শীতের সকালে বিছানা থেকে উঠতে গেলেই মনে হচ্ছে শরীরটা যেন জমে গেছে? হাঁটু, কোমর বা ঘাড়ের ব্যথা কি আপনাকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দিচ্ছে না? আপনি একা নন, এই শীতে গাঁটের ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসের সমস্যা ঘরে ঘরে এক বিভীষিকার রূপ নেয়। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা এবং বাতাসের নিম্নচাপ আপনার হাড়ের সংযোগস্থলের লুব্রিকেন্ট বা সাইনোভিয়াল ফ্লুইডকে ঘন করে দেয়, যার ফলে হাড়ের ঘর্ষণ বেড়ে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণার সৃষ্টি হয় । কিন্তু চিন্তার কিছু নেই! সঠিক খাদ্যাভ্যাস, কিছু সহজ ব্যায়াম এবং ঘরোয়া টোটকা মেনে চললে এই শীতেও আপনি থাকবেন চনমনে। এই প্রতিবেদনে আমরা জানাব এমন কিছু বৈজ্ঞানিক ও আয়ুর্বেদিক উপায়, যা আপনাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে নিমেষেই।
শীতকালে গাঁটের ব্যথা বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক কারণ
শীতকালে গাঁটের ব্যথা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এই সময় আবহাওয়ার পরিবর্তন সরাসরি আমাদের শরীরের অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টগুলোতে প্রভাব ফেলে।
১. ব্যারোমেট্রিক প্রেশারের প্রভাব
শীতকালে বায়ুমণ্ডলের চাপ বা ব্যারোমেট্রিক প্রেশার কমে যায়। এই চাপ কমার ফলে আমাদের শরীরের টিস্যুগুলো সামান্য প্রসারিত হয়। এই প্রসারণ জয়েন্টের আশপাশের স্নায়ুগুলোতে চাপ সৃষ্টি করে, যা ব্যথার অনুভূতি বাড়িয়ে দেয় । যারা আগে থেকেই আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন, তাদের জন্য এই সামান্য পরিবর্তনও অসহ্য যন্ত্রণার কারণ হতে পারে।
২. সাইনোভিয়াল ফ্লুইডের ঘনত্ব বৃদ্ধি
আমাদের জয়েন্টগুলোর মধ্যে ‘সাইনোভিয়াল ফ্লুইড’ নামক এক ধরনের তরল থাকে, যা হাড়ের ঘর্ষণ কমায় এবং লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে। তাপমাত্রা কমলে এই তরল ঘন হয়ে যায়, ফলে জয়েন্টের নমনীয়তা কমে যায় এবং হাড়ের ঘর্ষণ বৃদ্ধি পায় । এটি অনেকটা শীতকালে গাড়ির ইঞ্জিনে তেল জমে যাওয়ার মতো।
৩. রক্ত সঞ্চালনে বাধা
শীতের ঠান্ডায় আমাদের শরীর তাপ সংরক্ষণের চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের প্রান্তীয় অংশগুলোতে (যেমন হাত ও পায়ের আঙুল) রক্ত সঞ্চালন কমে গিয়ে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত প্রবাহ বাড়ে। এর ফলে জয়েন্টগুলোতে রক্তের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, যা ব্যথা ও আড়ষ্টতা সৃষ্টি করে ।
গাঁটের ব্যথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি: ৫টি কার্যকরী ঘরোয়া উপচার
৪. ভিটামিন ডি-এর অভাব
শীতকালে রোদের প্রখরতা কম থাকায় এবং মানুষ ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানোয় শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা দেয়। ভিটামিন ডি হাড় ও জয়েন্টের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এর অভাবে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যথার প্রবণতা বাড়ে ।
পরিসংখ্যান: শীতে আর্থ্রাইটিসের ভয়াবহতা
সাম্প্রতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শীতে আর্থ্রাইটিস ও জয়েন্ট পেইনের সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
-
WHO-এর তথ্য: ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে মাস্কুলোস্কেলিটাল পেইন বা পেশি ও হাড়ের ব্যথায় ভুগছেন জনসংখ্যার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ মানুষ। এর মধ্যে অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত প্রায় ৫৪.৪৪ মিলিয়ন মানুষ ।
-
গ্রাম বনাম শহর: আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সমস্যা শহরাঞ্চলের (১০.৩%) তুলনায় গ্রামাঞ্চলে (২০%) বেশি দেখা যাচ্ছে ।
-
দূষণ ও ব্যথা: দিল্লি-এনসিআর এবং অন্যান্য দূষিত শহরে শীতকালে জয়েন্ট পেইন বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বায়ুদূষণ। ইউরোপিয়ান মেডিক্যাল জার্নালের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পিএম ২.৫ (PM2.5) বা সূক্ষ্ম ধূলিকণার দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শে আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি ১২ থেকে ১৮ শতাংশ বেড়ে যায় ।
গাঁটের ব্যথা কমাতে খাদ্যাভ্যাস: কী খাবেন, কী বাদ দেবেন?
শীতে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি। কিছু খাবার প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন বাড়ায়, আবার কিছু খাবার তা কমাতে সাহায্য করে।
যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন (Foods to Avoid)
শীতে উৎসবের মরসুমে আমরা অনেকেই খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম করি, যা বিপদ ডেকে আনে।
| খাবারের ধরণ | কেন এড়িয়ে চলবেন? |
|---|---|
| রেড মিট (খাসি, গরুর মাংস) | এতে প্রচুর পরিমাণে পিউরিন ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা ইউরিক অ্যাসিড বাড়িয়ে জয়েন্টে ব্যথা ও প্রদাহ সৃষ্টি করে । |
| চিনি ও রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট | প্রক্রিয়াজাত চিনি এবং ময়দা সাইটোকাইন নামক প্রদাহজনক উপাদান নিঃসরণ বাড়ায়, যা ব্যথা বাড়িয়ে দেয় । |
| অ্যালকোহল ও বিয়ার | অ্যালকোহল শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বের হতে বাধা দেয়। বিশেষ করে বিয়ারে পিউরিন বেশি থাকায় তা বাতের ব্যথার জন্য মারাত্মক । |
| প্রক্রিয়াজাত খাবার (Processed Foods) | প্যাকেটজাত খাবার, চিপস বা ফাস্টফুডে থাকা ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত লবণ হাড়ের জন্য ক্ষতিকর । |
শীতে জল কম খাচ্ছেন? অজান্তেই ডেকে আনছেন কিডনি স্টোন ও হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক বিপদ!
যে খাবারগুলো পাতে রাখবেন
ব্যথা কমাতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া প্রয়োজন:
-
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: সামুদ্রিক মাছ (যেমন স্যালমন, টুনা), আখরোট এবং ফ্ল্যাক্সসিড বা তিসির বীজ।
-
হলুদ ও আদা: হলুদে থাকা কারকিউমিন এবং আদার জিঞ্জারোল প্রাকৃতিকভাবে ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।
-
রসুন: রসুনে থাকা ডাই-অ্যালাইল ডাই-সালফাইড এনজাইম কার্টিলেজ বা হাড়ের তরুণাস্থি ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।
-
মরিঙ্গা বা সজনে পাতা: এতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে যা হাড় মজবুত করে ।
ঘরোয়া ও আয়ুর্বেদিক টোটকা: ওষুধ ছাড়াই আরাম
ব্যথানাশক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে ঘরোয়া ও আয়ুর্বেদিক উপায়গুলো অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।
১. গরম সেক ও তেল মালিশ
শীতে ব্যথার জায়গায় গরম সেক দিলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং পেশি শিথিল হয়। ইউক্যালিপটাস তেল বা সরিষার তেলের সঙ্গে রসুন গরম করে মালিশ করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায় ।
২. আয়ুর্বেদিক ভেষজ
-
অশ্বগন্ধা: এটি স্নায়ু শান্ত করে এবং শরীরের প্রদাহ কমায়। এটি জয়েন্টের নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে
-
নির্গুণ্ডি: এটি ব্যথানাশক হিসেবে পরিচিত। এর তেল বা পাতার রস ফোলা ও ব্যথা কমাতে জাদুর মতো কাজ করে
-
গুগ্গুল: হাড়ের সংযোগস্থলে জমে থাকা টক্সিন বের করে দিতে এবং কার্টিলেজ সুস্থ রাখতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী
৩. হাইড্রেটেড থাকা
শীতকালে জলপিপাসা কম পায় বলে আমরা জল কম খাই। ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা জয়েন্টের লুব্রিকেন্ট কমিয়ে দেয়। তাই ব্যথা কমাতে প্রচুর পরিমাণে উষ্ণ গরম জল, স্যুপ বা ভেষজ চা পান করা উচিত ।
ব্যথামুক্ত থাকতে সহজ কিছু ব্যায়াম
শীতে লেপ-কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকলে ব্যথা আরও বাড়বে। সচল থাকতে নিয়মিত কিছু হালকা ব্যায়াম করা জরুরি। তবে ব্যায়াম শুরুর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
১. ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ (Cat-Cow Stretch)
এটি পিঠ ও ঘাড়ের আড়ষ্টতা কাটাতে দারুণ কাজ করে।
-
হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে বসুন।
-
শ্বাস নেওয়ার সময় পিঠ নিচের দিকে বাঁকিয়ে মাথা ওপরে তুলুন (কাউ পোজ)।
-
শ্বাস ছাড়ার সময় পিঠ ধনুকের মতো উঁচু করে মাথা নামান (ক্যাট পোজ)।
-
এভাবে ১০-১৫ বার করুন ।
২. সিটেড নি এক্সটেনশন (Seated Knee Extension)
হাঁটুর ব্যথার জন্য এটি খুব উপকারী।
-
চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন।
-
এক পা ধীরে ধীরে সোজা করে মাটির সমান্তরালে আনুন।
-
৫-১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং নামিয়ে নিন।
-
দুই পায়ে ১০ বার করে করুন ।
৩. সেতুল বন্ধনাসন (Bridge Pose)
এটি মেরুদণ্ড ও কোমরের নমনীয়তা বাড়ায়।
-
চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাজ করুন।
-
হাত শরীরের পাশে রেখে কোমর ধীরে ধীরে ওপরে তুলুন।
-
১০-২০ সেকেন্ড ধরে রেখে নামিয়ে নিন ।
শীতকাল মানেই ব্যথার সঙ্গে আপোষ করে বেঁচে থাকা নয়। একটু সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চা আপনাকে এই শীতেও সতেজ ও যন্ত্রণামুক্ত রাখতে পারে। মনে রাখবেন, ব্যথা যদি খুব তীব্র হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আজই আপনার জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনুন এবং এই সুন্দর ঋতুকে উপভোগ করুন প্রাণভরে। সুস্থ থাকুন, সচল থাকুন!











