বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস সম্প্রতি চীন সফরের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যকে “স্থলবদ্ধ” উল্লেখ করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি চীনকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক “বিস্তার” করার আহ্বান জানিয়েছেন, উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশ হল এই অঞ্চলের “একমাত্র সমুদ্রের অভিভাবক”। এই মন্তব্যগুলি ভারতের প্রতি একটি ছদ্মবেশী হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত ‘সাসটেইনেবল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড এনার্জি’ শীর্ষক একটি উচ্চ-পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে ইউনুস এই মন্তব্য করেন3। তিনি বলেন, “ভারতের সাতটি রাজ্য, ভারতের পূর্বাঞ্চল – যাকে সেভেন সিস্টার্স বলা হয়, তারা ভারতের একটি স্থলবদ্ধ অঞ্চল। তাদের সমুদ্রে পৌঁছানোর কোনও উপায় নেই। আমরা এই অঞ্চলের একমাত্র সমুদ্রের অভিভাবক”।
ইউনুস আরও যোগ করেন, “তাই এটি একটি বিশাল সম্ভাবনা খুলে দেয়। এটি চীনা অর্থনীতির একটি প্রসারণ হতে পারে। জিনিস তৈরি করুন, উৎপাদন করুন, বাজারজাত করুন, চীনে নিয়ে আসুন, অথবা বাকি বিশ্বে রপ্তানি করুন”। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই মন্তব্যকে “অশোভনীয়” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
চার দিনের চীন সফরে ইউনুস চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নয়টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই করেন। এই চুক্তিগুলি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, মিডিয়া, সংস্কৃতি এবং স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রকে কভার করে। সফরের সময় বাংলাদেশ চীন থেকে $২.১ বিলিয়ন বিনিয়োগ, ঋণ এবং অনুদান পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পায়।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছিলেন যে ইউনুস প্রথমে ভারত সফরের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু নয়াদিল্লি থেকে অনুকূল সাড়া পাননি। এর পরিবর্তে, ইউনুস বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে (২৬ মার্চ) একটি বিশেষ চীনা বিমানে করে বেইজিং যান, যা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের গুরুত্ব প্রতিফলিত করে।
ইউনুস চীনের সঙ্গে তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা করেছেন, যা আগে শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রকল্প ছিল। তিনি চীনকে জল ব্যবস্থাপনায় ৫০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছেন, চীনকে ‘জল ব্যবস্থাপনার মাস্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে। “আমরা আপনাদের কাছ থেকে শিখতে এসেছি; কীভাবে আমরা জল সম্পদকে মানুষের জন্য উপযোগী করতে পারি,” ইউনুস বলেন।
চীন বাংলাদেশের মংলা বন্দর আধুনিকীকরণের জন্য প্রায় $৪০০ মিলিয়ন, চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (CEIZ) উন্নয়নের জন্য $৩৫০ মিলিয়ন, এবং আরও $১৫০ মিলিয়ন কারিগরি সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উভয় দেশ সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও সম্মত হয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে সামুদ্রিক সহযোগিতা সংলাপের একটি নতুন পর্যায় অনুষ্ঠিত করার পরিকল্পনা করছে।
ইউনুসের মন্তব্য ভারতের মহলে প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সন্যাল এক্স (টুইটার) প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, “আকর্ষণীয় যে ইউনুস চীনাদের কাছে একটি জনসম্মুখে আবেদন করছেন এই ভিত্তিতে যে ভারতের ৭টি রাজ্য স্থলবদ্ধ। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে স্বাগত, কিন্তু ভারতের ৭টি রাজ্য স্থলবদ্ধ হওয়ার গুরুত্ব ঠিক কী?”
অবসরপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন অনিল গৌর ইউনুসের মন্তব্যকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেন, “মুহাম্মদ ইউনুস অর্থ সংগ্রহ করতে চীনে গেছেন কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বসে পড়েছে”। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে USAID, যা আগে বাংলাদেশকে সমর্থন করত, প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে তার অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে।
চীনের বর্ধিত প্রভাব ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে, কারণ বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে এবং দেশটির বেশ কিছু স্থান সিলিগুড়ি করিডোর (চিকেন’স নেক নামেও পরিচিত) এর কাছাকাছি অবস্থিত, যা একটি ছোট ভূখণ্ড যা উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিকে ভারতের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এর মাধ্যমে মায়ানমার, নেপাল এবং বাংলাদেশে তার উপস্থিতি বাড়িয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চীনের সীমানা সংলগ্ন এই বর্ধিত প্রভাব ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি (AEP) এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি সংকটপূর্ণ পর্যায়কে চিহ্নিত করে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার পতনের পর, যিনি দুই দশক ধরে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। আসন্ন BIMSTEC সম্মেলন আগামী এপ্রিল ২০২৫-এ উভয় দেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড় করাচ্ছে, যদিও ইউনুস এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।