Vastu Shastra Hanuman

পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি কোথায় লাগানো উচিত: সঠিক দিকনির্দেশনা ও গুরুত্ব

Vastu Shastra Hanuman: হিন্দু ধর্মে বজরংবলী বা হনুমানজিকে সংকটমোচন বলা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, তিনি ভক্তদের জীবনের সমস্ত বিপদ ও নেতিবাচক শক্তি দূর করেন। আজকাল অনেকেই ঘরে সুখ-শান্তি বজায় রাখতে এবং বাস্তু দোষ কাটাতে বাড়িতে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখেন।…

Updated Now: March 11, 2026 9:30 PM
বিজ্ঞাপন

Vastu Shastra Hanuman: হিন্দু ধর্মে বজরংবলী বা হনুমানজিকে সংকটমোচন বলা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, তিনি ভক্তদের জীবনের সমস্ত বিপদ ও নেতিবাচক শক্তি দূর করেন। আজকাল অনেকেই ঘরে সুখ-শান্তি বজায় রাখতে এবং বাস্তু দোষ কাটাতে বাড়িতে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখেন। কিন্তু শুধু ছবি কিনে এনে দেওয়ালে টাঙিয়ে দিলেই কি শুভ ফল পাওয়া যায়? একদমই নয়। বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী, দেব-দেবীর ছবি বা মূর্তি স্থাপনের নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। আপনি যদি সঠিক দিশা এবং বিধি মেনে বজরংবলীর ছবি স্থাপন না করেন, তবে সুফলের বদলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই পরিবারের মঙ্গল কামনায় এবং নেতিবাচক শক্তিকে দূরে রাখতে পঞ্চমুখী হনুমান ছবি রাখার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আজকের এই আলোচনায় আমরা জানব বাস্তুশাস্ত্র মতে বাড়ির কোন দিকে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখা সবচেয়ে শুভ, ছবি রাখার সময় কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং এর ফলে আপনার জীবনে কী কী জাদুকরী পরিবর্তন আসতে পারে।

পঞ্চমুখী হনুমানের পাঁচটি রূপের বিশেষ তাৎপর্য

হনুমানজির পঞ্চমুখী রূপের পিছনে একটি পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। রামায়ণের যুদ্ধে অহিরাবণ যখন রাম ও লক্ষ্মণকে পাতালে বন্দি করে রেখেছিলেন, তখন তাঁদের উদ্ধার করতে হনুমানজি এই রূপ ধারণ করেছিলেন। অহিরাবণের প্রাণভোমরা পাঁচটি প্রদীপের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, যা একসঙ্গে নেভানো প্রয়োজন ছিল। সেই কারণেই বজরংবলী পাঁচটি রূপ ধারণ করেন। এই পাঁচটি মুখের প্রত্যেকটির আলাদা অর্থ এবং আশীর্বাদ রয়েছে।

পূর্বমুখী বানর রূপ

পঞ্চমুখী হনুমানের মূল বা সামনের মুখটি হলো বানর রূপ, যা পূর্ব দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মুখ শত্রুদের দমন করতে এবং মনে সাহস জোগাতে সাহায্য করে । জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য যে মানসিক শক্তির প্রয়োজন, তা এই রূপের আরাধনা করলে পাওয়া যায়।

পশ্চিমমুখী গরুড় রূপ

ভগবান বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের রূপটি পশ্চিম দিকে থাকে। গরুড় মুখ জীবনের সমস্ত বাধা-বিঘ্ন এবং গুপ্ত সমস্যা দূর করে । আপনি যদি কর্মক্ষেত্রে বা ব্যবসায় বারবার বাধার সম্মুখীন হন, তবে হনুমানজির এই রূপ আপনাকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারে।

উত্তরমুখী বরাহ রূপ

উত্তর দিকের মুখটি হলো বরাহ অবতারের। এই রূপ খ্যাতি, সম্মান, ধন-সম্পদ এবং অফুরন্ত শক্তি প্রদান করে । পরিবারের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘায়ু কামনার জন্য বরাহ রূপের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বাস্তুশাস্ত্রে।

দক্ষিণমুখী নৃসিংহ রূপ

দক্ষিণ দিকে থাকে ভগবান নৃসিংহের মুখ। এই রূপ মানুষের মনের যাবতীয় ভয়, উদ্বেগ এবং অশুভ শক্তির প্রভাব নাশ করে । দক্ষিণ দিক থেকে আসা নেতিবাচক শক্তিকে রুখে দিয়ে বাড়িতে সুরক্ষার বলয় তৈরি করে নৃসিংহ রূপ।

ঊর্ধ্বমুখী হয়গ্রীব বা অশ্ব রূপ

পঞ্চমুখী হনুমানের ওপরের দিকে থাকা ঘোড়ার মতো মুখটিকে হয়গ্রীব বলা হয়। এই মুখ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, যা ভক্তদের সমস্ত অসম্পূর্ণ মনোকামনা পূরণ করে এবং জীবনে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায় ।

বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী পঞ্চমুখী হনুমান ছবি রাখার নিয়ম

বাড়িতে দেব-দেবীর ছবি রাখার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ নিয়ম থাকে, তবে পঞ্চমুখী হনুমানের ক্ষেত্রে সেই নিয়মগুলো আরও একটু নির্দিষ্ট। সঠিক নিয়ম মেনে চললে বাড়ির পরিবেশ থেকে সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর হয়ে যায়।

  • ছবিতে যেন সব কটি মুখ স্পষ্ট থাকে: বাজার থেকে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি বা মূর্তি কেনার সময় খেয়াল রাখবেন, তাতে যেন পাঁচটি মুখই খুব স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে বোঝা যায় । কোনো মুখ ঝাপসা বা অস্পষ্ট থাকলে সেই ছবি বাড়িতে না রাখাই ভালো।

  • চোখের উচ্চতায় স্থাপন: বজরংবলীর ছবি এমন উচ্চতায় রাখা উচিত, যাতে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করার সময় ছবিটি আপনার চোখের সোজাসুজি বা সামান্য ওপরে থাকে । খুব উঁচুতে বা একদম মেঝেতে ছবি রাখা বাস্তু মতে অনুচিত।

  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: দেবতার স্থানে কখনোই ধুলো-ময়লা জমতে দেবেন না। পঞ্চমুখী হনুমান ছবি রাখার নিয়ম অনুযায়ী, ছবি এবং তার আশপাশের জায়গা প্রতিদিন পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক । অপরিষ্কার স্থানে ভগবান বিরাজ করেন না।

  • সঠিক দিনে স্থাপন: হনুমানজির আরাধনার জন্য মঙ্গলবার এবং শনিবার সবচেয়ে শুভ দিন। তাই বাড়িতে নতুন ছবি বা মূর্তি স্থাপন করার হলে এই দুটি দিনের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন।

ছবি রাখার জন্য বাড়ির সেরা দিক ও স্থান

পঞ্চমুখী হনুমান ছবি রাখার নিয়ম জানার পাশাপাশি, বাড়ির কোন অংশে এটি রাখলে সবচেয়ে ভালো ফল মিলবে, তা জানা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তু বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি জায়গার কথা উল্লেখ করেছেন।

দক্ষিণ দিক বা দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ

বাস্তুশাস্ত্রে দক্ষিণ দিককে যমরাজ এবং নেতিবাচক শক্তির দিক হিসেবে ধরা হয়। মনে করা হয়, বাড়ির এই দিক দিয়েই সবচেয়ে বেশি অশুভ শক্তি প্রবেশ করে। তাই বাড়ির দক্ষিণ দেওয়ালে বা দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখা সবচেয়ে উপকারী । হনুমানজির ছবি এমনভাবে লাগান যাতে তিনি দক্ষিণ দিকে মুখ করে থাকেন। এর ফলে সমস্ত বাস্তু দোষ কেটে যায় এবং অশুভ শক্তি ঘরে ঢুকতে পারে না ।

বাড়ির সদর দরজা

বাড়ির প্রধান দরজা বা সদর দরজার ঠিক ওপরেও পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি লাগানো অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত হয় । এমন জায়গায় ছবি লাগাবেন যাতে বাইরে থেকে কেউ বাড়িতে ঢোকার সময় সবার আগে বজরংবলীর দর্শন পান । এটি একটি রক্ষাকবচের মতো কাজ করে, যা বাইরের কোনো খারাপ নজর বা নেতিবাচক শক্তিকে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না ।

ঠাকুর ঘর বা পুজোর স্থান

আপনার বাড়িতে যদি আলাদা কোনো ঠাকুর ঘর থাকে, তবে সেখানেও পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ছবিটি পূর্ব বা উত্তর দিকে মুখ করে রাখা ভালো । পূর্ব দিক ইতিবাচক শক্তি বাড়ায় এবং উত্তর দিক আর্থিক সমৃদ্ধি আকর্ষণ করে। তবে ঠাকুর ঘরে রাখলে নিয়মিত ধূপ-ধুনো দিয়ে পুজো করতে ভুলবেন না।

ছবি রাখার সময় যে ভুলগুলো একদম করবেন না

অনেকেই না জেনে বাড়ির যেকোনো জায়গায় দেব-দেবীর ছবি রেখে দেন, যা বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী মারাত্মক ভুল। নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে জেনে নিন পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখার ক্ষেত্রে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়।

বিষয়কী করবেন (Do’s)কী করবেন না (Don’ts)
স্থানের নির্বাচনসদর দরজা, দক্ষিণ দেওয়াল বা পরিষ্কার ঠাকুর ঘরে ছবি রাখুন ।শোওয়ার ঘর (Bedroom), বাথরুমের পাশের দেওয়াল বা রান্নাঘরে ছবি রাখবেন না
ছবির অবস্থানচোখের স্তরে বা তার সামান্য ওপরে ছবি স্থাপন করুন সিঁড়ির নিচে বা অন্ধকার কোনো স্যাঁতসেঁতে জায়গায় ছবি রাখবেন না
পরিচ্ছন্নতানিয়মিত ফ্রেম বা মূর্তি পরিষ্কার করুন এবং ধূপকাঠি দেখান ছবির আশেপাশে পুরনো খবরের কাগজ, বাতিল জিনিস বা আবর্জনা জমতে দেবেন না
ছবির ধরনপাঁচটি মুখই পরিষ্কার ও শান্ত ভঙ্গিতে রয়েছে এমন ছবি বাছুন অতিরিক্ত রাগী বা উগ্র রূপের ছবি বাড়িতে এড়িয়ে চলাই ভালো।

বাড়িতে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি রাখার জাদুকরী উপকারিতা

আপনি যদি সঠিক পঞ্চমুখী হনুমান ছবি রাখার নিয়ম মেনে চলেন, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার জীবনে এবং বাড়ির পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

বাস্তু দোষ এবং নেতিবাচক শক্তির বিনাশ

অনেকের বাড়িতে বিভিন্ন কারণে বাস্তু দোষ তৈরি হয়, যার ফলে পরিবারে অশান্তি, রোগব্যাধি এবং কলহ লেগেই থাকে । পঞ্চমুখী হনুমানজির ছবি এই ধরনের বাস্তু দোষ কাটাতে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী । এটি বাড়ির পরিবেশকে শান্ত রাখে এবং নেতিবাচক চিন্তাভাবনা দূর করে পজিটিভ এনার্জি ছড়িয়ে দেয় ।

ভয় ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি

হনুমানজিকে শক্তির প্রতীক বলা হয়। দক্ষিণ দিকে ওনার ছবি রাখলে মনে অকারণে যে ভয় বা দুশ্চিন্তা কাজ করে, তা দূর হয়ে যায় । আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, যার ফলে আপনি যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে ভয় পান না ।

আর্থিক সমৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে উন্নতি

বাস্তু বিজ্ঞান অনুসারে, বাড়িতে পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি থাকলে উন্নতি ও প্রগতির পথে আসা সমস্ত বাধা দূর হয়ে যায় । আপনার আটকে থাকা কাজগুলো সম্পন্ন হতে শুরু করে এবং পরিবারে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায় । বিশেষ করে যাঁরা কর্মক্ষেত্রে বা ব্যবসায় বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তাঁদের জন্য এই ছবি আশীর্বাদস্বরূপ।

শেষ কথা

হিন্দু ধর্ম ও বাস্তুশাস্ত্রে পঞ্চমুখী হনুমানকে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং শুভ বলে মনে করা হয়। আপনার বাড়িতে যদি কোনো অশান্তি থাকে বা আপনি যদি মনে করেন যে কোনো অশুভ শক্তির প্রভাব আপনার পরিবারকে পিছিয়ে দিচ্ছে, তবে আজই একটি পঞ্চমুখী বজরংবলীর ছবি বাড়িতে আনতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, শুধু ছবি আনলেই হবে না, পঞ্চমুখী হনুমান ছবি রাখার নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করাটাও জরুরি। সঠিক দিক, উচ্চতা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে ভক্তিভরে ওনার আরাধনা করুন। হনুমানজির কৃপায় আপনার বাড়ির চারপাশের সমস্ত নেতিবাচক পরিবেশ দূর হবে এবং পরিবারে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করবে।