আজ ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫। সারা দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, কেন অক্টোবরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হলেও ভারত সেপ্টেম্বরেই এই দিনটি উদযাপন করে? এর পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের গল্প, যিনি নিজের জন্মদিনকে শিক্ষকদের সম্মানে উৎসর্গ করেছিলেন। আজকের এই বিশেষ দিনে জানুন ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫-এর গভীর ইতিহাস, তাৎপর্য এবং প্রথম শিক্ষক দিবসের অজানা কাহিনী।
কে ছিলেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন? শিক্ষক দিবসের জনক
৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ উদযাপনের মূলে রয়েছেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন। ১৮৮৮ সালের এই দিনেই তামিলনাড়ুর তিরুত্তানিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন খ্যাতনামা দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিত ব্যক্তি।
ড. রাধাকৃষ্ণন স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৫২-১৯৬২) এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি (১৯৬২-১৯৬৭) ছিলেন। তাঁর শিক্ষা ও দর্শনের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ভারত রত্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তিনি সর্বদা বিশ্বাস করতেন যে “শিক্ষকদের হতে হবে দেশের সেরা মেধাবী ব্যক্তিরা”।
শিক্ষক আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশ ও তৃণমূল বাহিনীর বর্বরতা
প্রথম শিক্ষক দিবস কবে এবং কীভাবে শুরু হল?
ভারতে প্রথম শিক্ষক দিবস ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে উদযাপিত হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে রয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী কাহিনী। ১৯৬২ সালে যখন ড. রাধাকৃষ্ণন ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর ছাত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর ৭৪তম জন্মদিন জাঁকজমকের সাথে উদযাপনের প্রস্তাব দেন।
কিন্তু এই মহান ব্যক্তিত্ব বিনীতভাবে বলেছিলেন, “আমার জন্মদিন ব্যক্তিগতভাবে উদযাপনের পরিবর্তে একে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করা হোক। এটি আমার জন্য গর্বের বিষয় হবে”। এই আত্মত্যাগের মনোভাব থেকেই জন্ম নেয় ভারতে শিক্ষক দিবসের ঐতিহ্য।
সেই থেকে প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ সহ প্রতিটি বছরে এই দিনটি শিক্ষকদের সম্মানে উৎসর্গীকৃত হয়ে আসছে। ভারত সরকার ড. রাধাকৃষ্ণনের এই অনুরোধে সাড়া দিয়ে ১৯৬২ সাল থেকেই জাতীয়ভাবে শিক্ষক দিবস পালনের ঘোষণা দেয়।
কেন সেপ্টেম্বরে, অক্টোবরে নয়? ভারত ও বিশ্বের মধ্যে পার্থক্য
অনেকেই প্রশ্ন করেন, বিশ্বব্যাপী যখন অক্টোবরে শিক্ষক দিবস পালিত হয়, তখন ভারত কেন ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ উদযাপন করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয় ৫ অক্টোবর। এই দিনটি ১৯৯৪ সালে UNESCO কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে ILO/UNESCO-র একটি সুপারিশ গৃহীত হওয়ার স্মরণে এই তারিখ নির্বাচিত হয়। কিন্তু ভারত তার নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
ভারতে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ পালনের মূল কারণ হল আমাদের নিজস্ব মহান ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানো। ড. রাধাকৃষ্ণনের মতো একজন আদর্শ শিক্ষক ও দার্শনিকের জন্মদিনকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা আমাদের জাতীয় গর্বের বিষয়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ৫০ টি শুভেচ্ছা বার্তা
শিক্ষক দিবসের গভীর তাৎপর্য ও সামাজিক প্রভাব
৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫-এর তাৎপর্য কেবল একটি উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই দিনটির রয়েছে গভীর সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য। শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না, তারা শিক্ষার্থীদের জীবনে আলোকবর্তিকার মতো কাজ করেন।
ড. রাধাকৃষ্ণন বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষকদের কাজ কেবল তথ্য প্রদান নয়, বরং ছাত্রছাত্রীদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করা। তিনি বলেছিলেন, “শিক্ষকরা হলেন জাতির মেরুদণ্ড”। এই মানসিকতা থেকেই শিক্ষক দিবসের মূল ভাবনা উৎপন্ন।
আজকের ডিজিটাল যুগেও শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিহার্য। তারা কেবল জ্ঞান বিতরণ করেন না, বরং শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন, মূল্যবোধ স্থাপন ও সৃজনশীলতা বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
আধুনিক যুগে শিক্ষক দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
২০২৫ সালের এই শিক্ষক দিবসে আমরা দেখতে পাচ্ছি শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লবী পরিবর্তন। COVID-19 মহামারীর পর অনলাইন শিক্ষা, হাইব্রিড লার্নিং, এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের শিক্ষকরা কেবল ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে পাঠদান করেন না। তারা প্রযুক্তির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে তাদের অবদান আরও বেশি স্বীকৃতির দাবি রাখে।
বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষক দিবস উদযাপনের বৈচিত্র্য
৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ উদযাপনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দেখা যায় নানা ধরনের অনুষ্ঠান। পশ্চিমবঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। তামিলনাড়ুতে বিশেষভাবে উদযাপিত হয় কারণ এটি ড. রাধাকৃষ্ণনের জন্মস্থান।
দিল্লিতে প্রতি বছর রাষ্ট্রপতি ভবনে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হয়। এই অনুষ্ঠানে সারা দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের সম্মানিত করা হয়। স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের ভূমিকায় অভিনয় করে, যা শিক্ষকতার কঠিন দায়িত্ব বোঝাতে সহায়ক।
শিক্ষক দিবসের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
আজকের ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ আমাদের ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, এবং উন্নত প্রযুক্তির যুগে শিক্ষকদের ভূমিকা কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানবিক স্পর্শ ও নৈতিক শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের বিকল্প নেই। ভবিষ্যতের শিক্ষকরা হবেন প্রযুক্তি ও মানবিকতার সেতুবন্ধন।
শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য
৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদেরও রয়েছে কিছু দায়িত্ব। শুধু একদিন সম্মান জানালেই হবে না, সারা বছর শিক্ষকদের প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলা, নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখা, এবং পড়াশোনায় আন্তরিক হওয়াই হল প্রকৃত সম্মান।
আজকের প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা যেন মনে রাখেন, তাদের শিক্ষকরা কেবল পাঠ্যবই পড়ান না, বরং জীবনের মূল্যবান শিক্ষা দেন। এই শিক্ষা তাদের সারা জীবন কাজে লাগবে।
শিক্ষক দিবসের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
যদিও ভারত ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫ পালন করে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটি ভিন্ন তারিখে উদযাপিত হয়। চীনে ১০ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে, এবং অস্ট্রেলিয়ায় অক্টোবরের শেষ শুক্রবার শিক্ষক দিবস পালিত হয়।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি বিষয় সর্বজনীন – শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। বিশ্বব্যাপী শিক্ষকরা মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে যে অবদান রাখছেন, তা অতুলনীয়।
প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস ২০২৫-এর মতো এই দিনগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের মতো মহান ব্যক্তিত্বের আদর্শ অনুসরণ করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে। তাঁর জন্মদিনকে শিক্ষক দিবস হিসেবে উৎসর্গ করার যে উদার মানসিকতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য আজ ৬৩ বছর পার করে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, এবং আগামী প্রজন্মের কাছে শিক্ষকদের গুরুত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরে চলেছে।











