২৬ জানুয়ারি কেন হয়নি ভারতের স্বাধীনতা দিবস: পূর্ণ স্বরাজের অপূর্ণ স্বপ্ন থেকে প্রজাতন্ত্র দিবসের যাত্রা

১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রথমবার পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এই তারিখটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছিল, কিন্তু ১৭ বছর পরে ১৯৪৭ সালে যখন ভারত প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হয়,…

Srijita Chattopadhay

 

১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রথমবার পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এই তারিখটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছিল, কিন্তু ১৭ বছর পরে ১৯৪৭ সালে যখন ভারত প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হয়, তখন স্বাধীনতা দিবস হয় ১৫ অগাস্ট। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তাড়াহুড়া সিদ্ধান্ত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব। তবে ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক তাৎপর্য হারিয়ে যায়নি—১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এই তারিখটিই বেছে নেওয়া হয় এবং এই দিনটি হয়ে ওঠে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস।

লাহোর অধিবেশন: পূর্ণ স্বরাজের ঐতিহাসিক ঘোষণা

১৯২৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর লাহোরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরে যায়। জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে “পূর্ণ স্বরাজ” অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত করে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কংগ্রেস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে “ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস” বা আংশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

ভারতীয় জাতীয় আর্কাইভস অনুসারে, এই অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০ সালকে “স্বাধীনতা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা হবে এবং সেদিন সারাদেশে এই দিবসটি পালিত হবে। ১৯২৯ সালের এই সিদ্ধান্ত ছিল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তরুণ জাতীয়তাবাদী নেতাদের দীর্ঘদিনের দাবির ফসল, যারা গান্ধীজির অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য জোরালো আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন।

Republic Day: ২৬ জানুয়ারি কেন ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়?

১৯৩০-১৯৪৭: পূর্ণ স্বরাজ থেকে বাস্তব স্বাধীনতার পথ

লাহোর অধিবেশনের পর ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি সারা ভারতজুড়ে প্রথমবার “স্বাধীনতা দিবস” হিসেবে পালিত হয়। সেদিন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং পূর্ণ স্বরাজের শপথ নেন। এই ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে ভারতীয়দের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ব্রিটিশ সরকার ভারতকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ধ্বংস করেছে এবং তাই ভারতকে ব্রিটিশ সংযোগ সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।

ঐতিহাসিক বিপিন চন্দ্র তার “India’s Struggle for Independence” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে ১৯২০ সাল থেকেই ভারতীয় নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের যে প্রতিশ্রুতি ছিল তা পূরণ হবে না। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, পাঞ্জাবে অশান্তি এবং রাওলাট আইনের মতো ঘটনা ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।

১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারির পরে গান্ধীজি বিখ্যাত লবণ সত্যাগ্রহ শুরু করেন যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে কাঁপিয়ে দেয়। এরপরের দেড় দশক ধরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশদের দুর্বল অবস্থা স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে।

১৫ অগাস্ট কেন হলো স্বাধীনতা দিবস: মাউন্টব্যাটেনের সিদ্ধান্ত

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রথমে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন তারিখের মধ্যে ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ১৯৪৬-৪৭ সালে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে লর্ড মাউন্টব্যাটেন, ভারতের শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয়, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুততর করার সিদ্ধান্ত নেন।

NDTV-র ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, মাউন্টব্যাটেন ১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ তারিখটি বেছে নেন কারণ এই দিনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী ছিল। মাউন্টব্যাটেন পরবর্তীতে “Freedom at Midnight” গ্রন্থে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে এই তারিখটি তার কাছে সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের সমাপ্তির প্রতীক ছিল।

Times of India-র ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে মাউন্টব্যাটেনের এই সিদ্ধান্ত আকস্মিক ছিল এবং তিনি বিশেষভাবে ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিবেচনা করেননি। তার মূল লক্ষ্য ছিল আরও রক্তপাত এবং দাঙ্গা এড়ানো, এবং যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করা।

ফলস্বরূপ, ১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয় এবং এই দিনটিই ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৬ জানুয়ারির পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণার ঐতিহাসিক তাৎপর্য সেই মুহূর্তে পেছনে পড়ে যায়, কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাওয়া হয়নি।

সংবিধান প্রণয়ন: নতুন ভারতের ভিত্তি

স্বাধীনতার পরপরই ভারতের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয়। ডঃ বি.আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে খসড়া কমিটি প্রায় তিন বছর ধরে ভারতের সংবিধান রচনা করে। সংবিধান সভা মোট ১৬৫ দিনে এগারোটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত করে।

সংবিধান সভার কাজের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী:

  • ২৯ আগস্ট ১৯৪৭: খসড়া কমিটি গঠিত হয় আম্বেদকরের সভাপতিত্বে

  • ১৬ জুলাই ১৯৪৮: হরেন্দ্র কুমার মুখার্জির সাথে ভি.টি. কৃষ্ণমাচারী সংবিধান সভার দ্বিতীয় উপ-সভাপতি নির্বাচিত হন

  • ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯: সংবিধান সভা ভারতের সংবিধান গ্রহণ ও পাস করে

  • ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০: সংবিধান সভার শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সংবিধানে স্বাক্ষর করা হয়

সংবিধানের চূড়ান্ত সংস্করণে ছিল ৩৯৫টি ধারা, ৮টি তফসিল এবং ২২টি অংশ। Testbook-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২৯৯ জন সদস্যের মধ্যে ২৮৪ জন সদস্য সংবিধানে স্বাক্ষর করেন। প্রথম স্বাক্ষরকারী ছিলেন জওহরলাল নেহরু এবং শেষ স্বাক্ষরকারী ছিলেন তার জামাতা ফিরোজ গান্ধী।

২৬ জানুয়ারি ১৯৫০: পূর্ণ স্বরাজের সম্মানে প্রজাতন্ত্র দিবস

সংবিধান ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ সালে গৃহীত হলেও আইনগতভাবে এটি সেদিনই কার্যকর করা যেত। কিন্তু স্বাধীন ভারতের নেতারা একটি ইচ্ছাকৃত বিরতি নেন। তাদের সামনে ছিল একটি কাব্যিক সমাধান—পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণার ২০তম বার্ষিকী ছিল মাত্র দুই মাস দূরে।

Know India সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ভারত একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। এই দিনটি বেছে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৩০ সালের পূর্ণ স্বরাজ দিবসকে সম্মান জানানো এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে নতুন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা।

সংবিধান কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে ভারত আর ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীনে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র রইল না—এটি হয়ে উঠল একটি সম্পূর্ণ প্রজাতন্ত্র। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রণীত “Government of India Act 1935” সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে ভারতীয় সংবিধানের ৩৯৫ নম্বর ধারায় সাংবিধানিক স্বাধিকারতা নিশ্চিত করা হয়।

স্বাধীনতা দিবস বনাম প্রজাতন্ত্র দিবস: মূল পার্থক্য

১৫ অগাস্ট এবং ২৬ জানুয়ারি—এই দুটি তারিখই ভারতের জাতীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাদের তাৎপর্য ভিন্ন। এই দুই দিবসের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি নিচের সারণিতে উপস্থাপিত হলো:

বিষয় ১৫ অগাস্ট (স্বাধীনতা দিবস) ২৬ জানুয়ারি (প্রজাতন্ত্র দিবস)
ঘটনা প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হওয়া
বছর ১৯৪৭ ১৯৫০
ঘোষণাকারী লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও ভারতীয় নেতারা ভারতীয় সংবিধান সভা
পতাকা উত্তোলন প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লায় পতাকা উত্তোলন করেন রাষ্ট্রপতি কর্তব্য পথে পতাকা উত্তোলন করেন
অর্থ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
প্রতীক বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি নিজস্ব সংবিধান ও আইনের শাসন

প্রজাতন্ত্র দিবসের উৎসব ও তাৎপর্য

প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি ভারত জাড়ম্বরপূর্ণভাবে প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করে। দিল্লির কর্তব্য পথে (পূর্বে রাজপথ) অনুষ্ঠিত হয় বিশাল প্যারেড যেখানে ভারতের সামরিক শক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি প্রদর্শিত হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি, যিনি সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রথম নাগরিক, জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

২০২৬ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি ভারতীয় সংবিধান কার্যকরের ৭৬তম বার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের ঝাঁকি, সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় যা ভারতের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক।

প্রজাতন্ত্র দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পদ্মপুরস্কার ও বীরত্বের পুরস্কার প্রদান। এই দিনে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানিত করা হয়, যা সংবিধানের মূল্যবোধ—গণতন্ত্র, সমতা এবং ন্যায়বিচারকে তুলে ধরে।

January 2025-এ চলমান চাকরির ফর্ম ফিলাপ: আপনার সুযোগের সন্ধানে

পূর্ণ স্বরাজের উত্তরাধিকার: আজকের ভারত

১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারির পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বিবৃতি ছিল না—এটি ছিল ভারতীয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং মর্যাদার দাবি। যদিও ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা এসেছিল ১৫ অগাস্ট তারিখে, তবুও ২৬ জানুয়ারির স্বপ্ন ও সংকল্প ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি হয়ে থেকেছে।

আজকের ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, যেখানে ১.৪ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করেন। ১৯৫০ সালের সংবিধানে যে মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির নির্দেশমূলক নীতিগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেগুলি আজও ভারতের শাসনব্যবস্থা ও আইন প্রণয়নের মূল ভিত্তি।

১৯৩০ সালের পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণায় যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল, তা ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবনা ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং সকল নাগরিককে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

ঐতিহাসিক শিক্ষা ও জাতীয় চেতনা

২৬ জানুয়ারির এই দ্বৈত তাৎপর্য—একদিকে পূর্ণ স্বরাজের ঘোষণা, অন্যদিকে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা—আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, স্বাধীনতা একটি দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের ফল, যা একদিনে অর্জিত হয়নি। ১৯৩০ সালে পূর্ণ স্বরাজের ঘোষণা থেকে ১৯৪৭ সালে প্রকৃত স্বাধীনতা পর্যন্ত ১৭ বছরের সংগ্রাম এবং তারপর ১৯৫০ সালে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা—এই পুরো যাত্রা ছিল ত্যাগ, দৃঢ়তা এবং দূরদর্শিতার ফসল।

দ্বিতীয়ত, ২৬ জানুয়ারিকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া দেখায় যে ভারতের নেতারা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তারা শুধু একটি নতুন দেশ গড়তে চাননি, বরং সংগ্রামের ইতিহাসকে নতুন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

তৃতীয়ত, স্বাধীনতা এবং প্রজাতন্ত্র—দুটি ভিন্ন কিন্তু পরিপূরক ধারণা। ১৫ অগাস্ট আমাদের বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি দিয়েছিল, কিন্তু ২৬ জানুয়ারি আমাদের দিয়েছে নিজস্ব সংবিধান, নিজস্ব আইন এবং নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

শেষ কথা

২৬ জানুয়ারি ভারতের স্বাধীনতা দিবস হতে পারত, কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ১৯৩০ সালে পূর্ণ স্বরাজের যে ঘোষণা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয় ১৭ বছর পরে, ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট—যখন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ও নেতারা ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ভুলে যাননি। ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকরের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ২৬ জানুয়ারি তারিখ বেছে নেওয়া হয়, যা পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণার ২০তম বার্ষিকী ছিল। আজ ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি নয়, বরং নিজস্ব সংবিধান, আইন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলা। এই দ্বৈত তাৎপর্য—পূর্ণ স্বরাজের স্বপ্ন এবং সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের বাস্তবায়ন—আজও ভারতের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।

About Author
Srijita Chattopadhay

সৃজিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি তার লেখা দ্বারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি তুলে ধরতে সদা উদ্যমী। সৃজিতার লেখার ধারা মূলত সাহিত্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ঘিরে আবর্তিত হয়, যেখানে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর নিবন্ধ ও প্রতিবেদনগুলি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তার বস্তুনিষ্ঠতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। সৃজিতা তার কর্মজীবনে ক্রমাগত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর, যা তাকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন