জগদ্ধাত্রী পূজার প্রতিমা দর্শনে অনেকের মনেই এই প্রশ্নটি আসে যে, দেবীর বাহন সিংহের পায়ের নিচে একটি হাতি দলিত হচ্ছে কেন? এই দৃশ্য দেখে অনেকেই ভাবেন, এখানে কি আক্ষরিক অর্থেই ‘হাতি মারা’ হচ্ছে? প্রথমেই এই বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। জগদ্ধাত্রী পূজায় কোনো জীবন্ত হাতিকে হত্যা করা হয় না এবং এই মূর্তি কোনো হিংসার প্রচার করে না। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক প্রতীকের রূপায়ণ। এই ‘হাতি’ আসলে একটি হস্তীরূপী অসুর, যার নাম ‘করীন্দ্রাসুর’। দেবীর পদতলে তার এই অবস্থান আসলে অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির জয় নয়, বরং এটি মানুষের ভেতরের ‘অহংকার’ (Ego) বা ‘তমঃ’ গুণের দমনের প্রতীক। জগদ্ধাত্রী পূজা মূলত এই আত্ম-অহংকারকে বিনাশ করে নিজের ভেতরের সত্ত্বগুণ বা পরম চৈতন্যকে জাগ্রত করার আরাধনা। তাই এই প্রতিমা আমাদের শেখায় যে, জীবজগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী হাতিও যখন আসুরিক অহংকারের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন পরমেশ্বরী শক্তি তাকে দমন করে জগতের ভারসাম্য রক্ষা করেন।
জগদ্ধাত্রী মূর্তিতত্ত্বের গভীর তাৎপর্য
দেবী জগদ্ধাত্রীর মূর্তি বা প্রতিমা হিন্দু দর্শনের এক গভীর রূপক। প্রতিটি অংশই এক একটি বিশেষ অর্থ বহন করে, যা বুঝতে পারলে পূজার আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়।
দেবী জগদ্ধাত্রী: সত্ত্বগুণের প্রতীক
দেবী জগদ্ধাত্রী হলেন ত্রিনয়নী, চতুর্ভুজা এবং তাঁর গায়ের রঙ উদীয়মান সূর্যের মতো। এই উজ্জ্বল অরুনাভ বর্ণ ‘সত্ত্বগুণের’ প্রতীক। তিনি পরম শান্ত, অথচ তাঁর মধ্যে নিহিত রয়েছে সমগ্র জগতের চালিকাশক্তি। তাঁর চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, ধনু ও বাণ। তন্ত্র ও পুরাণ মতে, তিনিই হলেন জগতের ধাত্রী বা ধারণকর্ত্রী। যখন মহিষাসুর বধের পর দেবতারা অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন, তখন তাঁদের দর্প চূর্ণ করতে দেবী এই শান্ত, সৌম্য রূপে আবির্ভূত হন। তিনি যুদ্ধরতা নন, তিনি স্থিতিশীল শক্তির আধার।
সিংহ: দেবীর বাহন
দেবীর বাহন সিংহ। তবে এই সিংহ উগ্র বা হিংস্র নয়। এই সিংহও সত্ত্বগুণের প্রতীক, যা দেবীর শক্তিকে ধারণ করে আছে। সিংহ এখানে রাজসিক শক্তির (Rajas) প্রতীক নয়, বরং এটি দেবীর নির্দেশে চালিত এক ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক।
করীন্দ্রাসুর: পদতলে দলিত সেই ‘হাতি’
এবারে আসা যাক মূল প্রসঙ্গে—সেই ‘হাতি’। এই হাতিটি আসলে করীন্দ্রাসুর নামক এক অসুর। ‘করী’ শব্দের অর্থ হাতি এবং ‘ইন্দ্র’ এখানে শ্রেষ্ঠত্ব বোঝায়। অর্থাৎ, সে ছিল হস্তীরূপী শ্রেষ্ঠ অসুর। এই অসুর হলো মানুষের ভেতরের প্রবল ‘অহংকার’ (Ego) এবং ‘তমঃ’ গুণের (Ignorance/Darkness) প্রতীক। হাতি সাধারণত শক্তি, বুদ্ধি ও আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু সেই শক্তি যখন অসুরত্ব বা অহংকারে রূপান্তরিত হয়, তখন তা জগতের ভারসাম্য নষ্ট করে।
দেবী জগদ্ধাত্রী এই করীন্দ্রাসুরকে বধ করছেন না, তিনি তাকে ‘দমন’ করছেন। সিংহের থাবা সেই হাতির মাথায় চেপে বসে আছে, যা সূচিত করে যে—সত্ত্বগুণ বা ঐশ্বরিক চৈতন্য যখন জাগ্রত হয়, তখন তা আমাদের পাশবিক প্রবৃত্তি, তমঃ গুণ এবং সর্বনাশা অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে পদানত করে রাখে। তাই এই ‘হাতি মারা’ দৃশ্যটি আসলে অহংকারের বিনাশ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
পৌরাণিক আখ্যান: কেন এই হাতিরূপী অসুর?
জগদ্ধাত্রী রূপের উৎপত্তির পেছনে যে পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে, তা কেনোপনিষদ ও অন্যান্য পুরাণে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ণিত আছে। তবে সব কাহিনীর মূল সুর এক—দেবতাদের অহংকার চূর্ণ করা।
দেবতাদের দর্পহরণ
দুর্গাপূজার কাহিনীতে আমরা দেখি, দেবী মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দেন। এই বিশাল জয়ের পর দেবতাদের মধ্যে এক সূক্ষ্ম অহংকার জন্ম নেয়। তাঁরা ভাবতে শুরু করেন, এই জয় তাঁদের নিজেদের শক্তির ফল। অগ্নি ভাবেন, তিনি সব দহন করতে পারেন; বায়ু ভাবেন, তিনি সব উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারেন; ইন্দ্র ভাবেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ।
তাঁদের এই দর্প বা অহংকার চূর্ণ করার জন্য পরমব্রহ্ম এক ‘যক্ষ’-এর রূপ ধারণ করে তাঁদের সামনে আবির্ভূত হন। তিনি দেবতাদের পরীক্ষার জন্য একটি তৃণখণ্ড (ঘাসের টুকরো) রেখে বলেন, “তোমরা স্ব স্ব শক্তি প্রয়োগ করে এই তৃণখণ্ডটিকে সরাও বা পোড়াও।”
অগ্নিদেব তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও সেই তৃণখণ্ড পোড়াতে ব্যর্থ হন। পবনদেব তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়েও সেটিকে একচুল নড়াতে পারেন না। দেবরাজ ইন্দ্র যখন সেই যক্ষের দিকে অগ্রসর হন, তখন যক্ষ অন্তর্হিত হন এবং সেই স্থানে আবির্ভূতা হন এক স্বর্ণবর্ণা দেবী—উমা হৈমবতী বা দেবী জগদ্ধাত্রী।
করীন্দ্রাসুরের জন্ম ও দমন
দেবী তখন দেবতাদের বোঝান যে, “তোমরা যে শক্তি দিয়ে অসুর বধ করেছ, তা তোমাদের নিজস্ব শক্তি নয়। সেই শক্তি আমারই। আমিই সেই পরমব্রহ্ম, আমিই জগতের ধাত্রী।” দেবতাদের এই সম্মিলিত অহংকারই তখন এক মূর্ত রূপ ধারণ করে—তা হলো করীন্দ্রাসুর বা হাতিরূপী অসুর।
এই অহংকার যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ধ্বংসলীলা শুরু করতে যায়, তখন দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁর সত্ত্বগুণের বাহন সিংহের উপর আসীন হয়ে সেই অশুভ অহংকাররূপী করীন্দ্রাসুরকে দমন করেন এবং পদতলে পিষ্ট করে জগতের ভারসাম্য পুনঃস্থাপন করেন। এই কারণেই জগদ্ধাত্রী মূর্তিতে সিংহের পায়ের তলায় সর্বদা একটি হাতি বা করীন্দ্রাসুরকে দেখা যায়। এটি এক আধ্যাত্মিক বার্তা দেয় যে, জীবনে যত বড় সাফল্যই আসুক না কেন, অহংকারকে সর্বদা পদানত রাখতে হয়।
পূজার ইতিহাস: মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও এক স্বপ্নাদেশ
বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজার যে ধুমধাম আজ আমরা দেখি, তার প্রচলনের কৃতিত্ব মূলত নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে দেওয়া হয়। এই পূজার প্রচলন নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনী রয়েছে।
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের রোষানলে পড়েন। সময়মতো খাজনা বা রাজস্ব পরিশোধ করতে না পারায় নবাব তাঁকে মুর্শিদাবাদের কারাগারে বন্দী করেন। সেই বছর দুর্গাপূজার ঠিক আগে তিনি বন্দী হন, ফলে তাঁর রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা বন্ধ হয়ে যায়। দুর্গাপূজায় অংশ নিতে না পারায় মহারাজা অত্যন্ত মর্মাহত ও বিষণ্ণ হয়ে পড়েন।
পরে, দুর্গাপূজা শেষ হয়ে গেলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ভগ্ন হৃদয়ে তিনি যখন মুর্শিদাবাদ থেকে নদীপথে কৃষ্ণনগরে ফিরছিলেন, তখন কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথির রাতে তিনি নৌকার মধ্যেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কথিত আছে, সেই তন্দ্রার মধ্যেই তিনি এক দিব্য স্বপ্নাদেশ পান। দেবী এক কুমারী বালিকার রূপে তাঁকে দেখা দিয়ে বলেন, “হে রাজা, তুমি দুর্গাপূজায় আমার আরাধনা করতে পারোনি বলে দুঃখ কোরো না। ঠিক এক মাস পর, কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে আমার এই ‘জগদ্ধাত্রী’ রূপে পুনরায় পূজা করো। আমি তোমার পূজা গ্রহণ করব।”
স্বপ্নেই দেবী তাঁকে তাঁর এই চতুর্ভুজা, সিংহবাহিনী, অরুণবর্ণা রূপটি দেখিয়ে দেন। কৃষ্ণনগরে ফিরে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বিপুল সমারোহে এই জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন। মনে করা হয়, এটিই বাংলার প্রথম বারোয়ারি বা সর্বজনীন পূজাগুলোর মধ্যে অন্যতম, কারণ রাজা এই পূজায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রজাকে অবারিত দ্বার করে দিয়েছিলেন। নদিয়া জেলার সরকারি পোর্টালে (nadia.gov.in) এই ঐতিহাসিক পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়।
চন্দননগর ও কৃষ্ণনগর: জগদ্ধাত্রী পূজার দুই প্রধান পীঠস্থান
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে জগদ্ধাত্রী পূজা মূলত দুটি শহরকে কেন্দ্র করে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে—কৃষ্ণনগর এবং চন্দননগর। যদিও পূজা একই দেবীর, তবুও দুই জায়গার উদযাপনের ধরনে নিজস্বতা রয়েছে।
চন্দননগরের আলোর রোশনাই ও থিমের বৈচিত্র্য
একদা ফরাসি উপনিবেশ থাকা হুগলি জেলার চন্দননগর জগদ্ধাত্রী পূজার জন্য বিখ্যাত। এখানকার পূজার প্রধান আকর্ষণ হলো চোখধাঁধানো আলোর সজ্জা। চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সারা ভারতে বিখ্যাত। পূজার প্যান্ডেল থেকে শুরু করে গোটা শহরের রাস্তা সেজে ওঠে লক্ষ লক্ষ রঙিন টুনি বাল্ব, এলইডি এবং অভিনব আলোকসজ্জায়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের (WBTDCL) তথ্য অনুসারে, এই সময় চন্দননগর এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে।
- বিসর্জন শোভাযাত্রা: চন্দননগরের পূজার আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর বিসর্জন শোভাযাত্রা। প্রতিটি বড় বারোয়ারি তাদের সুসজ্জিত প্রতিমা ও আলোকসজ্জা সহকারে লরিতে করে শহর পরিক্রমা করে। এই শোভাযাত্রা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়।
- উচ্চতা ও থিম: এখানকার প্রতিমাগুলি বিশাল উঁচু হয় এবং প্যান্ডেলগুলিতেও থিমের বৈচিত্র্য দেখা যায়, যা দুর্গাপূজার থিম্যাটিক প্যান্ডেলের সাথে পাল্লা দেয়।
কৃষ্ণনগরের আভিজাত্য ও মৃৎশিল্পের পরাকাষ্ঠা
নদিয়ার কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার ধরণ অনেকটাই আলাদা। এখানে আভিজাত্য, ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় রীতিনীতির উপর বেশি জোর দেওয়া হয়।
- রাজবাড়ির পূজা: কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পূজা হলো এই শহরের পূজার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে আজও প্রাচীন প্রথা মেনে দেবীর আরাধনা করা হয়।
- মৃৎশিল্প: কৃষ্ণনগর তার জগৎবিখ্যাত মৃৎশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানকার শিল্পীদের হাতে গড়া জগদ্ধাত্রী প্রতিমার রূপ, বিশেষ করে দেবীর চোখ ও মুখের ভাব, এক বিশেষ শৈল্পিক উৎকর্ষের নিদর্শন।
- ডাকের সাজ: কৃষ্ণনগরের প্রতিমাগুলিতে ঐতিহ্যবাহী ‘ডাকের সাজ’ (শোলার ওপর রুপোলি জরির কাজ) প্রাধান্য পায়।
- মালোপাড়ার পূজা: কৃষ্ণনগরের প্রাচীনতম পূজাগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘মালোপাড়া’ অঞ্চলের পূজা। এখানকার প্রতিমাকে ‘জলশ্বরী’ বলা হয় এবং প্রাচীন রীতি মেনে প্রতিমা নৌকায় করে জলঙ্গী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
| বৈশিষ্ট | চন্দননগর | কৃষ্ণনগর |
| প্রধান আকর্ষণ | চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা ও থিম | ঐতিহ্য, রাজকীয় প্রথা ও মৃৎশিল্প |
| প্রতিমার উচ্চতা | অত্যন্ত উঁচু ও বিশাল | মাঝারি থেকে বড়, শাস্ত্রীয় রূপ |
| সাজ | বৈচিত্র্যময়, আধুনিক ও সাবেকী | মূলত ঐতিহ্যবাহী ‘ডাকের সাজ’ |
| বিসর্জন | জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযatra (লরিতে) | রাজবাড়ির নিজস্ব ঘাট ও মালোপাড়ার নৌকায় বিসর্জন |
পূজার বিধি ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
জগদ্ধাত্রী পূজার rituals বা আচার-বিধিও দুর্গাপূজার থেকে কিছুটা আলাদা এবং এর একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক দিক রয়েছে।
ত্রিসন্ধ্যা পূজা
জগদ্ধাত্রী পূজার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। অনেক জায়গায় এই একদিনেই সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী—এই তিন প্রহরের পূজা সম্পন্ন করা হয়।
- সপ্তমী পূজা: সকালে প্রথম প্রহরে সপ্তমী পূজা হয়।
- অষ্টমী পূজা: মধ্যাহ্নে বা দুপুরে দ্বিতীয় প্রহরে অষ্টমী পূজা হয়।
- নবমী পূজা: সন্ধ্যায় বা রাতে তৃতীয় প্রহরে নবমী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
এই ‘ত্রিসন্ধ্যা’ পূজা এই তিথির মাহাত্ম্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। এই একদিনের নিবিড় আরাধনা সাধকের মনকে কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করে।
সত্ত্বগুণের আরাধনা: শান্তি ও স্থিতিশীলতার পূজা
আগেই বলা হয়েছে, দেবী জগদ্ধাত্রী হলেন সত্ত্বগুণের প্রতীক। হিন্দু দর্শন অনুযায়ী, প্রকৃতি তিনটি গুণের (Properties) সমন্বয়ে গঠিত—সত্ত্ব (সৃষ্টি, জ্ঞান, শান্তি), রজঃ (ক্রিয়া, আবেগ, রাজসিক ভাব) এবং তমঃ (অজ্ঞানতা, জড়তা, বিনাশ)।
- দুর্গাপূজা: দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করছেন। এটি একটি ‘রাজসিক’ (Rajasik) রূপ। এখানে সরাসরি আসুরিক শক্তির বিনাশ ও সংগ্রাম দেখানো হয়। এটি কর্ম ও শক্তির পূজা।
- জগদ্ধাত্রী পূজা: দেবী জগদ্ধাত্রী শান্ত, সমাহিত। তিনি করীন্দ্রাসুরকে (অহংকার) দমন করে রেখেছেন। এটি ‘সাত্ত্বিক’ (Sattvik) রূপ। এটি যুদ্ধের পরের স্থিতি, শান্তি ও জ্ঞানের পূজা।
তিনি ‘জগৎ-ধাত্রী’—অর্থাৎ যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন। এই বিশ্বসংসার যে এক পরম শান্ত ও স্থিতিশীল শক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে, দেবী জগদ্ধাত্রী সেই পরম চৈতন্যেরই প্রতীক। তাই তাঁর পূজা আসলে নিজের ভেতরের সত্ত্বগুণকে জাগ্রত করে, রজঃ (চঞ্চলতা) ও তমঃ (অহংকার, অজ্ঞানতা)-কে নিয়ন্ত্রণ করার সাধনা।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, জগদ্ধাত্রী পূজা পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এক বিশাল প্রভাব ফেলে।
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতি
পূজার এই চার-পাঁচ দিন চন্দননগর ও কৃষ্ণনগর এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ ট্যুর প্যাকেজেরও আয়োজন করে।
- জনসমাগম: লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী (Pilgrims and Tourists) এই দুই শহরে ভিড় জমান। এর ফলে স্থানীয় পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার এক বিরাট অর্থনৈতিক জোয়ার আসে।
- বিশেষ ব্যবস্থা: ভিড় সামাল দিতে প্রশাসনকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। অনেক সময় বিশেষ লোকাল ট্রেন, ফেরি সার্ভিস চালানো হয়।
- গ্রামীণ অর্থনীতি: আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে বহু মানুষ এই উৎসবে যোগ দেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে।
শিল্প ও কারুশিল্পের বিকাশ
এই পূজা সরাসরি বাংলার দুটি বিখ্যাত কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং তার বিকাশে সাহায্য করছে—মৃৎশিল্প ও আলোকশিল্প।
- আলোকশিল্প: চন্দননগরের আলোকশিল্প আজ একটি ব্র্যান্ড। এই শিল্পের সাথে যুক্ত হাজার হাজার শিল্পী ও কর্মীর সারা বছরের আয়ের এক বড় অংশ আসে জগদ্ধাত্রী পূজার অর্ডার থেকে। এখানকার তৈরি আলোর গেট ও প্যানেল শুধু বাংলা নয়, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎসবেও রপ্তানি হয়।
- মৃৎশিল্প: কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা, যাঁরা তাঁদের মাটির পুতুলের জন্য GI ট্যাগ পেয়েছেন, তাঁরা জগদ্ধাত্রী প্রতিমা নির্মাণে তাঁদের বংশানুক্রমিক দক্ষতার পরাকাষ্ঠা দেখান। এই পূজাকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পী, প্যান্ডেল নির্মাতা, ঢাকি এবং শোলার সাজের শিল্পীদের কর্মসংস্থান হয়।
অহংকারের বিনাশেই আত্মার স্থিতি
সুতরাং, জগদ্ধাত্রী পূজায় ‘হাতি মারা’র দৃশ্যটি কোনো আক্ষরিক হত্যাকাণ্ড বা হিংসার প্রতীক নয়। এটি হিন্দু দর্শনের এক উচ্চমার্গের প্রতীকী রূপ। এই ‘হাতি’ বা করীন্দ্রাসুর হলো আমাদের নিজেদের ভেতরের অন্ধ ‘অহংকার’, ‘আমি’-বোধ বা ‘Ego’, যা আমাদের পতনের মূল কারণ।
দেবী জগদ্ধাত্রী, যিনি এই জগতের ধাত্রী বা পালয়িত্রী, তিনি আমাদের সেই অহংকারকে দমন করে স্থিতি, শান্তি ও জ্ঞানের পথে চালিত করেন। তিনি আমাদের শেখান যে, প্রকৃত শক্তি প্রদর্শনে নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণে; প্রকৃত জয় যুদ্ধে নয়, শান্তিতে। এই পূজা তাই শুধু দেবীর আরাধনা নয়, এ হলো নিজের ভেতরের করীন্দ্রাসুরকে চিনে তাকে দমন করার এক আধ্যাত্মিক সাধনা।











