Where to Buy Nakshi Kantha in Dhaka

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন: ঢাকার কোথায় পাবেন সেরা নকশিকাঁথার পণ্য?

Where to Buy Nakshi Kantha in Dhaka: নকশিকাঁথা, কেবল একটি সেলাই করা কাপড় নয়, এটি বাংলাদেশের লোকশিল্পের এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে প্রতিটি ফোঁড়ে লুকিয়ে আছে গ্রামীণ নারীর জীবনকথা, স্বপ্ন আর ঐতিহ্য। ঢাকার বুকে এই ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার নানা পণ্য কোথায় পাওয়া…

Updated Now: February 1, 2026 10:54 AM
বিজ্ঞাপন

Where to Buy Nakshi Kantha in Dhaka: নকশিকাঁথা, কেবল একটি সেলাই করা কাপড় নয়, এটি বাংলাদেশের লোকশিল্পের এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে প্রতিটি ফোঁড়ে লুকিয়ে আছে গ্রামীণ নারীর জীবনকথা, স্বপ্ন আর ঐতিহ্য। ঢাকার বুকে এই ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার নানা পণ্য কোথায় পাওয়া যায়, সেই জিজ্ঞাসা বহু ক্রেতার মনে। এই প্রশ্নের সরল উত্তর হলো—ঢাকার অভিজাত শোরুম থেকে শুরু করে ব্যস্ততম নিউ মার্কেট এবং আধুনিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত সর্বত্রই নকশিকাঁথার পণ্য মেলে। তবে, মান, নকশা এবং দামের ভিন্নতার কারণে ক্রেতাদের সঠিক জায়গাটি খুঁজে বের করা জরুরি। আড়ং, কারুপল্লী, কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফটস-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন নকশিকাঁথার পণ্যের জন্য বিখ্যাত, তেমনি উত্তরা বা গুলশানের আধুনিক বিপণনকেন্দ্রগুলোও এখন এই ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরছে। এই নিবন্ধে আমরা ঢাকার প্রধান প্রধান নকশিকাঁথা প্রাপ্তিস্থান, তাদের পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য তালিকা এবং এই শিল্পের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনাকে একটি নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত পণ্য ক্রয়ে সহায়তা করবে।

নকশিকাঁথার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

নকশিকাঁথা হলো বাংলার গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি এক বিশেষ ধরনের সেলাই করা কাঁথা। ‘নকশি’ শব্দটি এসেছে ‘নকশা’ বা ‘নকশ’ থেকে, যার অর্থ হলো নকশা বা চিত্র। আর ‘কাঁথা’ মানে হলো কাঁথা বা লেপ। অর্থাৎ, নকশিকাঁথা হলো নকশা করা কাঁথা। এর ইতিহাস সুপ্রাচীন, যা প্রাক-বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালেরও আগে) পর্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে করা হয় । তবে, লিখিত নথিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায় ষোড়শ শতকের কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থে । এই শিল্পটি মূলত অবিভক্ত বাংলার, বিশেষত বৃহত্তর ময়মনসিংহ, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী এবং বর্তমানে জামালপুর অঞ্চলের গ্রামীণ নারীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

নকশিকাঁথা তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরনো শাড়ি, লুঙ্গি বা ধুতিকে পুনর্ব্যবহার করা। কয়েকটি পুরনো কাপড় স্তরে স্তরে সাজিয়ে তার ওপর রঙিন সুতো দিয়ে নিপুণ হাতে সেলাই করা হতো। এই সেলাই কেবল কাপড়কে মজবুত করত না, বরং তাতে ফুটিয়ে তোলা হতো নানা ধরনের মোটিফ বা নকশা। এই মোটিফগুলো সাধারণত গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেমন—পদ্ম ফুল, সূর্য, জীবনবৃক্ষ, পাখি (ময়ূর, টিয়া), হাতি, ঘোড়া এবং জ্যামিতিক নকশা। হিন্দু, ইসলাম ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীকী প্রভাবও এই নকশাগুলোতে সুস্পষ্ট । প্রতিটি কাঁথা যেন এক একটি গল্প, যা সেলাইকারীর ব্যক্তিগত অনুভূতি, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং পারিপার্শ্বিক জীবনকে তুলে ধরে।

নকশিকাঁথার পুনরুজ্জীবন ও জিআই স্বীকৃতি

একসময় নকশিকাঁথা কেবল পারিবারিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। এই উদ্যোগের ফলেই নকশিকাঁথা ধীরে ধীরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে, নকশিকাঁথা বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক নির্দেশক (Geographical Indication – GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত, যা এর ঐতিহ্যগত স্বাতন্ত্র্য ও মানকে নিশ্চিত করে । এই স্বীকৃতি নকশিকাঁথা শিল্পকে আরও বেশি নির্ভরযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে।

ঢাকার কোথায় পাবেন সেরা নকশিকাঁথার পণ্য

ঢাকার বাজারে নকশিকাঁথার পণ্যের প্রাপ্তিস্থানকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: অভিজাত শোরুম, ঐতিহ্যবাহী বিপণনকেন্দ্র এবং স্থানীয়/পাইকারি বাজার। প্রতিটি স্থানের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং মূল্য পরিসীমা রয়েছে।

১. অভিজাত দেশীয় ব্র্যান্ডের শোরুম (Aarong, Kumudini)

ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে এই ব্র্যান্ডগুলোর শোরুম রয়েছে, যেখানে নকশিকাঁথার পণ্যগুলো উচ্চমান, আধুনিক ডিজাইন এবং নির্দিষ্ট মূল্যে পাওয়া যায়।

ক. আড়ং (Aarong): আভিজাত্য ও বৈচিত্র্যের প্রতীক

নকশিকাঁথাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার ক্ষেত্রে আড়ংয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা, বনানীসহ প্রায় সব বড় শপিং মলেই আড়ংয়ের শাখা রয়েছে। আড়ংয়ে কেবল ঐতিহ্যবাহী কাঁথা নয়, বরং নকশিকাঁথার মোটিফ ব্যবহার করে তৈরি শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, বেড কভার, কুশন কভার এবং ট্যাপেস্ট্রিও পাওয়া যায়।

আড়ংয়ের পণ্যগুলো সাধারণত উচ্চমানের এবং এদের নকশাগুলো বেশ আধুনিক ও রুচিশীল। তাদের নকশিকাঁথা শাড়িগুলো (যেমন মসলিন বা সিল্কের ওপর সূচিকর্ম) ১৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০,০০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হয় । বেড কভারের দামও মান ও সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে ৩৫,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। আড়ংয়ের পণ্য কেনার সুবিধা হলো, এখানে পণ্যের মান নিয়ে কোনো আপস করা হয় না এবং এটি একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত।

খ. কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফটস (Kumudini Handicrafts): ঐতিহ্যের ধারক

কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফটস তাদের পণ্যের গুণগত মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য সুপরিচিত। ঢাকার গুলশান এভিনিউতে (৭৪, গুলশান এভিনিউ, ঢাকা-১২১২) তাদের শোরুম রয়েছে। কুমুদিনী মূলত জামালপুর, সৈয়দপুর, যশোর এবং মানিকগঞ্জ থেকে নকশিকাঁথার কাজ করিয়ে আনে।

তাদের পণ্যের তালিকায় রয়েছে শাড়ি, পার্স, টেবিল ম্যাট, ওয়ালম্যাট এবং ঐতিহ্যবাহী কাঁথা। কুমুদিনীর নকশিকাঁথা শাড়িগুলো সাধারণত ৫,০০০ থেকে ৫,৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। কাঁথা বা কুইল্টগুলোর দাম ৮,১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৪,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ছোট পণ্য যেমন পার্স বা টেবিল ম্যাট ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যায় । কুমুদিনী থেকে কেনাকাটা করার অর্থ হলো, আপনি সরাসরি গ্রামীণ কারিগরদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করছেন।

২. ঐতিহ্যবাহী ও বিশেষায়িত বিপণনকেন্দ্র (Karupalli, Madhobi Mart, Source, Jatra)

এই বিপণনকেন্দ্রগুলো নকশিকাঁথাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং প্রায়শই গ্রামীণ কারিগরদের সাথে সরাসরি কাজ করে।

ক. কারুপল্লী (Karupalli): তৃণমূলের কারুশিল্পের প্রতিচ্ছবি

কারুপল্লী, যা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (BRDB)-এর একটি উদ্যোগ, নকশিকাঁথা এবং অন্যান্য হস্তশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ঢাকার কাওরান বাজারে (পল্লী ভবন, ৫ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫) তাদের শোরুম রয়েছে। কারুপল্লী জামালপুর, সাতক্ষীরা এবং যশোর অঞ্চলের কারিগরদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে।

তাদের পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিছানার চাদর, টেবিল ম্যাট এবং কুশন কভার। বিছানার চাদরগুলো ৩,০০০ থেকে ৪,৪০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। টেবিল ম্যাটের দাম শুরু হয় ৩৫০ টাকা থেকে এবং কুশন কভার ৬০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে । কারুপল্লী থেকে পণ্য কেনা মানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি উদ্যোগকে সমর্থন করা, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাহায্য করে।

খ. মাধবী মার্ট (Madhobi Mart): আধুনিকতার ছোঁয়া

মাধবী মার্ট একটি অপেক্ষাকৃত নতুন বিপণনকেন্দ্র, যা আধুনিক ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে নকশিকাঁথাকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছে। তাদের শোরুমটি উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশনের (পশ্চিম পাশে – পিলার নং ৩০) পাশে দিয়াবাড়িতে অবস্থিত।

মাধবী মার্টের স্বত্বাধিকারী সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী জানান, তাদের কাছে ৫০টিরও বেশি নকশার কাঁথা রয়েছে। হালকা ওজনের নরম কাঁথা থেকে শুরু করে তিন-চার স্তরের ভারী কাঁথাও এখানে পাওয়া যায়। দামের পরিসীমা ১,২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত । আধুনিক ক্রেতাদের জন্য তারা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইনেও অর্ডার গ্রহণ করে, যা ঘরে বসে কেনাকাটার সুবিধা দেয়।

গ. সোর্স (Source) ও যাত্রা (Jatra): ফ্যাশন ও ঐতিহ্য

মোহাম্মদপুরের সোর্স এবং বনানীর যাত্রা দেশীয় কৃষ্টি ও ফ্যাশন নিয়ে কাজ করে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানেও নকশিকাঁথার নকশা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক, কাঁথা এবং অন্যান্য গৃহসজ্জার সামগ্রী পাওয়া যায়। যারা ঐতিহ্যবাহী নকশাকে আধুনিক ফ্যাশনের সাথে মিলিয়ে পরতে চান, তাদের জন্য এই শোরুমগুলো আদর্শ।

৩. সাশ্রয়ী ও পাইকারি বাজার (New Market, Local Vendors)

যারা সাশ্রয়ী মূল্যে বা পাইকারি দামে নকশিকাঁথা কিনতে চান, তাদের জন্য ঢাকার কিছু বাজার সেরা গন্তব্য।

ক. নিউ মার্কেট ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা

ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকা নকশিকাঁথা কেনার জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান। নিউ মার্কেট সিটি কমপ্লেক্স, নিউ সুপার মার্কেট (উত্তর) এবং বনলতা কাঁচা বাজার মার্কেটের আশেপাশে বেশ কিছু দোকান রয়েছে, যেখানে পাইকারি ও খুচরা দামে নকশিকাঁথা বিক্রি হয়।

এই বাজারগুলোতে নকশিকাঁথার দাম শুরু হতে পারে মাত্র ৯০০ টাকা থেকে । তবে, এখানে পণ্যের মান যাচাই করে কেনা জরুরি, কারণ অনেক সময় কম দামে নিম্নমানের পণ্যও বিক্রি হতে পারে। পাইকারি ক্রেতারা এখানে সরাসরি কারিগর বা ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

খ. ফেরিওয়ালা ও স্থানীয় বাজার

ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এখনও ফেরিওয়ালারা সুরেলা কণ্ঠে ‘হাতের কাজের নকশিকাঁথা…’ বলে কাঁথা বিক্রি করে বেড়ান। যদিও এটি একটি অনিশ্চিত উৎস, তবে অনেক সময় তাদের কাছেও হাতে তৈরি মানসম্মত কাঁথা পাওয়া যায়। এছাড়া, বিভিন্ন স্থানীয় বাজার বা সাপ্তাহিক হাটেও নকশিকাঁথার পণ্য পাওয়া যেতে পারে।

নকশিকাঁথা শিল্পের বাজার বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান

নকশিকাঁথা কেবল একটি শিল্প নয়, এটি বাংলাদেশের হস্তশিল্প বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে এর বাজার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের হস্তশিল্প ও হোম টেক্সটাইল বাজারের পরিসংখ্যান (২০২৫-২০২৬)

সূচকপরিসংখ্যান (২০২৫-২০২৬)উৎস ও প্রাসঙ্গিকতা
হোম টেক্সটাইল বাজারের মূল্য২০২৫ সালে ৪৯১.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারবাংলাদেশের হোম টেক্সটাইল বাজারের আকার ।
প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি২০২৬ সালে ৫১১.১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাবাজারের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে ।
বার্ষিক হস্তশিল্প রপ্তানি আয়প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারহস্তশিল্প রপ্তানির বর্তমান অবস্থা ।
ডিআইটিএফ ২০২৬ অভ্যন্তরীণ লেনদেন৩৯৩ কোটি টাকা (আগের বছরের চেয়ে ৩.৪২% বৃদ্ধি)ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় নকশিকাঁথা সহ হস্তশিল্পের লেনদেন বৃদ্ধি ।
বৈশ্বিক হস্তশিল্প বাজারের মূল্য২০২৫ সালে ৭৮৭.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারনকশিকাঁথার আন্তর্জাতিক বাজারের বিশাল সম্ভাবনা।

এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে স্পষ্ট যে, নকশিকাঁথা শিল্পটি বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইল এবং হস্তশিল্প বাজারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। যদিও দেশের বার্ষিক হস্তশিল্প রপ্তানি আয় (প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) এর বিশাল সম্ভাবনার তুলনায় এখনও কম, তবে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (DITF) ২০২৬-এর মতো ইভেন্টগুলোতে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ৩.৪২% বৃদ্ধি এই শিল্পের প্রতি দেশীয় ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত দেয় ।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নকশিকাঁথার ভূমিকা

নকশিকাঁথা শিল্প মূলত গ্রামীণ নারীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। একটি মাঝারি আকারের কাঁথা তৈরি করতে ২-৩ মাস সময় লাগতে পারে এবং এর মূল্য ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে । জামালপুর অঞ্চলের নকশিকাঁথা ব্যবসায়ীদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণা থেকে জানা যায়, এই শিল্প গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা অর্জনে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ।

নকশিকাঁথা কেনার সময় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন

নকশিকাঁথা কেনার সময় ক্রেতাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা উচিত, যা পণ্যের মান, স্থায়িত্ব এবং মূল্য নির্ধারণে সাহায্য করবে।

১. সেলাইয়ের সূক্ষ্মতা ও ঘনত্ব (Stitch Quality)

নকশিকাঁথার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সেলাই। ভালো মানের কাঁথায় সেলাইগুলো হবে ঘন, সূক্ষ্ম এবং সমান। সেলাইয়ের ঘনত্ব যত বেশি হবে, কাঁথা তত বেশি টেকসই হবে এবং নকশা তত বেশি স্পষ্ট হবে। সেলাইয়ের ফোঁড়গুলো যেন কাপড়ের স্তরের ভেতর দিয়ে সমানভাবে যায়, তা নিশ্চিত করা উচিত।

২. কাপড়ের মান ও সুতোর রং (Fabric and Thread Quality)

ঐতিহ্যগতভাবে নকশিকাঁথা পুরনো সুতির কাপড় দিয়ে তৈরি হলেও, বর্তমানে নতুন সুতি, সিল্ক বা মসলিন কাপড় ব্যবহার করা হয়। কাঁথাটি যদি ব্যবহারের জন্য কেনা হয়, তবে সুতির কাপড়ই আরামদায়ক। সুতোর রং যেন পাকা হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ধোয়ার পর রং উঠে না যায়।

৩. নকশার মৌলিকত্ব ও কারিগরি দক্ষতা (Originality of Design)

নকশিকাঁথার নকশাগুলো সাধারণত হাতে আঁকা হয় এবং সেলাই করা হয়। প্রতিটি নকশা অনন্য এবং এর মধ্যে কারিগরের নিজস্বতা ফুটে ওঠে। যদি নকশাটি খুব বেশি যান্ত্রিক বা পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হয়, তবে তা হাতে তৈরি না-ও হতে পারে। আসল নকশিকাঁথার নকশায় কিছুটা অসামঞ্জস্যতা বা ত্রুটি থাকতে পারে, যা এর হাতে তৈরি হওয়ার প্রমাণ দেয়।

৪. দামের তারতম্য ও নির্ভরযোগ্যতা (Price Variation and Trust)

নকশিকাঁথার দাম এর আকার, সেলাইয়ের ঘনত্ব, নকশার জটিলতা এবং তৈরির সময় অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। একটি বড় এবং ঘন সেলাইয়ের কাঁথার দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি হবে।

 ঢাকার বাজারে নকশিকাঁথার পণ্যের আনুমানিক মূল্য তালিকা (২০২৬)

পণ্যের ধরনমূল্য পরিসীমা (টাকায়)প্রাপ্তিস্থান
ঐতিহ্যবাহী কাঁথা/কুইল্ট৯০০ – ২০,০০০+নিউ মার্কেট (কম), আড়ং/কুমুদিনী (বেশি)
নকশিকাঁথা শাড়ি৫,০০০ – ৩০,০০০+কুমুদিনী (সুতি), আড়ং (সিল্ক/মসলিন)
বেড কভার/চাদর৩,০০০ – ৩৫,০০০+কারুপল্লী (কম), আড়ং (বেশি)
কুশন কভার৬০০ – ১,৫০০কারুপল্লী, মাধবী মার্ট
টেবিল ম্যাট/পার্স৩০০ – ৭০০কুমুদিনী, মাধবী মার্ট

অভিজাত শোরুমগুলো (যেমন আড়ং) সাধারণত উচ্চমূল্যে পণ্য বিক্রি করে, কারণ তারা মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং এবং কারিগরদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, নিউ মার্কেট বা স্থানীয় বাজারগুলোতে দামাদামি করে কম দামে পণ্য পাওয়া যেতে পারে, তবে সেখানে মানের নিশ্চয়তা কম থাকে।

নকশিকাঁথা কেবল একটি পণ্য নয়, এটি বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও গ্রামীণ কারিগরদের জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ঢাকার বুকে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আড়ং, কারুপল্লী, কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফটস এবং মাধবী মার্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্রেতাদের উচিত, কেবল দামের দিকে না তাকিয়ে পণ্যের মান, সেলাইয়ের সূক্ষ্মতা এবং কারিগরের পরিশ্রমকে মূল্য দেওয়া। এই শিল্পকে সমর্থন করার মাধ্যমে আমরা কেবল একটি সুন্দর পণ্যই কিনি না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করি এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করি। তাই, ঢাকার যে কোনো প্রান্ত থেকে নকশিকাঁথা কেনার সময়, এর প্রতিটি ফোঁড়ের পেছনের গল্পটি মনে রাখা জরুরি।