ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কেঁপে উঠছেন? জানুন কেন হয় এই ‘জাম্প স্কেয়ার’!

আপনি কি কখনো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন যে ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হঠাৎ করে শরীরে একটা তীব্র ঝাঁকুনি লেগেছে? মনে হয়েছে যেন আপনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাচ্ছেন?…

Debolina Roy

 

আপনি কি কখনো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন যে ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হঠাৎ করে শরীরে একটা তীব্র ঝাঁকুনি লেগেছে? মনে হয়েছে যেন আপনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাচ্ছেন? এই ঘুমের ঘোরে আচমকা শরীর কেঁপে ওঠে কেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে চান অনেকেই।

চিন্তার কোনো কারণ নেই! আপনি একা নন। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০% মানুষ জীবনে কমপক্ষে একবার হলেও এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। এই রহস্যময় ঘটনাটির একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, যা জানলে আপনার সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে।

হিপনিক জার্ক কী এবং কেন হয়?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় হিপনিক জার্ক (Hypnic Jerk) বা হিপনাগোজিক জার্ক। এটি একধরনের মায়োক্লোনাস – অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচন যা ঘুমের শুরুর পর্যায়ে ঘটে থাকে।

ঘুমের ঘোরে আচমকা শরীর কেঁপে ওঠে কেন এর মূল কারণটি বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে ঘুমের প্রক্রিয়া সম্পর্কে। জাগ্রত অবস্থা থেকে গভীর ঘুমে যাওয়ার সময় আমাদের শরীরে একটি জটিল রূপান্তর ঘটে।

মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে যোগাযোগের ব্যাঘাত

ঘুমের প্রাথমিক পর্যায়ে nREM (Non-Rapid Eye Movement) এর N1 দশায় আমাদের শরীরের পেশিগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে। কিন্তু এই সময় মস্তিষ্ক এখনও সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্ক যখন পেশির এই শিথিলতা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না, তখন অ্যামিগডালা নামক অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই অ্যামিগডালা আকস্মিক ভীতি বা বিপদের সংকেত পাঠায়, যার ফলে শরীরে একটি প্রতিরক্ষামূলক ঝাঁকুনি সৃষ্টি হয়। এভাবেই ঘুমের ঘোরে আচমকা শরীর কেঁপে ওঠে কেন এর রহস্যের সমাধান পাওয়া যায়।

হিপনিক জার্কের লক্ষণ ও অনুভূতি

হিপনিক জার্কের সময় বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি হতে পারে:

  • পড়ে যাওয়ার অনুভূতি: মনে হয় যেন আপনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন

  • বিদ্যুৎ স্পর্শের মতো ঝাঁকুনি: শরীরে হঠাৎ একটা তীব্র কাঁপুনি

  • হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি: হার্ট রেট হঠাৎ বেড়ে যাওয়া

  • শ্বাসকষ্ট: দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের হার

  • ঘাম: হঠাৎ ঘেমে যাওয়া

এই লক্ষণগুলো সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী হয় এবং কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে না।

কারা বেশি আক্রান্ত হন?

গবেষণায় দেখা গেছে যে:

  • পুরুষদের মধ্যে হিপনিক জার্ক বেশি দেখা যায়

  • তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্করা শিশু-কিশোরদের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হন

  • অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচী যাদের, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন

  • দৈনিক ১০% মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন

হিপনিক জার্কের কারণসমূহ

জীবনযাত্রাগত কারণ

ক্যাফেইনের অতিরিক্ত ব্যবহার: কফি, চা, এনার্জি ড্রিংক ঘুমানোর আগে খেলে মস্তিষ্ক উত্তেজিত থাকে। ঘুমের ঘোরে আচমকা শরীর কেঁপে ওঠে কেন এর একটি প্রধান কারণ হলো ক্যাফেইনের প্রভাব।

মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা মস্তিষ্ককে অস্থির রাখে।

অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস: রাত জেগে থাকা, দিনে ঘুমানো, ঘুমের সময় পরিবর্তন করা।

শারীরিক কারণ

পুষ্টির অভাব: শরীরে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন B12 এর অভাব।

অতিরিক্ত ক্লান্তি: দিনভর অধিক পরিশ্রমের পর যখন শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু ওষুধ, বিশেষ করে SSRI অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট হিপনিক জার্ক বাড়াতে পারে।

কীভাবে প্রতিরোধ করবেন হিপনিক জার্ক?

ঘুমের পরিবেশ উন্নত করুন

অন্ধকার ও শান্ত পরিবেশ: ঘুমানোর সময় ঘর যথাসম্ভব অন্ধকার ও শব্দমুক্ত রাখুন।

আরামদায়ক তাপমাত্রা: ঘরের তাপমাত্রা ১৬-১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখুন।

নিয়মিত ঘুমের সময়সূচী: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান ও জাগুন।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন

ক্যাফেইন সীমিত করুন: ঘুমানোর কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা আগে কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংক এড়িয়ে চলুন।

পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ: ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন কলা, বাদাম, পালংশাক খান।

রাতের খাবার হালকা রাখুন: ভারী খাবার হজমে সময় লাগে, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।

চাপ ব্যবস্থাপনা

মেডিটেশন: দৈনিক ১০-১৫ মিনিট ধ্যান করুন।

শ্বাসের ব্যায়াম: ৪-৭-৮ পদ্ধতি ব্যবহার করুন (৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন, ৭ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৮ সেকেন্ডে ছাড়ুন)।

প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন: শরীরের বিভিন্ন অংশের পেশি ক্রমান্বয়ে শিথিল করুন।

ব্যায়াম ও শারীরিক কার্যক্রম

সকালে হালকা ব্যায়াম: দিনের প্রথমে বা বিকালে নিয়মিত ব্যায়াম করুন, রাতে নয়।

যোগব্যায়াম: বিশেষ করে রেস্টোরেটিভ যোগা ভালো ফলাফল দেয়।

হাঁটাহাঁটি: দৈনিক ৩০ মিনিট হাঁটুন, তবে ঘুমানোর ৩ ঘণ্টা আগে নয়।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন?

যদিও হিপনিক জার্ক সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবুও নিম্নলিখিত অবস্থায় চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন:

  • সপ্তাহে ৩-৪ বারের বেশি হিপনিক জার্ক হলে

  • ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে

  • দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করলে

  • অস্থিরতা ও মনোযোগের অভাব তৈরি হলে

চিকিৎসকরা প্রয়োজনে পলিসমনোগ্রাফি বা EEG পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয় করতে পারেন।

আধুনিক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসা

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে হিপনিক জার্ক আমাদের বিবর্তনীয় অতীতের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন গাছে ঘুমাতেন, তখন পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য এই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

আমেরিকান একাডেমি অফ স্লিপ মেডিসিন (AASM) এর সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা।

সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের জন্য টিপস

হাইড্রেশন: দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, তবে ঘুমানোর ২ ঘণ্টা আগে কম পান করুন।

সূর্যের আলো: দিনে কমপক্ষে ৩০ মিনিট প্রাকৃতিক আলোতে থাকুন।

ইলেকট্রনিক ডিভাইস সীমিত করুন: ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বন্ধ রাখুন।

ঘুমের ডায়েরি: কখন হিপনিক জার্ক হয়, তার একটি রেকর্ড রাখুন।

ঘুমের ঘোরে আচমকা শরীর কেঁপে ওঠে কেন এই প্রশ্নের উত্তর এখন আপনার কাছে স্পষ্ট। এটি একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যা সঠিক জীবনযাত্রা মেনে চললে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মনে রাখবেন, আপনি একা নন এবং এর জন্য ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। নিয়মিত ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলে সুস্থ ও সুখী জীবনযাপন করুন।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।