after buying new car: আপনার স্বপ্নের গাড়িটি অবশেষে ঘরে এসেছে! চকচকে নতুন গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা জয় করে ফেলেছেন। কিন্তু এই আনন্দের মুহূর্তের পরেই শুরু হয় আসল চ্যালেঞ্জ। নতুন গাড়ি কেনার পর প্রথম কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে আপনি যে সিদ্ধান্তগুলো নেবেন, তার উপর নির্ভর করবে আপনার গাড়ির দীর্ঘমেয়াদী পারফরম্যান্স, নিরাপত্তা এবং রিসেল ভ্যালু। অনেকেই এই প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন, যার ফল ভোগ করতে হয় পরবর্তী বছরগুলোতে। আজকের এই বিস্তারিত আলোচনায় আমরা জানব নতুন গাড়ি কিনে ফেলার পর আপনার প্রথম দিক থেকেই কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এবং কোন কাজগুলো একেবারেই করা যাবে না।
নতুন গাড়ির প্রাথমিক যত্নে যা অবশ্যই করবেন
প্রথম সার্ভিসিং এবং রানিং-ইন পিরিয়ড
নতুন গাড়ির প্রথম ১০০০ থেকে ১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টাকে বলা হয় ‘রানিং-ইন পিরিয়ড’। এই পর্যায়ে ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ একে অপরের সাথে মানিয়ে নেয়। তাই এই সময় গাড়ির গতি ৮০ কিমি/ঘন্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।
প্রথম সার্ভিসিং সাধারণত ১০০০ কিলোমিটার বা এক মাসের মধ্যে করাতে হয়। এই সার্ভিসিংয়ে ইঞ্জিন অয়েল, ফিল্টার পরিবর্তন এবং সামগ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। অনেকে মনে করেন যে নতুন গাড়িতে কোনো সমস্যা নেই বলে প্রথম সার্ভিসিং এড়িয়ে যাওয়া যায়। এটি একটি বড় ভুল।
Car Maintenance Tips: আপনার গাড়িকে নতুন রাখতে ১০টি অপরিহার্য রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল
বীমা এবং রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা
নতুন গাড়ি কেনার সাথে সাথেই নিশ্চিত করুন যে আপনার গাড়ির সম্পূর্ণ বীমা এবং রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র সব ঠিকঠাক আছে। ডিলার থেকে যে অস্থায়ী বীমা দেয়, সেটি সাধারণত তিন মাসের জন্য থাকে। এই সময়ের মধ্যেই স্থায়ী বীমা করিয়ে নিন।
কমপ্রিহেনসিভ ইনস্যুরেন্স করান, শুধু থার্ড পার্টি না। এতে দুর্ঘটনায় আপনার গাড়ির ক্ষতির খরচও পাবেন। আজকালকার ট্রাফিক পরিস্থিতি দেখে জিরো ডেপ্রিসিয়েশন কভার নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।
নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ওয়াশিং
নতুন গাড়ির চকচকে রূপ বজায় রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার করুন। সপ্তাহে অন্তত একবার ভালোভাবে ধোয়ান। তবে মনে রাখবেন, প্রথম দিকে খুব বেশি ওয়াক্স বা পলিশ ব্যবহার করবেন না। গাড়ির পেইন্ট সম্পূর্ণভাবে শক্ত হতে সময় লাগে।
ভিতরের দিকেও পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিন। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করুন। সিটে কোনো খাবার বা তরল পদার্থ পড়লে সাথে সাথে পরিষ্কার করুন।
যে বিষয়গুলো একেবারেই করবেন না
অতিরিক্ত গতিতে চালানো এবং রেসিং
নতুন গাড়ি পেয়ে অনেকেই উত্সাহে পূর্ণ স্পিডে চালাতে শুরু করেন। এটি গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রথম ১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হাইওয়েতেও ৮০ কিমি/ঘন্টার বেশি গতি এড়িয়ে চলুন।
ইঞ্জিনকে ফুল রেভ দেওয়া, হঠাৎ ব্রেক করা, বা দ্রুত এক্সিলারেট করা—এসব অভ্যাস ইঞ্জিনের আয়ু কমিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে গাড়িকে বিভিন্ন রোড কন্ডিশনের সাথে পরিচয় করান।
সস্তা জ্ঞান করে অননুমোদিত পার্টস ব্যবহার
বাজারে অনেক সস্তা চাইনিজ পার্টস পাওয়া যায়। প্রলোভনে পড়ে সেগুলো ব্যবহার করবেন না। নতুন গাড়িতে শুধুমাত্র অথরাইজড ডিলার থেকে বা কোম্পানির সার্টিফাইড পার্টস ব্যবহার করুন।
এয়ার ফিল্টার, অয়েল ফিল্টার, স্পার্ক প্লাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে কখনোই কোয়ালিটি কমপ্রোমাইজ করবেন না। ওয়ারেন্টি থাকা অবস্থায় কোনো অননুমোদিত মেকানিকের কাছে গেলে ওয়ারেন্টি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
অতিরিক্ত লোড এবং ওভারলোডিং
নতুন গাড়িতে শুরু থেকেই অতিরিক্ত ওজন বহন করবেন না। গাড়ির ইঞ্জিন, সাসপেনশন এবং ব্রেকিং সিস্টেম প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক লোডের জন্য ডিজাইন করা। প্রথম কয়েক মাস শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে চলাচল করুন।
পাঁচ সিটের গাড়িতে সাত-আটজন বসিয়ে চালানো, বুটে অতিরিক্ত মালপত্র ভরানো—এসব অভ্যাস শুরু থেকেই পরিহার করুন।
নিরাপত্তা এবং মেইনটেনেন্স চেকলিস্ট
টায়ার এবং চাকার যত্ন
নিয়মিত টায়ারের বাতাসের চাপ পরীক্ষা করুন। সঠিক প্রেশার বজায় না থাকলে টায়ার তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে এবং জ্ঞানও বেশি খরচ হবে। মাসে অন্তত একবার সব টায়ারের প্রেশার দেখুন।
টায়ারের ট্র্যাড প্যাটার্নও নজরে রাখুন। অসমান ক্ষয় হলে চাকার অ্যালাইনমেন্ট বা ব্যালেন্সিং করাতে হতে পারে। নতুন গাড়িতেও এই সমস্যা হতে পারে।
তরল পদার্থের স্তর পরীক্ষা
ইঞ্জিন অয়েল, ব্রেক ফ্লুইড, রেডিয়েটর কুল্যান্ট, পাওয়ার স্টিয়ারিং ফ্লুইডের স্তর নিয়মিত পরীক্ষা করুন। নতুন গাড়িতেও কোনো লিকেজ হতে পারে। তাই প্রথম দিকে একটু বেশিই নজর রাখুন।
কোনো তরল পদার্থের স্তর হঠাৎ কমে গেলে বা রঙ পরিবর্তন হলে সাথে সাথে সার্ভিস সেন্টারে যোগাযোগ করুন।
দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের কৌশল
রেগুলার সার্ভিসিং এবং রেকর্ড রাখা
প্রতিটি সার্ভিসিংয়ের একটি সুন্দর রেকর্ড রাখুন। কী কী কাজ হয়েছে, কোন পার্টস বদলানো হয়েছে, কবে পরবর্তী সার্ভিসিং দরকার—এসব তথ্য লিখে রাখুন।
ভবিষ্যতে গাড়ি বিক্রি করার সময় এই রেকর্ড অত্যন্ত কাজে আসবে। ক্রেতারা রেগুলার মেইনটেইন্ড গাড়ির জন্য ভালো দাম দিতে প্রস্তুত থাকেন।
আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা
সম্ভব হলে গাড়ি গ্যারেজে বা ছাদের নিচে রাখুন। প্রচন্ড রোদ, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি থেকে সুরক্ষিত রাখলে পেইন্ট এবং ইন্টেরিয়র দীর্ঘদিন নতুনের মতো থাকবে।
বাইরে পার্ক করতে হলে ভালো মানের কার কভার ব্যবহার করুন। তবে প্রতিদিন কভার খোলা-লাগানো পেইন্টের ক্ষতি করতে পারে।
সাশ্রয়ী ড্রাইভিং হ্যাবিট ডেভেলপ
স্মুথ অ্যাক্সিলারেশন, গ্র্যাজুয়াল ব্রেকিং, সিটি ড্রাইভিংয়ে ৪০-৫০ কিমি/ঘন্টা স্পিড মেইনটেইন করা—এসব অভ্যাস গড়ুন। এতে ইঞ্জিনের আয়ু বাড়বে এবং জ্বালানি খরচও কমবে।
ট্রাফিক জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকার সময় এয়ার কন্ডিশনার কম ব্যবহার করুন। অদরকারি আইডেলিং এড়িয়ে চলুন।
বাজেট পরিকল্পনা এবং আর্থিক বিষয়াবলী
মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচের পরিকল্পনা
নতুন গাড়ি কেনার পর শুধু EMI-ই খরচ নয়। মাসিক জ্বালানি, পার্কিং, টোল, সার্ভিসিং, বীমার পুনর্নবীকরণ—এসব খরচের জন্য আলাদা বাজেট রাখুন।
সাধারণত মাসিক চলাচলের খরচ গাড়ির দামের ১০-১৫% হতে পারে। প্রিমিয়াম কারের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি হবে।
আপনার গাড়ির দীর্ঘায়ু এবং নিরাপত্তার চাবিকাঠি: ১০টি অপরিহার্য রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল
রিসেল ভ্যালু সংরক্ষণের কৌশল
নতুন গাড়ি কেনার সাথে সাথেই ভাবতে হবে কীভাবে এর রিসেল ভ্যালু ভালো রাখা যায়। রেগুলার সার্ভিসিং, কোনো দুর্ঘটনা এড়ানো, ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র ভালো রাখা—এসব বিষয়ে সচেতন থাকুন।
অতিরিক্ত অ্যাক্সেসরিজ লাগানোর আগে ভেবে দেখুন এটি ভবিষ্যতে সবার পছন্দ হবে কিনা। কিছু কিছু মডিফিকেশন রিসেল ভ্যালু কমিয়ে দেয়।
এমার্জেন্সি প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা
ইমার্জেন্সি কিট প্রস্তুত রাখা
গাড়িতে সর্বদা একটি ফার্স্ট এইড বক্স, স্পেয়ার টায়ার, জ্যাক, লাগ রেঞ্চ, জাম্পার কেবল, টর্চলাইট রাখুন। পাংচার রিপেয়ার কিট এবং এয়ার পাম্প রাখলে রাস্তায় সমস্যায় পড়লে কাজে আসবে।
মোবাইল চার্জার, ছোট টুলকিট, কিছু পানি এবং শুকনো খাবারও রাখতে পারেন।
ইনস্যুরেন্স ক্লেইম প্রক্রিয়া জানা
দুর্ঘটনার সময় কী করতে হবে, কাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে—এসব বিষয়ে আগে থেকেই জেনে রাখুন। ইনস্যুরেন্স কোম্পানির হটলাইন নম্বর এবং এজেন্টের নম্বর ফোনে সেভ করে রাখুন।
ছোটখাটো দুর্ঘটনার ছবি তুলে রাখুন এবং প্রয়োজনে পুলিশ রিপোর্ট করান।
নতুন গাড়ি কেনার পর সঠিক পরিচর্যা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করলে আপনার স্বপ্নের গাড়িটি বহু বছর আপনার সেবা করবে। মনে রাখবেন, প্রথম কয়েক মাসে যে অভ্যাস গড়ে তুলবেন, সেটাই পরবর্তী বছরগুলোতে আপনার গাড়ির কন্ডিশন নির্ধারণ করবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সতর্ক ড্রাইভিং এবং উপযুক্ত সংরক্ষণই একটি নতুন গাড়িকে দীর্ঘদিন নতুনের মতো রাখার মূল চাবিকাঠি। তাই ভোগ করুন আপনার নতুন গাড়ির সাথে যাত্রা, কিন্তু একই সাথে থাকুন দায়িত্বশীল এবং সচেতন।











