, হেফথালাইটরা ছিল মধ্য এশিয়ার একটি যাযাবর গোষ্ঠী, যারা পঞ্চম শতকে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতকে আক্রমণ করে। গ্রিক ও ভারতীয় সূত্রগুলো এদের ‘শ্বেত হুন’ বা ‘স্বেত-হুন’ (Svetahuna) বলে উল্লেখ করেছে।

এই শ্বেত হুনরা প্রথমে গান্ধার (বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করে। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সমৃদ্ধশালী গুপ্ত সাম্রাজ্য।

 

ভারতে হুন সাম্রাজ্য: তোরামান ও মিহিরকুল

 

ভারতে হুন শাসনের কথা উঠলে দুটি নাম অপরিহার্য: তোরামান এবং তার পুত্র মিহিরকুল

  • তোরামান (Toramana): পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে, তোরামান গুপ্ত সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল আক্রমণ করেন এবং মালওয়া (মধ্য ভারত) পর্যন্ত নিজ আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। তার মুদ্রা ও শিলালিপি ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে পাওয়া গেছে, যা তার শাসনের পরিধি নির্দেশ করে।
  • মিহিরকুল (Mihirakula): তোরামনের পুত্র মিহিরকুল ছিলেন হুন শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত। ঐতিহাসিক কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী’-তে তাকে এক নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মিহিরকুল তার রাজধানী সাকল (বর্তমান শিয়ালকোট) থেকে শাসন পরিচালনা করতেন। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি অত্যন্ত বিরূপ ছিলেন এবং বহু বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার শাসনকাল ছিল চরম নৃশংসতা ও অস্থিতিশীলতায় পূর্ণ।

 

বাংলায় কি হুনরা সত্যিই এসেছিল? প্রত্যক্ষ বনাম পরোক্ষ প্রভাব

 

মূল প্রশ্নটি হলো, মিহিরকুলের মতো শাসকের সাম্রাজ্য কি বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে হবে।

 

প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব

 

এখন পর্যন্ত বাংলার মূল ভূখণ্ড (গৌড়, বঙ্গ, সমতট, পুণ্ড্রবর্ধন) থেকে হুনদের সরাসরি শাসন বা বড়সড় বসতির কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বা শিলালিপিজাত প্রত্যক্ষ প্রমাণ (Direct Evidence) পাওয়া যায়নি। মিহিরকুলের সাম্রাজ্যের সীমা মূলত পাঞ্জাব, কাশ্মীর, রাজস্থান এবং মধ্য ভারতের মালওয়া অঞ্চল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। বাংলার গুপ্ত শাসকরা তখনও পর্যন্ত নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রেখেছিলেন, যদিও কেন্দ্রীয় গুপ্ত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

 

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন এবং বাংলার পরিস্থিতি

 

হুন আক্রমণের সবচেয়ে বড় প্রভাব বাংলায় সরাসরি পড়েনি, পড়েছিল পরোক্ষভাবে। হুনদের ক্রমাগত আক্রমণ, বিশেষ করে মিহিরকুলের সময়কার যুদ্ধবিগ্রহ, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয়। [suspicious link removed] দেখা যায়, গুপ্ত সম্রাটরা হুনদের প্রতিহত করতে গিয়েই দুর্বল হয়ে পড়েন।

এই কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে বাংলার মতো প্রান্তিক প্রদেশগুলোতে স্থানীয় শাসকরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেন। বাংলার বিভিন্ন অংশে, যেমন দক্ষিণ-পূর্বে সমতট (বর্তমান কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল) এবং পশ্চিমে গৌড় (বর্তমান মুর্শিদাবাদ-মালদা অঞ্চল) অঞ্চলে স্বাধীন বা অর্ধ-স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব ঘটে।

 

পরোক্ষ প্রভাব: রাজনৈতিক শূন্যতা এবং শশাঙ্কের উত্থান

 

হুন আক্রমণ কার্যত উত্তর ভারতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা (Political Vacuum) তৈরি করেছিল, তা-ই বাংলায় এক নতুন যুগের সূচনা করে। ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গুপ্তদের আধিপত্য বাংলা থেকে সম্পূর্ণ মুছে যায়। এই সুযোগেই উত্থান ঘটে বাংলার প্রথম সার্বভৌম রাজা শশাঙ্কের। শশাঙ্ক গৌড়কে কেন্দ্র করে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা হুন-পরবর্তী ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল।

সুতরাং, বলা যায়, হুনরা বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেনি, কিন্তু তাদের আক্রমণের ফলেই বাংলার মাটিতে শশাঙ্কের মতো স্বাধীন রাজার উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।

 

হুন শক্তির পতন: এক সাম্রাজ্যের অবসান

 

মিহিরকুলের মতো শক্তিশালী শাসকের পতনও আকস্মিকভাবেই ঘটেছিল। তার নৃশংসতা এবং সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্থানীয় ভারতীয় রাজাদের একত্রিত হতে বাধ্য করে।

 

যশোধর্মনের বিজয়: মান্দাসোর শিলালিপি

 

হুনদের পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো মধ্যপ্রদেশের মান্দাসোর (Mandasor) শিলালিপি। এই শিলালিপি অনুসারে, মালওয়ার স্থানীয় রাজা যশোধর্মণ আনুমানিক ৫২৮ খ্রিস্টাব্দে এক বিশাল যুদ্ধে মিহিরকুলকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে এই বিজয়কে হুনদের ভারত জয়ের স্বপ্নের অবসান হিসেবে দেখা হয়।

ঐতিহাসিকরা আরও মনে করেন, গুপ্ত সম্রাট নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য-ও হুনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাফল্য লাভ করেছিলেন। এই সম্মিলিত প্রতিরোধে হুন শক্তি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে এবং মিহিরকুল কাশ্মীরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, যেখানে তার শাসনের অবসান ঘটে।

 

মূল প্রশ্ন: পরাজিত হুনরা কোথায় হারিয়ে গেল?

 

যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের পর হুনরা যেন ইতিহাসের পাতা থেকে কর্পূরের মতো উবে গেল। লক্ষ লক্ষ হুন যোদ্ধা এবং তাদের পরিবারবর্গ কোথায় গেল? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে: আত্মীকরণ (Assimilation)

তারা ভারত ছেড়ে মধ্য এশিয়ায় ফিরে যায়নি। তারা এখানেই থেকে গিয়েছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিল।

 

‘অন্তর্ধান’ নয়, ‘আত্মীকরণ’

 

পরাজিত হুনরা কোনো একক জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারেনি। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ধ্বংস হওয়ার পর, তারা ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে বিজয়ী ভারতীয় রাজ্যগুলোর প্রজা হিসেবে বসবাস শুরু করে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে, তারা ধীরে ধীরে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং ধর্ম গ্রহণ করে।

 

সামাজিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি: ‘অগ্নিকুল’ তত্ত্ব

 

এই আত্মীকরণের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত তত্ত্বটি হলো ‘অগ্নিকুল’ (Agnikula) তত্ত্ব। এই তত্ত্বটি মূলত চন্দ বরদাইয়ের লেখা ‘পৃথ্বীরাজ রাসো’ নামক মহাকাব্যে পাওয়া যায়।

তত্ত্বটি কী?

এই পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, যখন পৃথিবীতে অশুভ শক্তি (অসুর) বৃদ্ধি পায়, তখন ঋষি বশিষ্ঠ মাউন্ট আবুতে এক পবিত্র যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞের আগুন (অগ্নি) থেকে চারটি যোদ্ধা গোত্রের জন্ম হয়, যারা পৃথিবীকে রক্ষা করবে। এই চারটি গোত্র হলো:

১. প্রতিহার (বা পরিহার)

২. চৌহান (বা চহমন)

৩. সোলাঙ্কি (বা চালুক্য)

৪. পারমার (বা পঁওয়ার)

অগ্নিকুল গোত্র প্রধান শাসন এলাকা
প্রতিহার কনৌজ, মান্দোর
চৌহান আজমির, দিল্লি
সোলাঙ্কি গুজরাট (অনহিলওয়াড়া)
পারমার মালওয়া (ধার)

 

ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এবং বিতর্ক

 

অনেক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক, যেমন ডি. আর. ভাণ্ডারকর (D.R. Bhandarkar) এবং ভিনসেন্ট স্মিথ (Vincent Smith), এই ‘অগ্নিকুল’ তত্ত্বটিকে একটি রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, এই “বিদেশী” যোদ্ধাদের (যেমন হুন এবং তাদের সহযোগী গুর্জর) হিন্দু সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই এই “অগ্নি দ্বারা শুদ্ধিকরণ” (Purification by Fire) কাহিনীর উদ্ভব হয়েছিল।

  • যুক্তি: হুনরা ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। হিন্দু বর্ণব্যবস্থায় তাদের যোদ্ধা বা ‘ক্ষত্রিয়’ বর্ণে স্থান দেওয়া হয়। এই তত্ত্বটি ছিল তাদের বিদেশী পরিচয় মুছে ফেলে একটি নতুন, পবিত্র ‘ক্ষত্রিয়’ পরিচয় প্রদান করার সামাজিক প্রক্রিয়া।
  • বিতর্ক: তবে, এই তত্ত্ব সর্বজনগ্রাহ্য নয়। অনেক ঐতিহাসিক, যেমন জি. এইচ. ওঝা (G.H. Ojha), এই তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, রাজপুতদের উৎস সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় এবং ‘অগ্নিকুল’ কাহিনীটি পরবর্তীকালের সংযোজন, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

তা সত্ত্বেও, এই তত্ত্বটি হুনদের মতো বিদেশী গোষ্ঠীগুলোর ভারতীয় সমাজে মিশে যাওয়ার জটিল প্রক্রিয়াটিকে বুঝতে সাহায্য করে।

 

গুর্জর এবং জাঠ সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক

 

আধুনিক ভারতের দুটি প্রধান সম্প্রদায় – গুর্জর (Gujjar) এবং জাঠ (Jat)-দের উৎপত্তির সাথেও হুনদের নাম জড়িয়ে আছে।

  • গুর্জর: ঐতিহাসিকরা প্রায়শই ‘গুর্জর’ শব্দটিকে ‘খাজার’ (Khazar) বা হুনদের সাথে সম্পর্কিত একটি মধ্য এশীয় উপজাতির সাথে যুক্ত করেন। মনে করা হয়, হুন আক্রমণের সময় বা তার ঠিক পরেই এই গুর্জররা উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে এবং সময়ের সাথে সাথে হুনদের অবশিষ্টাংশের সাথে মিশে যায়। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এশিয়া ফর এডুকেটরস (Columbia University’s Asia for Educators) এর মতো একাডেমিক রিসোর্সগুলো মধ্যযুগীয় ভারতের এই জটিল জাতিগত মিশ্রণের দিকে ইঙ্গিত করে। গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্য, যা অগ্নিকুল তত্ত্বের একটি অংশ, এই মিশ্রণের ফলেই উদ্ভূত হতে পারে।
  • জাঠ: উত্তর ভারতের এই প্রধান কৃষি ও যোদ্ধা সম্প্রদায়ের শারীরিক গঠন এবং সামাজিক রীতিনীতির সাথে মধ্য এশীয় যাযাবর গোষ্ঠীগুলির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এটিও একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা যে পরাজিত হুন সৈন্যদের একটি বড় অংশ কৃষিকাজ গ্রহণ করে এবং স্থানীয় জাঠ জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়।

 

বাংলায় আত্তীকরণের কোনো প্রমাণ আছে কি?

 

যেহেতু হুনরা বাংলায় সেভাবে প্রবেশ করেনি, তাই বাংলায় তাদের আত্মীকরণের প্রশ্নটিও কিছুটা ভিন্ন।

 

সীমিত প্রমাণ এবং অনুমান

 

উত্তর বা পশ্চিম ভারতের মতো বাংলায় হুনদের কোনো বড়সড় বসতি গড়ে ওঠেনি। তাই ‘অগ্নিকুল’ বা ‘গুর্জর’ তত্ত্বের মতো কোনো বড় সামাজিক আন্দোলনও এখানে ঘটেনি।

যদি কোনো হুন গোষ্ঠী বাংলায় প্রবেশ করেও থাকে, তবে তা ছিল খুবই ক্ষুদ্র আকারে। হয়তো তারা পরাজিত সৈন্য বা পলাতক গোষ্ঠী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলো বাংলার তৎকালীন উন্নত এবং ঘনবসতিপূর্ণ সমাজে খুব দ্রুত তাদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পূর্ণভাবে মিশে যায়। বাংলার তৎকালীন সমাজে অস্ট্রো-এশিয়াটিক, দ্রাবিড়, তিব্বতি-বর্মী এবং আর্য রক্তের যে জটিল মিশ্রণ ছিল, তাতে নতুন একটি উপাদান হিসেবে তারা বিলীন হয়ে যায়।

 

হুন আক্রমণের দীর্ঘমেয়াদী বাংলা ও ভারতের প্রভাব

 

যদিও হুনরা বাংলায় সরাসরি শাসন করেনি, তাদের আক্রমণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:

১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবসান: হুন আক্রমণই ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের কফিনের শেষ পেরেক। এর ফলে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে পড়ে।

২. আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: হুনদের ধ্বংসলীলার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল কনৌজের হর্ষবর্ধন, বাংলার শশাঙ্ক এবং দাক্ষিণাত্যের চালুক্যদের মতো নতুন আঞ্চলিক শক্তি।

৩. সামন্ততন্ত্রের সূচনা: গুপ্তদের পতনের পর যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, তা ভারতে সামন্ততান্ত্রিক (Feudal) ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে, যা মধ্যযুগীয় ভারতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

৪. নতুন জাতিগত মিশ্রণ: হুন, গুর্জর এবং অন্যান্য মধ্য এশীয় গোষ্ঠীর আত্মীকরণ উত্তর ভারতের জাতিগত মানচিত্রকে চিরতরে পাল্টে দেয়, যা “রাজপুত যুগ” নামে পরিচিত এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

 

ইতিহাসের একীভূত স্রোতে

 

সুতরাং, “বাংলায় আগত হুনরা কোথায় গেল?”—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, তারা বাংলায় সেভাবে আসেইনি। তাদের মূল কর্মক্ষেত্র ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারত।

আর সমগ্র ভারতে হুনরা কোথায় গেল? এর উত্তর হলো—তারা কোথাও যায়নি। তারা ঠিক এখানেই আছে, কিন্তু অন্য নামে, অন্য পরিচয়ে। হুনরা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু জাতিগতভাবে তারা ভারতীয় সমাজের বিশাল জনসমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। তাদের রক্ত ও সংস্কৃতি রাজপুত, গুর্জর, জাঠ এবং উত্তর ভারতের আরও অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশে গিয়ে ভারতীয় সভ্যতার বৈচিত্র্যময় স্রোতকেই আরও সমৃদ্ধ করেছে। হুনদের “হারিয়ে যাওয়া” আসলে ধ্বংসের গল্প নয়, তা ভারতীয় সমাজের অন্তর্ভুক্তিকরণ ও আত্মীকরণের এক অসাধারণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

 

About Author
মনীষা মুখার্জী

আরও পড়ুন