মায়ের হাতের স্বাদের খোঁজে: কেন জেন-জি (Gen Z) এবং তরুণরা আবার ফিরে যাচ্ছে রান্নাঘরে?

একাকীত্ব কি কেবলই মনের অবস্থা, নাকি তা প্লেটের ওপরেও প্রভাব ফেলে? ভারতের মেট্রো শহরগুলোতে বসবাসকারী হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কাছে উত্তরটা এখন স্পষ্ট। সুইগি (Swiggy) বা জোমাটো (Zomato)-র সহজলভ্য দুনিয়াকে পাশ…

Riddhi Datta

 

একাকীত্ব কি কেবলই মনের অবস্থা, নাকি তা প্লেটের ওপরেও প্রভাব ফেলে? ভারতের মেট্রো শহরগুলোতে বসবাসকারী হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কাছে উত্তরটা এখন স্পষ্ট। সুইগি (Swiggy) বা জোমাটো (Zomato)-র সহজলভ্য দুনিয়াকে পাশ কাটিয়ে, বেঙ্গালুরু, পুনে, কিংবা দিল্লির ফ্ল্যাটে একলা থাকা তরুণ আইটি প্রফেশনাল বা সদ্য গ্র্যাজুয়েটরা আজ হাতা-খুন্তি হাতে তুলে নিচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এটি কেবল শখ নয়, বরং একটি শক্তিশালী সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। ২০২৪-২৫ সালের ফুড ট্রেন্ডস রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের শহুরে তরুণদের মধ্যে বাড়িতে রান্না করার প্রবণতা বা ‘Home Cooking’-এর গ্রাফ অবিশ্বাস্যভাবে ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু কেন? এর পেছনে কি কেবলই স্বাস্থ্যের চিন্তা, নাকি লুকিয়ে আছে ফেলে আসা শৈশবের সেই ‘কমফোর্ট ফুড’-এর প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা?

একলা জীবনে ‘বাড়ির স্বাদ’: একটি নতুন আখ্যান

ভারতের কর্মসংস্থানের মানচিত্র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ তরুণ তাদের ছোট শহর বা মফস্বল ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন বড় বড় মেট্রো সিটিতে। সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর, রাতে যখন তারা ফ্ল্যাটে ফেরেন, তখন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের প্লাস্টিকের কন্টেইনারের খাবার আর তাদের মন ভরাতে পারছে না। গোদরেজ ফুড ট্রেন্ডস রিপোর্ট (Godrej Food Trends Report 2024) অনুসারে, ভারতীয় তরুণরা এখন রান্নার মধ্যে এক ধরণের ‘থেরাপিউটিক’ বা মানসিক প্রশান্তি খুঁজছেন। তারা উপলব্ধি করছেন যে, মায়ের হাতের সেই ডাল-ভাত বা রবিবারের মাংসের ঝোল কেবল খাবার ছিল না, ছিল এক গভীর আবেগ ও সুরক্ষার অনুভূতি।

এই প্রবণতাটি কেবল ক্ষুধার নিবৃত্তি নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক ‘প্রত্যাবর্তন’। ইন্ডিয়া টুডে-র (India Today) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুনের একজন ৩৩ বছর বয়সী এইচআর প্রফেশনাল প্রায় ১৫ বার চেষ্টার পর তার মায়ের মতো বিরিয়ানি রান্না করতে পেরেছেন। এই সাফল্য তাকে যে মানসিক তৃপ্তি দিয়েছে, তা কোনো ফাইভ-স্টার হোটেলের খাবার দিতে পারেনি। তরুণ প্রজন্মের কাছে এখন রান্না করা মানে ‘সেলফ-লাভ’ বা নিজেকে ভালোবাসা।

পরিবারের ‘হেলথ বাজেট’ না করলে দারিদ্র্যের ছায়া! জানুন কেন এটি আজকের অপরিহার্য অস্ত্র

‘অর্ডারিং ইন’ ফ্যাটিগ বনাম রান্নার আনন্দ

গত এক দশকে ফুড টেকনোলজি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে ‘ডেলিভারি ফ্যাটিগ’ (Delivery Fatigue)। প্রতিদিন বাইরের খাবার খাওয়ার ফলে শরীরের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি সচেতন।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরের খাবারে অতিরিক্ত তেল, মশলা এবং প্রিজারভেটিভের ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। বিশেষ করে পোস্ট-প্যান্ডেমিক বা করোনা-পরবর্তী সময়ে জেন-জি (Gen Z) এবং মিলিনিয়ালরা (Millennials) তাদের ‘গাট হেলথ’ (Gut Health) বা পেটের স্বাস্থ্য নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক। তারা বুঝতে শিখেছে যে, নিজের হাতে রান্না করা খাবারে তারা তেলের পরিমাণ, মশলার মান এবং সবজির সতেজতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

কেন বাইরের খাবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে?

  • একঘেয়ে স্বাদ: রেস্তোরাঁর খাবারে প্রায়শই একই রকম ‘বেস গ্রেভি’ ব্যবহার করা হয়, যা কিছুদিন পর আর ভালো লাগে না।

  • অস্বাস্থ্যকর উপাদান: সস্তা তেল এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামের ব্যবহার।

  • প্লাস্টিক বর্জ্য: প্রতিদিনের অর্ডারে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যা পরিবেশ সচেতন তরুণদের ভাবিয়ে তুলছে।

মনস্তাত্ত্বিক কারণ: নস্টালজিয়া এবং একাকীত্ব মোকাবিলা

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, রান্না করা তরুণদের জন্য একাকীত্ব কাটানোর একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের সিনিয়রি কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. রাজীব মেহতার মতে, “রান্না করা এবং সেই খাবারের ঘ্রাণ আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশকে উদ্দীপ্ত করে যা আমাদের নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ স্পেস’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়।”

যখন একজন তরুণ বা তরুণী প্রবাসে তাদের পারিবারিক রেসিপি রান্না করেন, তখন তারা কেবল খাবার তৈরি করেন না, তারা তাদের পরিবারকে তাদের রান্নাঘরে অনুভব করেন। ভিডিও কলে মায়ের কাছ থেকে রেসিপি শুনে রান্না করাটা আজ এক ধরণের ‘ভার্চুয়াল ফ্যামিলি টাইম’-এ পরিণত হয়েছে। এটি তাদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমাতে এবং প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে সাহায্য করে।

একাকীত্ব বনাম সৃজনশীলতা

বিষয় প্রভাব
মানসিক চাপ রান্না করার প্রক্রিয়াটি (চপিং, নাড়াচাড়া) একটি ধ্যানের মতো কাজ করে, যা কর্টিসল লেভেল কমায়।
সংযোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের রান্না করা খাবারের ছবি শেয়ার করে তারা কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হন।
আত্মবিশ্বাস একটি জটিল পারিবারিক রেসিপি সফলভাবে রান্না করতে পারা আত্মবিশ্বাস বা ‘সেন্স অফ অ্যাচিভমেন্ট’ বাড়িয়ে দেয়।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: পকেট বাঁচানোর কৌশল

মেট্রো শহরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় বা ‘Cost of Living’ আকাশছোঁয়া। বেঙ্গালুরু বা মুম্বাইয়ের মতো শহরে প্রতিদিন দুই বেলা বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করা একটি বড় অর্থনৈতিক বোঝা।

নেক্সট লিপ (NextLeap)-এর একটি মার্কেট অ্যানালিসিস রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে ভারতের ‘রেডি-টু-কুক’ (Ready-to-cook) এবং হোম কুকিং মার্কেট প্রায় ৪৯০ মিলিয়ন ডলারের ছিল এবং এটি দ্রুত বাড়ছে। তরুণরা হিসাব করে দেখেছেন যে, বাড়িতে রান্না করলে মাসের শেষে তাদের ফুড বাজেটের প্রায় ৪০-৫০% সাশ্রয় হয়।

উদাহরণস্বরূপ:

  • এক প্লেট সাধারণ ‘ডাল-খিচাড়ি’ অর্ডার করতে খরচ হয় ২০০-২৫০ টাকা।

  • বাড়িতে রান্না করলে সেই একই পরিমাণ খাবারের খরচ পড়ে মাত্র ৫০-৬০ টাকা।

এই অর্থনৈতিক সাশ্রয় তরুণদের অন্য শখ পূরণ বা সঞ্চয়ে সাহায্য করছে, যা তাদের রান্নার প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলছে।

আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনা: শনাক্ত করা যাচ্ছে না মৃতদেহ, পরিবারকে ডিএনএ নমুনা জমার নির্দেশ

সাংস্কৃতিক শেকড় এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব

সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম (Instagram) এবং ইউটিউব (YouTube), এই ট্রেন্ডকে ত্বরান্বিত করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। একসময় রান্নাকে ‘বোরিং’ বা কেবল ‘নারীদের কাজ’ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আজ পুরুষ এবং নারী নির্বিশেষে ফুড ইনফ্লুয়েন্সাররা দেখাচ্ছেন যে রান্না করা একটি ‘কুল’ বা আধুনিক লাইফস্টাইল স্কিল।

‘গোদরেজ ফুড ট্রেন্ডস রিপোর্ট ২০২৪’ (Godrej Food Trends Report 2024) হাইলাইট করেছে যে, তরুণরা এখন তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার নিয়ে গর্ববোধ করছে। আগে যেখানে পিৎজা বা বার্গারের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড করত, এখন সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে মাটির হাড়িতে রান্না করা মাংস, হাতে বানানো রুটি, কিংবা ঠাকুরমার স্পেশাল আচারের রেসিপি।

ইনফ্লুয়েন্সার এফেক্ট:

  • সহজ পাঠ: অল্প সময়ের রিলস বা শর্টস-এর মাধ্যমে জটিল ভারতীয় রেসিপিগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

  • অ্যাথেনটিসিটি: তরুণরা এখন ‘ফিউশন’ খাবারের চেয়ে ‘অথেনটিক’ বা খাঁটি আঞ্চলিক খাবারের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। তারা জানতে চাইছে তাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে মশলা ব্যবহার করতেন।

আধুনিক মোড়কে ঐতিহ্যের চর্চা

যদিও তরুণরা পারিবারিক রেসিপি শিখছে, তারা সেগুলোকে হুবহু নকল করছে না; বরং নিজেদের মতো করে আধুনিক বা ‘মডার্ন টুইস্ট’ দিচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে তারা রেসিপির মূল স্বাদ ঠিক রেখে কিছু উপাদানে পরিবর্তন আনছে।

১. উপাদানের পরিবর্তন: সাদা ভাতের বদলে ব্রাউন রাইস বা কিনোয়া (Quinoa) ব্যবহার করা।
২. রান্নার পদ্ধতি: ডিপ ফ্রাই বা ডুবো তেলে ভাজার বদলে ‘এয়ার ফ্রাইয়ার’ (Air Fryer) ব্যবহার করা।
৩. সাসটেইনেবিলিটি: তারা স্থানীয় এবং সিজনাল সবজি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, যা পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী।

পুষ্টিবিদ এডউইনা রাজ (Edwina Raj)-এর মতে, “তরুণ প্রজন্ম এখন ঐতিহ্য এবং বিজ্ঞানের এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছে। তারা জানে হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ বা জিরার হজম ক্ষমতা সম্পর্কে, এবং তারা সেটা বুঝেই রান্নায় ব্যবহার করছে।”

রান্নার সরঞ্জাম বা ‘কিচেন গিয়ার’-এর বিবর্তন

তরুণদের এই রান্নামুখী হওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারের ওপরও। একসময় যেখানে নন-স্টিক প্যানের দাপট ছিল, এখন জেন-জি (Gen Z) ঝুঁকছে কাস্ট আয়রন (Cast Iron), স্টেইনলেস স্টিল এবং মাটির পাত্রের দিকে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, তরুণরা এখন টেফলন কোটিং-যুক্ত বাসনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন এবং তাই তারা ঐতিহ্যবাহী রান্নার পাত্রের দিকে ফিরে যাচ্ছে। প্রেসার কুকার, ব্লেন্ডার এবং ফুড প্রসেসরের বিক্রিও ই-কমার্স সাইটগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, তরুণ ভারতীয়দের পারিবারিক রেসিপি শেখার এই আগ্রহ কোনো ক্ষণস্থায়ী হুজুগ নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তারা বুঝতে পেরেছে যে, জীবনের ইঁদুর দৌড়ে টিকে থাকতে হলে শরীর এবং মন উভয়কেই সুস্থ রাখা জরুরি, আর তার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বাড়ির রান্নাঘরে। মায়ের পুরনো ডায়েরির পাতা উল্টে তারা যখন কোনো রেসিপি রান্না করে, তখন তারা কেবল ক্ষুধা মেটায় না, তারা তাদের শেকড়কে আঁকড়ে ধরে। একাকীত্বের শহরে এই ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর ডালই হয়ে ওঠে তাদের সবথেকে বড় আপনজন। আগামী দিনে এই ‘স্লো লিভিং’ (Slow Living) এবং ‘মাইন্ডফুল ইটিং’ (Mindful Eating)-এর ধারণা আরও শক্তিশালী হবে, যেখানে রান্নার হাত ধরেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হবে ভালোবাসা ও সংস্কৃতি।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।