শীতকাল এলেই অনেকের মনে একটা সাধারণ প্রশ্ন জাগে—ঠান্ডায় কি সিলিন্ডারের গ্যাস জমে যেতে পারে? উত্তরটা হলো, ঠিক ‘জমে যাওয়া’ নয়, তবে বিশেষত শীতকালে এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার ব্যবহারে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার থেকে অসাবধান হলেই ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। আসল বিপদ ‘গ্যাস জমে যাওয়ায়’ নয়, বরং সেই ভুল ধারণা থেকে সিলিন্ডারকে গরম করার চেষ্টা, বন্ধ ঘরে গ্যাসের ব্যবহার এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই লুকিয়ে আছে। এই আর্টিকেলে আমরা শীতকালীন গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের সঠিক নিয়মাবলী, সাধারণ ভুলভ্রান্তি এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করব, যা আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে।
শীতকালে গ্যাস সিলিন্ডার ‘জমাট’ বাঁধার আসল সত্যিটা কী?
আমরা প্রায়শই শুনি যে “শীতকালে গ্যাস জমে গেছে”, যার ফলে চুলার আঁচ কমে যায় বা সিলিন্ডার থেকে গ্যাস ঠিকমতো বের হয় না। এই ধারণার পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণটি বোঝা খুবই জরুরি।
এলপিজি (LPG) বা লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস, যা আমরা রান্নার কাজে ব্যবহার করি, তা মূলত প্রোপেন (Propane) এবং বিউটেন (Butane) নামক দুটি গ্যাসের মিশ্রণ। এই গ্যাস দুটিকে প্রচণ্ড চাপে তরল করে সিলিন্ডারে ভরা হয়। যখন আমরা চুলার নব অন করি, তখন সিলিন্ডারের ভেতরের চাপ কমে যায় এবং এই তরল গ্যাস বাষ্পে (Vapor) পরিণত হয়ে পাইপের মাধ্যমে চুলায় পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়াকে ‘ভেপোরাইজেশন’ (Vaporization) বলে।
AC-র গ্যাস ফুরিয়েছে কি না বোঝা যায় ঘরে বসেই, সহজ উপায়! মেকানিক বোকা বানাতে পারবে না
প্রোপেন বনাম বিউটেন: শীতের সমস্যা
সমস্যাটা শুরু হয় এই দুটি গ্যাসের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের কারণে।
- প্রোপেন: এর স্ফুটনাঙ্ক (Boiling Point) হলো -৪২° সেলসিয়াস। অর্থাৎ, আবহাওয়া যত ঠান্ডা হোক না কেন (অন্তত ভারতের প্রেক্ষাপটে), প্রোপেন সহজেই বাষ্পে পরিণত হতে পারে।
- বিউটেন: এর স্ফুটনাঙ্ক হলো -০.৫° সেলসিয়াস। অর্থাৎ, তাপমাত্রা যদি ০° সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার নিচে নেমে যায়, তখন বিউটেনের বাষ্পে পরিণত হওয়ার হার মারাত্মকভাবে কমে যায়।
ভারতের মতো দেশে গার্হস্থ্য এলপিজি সিলিন্ডারে বিউটেনের ভাগই বেশি থাকে। তাই শীতকালে, বিশেষত যেসব অঞ্চলে তাপমাত্রা খুব কমে যায়, সেখানে সিলিন্ডারের ভেতরের তরল বিউটেন সহজে বাষ্পে পরিণত হতে পারে না। ফলে সিলিন্ডারের ভেতরের চাপ (Pressure) কমে যায়। আমাদের মনে হয় গ্যাস থাকা সত্ত্বেও সিলিন্ডার ‘খালি’ হয়ে গেছে বা ‘জমে’ গেছে। এটি গ্যাসের ‘জমে যাওয়া’ (Freezing) নয়, বরং বাষ্পীভবনের হার কমে যাওয়া (Poor Vaporization)।
এই কারণেই শীতের সকালে সিলিন্ডারের গা খুব ঠান্ডা অনুভূত হয় এবং অনেক সময় সিলিন্ডারের গায়ে বাইরে থেকে জলীয় বাষ্প জমে বরফের মতো আস্তরণও পড়তে দেখা যায়। এটি ভেতরের গ্যাস বাষ্পে পরিণত হওয়ার সময় পরিবেশ থেকে তাপ শোষণ করার ফলেই ঘটে।
বিপদ ‘জমাট’ গ্যাসে নয়, বিপদ এই ভুলগুলিতে!
যখনই মানুষ এই ‘গ্যাস কমে যাওয়ার’ সমস্যার সম্মুখীন হন, তখনই তাঁরা কিছু বিপজ্জনক ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, যা থেকে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আসল বিপদগুলি হলো:
ভুল ১: সিলিন্ডার গরম করার মারাত্মক প্রবণতা (The Deadly Mistake of Heating the Cylinder)
এটি শীতকালে ঘটা দুর্ঘটনাগুলির অন্যতম প্রধান কারণ। গ্যাস কম বেরোচ্ছে দেখে অনেকেই সিলিন্ডারটিকে গরম করার চেষ্টা করেন।
যা কখনোই করবেন না:
- সরাসরি আগুন বা হিটারের সামনে রাখা: সিলিন্ডারকে কখনোই আগুনের উনুন, রুম হিটার বা ব্লোয়ারের সামনে রাখা উচিত নয়। এলপিজি অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। তাপ পেলে সিলিন্ডারের ভেতরের তরল গ্যাস দ্রুত বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করে এবং সিলিন্ডারের ভেতরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত চাপ সিলিন্ডার সহ্য করতে না পারলে এটি একটি বোমার মতো ফেটে যেতে পারে। এই ঘটনাকে BLEVE (Boiling Liquid Expanding Vapor Explosion) বলা হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।
- গরম জলে ডোবানো বা গরম জল ঢালা: অনেকেই সিলিন্ডারকে গরম জলের বালতিতে বসিয়ে দেন বা তার গায়ে গরম জল ঢালেন। এটিও একইরকম বিপজ্জনক। হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনে সিলিন্ডারের ধাতব কাঠামোর ক্ষতি হতে পারে এবং ভেতরের চাপ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যেতে পারে।
- সিলিন্ডার কাৎ করে বা উল্টে ব্যবহার করা: গ্যাসে কম আসায় অনেকেই সিলিন্ডারটিকে কাৎ করে বা শুইয়ে দেন। এটি অত্যন্ত ভুল একটি অভ্যাস। সিলিন্ডার সবসময় খাড়াভাবে রাখার জন্যই ডিজাইন করা হয়। কাৎ করলে তরল এলপিজি সরাসরি পাইপে চলে এসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।
সঠিক উপায়: যদি গ্যাস কম বের হয়, সিলিন্ডারটিকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখুন। খুব প্রয়োজন হলে, একটি ভিজে কাপড় দিয়ে সিলিন্ডারের গা মুছে দিতে পারেন (ঘষবেন না), তবে কোনোভাবেই গরম করার চেষ্টা করবেন না। সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো, আপনার গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরের সাথে যোগাযোগ করা।
গ্যাস সাবসিডি পেতে চান? আধার লিংক না করলে হাতছাড়া হবে সুবিধা!
ভুল ২: বন্ধ ঘরে গ্যাস ব্যবহার (Using Gas Appliances in a Closed Room)
শীতকালে আমরা ঠান্ডা এড়ানোর জন্য ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ রাখি। রান্নাঘরও এর ব্যতিক্রম নয়। এটি একটি ‘নীরব ঘাতক’ (Silent Killer) পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিপদ: কার্বন মনোক্সাইড (CO) পয়জনিং
গ্যাস ওভেন, গ্যাস গিজার বা যেকোনো জ্বালানি যখন জ্বলে, তখন তার অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। একটি বন্ধ ঘরে অক্সিজেনের সরবরাহ সীমিত থাকে। যখন পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে এলপিজি অসম্পূর্ণভাবে জ্বলে (Incomplete Combustion), তখন বর্ণহীন, গন্ধহীন বিষাক্ত কার্বন মনোকল্সাইড (Carbon Monoxide or CO) গ্যাস তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহস্থালীর বায়ু দূষণের কারণে মারা যান, যার একটি বড় অংশ এই ধরনের অসম্পূর্ণ দহন।
কার্বন মনোক্সাইডের লক্ষণ:
- মাথা ব্যথা
- বমি ভাব
- মাথা ঘোরা
- দুর্বলতা
- দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই গ্যাস গন্ধহীন হওয়ায় মানুষ আক্রান্ত হলেও বুঝতে পারেন না। ঘুমন্ত অবস্থায় এটি ঘটলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ করে বাথরুমে গ্যাস গিজার ব্যবহার করলে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
সমাধান:
- রান্না করার সময় রান্নাঘরের জানালা সামান্য খুলে রাখুন।
- রান্নাঘরে একটি ভালো মানের এগজস্ট ফ্যান (Exhaust Fan) অবশ্যই চালু রাখুন।
- বাথরুমের গ্যাস গিজার কখনোই বাথরুমের ভেতরে রাখবেন না। এটি বাথরুমের বাইরে বা বারান্দায় রাখুন এবং এর এগজস্ট পাইপ যেন খোলা জায়গায় থাকে তা নিশ্চিত করুন।
ভুল ৩: গ্যাসের পাইপ এবং রেগুলেটরের প্রতি উদাসীনতা
শীতের শুষ্ক এবং ঠান্ডা আবহাওয়া রাবার বা প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে।
- পাইপ ফেটে যাওয়া: এলপিজি সিলিন্ডার থেকে ওভেন পর্যন্ত যে রাবার বা পিভিসি পাইপটি (Hose Pipe) ব্যবহার করা হয়, তা শীতের ঠান্ডায় শক্ত এবং ভঙ্গুর (Brittle) হয়ে যেতে পারে। সামান্য অসাবধানতায় বা টান পড়লে এতে সূক্ষ্ম ফাটল ধরতে পারে। এই ফাটল দিয়ে গ্যাস লিক করতে পারে, যা আগুনের সংস্পর্শে এলেই বিপদ।
- রেগুলেটরের সমস্যা: রেগুলেটরের ভেতরের রাবার সিল বা ওয়াশারও ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা লিক সৃষ্টি করতে পারে।
করণীয়:
- প্রতিদিন রান্না শুরু করার আগে পাইপটি ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। দেখুন তাতে কোনো ফাটল, কাটা দাগ বা ফোস্কা পড়েছে কিনা।
- শুধুমাত্র ISI-চিহ্নিত এবং এলপিজি কোম্পানির অনুমোদিত (যেমন, Indane Suraksha LPG Hose) পাইপ ব্যবহার করুন।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের পাইপ প্রতি ২ বছরে এবং সর্বোচ্চ ৫ বছরের মধ্যে অবশ্যই বদলে ফেলা উচিত, তা দেখতে যতই ভালো থাকুক না কেন। পাইপের গায়ে এর মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ (Expiry Date) লেখা থাকে, তা পরীক্ষা করুন।
- প্রতি ৫ বছর অন্তর রেগুলেটরটি পরীক্ষা করানো বা বদলে নেওয়া উচিত।
এলপিজি (LPG) কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে? (একটি গভীর বিশ্লেষণ)
এলপিজি (LPG) হলো হাইড্রোকার্বন গ্যাসের একটি দাহ্য মিশ্রণ। এটি মূলত প্রোপেন ($C_3H_8$) এবং বিউটেন ($C_4H_{10}$) নিয়ে গঠিত। এই গ্যাসগুলি পেট্রোলিয়াম পরিশোধন বা প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের সময় উপজাত (By-product) হিসাবে পাওয়া যায়।
এলপিজি-কে সিলিন্ডারে ভরার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। সাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপে এটি গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। কিন্তু যখন এর ওপর চাপ বাড়ানো হয় (প্রায় ৮-১০ গুণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ) এবং তাপমাত্রা কমানো হয়, তখন এটি তরলে পরিণত হয়। এই তরল অবস্থাতেই এটি সিলিন্ডারে সংরক্ষণ এবং পরিবহন করা হয়। এক লিটার তরল এলপিজি প্রায় ২৫০ লিটার গ্যাসীয় এলপিজির সমান স্থান নেয়, তাই এভাবে এটি সংরক্ষণ করা অনেক সুবিধাজনক।
এলপিজির নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই!
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বিশুদ্ধ এলপিজির নিজস্ব কোনো রঙ বা গন্ধ নেই। কিন্তু গ্যাস লিক হলে তা বোঝার জন্য এর সাথে ‘ইথাইল মারক্যাপ্টান’ (Ethyl Mercaptan) নামক একটি তীব্র গন্ধযুক্ত রাসায়নিক মেশানো হয়। আমরা গ্যাস লিকের যে ‘পচা ডিমের’ মতো গন্ধ পাই, তা আসলে এই মারক্যাপ্টানের গন্ধ।
গ্যাস লিক (Gas Leak): চেনার উপায় ও তাৎক্ষণিক করণীয়
সতর্কতা সত্ত্বেও যেকোনো সময় গ্যাস লিক হতে পারে। এই সময় আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াটা জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
লিক চেনার উপায়
১. গন্ধ: ‘ইথাইল মারক্যাপ্টান’-এর তীব্র পচা গন্ধ।
২. শব্দ: সিলিন্ডার বা পাইপের কাছ থেকে হিস্ হিস্ (Hissing) শব্দ আসা।
৩. সোপ টেস্ট (Soap Test): যদি সন্দেহ হয়, সাবানের ফেনার একটি মিশ্রণ তৈরি করে সন্দেহজনক জায়গায় (পাইপের জয়েন্ট, রেগুলেটরের সংযোগস্থল) লাগান। যদি বুদবুদ (Bubble) তৈরি হয়, তবে নিশ্চিতভাবে সেখানে লিক আছে। কখনোই দেশলাই বা লাইটার জ্বেলে লিক পরীক্ষা করবেন না।
লিক হলে কী করবেন (১০টি জরুরি পদক্ষেপ)
ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDMA) এবং গ্যাস কোম্পানিগুলির নির্দেশিকা অনুযায়ী, লিক হলে এই পদক্ষেপগুলি নিন:
১. আতঙ্কিত হবেন না: মাথা ঠান্ডা রাখুন।
২. আগুন জ্বালাবেন না: দেশলাই, লাইটার, মোমবাতি বা যেকোনো ধরনের আগুন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৩. ইলেকট্রিক সুইচ স্পর্শ করবেন না: কোনো ইলেকট্রিক সুইচ অন বা অফ করবেন না। ঘরের আলো জ্বললে তা জ্বলতে দিন, বন্ধ থাকলে বন্ধই রাখুন। সুইচ অন/অফ করার সময় যে সামান্য স্পার্ক (Spark) তৈরি হয়, তা থেকেই জমে থাকা গ্যাসে আগুন লেগে বিস্ফোরণ হতে পারে।
৪. মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না: ঘরের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার বা রিসিভ করবেন না।
৫. রেগুলেটর বন্ধ করুন: যত দ্রুত সম্ভব সিলিন্ডারের রেগুলেটরের নবটি বন্ধ (Off) করুন। যদি রেগুলেটর থেকে লিক হয়, তবে সিলিন্ডারের ওপরের সেফটি ক্যাপ (Safety Cap)টি সজোরে চেপে বসিয়ে দিন।
৬. দরজা-জানালা খুলে দিন: ঘরের সমস্ত দরজা ও জানালা খুলে দিন, যাতে গ্যাস বেরিয়ে যেতে পারে এবং তাজা বাতাস আসতে পারে। মনে রাখবেন, এলপিজি বাতাসর থেকে ভারী, তাই এটি মেঝেতে জমা হয়।
৭. পাখা বা এগজস্ট ফ্যান চালাবেন না: এগজস্ট ফ্যান বা সিলিং ফ্যানও চালাবেন না, কারণ এগুলিও ইলেকট্রিক সুইচ।
৮. পরিবারের সবাইকে বাইরে আনুন: শিশু, বৃদ্ধ এবং পোষ্যদের সহ সবাইকে দ্রুত ঘর থেকে বের করে একটি নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে আসুন।
৯. ডিস্ট্রিবিউটরকে খবর দিন: বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে আপনার গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরের ইমার্জেন্সি নম্বরে বা ফায়ার সার্ভিসে (Fire Brigade) খবর দিন।
১০. ভেজা কাপড়: যদি সিলিন্ডারে আগুন লেগেই যায় (শুধুমাত্র রেগুলেটরের মুখে), তবে একটি ভেজা চটের বস্তা বা মোটা কাঁথা বা কম্বল দিয়ে সজোরে জড়িয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রশিক্ষণ না থাকলে এই চেষ্টা না করে অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়াই শ্রেয়।
সুরক্ষিত রান্নাঘরের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
কেবলমাত্র শীতকালেই নয়, সারা বছরই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ভারতের প্রধান গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলি, যেমন ইন্ডেন (Indane), এইচপি গ্যাস (HP Gas) এবং ভারত গ্যাস (Bharat Gas), এবং সেইসাথে রেগুলেটরি বডি PESO (পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভ সেফটি অর্গানাইজেশন)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি সুরক্ষিত রান্নাঘরের মানদণ্ড নিচে দেওয়া হলো।
সিলিন্ডার বসানোর সঠিক স্থান
- বায়ুচলাচল: সিলিন্ডারটি রান্নাঘরের এমন জায়গায় রাখুন যেখানে পর্যাপ্ত বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা আছে।
- সমতল ও খাড়া: সিলিন্ডারটি সবসময় একটি সমতল, শক্ত মেঝের ওপর খাড়াভাবে (Upright) রাখতে হবে। একে কখনোই শুইয়ে বা কাৎ করে রাখা চলবে না।
- তাপ থেকে দূরে: চুলা, হিটার বা অন্য কোনো তাপের উৎস থেকে সিলিন্ডারকে অন্তত ৩-৪ ফুট দূরে রাখতে হবে। সরাসরি সূর্যরশ্মি যেন সিলিন্ডারের ওপর না পড়ে।
- চুলা থেকে নিচুতে: এলপিজি বাতাসর থেকে ভারী। তাই নিরাপত্তার জন্য সিলিন্ডারটি সবসময় গ্যাস ওভেনের থেকে নিচু স্তরে রাখা উচিত, যাতে লিক হলে গ্যাসটি মেঝে বরাবর ছড়িয়ে পড়ে এবং চুলার আগুনের সংস্পর্শে না আসে। সিলিন্ডারকে কোনো ক্যাবিনেট বা তাকের ওপরে রাখা উচিত নয়।
- বদ্ধ স্থান বর্জন: সিলিন্ডার কখনোই কোনো বন্ধ আলমারি, ক্যাবিনেট বা বেসমেন্টের মধ্যে রাখবেন না।
গ্যাস ওভেন (Gas Oven) ব্যবহারের নিয়মাবলী
- শিখার রঙ: একটি সুস্থ ওভেন বা বার্নারের শিখার রঙ হবে নীল। যদি শিখার রঙ হলুদ বা কমলা হয়, তবে বুঝতে হবে গ্যাসের অসম্পূর্ণ দহন হচ্ছে (অর্থাৎ কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হচ্ছে) অথবা বার্নার নোংরা হয়েছে। অবিলম্বে বার্নার পরিষ্কার করুন বা সার্ভিসিং করান।
- আগে লাইটার, পরে নব: ওভেন জ্বালানোর সঠিক নিয়ম হলো, আগে লাইটার বা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে বার্নারের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তারপর ওভেনের নব অন করা। এর উল্টোটা করলে (আগে নব অন করে পরে লাইটার খুঁজলে) গ্যাস জমা হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
- রান্নার সময় নজরদারি: রান্না বসিয়ে, বিশেষত দুধ বা জল গরম করতে দিয়ে অন্য ঘরে চলে যাবেন না। উথলে পড়ে আগুন নিভে গেলে গ্যাস লিক হতে থাকবে।
শীতকালীন বিশেষ সতর্কতা: একটি চেকলিস্ট
শীতকালে আপনার রান্নাঘরকে সুরক্ষিত রাখতে এই চেকলিস্টটি অনুসরণ করুন:
| বিষয় (Category) | করণীয় (Action Required) | গুরুত্ব (Importance) |
| ভেন্টিলেশন | রান্না করার সময় রান্নাঘরের জানালা বা দরজা সামান্য খোলা রাখুন। এগজস্ট ফ্যান চালু রাখুন। | অত্যন্ত জরুরি |
| সিলিন্ডার পজিশন | সিলিন্ডার খাড়া রাখুন। কখনোই গরম করার চেষ্টা করবেন না (আগুন, জল বা হিটার দিয়ে)। | প্রাণঘাতী ঝুঁকি |
| গ্যাস পাইপ (Hose) | প্রতিদিন চোখে দেখে পরীক্ষা করুন। ফাটল, ছিদ্র বা শক্ত হয়ে গেছে কিনা দেখুন। ৫ বছরের বেশি পুরানো হলে বদলে ফেলুন। | অত্যন্ত জরুরি |
| গ্যাস গিজার | বাথরুমের ভেতরে গিজার থাকলে অবিলম্বে তা বাইরে শিফট করুন। ভেন্টিলেশন পাইপ চেক করুন। | প্রাণঘাতী ঝুঁকি |
| ওভেন বার্নার | আগুনের শিখা নীল আছে কিনা দেখুন। হলুদ শিখা মানেই বিপদ সংকেত (CO)। | জরুরি |
| গন্ধ | রান্নাঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিন (যেমনটা ওপরে বলা হয়েছে)। | অত্যন্ত জরুরি |
শীতকাল আরামদায়ক হতে পারে, যদি আমরা সচেতন থাকি। মনে রাখবেন, এলপিজি সিলিন্ডারের আসল বিপদ ঠান্ডায় ‘জমে যাওয়া’ নয়, বরং আমাদের অসচেতনতা, ভুল ধারণা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। সিলিন্ডার গরম করার চেষ্টা করা, বন্ধ ঘরে রান্না করা বা ফাটল ধরা পাইপ ব্যবহার করা—এই ভুলগুলিই ছোট অসাবধানতাকে বড় দুর্ঘটনায় পরিণত করে। সামান্য সতর্কতা এবং সঠিক জ্ঞানই পারে আপনার পরিবারকে এই ভয়ানক পরিণাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে











