ধোনির ‘৭’, কোহলির ‘১৮’ – রহস্য ফাঁস! ক্রিকেটারদের জার্সির নম্বর আসলে কে ঠিক করে?

ক্রিকেট মাঠে যখন শচীন তেন্ডুলকর '১০' নম্বর জার্সি পরে নামতেন, তখন সেটা শুধু একটা সংখ্যা থাকত না, হয়ে উঠত কোটি ভক্তের আবেগ। ঠিক তেমনই, এমএস ধোনির '৭' বা বিরাট কোহলির…

Ani Roy

 

ক্রিকেট মাঠে যখন শচীন তেন্ডুলকর ‘১০’ নম্বর জার্সি পরে নামতেন, তখন সেটা শুধু একটা সংখ্যা থাকত না, হয়ে উঠত কোটি ভক্তের আবেগ। ঠিক তেমনই, এমএস ধোনির ‘৭’ বা বিরাট কোহলির ‘১৮’ নম্বর জার্সি আজ ক্রিকেটারের পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু এই নম্বরগুলি আসে কোথা থেকে? এর পেছনে কি বিশেষ কোনো নিয়ম আছে? সহজ কথায়, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের জার্সির নম্বর প্রাথমিকভাবে খেলোয়াড় নিজেই পছন্দ করেন, তবে সেই পছন্দকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ড (যেমন ভারতের ক্ষেত্রে BCCI) এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (ICC) নির্দিষ্ট নিয়মাবলী মেনে অনুমোদন পেতে হয়। নতুন খেলোয়াড়রা সাধারণত দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের দ্বারা ব্যবহৃত হয়নি এমন নম্বর থেকে তাদের পছন্দের নম্বর বেছে নেওয়ার সুযোগ পান।

ক্রিকেট বিশ্বে জার্সি নম্বরের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে নতুন। ফুটবলের মতো ক্রিকেটে প্রথম থেকেই নম্বরের প্রচলন ছিল না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জার্সি নম্বরের প্রথাগত সূচনা হয় ১৯৯৯ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময়, খেলোয়াড়দের সহজে চেনার সুবিধার্থে। যদিও এর আগে, ১৯৯৫-৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের জার্সির পেছনে নম্বর দেখা গিয়েছিল, তবে আইসিসি ইভেন্টে এটি বাধ্যতামূলক ছিল না। টেস্ট ক্রিকেটে এই প্রথা চালু হয়েছে আরও অনেক পরে, ২০১৯ সালে অ্যাশেজ সিরিজ থেকে, যা নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পছন্দ, দলের ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের এক জটিল সমন্বয়।

জার্সি নম্বরের ইতিহাস: সাদা পোশাক থেকে রঙিন নম্বরে

আজ আমরা টিভিতে রঙিন জার্সিতে খেলোয়াড়দের নম্বর দেখে অভ্যস্ত হলেও, ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে এর কোনো স্থান ছিল না। টেস্ট ক্রিকেট, যা ক্রিকেটের আদি এবং অভিজাত রূপ, শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কেবল সাদা পোশাকেই খেলা হতো। সেখানে খেলোয়াড়দের চেনার একমাত্র উপায় ছিল তাদের চেহারা, উচ্চতা বা খেলার ধরণ।

ওডিআই ক্রিকেটে নম্বরের সূচনা

জার্সি নম্বরের প্রয়োজনীয়তা প্রথম অনুভূত হয় সীমিত ওভারের ক্রিকেটের (One Day Internationals) আগমনের সাথে। বিশেষ করে যখন ডে-নাইট ম্যাচ শুরু হয় এবং খেলোয়াড়রা রঙিন পোশাক পরতে শুরু করেন। দর্শকদের এবং ধারাভাষ্যকারদের জন্য দূর থেকে খেলোয়াড়দের চেনা কঠিন হয়ে পড়ছিল।

যেমনটি আগে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটে প্রথম খেলোয়াড়দের পিঠে নম্বর দেখা যায়। তবে, বিশ্বব্যাপী এটি মান্যতা পায় ১৯৯৯ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে। এই টুর্নামেন্টে আইসিসি সব দলের খেলোয়াড়দের জন্য জার্সি নম্বর বাধ্যতামূলক করে। সেই সময়ে, বেশিরভাগ দলের অধিনায়করা ‘১’ নম্বর জার্সি পরতেন (যেমন অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ওয়া), তবে ভারতের অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ‘৯’ নম্বর জার্সি পরেছিলেন। শচীন তেন্ডুলকর তখন ‘১০’ নম্বর পেয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে ইতিহাস হয়ে যায়।

মেসি যুগের অবসানের পর কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে আর্জেন্টিনা?

টেস্ট ক্রিকেটে নম্বরের আগমন: এক বিতর্কিত অধ্যায়

টেস্ট ক্রিকেটে জার্সি নম্বর চালু করা ছিল এক বৈপ্লবিক এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। ২০১৯ সালের ১ আগস্ট, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (WTC) সূচনালগ্নে, ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজের (অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড) প্রথম টেস্টে খেলোয়াড়রা প্রথমবার সাদা জার্সির পিঠে নাম এবং নম্বর নিয়ে মাঠে নামেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) এই পদক্ষেপ নিয়েছিল মূলত নতুন দর্শকদের টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট করতে এবং খেলোয়াড়দের পরিচিতি বাড়াতে। তাদের যুক্তি ছিল, টি-টোয়েন্টি বা ওডিআই দেখে অভ্যস্ত দর্শকরা টেস্টেও তাদের প্রিয় খেলোয়াড়কে সহজে চিনতে পারবেন।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে ক্রিকেটের অনেক বিশুদ্ধতাবাদী (purists) ভালোভাবে নেননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট এবং ব্রেট লি-এর মতো তারকারা এর তীব্র সমালোচনা করেন। তাদের মতে, টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্য এর সাদা পোশাকেই নিহিত, সেখানে নাম বা নম্বর সেই আভিজাত্যকে ক্ষুণ্ণ করে। তবে, সময়ের সাথে সাথে এই প্রথাটি এখন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নম্বর নির্বাচনের প্রক্রিয়া: কে, কীভাবে এবং কেন?

জার্সির নম্বর ঠিক করার প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। এটি কেবল “ইচ্ছে হলো আর নিয়ে নিলাম” এমন নয়।

খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পছন্দ (The Player’s Choice)

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, খেলোয়াড়রাই তাদের জার্সির নম্বর বেছে নেন। এই পছন্দের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে:

  • জন্ম তারিখ: অনেক খেলোয়াড় তাদের জন্ম তারিখ বা মাসকে জার্সি নম্বর হিসেবে বেছে নেন। যেমন, এমএস ধোনির জন্মদিন ৭ই জুলাই (07/07), তাই তিনি ‘৭’ নম্বর বেছে নেন। যুবরাজ সিং-এর জন্মদিন ১২ই ডিসেম্বর (12/12), তিনি ‘১২’ নম্বর পরতেন।
  • ভাগ্যবান সংখ্যা (Lucky Number): অনেকেই সংখ্যাতত্ত্ব বা জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করেন। সৌরভ গাঙ্গুলী তার ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ‘১’, ‘২৪’ এবং পরবর্তীতে ‘৯৯’ নম্বর জার্সি পরেছেন, যার পেছনে সংখ্যাতত্ত্বের প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়। রোহিত শর্মা ‘৪৫’ নম্বর পরেন কারণ তার মা এই নম্বরটি পছন্দ করেছিলেন।
  • ব্যক্তিগত আবেগ বা স্মৃতি: বিরাট কোহলির ‘১৮’ নম্বর জার্সির পেছনে এক আবেগঘন কারণ রয়েছে। ২০০৬ সালের ১৮ই ডিসেম্বর তার বাবা মারা যান। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই তিনি এই নম্বরটি বেছে নেন, যা তিনি তার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ের সময়ও পরতেন।
  • আইডলের নম্বর: অনেক তরুণ খেলোয়াড় তাদের ক্রিকেট আইডলের নম্বর দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। যদিও জাতীয় দলে একই নম্বর পাওয়া কঠিন।
  • অদ্ভূত কারণ: ক্রিস গেইল তার সর্বোচ্চ টেস্ট স্কোর (৩৩৩) স্মরণীয় করে রাখতে ‘৩৩৩’ নম্বর জার্সি পরেন। হার্দিক পান্ডিয়া একসময় ‘২২৮’ পরেছিলেন, যা তার একটি ঘরোয়া ম্যাচে করা সর্বোচ্চ স্কোর ছিল।

    কল্পনাতীত টাকার অফার! মোদীর বাহন নির্মাতা টয়োটাই কি এবার ভারতীয় ক্রিকেট দলের নতুন স্পনসর?

 বোর্ড এবং টিম ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা

একজন খেলোয়াড় একটি নম্বর পছন্দ করলেই তা চূড়ান্ত হয়ে যায় না। প্রক্রিয়াটি হলো:

১. অনুরোধ (Request): যখন কোনো নতুন খেলোয়াড় দলে যোগ দেন, তখন তাকে তার পছন্দের কয়েকটি নম্বর জমা দিতে বলা হয়।

২. যাচাইকরণ (Verification): টিম ম্যানেজার বা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট বিভাগ খতিয়ে দেখে যে ওই নম্বরটি ইতিমধ্যেই দলের অন্য কোনো খেলোয়াড়ের (বর্তমান বা সম্প্রতি খেলা) কাছে আছে কিনা।

৩. বরাদ্দ (Allocation): যদি নম্বরটি উপলব্ধ থাকে, তবে তা খেলোয়াড়কে বরাদ্দ করা হয়।

যদি দুজন খেলোয়াড় একই নম্বর চান? সাধারণত, দলে যিনি সিনিয়র বা যিনি আগে থেকে ওই নম্বরটি ব্যবহার করছেন, তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

 আইসিসি (ICC)-এর নিয়মাবলী

আইসিসি ইভেন্টগুলিতে (যেমন বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, WTC) জার্সি নম্বরের ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়ম মানা হয়। আইসিসি-এর “Clothing and Equipment Regulations” অনুযায়ী:

  • খেলোয়াড়রা সাধারণত ১ থেকে ১০০-এর মধ্যে নম্বর বেছে নিতে পারেন। (যদিও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এর বাইরেও নম্বর দেখা যায়)।
  • একটি টুর্নামেন্টের জন্য স্কোয়াডে থাকা কোনো দুজন খেলোয়াড়ের নম্বর একই হতে পারবে না।
  • নম্বরের আকার, ফন্ট এবং জার্সিতে তার অবস্থান নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকে, যাতে তা সম্প্রচারের সময় স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

জার্সি নম্বর ‘রিটায়ার’ (Retire) করা: সম্মান ও বিতর্ক

ক্রিকেটে জার্সি নম্বর ‘রিটায়ার’ করার প্রথাটি খুব বেশি প্রচলিত না হলেও, এর কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। যখন একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় অবসর নেন, তখন তার প্রতি সম্মান জানাতে বোর্ড সেই নম্বরটি অন্য কোনো খেলোয়াড়কে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

 শচীন তেন্ডুলকর এবং ‘১০’ নম্বর বিতর্ক

ভারতীয় ক্রিকেটে ‘১০’ নম্বর জার্সিটি শচীন তেন্ডুলকরের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। তিনি অবসর নেওয়ার পর, এই নম্বরটি কে পরবেন তা নিয়ে একধরনের অলিখিত প্রশ্ন তৈরি হয়।

২০১৭ সালে, পেসার শার্দূল ঠাকুর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে ‘১০’ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় শচীন ভক্তরা এর তীব্র সমালোচনা করেন। ভক্তদের আবেগ এবং শচীনের প্রতি সম্মান জানিয়ে, ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (BCCI) অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘১০’ নম্বর জার্সিটিকে ‘রিটায়ার’ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর অর্থ হলো, ভারতীয় সিনিয়র দলের আর কোনো খেলোয়াড়কে এই নম্বরটি দেওয়া হবে না। যদিও আইসিসি টুর্নামেন্টে এই নিয়ম শিথিল হতে পারে, কারণ আইসিসি সাধারণত নম্বর রিটায়ার করার পক্ষে নয়।

 ফিল হিউজ এবং ‘৬৪’ নম্বর

জার্সি রিটায়ার করার সবচেয়ে আবেগঘন উদাহরণটি হলো অস্ট্রেলিয়ার ফিল হিউজের ‘৬৪’ নম্বর জার্সি। ২০১৪ সালে, একটি ঘরোয়া ম্যাচে বলের আঘাতে মর্মান্তিকভাবে মারা যান এই তরুণ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান। তার মৃত্যুর পর, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (CA) তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়ে ‘৬৪’ নম্বর জার্সিটিকে স্থায়ীভাবে রিটায়ার করে দেয়।

আইপিএল (IPL) এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নম্বরের খেলা

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) বা অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে জার্সি নম্বরের নিয়মাবলী কিছুটা আলাদা এবং শিথিল। এখানে খেলোয়াড়ের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।

আইপিএল-এ খেলোয়াড়রা সাধারণত তাদের আন্তর্জাতিক বা পছন্দের নম্বরটিই ধরে রাখেন। যেমন, এমএস ধোনি চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে ‘৭’ এবং বিরাট কোহলি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে ‘১৮’ পরেন। এটি তাদের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড “MSD 7” বা “VK 18” তৈরিতে সাহায্য করে, যা মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সমস্যা হয় যখন একই নম্বর পছন্দ করেন এমন দুজন খেলোয়াড় একই দলে আসেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি দুজন খেলোয়াড়ের প্রিয় নম্বর ‘৭’ হয়, তবে দলের সিনিয়র খেলোয়াড় বা যিনি আগে থেকে দলে আছেন, তিনি সেই নম্বরটি পান। নতুন খেলোয়াড়কে অন্য নম্বর বেছে নিতে হয়।

বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জার্সি নম্বর ও তার পেছনের গল্প

কিছু জার্সি নম্বর খেলোয়াড়দের পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে।

খেলোয়াড় জার্সি নম্বর নম্বরের পেছনের কারণ/গল্প
শচীন তেন্ডুলকর ১০ প্রাথমিকভাবে তার পদবী ‘Tendulkar’-এ ‘Ten’ (দশ) শব্দটি থাকার কারণে তিনি এটি বেছে নেন।
এমএস ধোনি তার জন্মদিন ৭ই জুলাই। তিনি ৭ সংখ্যাটিকে খুব শুভ বলে মনে করেন।
বিরাট কোহলি ১৮ তার বাবার মৃত্যুদিন (১৮ই ডিসেম্বর) এবং তার অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নম্বর।
রোহিত শর্মা ৪৫ তার মায়ের পছন্দে এই নম্বর। সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ীও এটি তার জন্য শুভ।
সৌরভ গাঙ্গুলী ৯৯/২৪/১ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নম্বর ব্যবহার করেছেন, যার পেছনে সংখ্যাতত্ত্বের প্রভাব ছিল। ৯৯ ছিল সর্বোচ্চ নম্বর।
শেন ওয়ার্ন ২৩ বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডনের ‘২৩’ নম্বর দ্বারা অনুপ্রাণিত।
রাহুল দ্রাবিড় ১৯ তার স্ত্রীর জন্মদিন (১৯শে এপ্রিল) মনে রাখার সহজ উপায় হিসেবে তিনি এই নম্বরটি বেছে নেন।
বীরেন্দ্র শেবাগ – (নম্বরহীন) একটা সময় পর্যন্ত নম্বর (যেমন ১২) পরলেও, জ্যোতিষীর পরামর্শে তিনি নম্বর ছাড়াই খেলা শুরু করেন।
ক্রিস গেইল ৩৩৩ তার টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোর ৩৩৩।
এবি ডি ভিলিয়ার্স ১৭ তার জন্ম তারিখ ১৭ই ফেব্রুয়ারি।

এই উদাহরণগুলি দেখায় যে জার্সি নম্বর এখন আর শুধু পরিচিতির জন্য নয়, এটি খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত গল্প, বিশ্বাস এবং আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভারতের দ্রুততম বোলারদের তালিকা দেখলেও দেখা যাবে, প্রত্যেকের নম্বরের পেছনেই কোনো না কোনো ব্যক্তিগত কারণ রয়েছে।

জার্সি নম্বরের গুরুত্ব: শুধু সংখ্যা নয়, এক পরিচিতি

আধুনিক ক্রিকেটে জার্সি নম্বরের গুরুত্ব অপরিসীম।

খেলোয়াড় পরিচিতি (Player Identification)

মাঠে ১১ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে দ্রুত কাউকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার জার্সি নম্বর। বিশেষ করে স্টেডিয়ামের দূর থেকে বা টিভিতে খেলা দেখার সময়, ধারাভাষ্যকার এবং দর্শক—উভয়ের জন্যই এটি অপরিহার্য। টেস্ট ক্রিকেটে এটি চালু হওয়ার পেছনেও এই যুক্তিটিই প্রধান ছিল।

ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং (Branding and Marketing)

বর্তমান সময়ে ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি বিশাল শিল্প। খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বর তাদের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরিতে সাহায্য করে। “VK 18”, “MSD 7”, “Rohit 45″—এই নামগুলি এখন জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। কোম্পানিগুলি এই ব্র্যান্ড ভ্যালুর ওপর ভিত্তি করে স্পনসরশিপ দেয়।

এছাড়াও, ফ্যান মার্চেন্ডাইজ (যেমন জার্সি, ক্যাপ, ইত্যাদি) বিক্রির ক্ষেত্রে এই নম্বরগুলি বিশাল ভূমিকা পালন করে। ভক্তরা তাদের প্রিয় খেলোয়াড়ের নির্দিষ্ট নম্বরের জার্সি কিনতেই বেশি পছন্দ করেন।

ভক্তদের সাথে মানসিক সংযোগ

যখন একজন ভক্ত তার প্রিয় খেলোয়াড়ের নম্বরের জার্সি পরেন, তখন তিনি সেই খেলোয়াড়ের সাথে একাত্মতা বোধ করেন। শচীনের ‘১০’ বা ধোনির ‘৭’ নম্বর জার্সি পরা মানে শুধু একটি পোশাক পরা নয়, এটি সেই খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা এবং সমর্থনের প্রতীক।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

ক্রিকেটের বিবর্তন ঘটেছে এর জন্মলগ্ন থেকে। জার্সি নম্বরের প্রবর্তন সেই বিবর্তনেরই একটি অংশ। যা একদিন শুধুমাত্র খেলোয়াড়দের চেনার সুবিধার্থে শুরু হয়েছিল, তা আজ খেলোয়াড়ের পরিচয়, আবেগ, বিশ্বাস এবং বিলিয়ন ডলারের মার্কেটিং কৌশলের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুতরাং, একজন ক্রিকেটারের জার্সি নম্বর কে ঠিক করে? এর উত্তর হলো—এটি একটি সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। শুরুটা হয় খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পছন্দ দিয়ে, যা তার জীবনের কোনো গল্প বা বিশ্বাস থেকে আসে। কিন্তু সেই পছন্দকে চূড়ান্ত রূপ দেয় সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসি-এর নির্ধারিত নিয়মাবলী। শচীনের ‘১০’ নম্বরের অনানুষ্ঠানিক অবসর বা ফিল হিউজের ‘৬৪’ নম্বরের স্থায়ী অবসর দেখিয়ে দেয় যে, এই নম্বরগুলি এখন আর শুধু সংখ্যা নয়, এগুলি ক্রিকেটের ইতিহাসে একেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

About Author
Ani Roy

অনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডুকেশনে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং আজীবন শেখার প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনি নতুন শিক্ষামূলক পদ্ধতি ও প্র্যাকটিসগুলি অন্বেষণ করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তার একাডেমিক যাত্রা তাকে শিক্ষার তত্ত্ব এবং ব্যবহারিক শিক্ষণ কৌশলগুলিতে দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করেছে। অনি অন্তর্দৃষ্টি এবং দক্ষতা তার চিন্তাশীল লেখাগুলিতে প্রতিফলিত হয়, যা শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত ও তথ্যপূর্ণ করার উদ্দেশ্যে লেখা। তিনি তার আকর্ষণীয় এবং প্রভাবশালী কাজের মাধ্যমে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখতে থাকেন।