পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চীন সফর শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন ২১টি সমঝোতা চুক্তি ও যৌথ উদ্যোগ নিয়ে, যার মোট মূল্য ৮৫০ কোটি ডলার। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক সমঝোতা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপেক) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা করেছে, যা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শেহবাজ শরিফ তার ছয় দিনের চীন সফরে শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রিমিয়ার লি কিয়াংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তার এক্স অ্যাকাউন্টে এই বৈঠককে “অত্যন্ত ফলপ্রসূ” বলে অভিহিত করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে চীনা কোম্পানিগুলিকে পাকিস্তানে তাদের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
সম্পাদিত চুক্তিগুলির মধ্যে ৭০০ কোটি ডলারের সমঝোতা স্মারক এবং ১৫০ কোটি ডলারের যৌথ উদ্যোগ রয়েছে। এই চুক্তিসমূহ কৃষি, নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্বাস্থ্য, ইস্পাত এবং অন্যান্য খাতে বিস্তৃত। সিপেক ২.০ এর পাঁচটি নতুন করিডোর প্রবৃদ্ধি, জীবিকা, উদ্ভাবন, সবুজ উন্নয়ন এবং উন্মুক্ততার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে।
চীনা বিনিয়োগের এই নতুন ঢেউ পাকিস্তানে চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বেইজিংয়ে ব্যবসায়িক নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, “পাকিস্তানে চীনা ভাই-বোনদের নিরাপত্তা আমাদের সবার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।” তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে পাকিস্তান চীনা কোম্পানিগুলির জন্য এক সেকেন্ডের দেরিও সহ্য করবে না।
সিপেক ২.০ এর অধীনে পাঁচটি নতুন করিডোর চালু হবে যা চীনের জিনজিয়াং প্রদেশকে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এই প্রকল্পে মেইনলাইন-১ রেল প্রকল্প, কারাকোরাম হাইওয়ে পুনর্গঠন এবং গোয়াদার বন্দরের কার্যক্রম বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা যোগ করতে পাকিস্তান চীনের পুঁজিবাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই ইউয়ান-ভিত্তিক বন্ড পাকিস্তানের জন্য ২০০-৩০০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করবে এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করবে।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পাকিস্তান-চীন বি২বি বিনিয়োগ সম্মেলনে ৩০০ পাকিস্তানি এবং ৫০০ চীনা কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছে। এই সম্মেলনে কৃষি, খনিজ পদার্থ, টেক্সটাইল, শিল্প খাত এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেবের মতে, চীনা বেসরকারি খাত এবং রপ্তানিভিত্তিক শিল্পগুলির পাকিস্তানে উৎপাদন ইউনিট স্থানান্তর করা উচিত।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের কারণ। সিপেক প্রকল্প পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে) এলাকা দিয়ে অতিক্রম করে, যা ভারত তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে মনে করে। ভারত সরকার ক্রমাগত এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে এবং এটিকে তার আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে।
২০২৫ সালে জনসংখ্যার প্রতিযোগিতায় ভারত বনাম চীন: কে হবে শীর্ষে?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সিপেক সম্পর্কে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট এবং ধারাবাহিক। সরকার ক্রমাগত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে এবং তৃতীয় কোনো দেশের এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ বা সিপেক প্রকল্পের সম্প্রসারণ অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান-চীনের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, বিশেষত যখন ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. অভিষেক শ্রীবাস্তব উল্লেখ করেছেন যে সিপেক শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়, এটি ভারতের দোরগোড়ায় একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
সিপেক প্রকল্প ২০১৩ সালে চালু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বর্তমানে এর মূল্য ৬৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই প্রকল্প চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি প্রধান অংশ যা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে স্থল ও সমুদ্র পথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষ্য রাখে।
গোয়াদার বন্দর, যা সিপেকের “মুকুটের রত্ন” হিসেবে পরিচিত, আরব সাগরের উষ্ণ জলে অবস্থিত এবং চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে বাণিজ্যিক পথ তৈরি করে। যদিও এই বন্দর ২০০৭ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং ২০১৩ সাল থেকে চীনা কোম্পানি পরিচালনা করছে, তবুও এটি তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারেনি। পাকিস্তানের সামুদ্রিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গোয়াদার পাকিস্তানের মোট সমুদ্র বাণিজ্যের মাত্র ১ শতাংশেরও কম পরিচালনা করেছে।
আফগানিস্তানের সঙ্গে সিপেক সম্প্রসারণের বিষয়েও চীন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মে ২০২৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিন দেশ সিপেক প্রকল্প আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তার করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা ভারতের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“চীন-আমেরিকা উত্তেজনা: যুদ্ধের আশঙ্কা নাকি বাণিজ্যিক চাপ? ডিপসিকের পর আলিবাবার বাজারে ফের জল্পনা
আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন-পাকিস্তান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সিপিএফটিএ) অনুযায়ী দ্বিতীয় পর্যায়ে উভয় দেশের মধ্যে শূন্য শুল্কের পণ্যের অনুপাত ৩৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশে উন্নীত হবে। ২০২৪ সালে চীন-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২৩১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রযুক্তিগত সহযোগিতার দিক থেকে সিপেক ২.০ তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বিগ ডেটার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। চীন ইতিমধ্যে পাকিস্তানের স্মার্টফোন বাজারের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন, টেলিকম এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে।
ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে চীনের সামরিক ও পারমাণবিক সহযোগিতা পাকিস্তানের সঙ্গে বৃদ্ধি। চীন ভারতের পারমাণবিক সরবরাহকারী গ্রুপ (এনএসজি) সদস্যপদ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন লাভের আকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে আসছে। এছাড়াও পাকিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসীদের সুরক্ষা দিয়ে ভারতের কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলি বাধাগ্রস্ত করছে।
জলবিদ্যুৎ এবং পরিবেশগত উদ্বেগের ক্ষেত্রে চীনের ব্রহ্মপুত্র ও সতলজ নদীর উজানে নিয়ন্ত্রণ ভারতের জল নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। মেডোগ এবং জাংমু বাঁধের মতো প্রকল্পগুলি উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ২০২৩ সালে ব্রহ্মপুত্রের জলবিদ্যুৎ তথ্য ভাগাভাগির চুক্তি মেয়াদ শেষ হয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক আলোচনায় নবায়নের আশা দেখা দিয়েছে।
ভারত তার পাল্টা কৌশল হিসেবে চাবাহার বন্দর এবং ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডোর (আইএমইইসি) এর মতো বিকল্প উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, শক্তিশালী আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব তৈরি এবং বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরার মাধ্যমে ভারত সিপেকের মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে চীনের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল ঋণের বোঝা। আইএমএফের মতে, ২০২১ সালে পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণের ২১.৪ শতাংশ চীনের কাছে রয়েছে, যা চীনকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি “ঋণের ফাঁদ” নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তবে সাম্প্রতিক উন্নয়নে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চীন তার সবচেয়ে বড় পাকিস্তান প্রকল্প মেইনলাইন-১ (এমএল-১) রেল প্রকল্প থেকে সরে এসেছে এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এখন কারাচি-রোহরি সেকশনের অর্থায়ন করবে। এই পরিবর্তন পাকিস্তানের বহুমুখী অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা প্রতিফলিত করে।
চীনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আর্থিক উদ্বেগ এবং পাকিস্তানের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ। নিজস্ব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশি প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ হ্রাসের কারণে চীন সাবধানতা অবলম্বন করছে। পাকিস্তানের বারবার আইএমএফ সহায়তা নেওয়া এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এই প্রোফাইলের সঙ্গে মানানসই।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সাম্প্রতিক বক্তব্য এই ভারসাম্যের প্রতিফলন: “আমরা একজন বন্ধুর জন্য অন্য বন্ধুকে ত্যাগ করব না।” এই সতর্ক বাক্যটি চীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ধারণা এড়িয়ে পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে, এমনকি যখন এটি ক্রমশ তার অংশীদারিত্ব বৈচিত্র্যকরণের দিকে তাকাচ্ছে।
আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের খনিজ সম্পদে আগ্রহ দেখিয়েছেন, যার মধ্যে রেকো দিক সম্পদও রয়েছে। এটি একটি সংকেত যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও পাকিস্তানের সঙ্গে পুনরায় সম্পৃক্ত হতে পারে।
এই নতুন চীন-পাকিস্তান সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। ভারতের জন্য এটি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে তার কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে যাতে এই ক্রমবর্ধমান চীন-পাকিস্তান অংশীদারিত্বের প্রভাব মোকাবেলা করা যায়।











