শীতে জল কম খাচ্ছেন? অজান্তেই ডেকে আনছেন কিডনি স্টোন ও হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক বিপদ!

শীতের সকাল, লেপ-কম্বলের উষ্ণতা আর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি—শীতকাল আমাদের অনেকেরই প্রিয় ঋতু। কিন্তু এই আরামদায়ক আবহাওয়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক 'নীরব ঘাতক'। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, গরমকালের মতো…

Debolina Roy

 

শীতের সকাল, লেপ-কম্বলের উষ্ণতা আর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি—শীতকাল আমাদের অনেকেরই প্রিয় ঋতু। কিন্তু এই আরামদায়ক আবহাওয়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ‘নীরব ঘাতক’। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, গরমকালের মতো শীতকালে আমাদের খুব একটা জল পিপাসা পায় না? আর ঠিক এই কারণেই, আমরা অজান্তেই আমাদের শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Winter Dehydration’ বা শীতকালীন জলশূন্যতা।

শুনতে সাধারণ মনে হলেও, শীতকালে পর্যাপ্ত জল না খাওয়ার অভ্যাসটি কেবল আপনার ত্বক শুষ্ক করছে না, বরং এটি আপনার কিডনিতে পাথর জমানো, হার্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কেন শীতে পিপাসা পায় না? আর কেনই বা ডাক্তাররা শীতকালে কিডনি স্টোনের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া নিয়ে এত চিন্তিত? আজকের এই আর্টিকেলে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য, গবেষণা এবং বাস্তব পরিসংখ্যানের আলোকে বিশ্লেষণ করব শীতের দিনের এই নীরব স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে।

শীতে কেন জল পিপাসা পায় না? (The Science Behind ‘Cold Diuresis’)

অনেকেই ভাবেন, শীতে ঘাম কম হয়, তাই শরীরের জলের প্রয়োজনও কম। এটি একটি অত্যন্ত ভুল ধারণা। বরং শীতকালে আমাদের শরীর এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যা আমাদের অজান্তেই শরীর থেকে জল বের করে দেয়।

১. কোল্ড ডাইউরেসিস (Cold Diuresis)

শীতকালে আমাদের শরীর নিজেকে গরম রাখতে চায়। যখন তাপমাত্রা কমে যায়, তখন আমাদের রক্তনালীগুলি সংকুচিত হয়ে যায় (Vasoconstriction)। এর ফলে শরীরের কেন্দ্রস্থলে (যেমন হার্ট, কিডনি, ফুসফুস) রক্তচাপ বেড়ে যায়। শরীর তখন এই বাড়তি রক্তচাপ কমানোর জন্য কিডনিকে নির্দেশ দেয় রক্ত থেকে অতিরিক্ত তরল বের করে দিতে। ফলে শীতকালে আমাদের ঘন ঘন প্রস্রাব পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেই ‘Cold Diuresis’ বলা হয়। এর ফলে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়, অথচ আমাদের পিপাসা অনুভূত হয় না।

বেশি বয়সে মা হওয়ার ৭টি প্রধান ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

২. শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে জল হারানো

আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, শীতের সকালে কথা বললে বা নিঃশ্বাস ছাড়লে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয়। এটি আসলে ধোঁয়া নয়, এটি আপনার শরীরের জলীয় বাষ্প। শীতের বাতাস খুব শুষ্ক হয়। যখন আমরা শ্বাস নিই, আমাদের ফুসফুস সেই শুষ্ক বাতাসকে আর্দ্র করার জন্য প্রচুর জল ব্যবহার করে। Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেই আমরা শীতকালে প্রতিদিন প্রায় ১-২ গ্লাস জল হারাতে পারি।

৩. ঘাম দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়া

শীতে আমরা গরম পোশাক পরে থাকি এবং বাইরের বাতাস শুষ্ক থাকে। ফলে শরীর থেকে যেটুকু ঘাম বের হয়, তা দ্রুত বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। আমরা ঘাম অনুভব করি না, তাই আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের ‘জল খাওয়ার সিগন্যাল’ বা তৃষ্ণা অনুভব করতে দেয় না।

শীতে কম জল খাওয়া: শরীরে কী কী মারাত্মক রোগ বাসা বাঁধতে পারে?

গরমকালে ডিহাইড্রেশন হলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি (মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা)। কিন্তু শীতে এটি ঘটে ধীরে ধীরে, যাকে বলা হয় ‘Insensible Water Loss’। দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

১. কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বৃদ্ধি (Kidney Stones)

শীতকালকে ইউরোলজিস্টরা অনেক সময় “Kidney Stone Season” বলে সতর্ক করেন।

  • কারণ: কম জল খাওয়ার ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় এবং তা অত্যন্ত ঘন (Concentrated) হয়ে পড়ে।

  • গবেষণা: ২০১৪ সালে ‘Environmental Health Insights’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় মানুষের তৃষ্ণা কমে যাওয়ায় জল খাওয়ার প্রবণতা প্রায় ৪০% কমে যায়। এর ফলে প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট এবং ইউরিক অ্যাসিডের মতো খনিজ পদার্থগুলো জমাট বেঁধে পাথর বা ‘স্টোন’ তৈরি করে।

  • বাস্তব তথ্য: শীতকালে আমরা নোনতা খাবার, ভাজাভুজি বা প্রসেসড ফুড বেশি খাই, যা শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়ায়। পর্যাপ্ত জল না থাকায় এই সোডিয়াম কিডনি দিয়ে বের হতে পারে না এবং ক্যালসিয়ামের সাথে মিশে পাথর তৈরি করে।

২. হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ (Heart Health Risks)

শীতকালে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঘটনা বেড়ে যায়, এবং এর অন্যতম একটি কারণ হলো ডিহাইড্রেশন।

  • রক্তের ঘনত্ব বৃদ্ধি: আমাদের রক্তের একটি বড় অংশ হলো জল। যখন শরীরে জলের ঘাটতি হয়, তখন রক্তের Viscosity বা ঘনত্ব বেড়ে যায়। রক্ত ঘন হয়ে গেলে তা পাম্প করতে হার্টকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

  • উচ্চ রক্তচাপ: ডিহাইড্রেশনের ফলে শরীর জল ধরে রাখার জন্য রক্তনালী সংকুচিত করে ফেলে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। ঘন রক্ত এবং উচ্চ রক্তচাপ—এই দুয়ের কম্বিনেশন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া (Weak Immunity)

শীতকালে সর্দি-কাশি, ফ্লু বা ভাইরাসিজনিত জ্বর খুব সাধারণ। এর পেছনেও ডিহাইড্রেশনের ভূমিকা আছে।

  • আমাদের নাক, মুখ এবং গলার ভেতরে মিউকাস মেমব্রেন বা শ্লেষ্মা ঝিল্লি থাকে, যা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে শরীরে ঢুকতে বাধা দেয়।

  • পর্যাপ্ত জল না খেলে এই ঝিল্লি শুকিয়ে যায় এবং এতে ফাটল ধরে। ফলে ভাইরাস খুব সহজেই আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। National Institutes of Health (NIH)-এর মতে, হাইড্রেটেড থাকা ইমিউন সিস্টেমের প্রথম স্তরের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।

৪. হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা বৃদ্ধি (Joint Pain)

শীতকালে আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা বাড়ে। এর কারণ কি শুধুই ঠান্ডা? না।

  • আমাদের হাড়ের সংযোগস্থলের কার্টিলেজ বা তরুণাস্থির প্রায় ৮০% হলো জল।

  • জল কম খেলে এই কার্টিলেজ শুকিয়ে যায় এবং হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ বাড়ে। ফলে হাঁটু, কোমর বা মেরুদণ্ডে ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করে।

৫. কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজমের সমস্যা (Digestive Issues)

শীতে বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম কিছুটা ধীর হয়ে যায়। তার ওপর জলের অভাব হলে অন্ত্রের (Intestine) কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শরীর তখন খাবারের বর্জ্য থেকে জল শুষে নেওয়ার চেষ্টা করে, যার ফলে মল শক্ত হয়ে যায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়।

শীতকালীন ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ: আপনি কি ঝুঁকিতে আছেন?

শীতে ডিহাইড্রেশন চেনা একটু কঠিন, কারণ আমরা ঘামি না। নিচের টেবিলটি দেখে মিলিয়ে নিন আপনার কোনো লক্ষণ আছে কিনা:

লক্ষণ সাধারণ ব্যাখ্যা কী করা উচিত?
প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ বা অ্যাম্বার রঙের প্রস্রাব ডিহাইড্রেশনের প্রধান লক্ষণ। অবিলম্বে ২-৩ গ্লাস জল পান করুন।
শুষ্ক ত্বক ও ঠোঁট ত্বক খসখসে হওয়া, ঠোঁট ফেটে যাওয়া শুধু আবহাওয়ার দোষ নয়, এটি শরীরের ভেতরের শুষ্কতা। ময়েশ্চারাইজারের পাশাপাশি প্রচুর জল খান।
মাথা ব্যথা ও ক্লান্তি কারণ ছাড়া দুপুরে বা বিকেলে মাথা ধরা বা ঝিমঝিম করা। চা/কফি না খেয়ে এক গ্লাস ইষদুষ্ণ জল খান।
ক্ষুধা অনুভব করা অনেক সময় মস্তিষ্ক তৃষ্ণাকে ক্ষুধা হিসেবে ভুল সংকেত দেয় (False Hunger)। ভারী খাবার খাওয়ার আগে এক গ্লাস জল খেয়ে দেখুন।
পেশীতে টান (Cramps) বিশেষ করে পায়ের ডিমে টান ধরা। এটি ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্সের লক্ষণ। ডাবের জল বা নুন-চিনির জল খান।
About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।