টাইফয়েড টিকা ঠিক কোথায় নেওয়া উচিত? জানুন সম্পূর্ণ তথ্য

Where is the Typhoid Vaccine Given on the Body: টাইফয়েড একটি জলবাহিত রোগ যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। এই রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ…

Debolina Roy

 

Where is the Typhoid Vaccine Given on the Body: টাইফয়েড একটি জলবাহিত রোগ যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। এই রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো টিকা। সাধারণভাবে, টাইফয়েডের ইনজেকটেবল টিকা হাতের উপরের অংশে থাকা ডেল্টয়েড পেশীতে (deltoid muscle) পুশ করা হয়। তবে টাইফয়েডের বিভিন্ন ধরণের টিকা রয়েছে এবং প্রয়োগের পদ্ধতিও ভিন্ন। যেমন, মুখে খাওয়ার ক্যাপসুলও ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা সরাসরি পরিপাকতন্ত্রে কাজ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মতে, টিকার সঠিক প্রয়োগ এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই টিকা নেওয়ার আগে এর ধরণ এবং প্রয়োগের স্থান সম্পর্কে জেনে নেওয়া আবশ্যক।

টাইফয়েড জ্বর: একটি নীরব মহামারী

টাইফয়েড জ্বর সালমোনেলা টাইফি (Salmonella Typhi) নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সৃষ্ট একটি মারাত্মক রোগ। এই রোগটি মূলত দূষিত জল এবং খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব রয়েছে এমন অঞ্চলে টাইফয়েডের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

রোগের লক্ষণ ও বিস্তার

টাইফয়েড জ্বরের সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • ধারাবাহিকভাবে উচ্চ তাপমাত্রা (১০৩-১০৪° ফারেনহাইট)।
  • মাথাব্যথা এবং শরীরে ব্যথা।
  • শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি।
  • পেটে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া।
  • ক্ষুধামন্দা।
  • কিছু ক্ষেত্রে বুকে ও পেটে গোলাপী দাগ (rose spots) দেখা যায়।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে টাইফয়েড থেকে নানা রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন – অন্ত্রে রক্তক্ষরণ বা ছিদ্র হয়ে যাওয়া, যা রোগীর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং আনুমানিক ১,১০,০০০ মানুষ মারা যায়। এর বেশিরভাগই ঘটে দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার মতো অঞ্চলে।

টাইফয়েড ভ্যাকসিনের প্রকারভেদ এবং কার্যকারিতা

বর্তমানে মূলত তিন ধরনের টাইফয়েড ভ্যাকসিন বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেকটির প্রয়োগ পদ্ধতি, বয়সসীমা এবং কার্যকারিতার মেয়াদ ভিন্ন।

ইনজেকটেবল ভ্যাকসিন (Injectable Vaccines)

যে ভ্যাকসিনগুলো ইনজেকশনের মাধ্যমে পেশীতে দেওয়া হয়, সেগুলি হলো ইনজেকটেবল ভ্যাকসিন। এর দুটি প্রধান প্রকার রয়েছে।

১. টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (Typhoid Conjugate Vaccine – TCV)

এটি বর্তমানে সবচেয়ে আধুনিক এবং কার্যকর টাইফয়েড ভ্যাকসিন। WHO এই ভ্যাকসিনটিকেই টাইফয়েড-প্রবণ দেশগুলিতে শিশুদের রুটিন টিকাকরণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর দিয়ে সুপারিশ করেছে।

  • কার্যকারিতা: TCV প্রায় ৮৫% পর্যন্ত সুরক্ষা প্রদান করে এবং এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
  • বয়সসীমা: এটি ৬ মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদেরও দেওয়া যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা অনেক বেশি হওয়ায় এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
  • বুস্টার ডোজ: সাধারণত এই টিকার একটি ডোজই যথেষ্ট, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বুস্টার ডোজের প্রয়োজন হতে পারে।

২. ভিআই ক্যাপসুলার পলিস্যাকারাইড ভ্যাকসিন (Vi Capsular Polysaccharide Vaccine – ViCPS)

TCV আসার আগে এই ভ্যাকসিনটি বহুল ব্যবহৃত হতো। এটি সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার বাইরের আবরণের একটি অংশ (পলিস্যাকারাইড) ব্যবহার করে তৈরি হয়।

  • কার্যকারিতা: এর কার্যকারিতা প্রায় ৫৫% থেকে ৭২% এবং এটি প্রায় ২-৩ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়।
  • বয়সসীমা: এই ভ্যাকসিনটি সাধারণত ২ বছরের বেশি বয়সী শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সুপারিশ করা হয়, কারণ ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
  • বুস্টার ডোজ: প্রতি ২-৩ বছর অন্তর বুস্টার ডোজ নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

মুখে খাওয়ার ভ্যাকসিন (Oral Vaccine)

এই ভ্যাকসিনটি ইনজেকশনের পরিবর্তে ক্যাপসুল হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

Ty21a ভ্যাকসিন (লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড)

এটি একটি জীবন্ত কিন্তু দুর্বল করা (Salmonella Typhi) ব্যাকটেরিয়া দিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন। এটি ক্যাপসুল আকারে পাওয়া যায়।

  • কার্যকারিতা: এর কার্যকারিতা প্রায় ৫০% থেকে ৮০% পর্যন্ত হতে পারে এবং এটি প্রায় ৫-৭ বছর সুরক্ষা দেয়।
  • প্রশাসন পদ্ধতি: এই ভ্যাকসিনের সম্পূর্ণ কোর্সে ৪টি ক্যাপসুল থাকে, যা একদিন অন্তর একটি করে খেতে হয় (যেমন, ১ম, ৩য়, ৫ম এবং ৭ম দিনে)। ক্যাপসুলটি ঠান্ডা বা সামান্য গরম জলের সাথে খালি পেটে (খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা আগে) খেতে হয়।
  • বয়সসীমা: সাধারণত ৬ বছরের বেশি বয়সী শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এটি সুপারিশ করা হয়।

ভ্যাকসিন প্রয়োগের সঠিক স্থান: কোথায় এবং কেন? 🤔

টাইফয়েড ভ্যাকসিনের প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে এর প্রয়োগের স্থান নির্ধারিত হয়।

ইনজেকটেবল ভ্যাকসিনের জন্য: ডেল্টয়েড পেশী (Deltoid Muscle)

TCV এবং ViCPS উভয় ভ্যাকসিনই হলো ইন্ট্রামাসকুলার (Intramuscular) ইনজেকশন, অর্থাৎ এগুলি সরাসরি পেশীতে দেওয়া হয়। এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এবং বহুল ব্যবহৃত স্থান হলো হাতের উপরের অংশের ত্রিকোণাকার ‘ডেল্টয়েড’ পেশী

কেন ডেল্টয়েড পেশী বেছে নেওয়া হয়?

ডেল্টয়েড পেশীকে ইনজেকশনের জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে:

  1. রক্ত সরবরাহ: এই পেশীতে প্রচুর রক্তনালী থাকে, যা ভ্যাকসিনের অ্যান্টিজেনকে দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোষ (immune cells) পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করে। ফলে শরীর দ্রুত এবং শক্তিশালীভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে।
  2. লিম্ফ নোডের নৈকট্য: ডেল্টয়েড পেশীর কাছে বগলে (axilla) অনেক লিম্ফ নোড (lymph nodes) থাকে, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র। ভ্যাকসিন দেওয়ার পর অ্যান্টিজেন সহজেই এই লিম্ফ নোডগুলিতে পৌঁছায় এবং সেখানে থাকা টি-কোষ (T-cells) ও বি-কোষকে (B-cells) সক্রিয় করে তোলে, যা কার্যকর রোগ প্রতিরোধের জন্য অপরিহার্য।
  3. নিরাপত্তা ও সুবিধা: এই স্থানে ইনজেকশন দেওয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এখানে বড় কোনো স্নায়ু বা রক্তনালীকে আঘাত করার ঝুঁকি কম। তাছাড়া, সহজেই এই স্থানটি উন্মুক্ত করা যায় বলে ইনজেকশন দেওয়ার প্রক্রিয়াটি সুবিধাজনক হয়।
  4. সীমিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: পেশীতে ইনজেকশন দিলে ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, যেমন – ফোলা বা ব্যথা, নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে এবং দ্রুত কমে যায়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: খুব ছোট শিশু বা শিশুদের ক্ষেত্রে, যাদের ডেল্টয়েড পেশী যথেষ্ট পুষ্ট নয়, তাদের জন্য অনেক সময় উরুর সামনের দিকের পেশী (vastus lateralis muscle) বেছে নেওয়া হয়। তবে TCV সাধারণত ৬ মাস বয়সের পর দেওয়া হয়, যখন ডেল্টয়েড পেশী ইনজেকশনের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

মুখে খাওয়ার ভ্যাকসিনের জন্য: মুখ এবং পরিপাকতন্ত্র

Ty21a ভ্যাকসিনটি কোনো ইনজেকশন নয়, তাই এর কোনো নির্দিষ্ট “পুশ” করার স্থান নেই। এটি ক্যাপসুলের মাধ্যমে মুখে গ্রহণ করা হয়।

এটি কিভাবে কাজ করে?

সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া সাধারণত মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে এবং অন্ত্রে (intestine) গিয়ে সংক্রমণ ঘটায়। Ty21a ভ্যাকসিনটি দুর্বল করা জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটিও একই পথে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে।

  • ক্যাপসুলটি অন্ত্রে পৌঁছানোর পর এর মধ্যে থাকা দুর্বল ব্যাকটেরিয়াগুলো অন্ত্রের প্রাচীরে থাকা রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকে (যেমন, gut-associated lymphoid tissue – GALT) সক্রিয় করে।
  • এর ফলে শরীর স্থানীয়ভাবে (অন্ত্রের মধ্যে) এবং সিস্টেমিকভাবে (সারা শরীরে) ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এটি অনেকটা প্রাকৃতিক সংক্রমণের মতোই শরীরকে ভবিষ্যতের আসল সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত করে।

ভ্যাকসিনগুলোর তুলনামূলক সারণী

বৈশিষ্ট্য টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (TCV) ভিআই ক্যাপসুলার পলিস্যাকারাইড ভ্যাকসিন (ViCPS) Ty21a (মুখে খাওয়ার ভ্যাকসিন)
ধরণ ইনজেকটেবল (কনজুগেট) ইনজেকটেবল (পলিস্যাকারাইড) মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল (লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড)
প্রয়োগের স্থান ডেল্টয়েড পেশী (হাতের উপর) ডেল্টয়েড পেশী (হাতের উপর) মুখ দিয়ে গ্রহণ, পরিপাকতন্ত্রে কাজ করে
বয়সসীমা ৬ মাস বয়স থেকে ২ বছর বয়স থেকে ৬ বছর বয়স থেকে
কার্যকারিতা প্রায় ৮৫% প্রায় ৫৫-৭২% প্রায় ৫০-৮০%
সুরক্ষার মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী (সম্ভবত আজীবন) ২-৩ বছর ৫-৭ বছর
ডোজ ১টি ডোজ ১টি ডোজ (২-৩ বছর পর বুস্টার) ৪টি ক্যাপসুলের কোর্স (১ দিন অন্তর)
About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।