বিশ্বের সবচেয়ে শীতল জনপদ: যেখানে হিমাঙ্কের নিচে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মানুষ বেঁচে থাকে

পৃথিবীতে এমন কিছু স্থান রয়েছে যেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যায়, তবুও সেখানে মানুষ বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলের ওইমিয়াকন এবং…

Srijita Chattopadhay

 

পৃথিবীতে এমন কিছু স্থান রয়েছে যেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যায়, তবুও সেখানে মানুষ বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলের ওইমিয়াকন এবং ভেরখয়ান্স্ক গ্রাম এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে, যেখানে রেকর্ড তাপমাত্রা -৬৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমেছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে, ওইমিয়াকন বিশ্বের সবচেয়ে ঠান্ডা স্থায়ী বসতিপূর্ণ স্থান হিসেবে স্বীকৃত। এই চরম পরিবেশে প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন, যা মানব সহনশীলতার এক অসাধারণ উদাহরণ।

ওইমিয়াকন: পৃথিবীর শীতলতম জনপদ

রাশিয়ার সাখা প্রজাতন্ত্রের (ইয়াকুটিয়া) অন্তর্গত ওইমিয়াকন একটি ছোট্ট গ্রাম যেখানে প্রায় ৫০০ জন মানুষ বসবাস করে। এই গ্রামে ১৯২৪ সালে -৭১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, যা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। তবে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত রেকর্ড অনুযায়ী ১৯৩৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এখানে -৬৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছিল, যা অ্যান্টার্কটিকার বাইরে রেকর্ড করা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এই তাপমাত্রা এতটাই চরম যে মানুষের চোখের পাতা জমে যেতে পারে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বাতাস জমে বরফ হয়ে যায়।

ওইমিয়াকন গ্রামটি প্রায় ২২৫টি পরিবারের বাসস্থান এবং শীতকালে ঘরের ভিতর এবং বাইরের তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে। এখানকার বাসিন্দারা মূলত মাছ ধরা এবং তাইগা বনে শিকারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। জানুয়ারি মাসে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে -৪৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং স্কুলগুলি কেবলমাত্র তখনই বন্ধ হয় যখন তাপমাত্রা -৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়।

ভেরখয়ান্স্ক: উত্তর মেরুর হিমশীতল শহর

ভেরখয়ান্স্ক ওইমিয়াকনের সাথে সবচেয়ে ঠান্ডা জনবসতিপূর্ণ স্থানের রেকর্ড ভাগ করে নেয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুসারে, ১৮৯২ সালের ৫ এবং ৭ ফেব্রুয়ারি এখানে -৬৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এই শহরে প্রায় ১,৩১১ জন মানুষ বসবাس করে এবং এটি আর্কটিক সার্কেলের ভিতরে অবস্থিত।

ভেরখয়ান্স্কের বৈশিষ্ট্য হল এর চরম তাপমাত্রার পার্থক্য। জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা -৪৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও জুলাই মাসে তা বেড়ে +১৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, ২০২০ সালের ২০ জুন এখানে +৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা আর্কটিক সার্কেলের উত্তরে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। এর ফলে এই শহরটি ১০৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পার্থক্যের রেকর্ড ধারণ করে, যা বিশ্বের বৃহত্তম তাপমাত্রা পরিসীমা।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে ভেরখয়ান্স্কে তাপমাত্রা -৭১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমেছিল এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল মাত্র -৬৯.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল প্রায় -৪৫.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দেখায় যে এই অঞ্চলে চরম শীত একটি নিয়মিত ঘটনা।

ইয়াকুটস্ক: বিশ্বের শীতলতম প্রধান শহর

ইয়াকুটস্ক সাইবেরিয়ার একটি প্রধান শহর যেখানে ৩,৫৫,০০০-এর বেশি মানুষ বসবাস করে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঠান্ডা প্রধান শহর হিসেবে পরিচিত এবং এখানে ১৮৯১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি -৬৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ইয়াকুটস্ক অঞ্চলে তাপমাত্রা -৬২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমেছিল, যা দুই দশকের মধ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে ঠান্ডা দিন ছিল।

ইয়াকুটস্কের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা -৮.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে স্বাভাবিক শীতে তাপমাত্রা -৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। জানুয়ারি মাসে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে -৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা -৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যার মানে সারাদিন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে।

ইয়াকুটস্কের অধিকাংশ বাসিন্দা আলরোসা নামক একটি হীরা খনি কোম্পানিতে কাজ করে। শহরটি ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তাপমাত্রা -৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই স্তরে থাকে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শহরে তাপমাত্রা -৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমেছিল, যা ১৫ বছরের মধ্যে রেকর্ড করা সবচেয়ে কম তাপমাত্রা।

চরম শীতে দৈনন্দিন জীবনযাপন

এই চরম পরিবেশে মানুষের জীবনযাপন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং বিশেষ অভিযোজন প্রয়োজন। এখানকার বাসিন্দাদের অবশ্যই বিশেষভাবে নির্মিত বাড়িতে থাকতে হয় যেগুলি সুরক্ষিত নিরোধক ব্যবস্থায় সজ্জিত। ঘরগুলিতে ক্রমাগত গরম জল বা বাষ্প সরবরাহ করা হয় যাতে পাইপ জমে না যায়।

গাড়ি চালানো একটি বড় সমস্যা কারণ এই তাপমাত্রায় ইঞ্জিন জমে যেতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারা হয় গরম গ্যারেজে গাড়ি রাখে অথবা সারা শীতকাল ইঞ্জিন চালু রেখে দেয়। যদি গাড়ি বন্ধ করা হয় তবে তা আবার চালু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইয়াকুটস্কের একজন বাসিন্দা বলেছেন, “আপনি এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন না। হয় আপনি মানিয়ে নিয়ে উপযুক্তভাবে পোশাক পরবেন নয়তো কষ্ট ভোগ করবেন।”

পোশাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষকে অবশ্যই একাধিক স্তরের পোশাক পরতে হয়। শরীর থেকে মাথার মাধ্যমে ৪০-৪৫ শতাংশ তাপ হারাতে পারে, তাই উষ্ণ টুপি এবং স্কার্ফ অপরিহার্য। বাসিন্দারা সাধারণত দুটি স্কার্ফ, একাধিক গ্লাভস, টুপি এবং হুড পরেন। ত্বক রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি কারণ খোলা ত্বক কয়েক মিনিটের মধ্যে তুষারাঘাতে আক্রান্ত হতে পারে।

খাদ্য মূলত মাছ, মাংস এবং শিকার থেকে প্রাপ্ত পশুজাত পণ্যের উপর নির্ভরশীল। উচ্চ প্রোটিন খাদ্য শরীরে বেশি তাপ উৎপাদনে সাহায্য করে এবং বিপাকীয় হার বৃদ্ধি করে। কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব কারণ মাটি বছরের বেশিরভাগ সময় পার্মাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত থাকে।

স্কুলগুলি সাধারণত চলতে থাকে যতক্ষণ না তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট স্তরের নিচে নেমে যায়। ওইমিয়াকনে স্কুল কেবলমাত্র তখনই বন্ধ হয় যখন তাপমাত্রা -৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, যা দেখায় যে মানুষ কতটা এই চরম পরিবেশে অভ্যস্ত।

পৃথিবীর অন্যান্য শীতল জনবসতি

উলানবাটার: বিশ্বের শীতলতম রাজধানী

মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটার বিশ্বের সবচেয়ে ঠান্ডা রাজধানী শহর। এর বার্ষিক গড় তাপমাত্রা -২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে, যা সারা বছর হিমাঙ্কের কাছাকাছি। এটি পরবর্তী শীতলতম রাজধানী রেইকিয়াভিক থেকে ৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা। মঙ্গোলিয়ার মহাদেশীয় জলবায়ু রয়েছে যা সমুদ্রের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় চরম শীতের সৃষ্টি করে।

স্ন্যাগ, কানাডা: উত্তর আমেরিকার শীতলতম স্থান

ইউকন অঞ্চলের স্ন্যাগ নামক একটি ছোট্ট স্থানে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে কম তাপমাত্রার রেকর্ড রয়েছে। ১৯৪৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এখানে -৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-৮১.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। স্ন্যাগ একটি বড় বাটি আকৃতির উপত্যকায় একটি মালভূমিতে অবস্থিত, যেখানে আশেপাশের পর্বতমালা থেকে ঠান্ডা বাতাস নেমে আসে এবং দক্ষিণের পর্বতগুলি উষ্ণ বাতাসকে আটকে রাখে।

নর্ডিক দেশসমূহ: ইউরোপের হিমশীতল অঞ্চল

নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন পৃথিবীর অন্যতম শীতল দেশ। ফিনল্যান্ডে শীতকাল ১০০-২০০ দিন স্থায়ী হয় এবং ল্যাপল্যান্ডে তাপমাত্রা -৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যেতে পারে। নরওয়ের ফিনমার্ক অঞ্চলে নিয়মিতভাবে তাপমাত্রা -৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নেমে যায়। সুইডেনের ভুগাটজালমে এলাকায় -৫২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: কেন এত ঠান্ডা?

এই অঞ্চলগুলিতে চরম শীতের পিছনে বেশ কয়েকটি ভৌগোলিক এবং জলবায়ু কারণ রয়েছে। প্রথমত, এগুলি উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত যেখানে সূর্যের আলো অত্যন্ত তির্যকভাবে পড়ে এবং শীতকালে সূর্য দিগন্তের খুব কাছাকাছি থাকে। ইয়াকুটস্কে জানুয়ারি মাসে দিনে মাত্র চার ঘণ্টার কম সূর্যালোক পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলগুলিতে মহাদেশীয় জলবায়ু বিরাজমান যা সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় সৃষ্টি হয়। সমুদ্র তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু সাইবেরিয়া এই প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন। শীতকালে উচ্চ চাপ বলয় এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে যা উষ্ণ বাতাসকে প্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং মেঘহীন আকাশের সৃষ্টি করে, ফলে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে হারিয়ে যায়।

তৃতীয়ত, অনেক এলাকা উপত্যকা বা নিম্নভূমিতে অবস্থিত যেখানে ঠান্ডা বাতাস জমা হয়। ভেরখয়ান্স্ক এবং ওইমিয়াকন উভয়ই এমন ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত যেখানে পার্শ্ববর্তী পর্বতমালা থেকে ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে এসে জমা হয়, যার ফলে তাপমাত্রা আরও কমে যায়।

মানব শরীরের অভিযোজন এবং সীমাবদ্ধতা

মানুষের শরীর কিছুটা ঠান্ডার সাথে মানিয়ে নিতে পারে তবে সীমা রয়েছে। একজন পোশাক পরা ব্যক্তি বাতাসহীন অবস্থায় -২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। তবে বাতাস পরিস্থিতি আরও খারাপ করে দেয়, যাকে “উইন্ড চিল ফ্যাক্টর” বলা হয়। পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ থাকলে শরীর যথেষ্ট তাপ উৎপাদন করতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডায় কাজ করার জন্য শরীর অভিযোজিত হতে পারে, যেমনটি এস্কিমো এবং জেলেদের মধ্যে দেখা যায়। আদিবাসীদের উচ্চ বিপাকীয় হার তাদের উচ্চ প্রোটিন খাদ্যের কারণে হয় যা বেশি তাপ উৎপাদনে সহায়তা করে। সক্রিয় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ঠান্ডা তাপমাত্রা হৃদস্পন্দন কমিয়ে দিতে পারে, যা রক্ত প্রবাহ হ্রাস করে এবং শরীরকে আরও ঠান্ডা করে তোলে।

পরিবেশগত প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তন

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনকি এই চরম শীতল অঞ্চলগুলিতেও পরিবর্তন আসছে। ২০২০ সালে ভেরখয়ান্স্কে +৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, যা বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করেছে। আর্কটিক অঞ্চলে উষ্ণায়ন বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত হারে ঘটছে।

পার্মাফ্রস্ট গলে যাওয়া একটি বড় সমস্যা যা ভবন এবং অবকাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। ইয়াকুটস্কের মতো শহরগুলিতে ভবনগুলি মাটির উপরে খুঁটির উপর নির্মিত হয় যাতে তাপ স্থানান্তর রোধ করা যায়, কিন্তু পার্মাফ্রস্ট গলে গেলে এই কাঠামোগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পর্যটন এবং বাহ্যিক আগ্রহ

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই চরম শীতল স্থানগুলি পর্যটকদের আকর্ষণ করছে যারা চরম অভিজ্ঞতা খুঁজছেন। ওইমিয়াকন এবং ইয়াকুটস্ক উভয়ই দর্শক গ্রহণ করে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা স্থানের অভিজ্ঞতা নিতে চায়। স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটন একটি নতুন আয়ের উৎস হয়ে উঠছে, যদিও এটি এখনও অল্প সংখ্যক সাহসী ভ্রমণকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

২০২৫ সালে ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অঞ্চলগুলির ভিডিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাসিন্দারা তাদের দৈনন্দিন জীবন, খাবার, এবং চরম পরিস্থিতিতে কীভাবে বেঁচে থাকা যায় সেই বিষয়ে ভিডিও শেয়ার করছেন, যা বিশ্বব্যাপী দর্শকদের আকৃষ্ট করছে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: বিশ্বের শীতলতম স্থানসমূহ

স্থান দেশ রেকর্ড তাপমাত্রা জনসংখ্যা বিশেষত্ব
ওইমিয়াকন রাশিয়া -৬৭.৭°সে থেকে -৭১.২°সে প্রায় ৫০০-৮০০ সবচেয়ে ঠান্ডা জনবসতি
ভেরখয়ান্স্ক রাশিয়া -৬৭.৭°সে ১,৩১১ বৃহত্তম তাপমাত্রা পরিসীমা
ইয়াকুটস্ক রাশিয়া -৬৪.৪°সে ৩,৫৫,০০০+ শীতলতম প্রধান শহর
স্ন্যাগ কানাডা -৬৩°সে খুবই কম উত্তর আমেরিকার রেকর্ড
উলানবাটার মঙ্গোলিয়া -৪৫°সে ১৫ লক্ষ+ শীতলতম রাজধানী

অর্থনীতি এবং জীবিকা

এই চরম পরিবেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সীমিত কিন্তু বিদ্যমান। ইয়াকুটস্ক অঞ্চলে হীরা খনন একটি প্রধান শিল্প এবং আলরোসা কোম্পানি বিশ্বের বৃহত্তম হীরা উৎপাদকদের মধ্যে একটি। প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন সোনা, হীরা এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে হরিণ পালন, মাছ ধরা এবং শিকার। ইয়াকুট এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী শতাব্দী ধরে এই পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করে বেঁচে রয়েছে। তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং দক্ষতা এই চরম পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।

সরকারি চাকরি এবং পরিষেবা খাতও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত বড় শহর যেমন ইয়াকুটস্কে। তবে, জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যন্ত উচ্চ কারণ বেশিরভাগ পণ্য দূর থেকে পরিবহন করতে হয়। শীতকালে পরিবহন আরও কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে যখন রাস্তাগুলি বরফে আচ্ছাদিত থাকে এবং নদীগুলি জমে যায়।

সংস্কৃতি এবং সামাজিক জীবন

চরম পরিবেশ এই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সম্প্রদায়ের বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী কারণ বেঁচে থাকার জন্য পারস্পরিক সহায়তা অপরিহার্য। প্রতিবেশীরা একে অপরের দেখাশোনা করে এবং জরুরি অবস্থায় সাহায্য করে।

শীতকালে সামাজিক কার্যক্রম সীমিত হলেও মানুষ বিভিন্ন উৎসব এবং ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান উদযাপন করে। ইয়াকুট সংস্কৃতিতে গ্রীষ্মকালীন উৎসব “ইসিয়াখ” একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেখানে দীর্ঘ শীতের পর উষ্ণতার আগমন উদযাপন করা হয়।

খাদ্য সংস্কৃতিও অনন্য। জমে যাওয়া মাছ এবং মাংস ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং প্রাকৃতিক হিমায়ন ব্যবস্থা সারা বছর খাদ্য সংরক্ষণের সুবিধা প্রদান করে। ইয়াকুত রান্নায় ঘোড়ার মাংস, হরিণের মাংস এবং বিভিন্ন ধরনের মাছ প্রধান উপাদান।

বিশ্বের শীতলতম জনপদগুলি মানব সহনশীলতা এবং অভিযোজন ক্ষমতার এক অসাধারণ প্রমাণ। ওইমিয়াকন, ভেরখয়ান্স্ক এবং ইয়াকুটস্কের মতো স্থানে যেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রি নিচে নেমে যায়, সেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে। এই অঞ্চলগুলি শুধুমাত্র ভৌগোলিক রেকর্ডের জন্য নয়, বরং মানুষের দৃঢ়তা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ইচ্ছাশক্তির জন্যও বিখ্যাত। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই সম্প্রদায়গুলি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, তবে তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় তাদের ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী করে তুলছে। এই চরম স্থানগুলির অধ্যয়ন কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটায় না, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরিবেশে মানব সভ্যতার স্থিতিস্থাপকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে।

About Author
Srijita Chattopadhay

সৃজিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি তার লেখা দ্বারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি তুলে ধরতে সদা উদ্যমী। সৃজিতার লেখার ধারা মূলত সাহিত্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ঘিরে আবর্তিত হয়, যেখানে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর নিবন্ধ ও প্রতিবেদনগুলি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তার বস্তুনিষ্ঠতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। সৃজিতা তার কর্মজীবনে ক্রমাগত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর, যা তাকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন