মানব সভ্যতার উন্মেষের পর থেকেই অজানাকে জানার এবং অদেখাকে দেখার এক দুর্নিবার কৌতূহল মানুষের মজ্জাগত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ—সবখানেই পৌঁছে গেছে মানুষের পদচিহ্ন। কিন্তু মাটির নিচে, ভূগর্ভস্থ এক বিশাল অন্ধকার জগতেও যে আস্ত এক বনভূমি, নদী এবং মেঘমালা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই কল্পনার বাইরে ছিল। প্রকৃতিপ্রেমী, বিজ্ঞানী এবং সাধারণ পর্যটকদের মনে প্রায়ই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহা কোনটি? ভূতত্ত্ববিদ এবং বিশ্ব রেকর্ড অনুযায়ী, আয়তনের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় গুহাটি হলো ভিয়েতনামের ‘হ্যাং সন ডুং’ (Hang Son Doong) । এটি এতটাই বিশাল যে, এর ভেতরে অনায়াসেই ৪০ তলা উঁচু কোনো গগনচুম্বী ভবন অথবা একটি আস্ত বোয়িং ৭৪৭ বিমান তার ডানা ছড়িয়ে উড়ে যেতে পারে ।
এই অনন্য প্রাকৃতিক আশ্চর্যের ভেতরে রয়েছে নিজস্ব জঙ্গল, প্রবহমান নদী, ভূগর্ভস্থ মেঘ এবং সম্পূর্ণ আলাদা একটি ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র। যুগ যুগ ধরে গহীন অরণ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গুহাটি কেবল আকারে বিশাল নয়, বরং এর ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং জীববৈচিত্র্য বিজ্ঞানীদের জন্য এক উন্মুক্ত গবেষণাগার। আজকের এই বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা জানবো এই বিস্ময়কর গুহার ভৌগোলিক গঠন, রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ইতিহাস, অনন্য জীববৈচিত্র্য, বিশ্বের অন্যান্য বড় গুহার সাথে এর বৈজ্ঞানিক তুলনা এবং এখানে ভ্রমণের বিস্তারিত গাইডলাইন সম্পর্কে।
হ্যাং সন ডুং গুহার ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশালতা
ভৌগোলিক বিস্ময়ে ভরপুর এই গুহাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের কোয়াং বিন (Quang Binh) প্রদেশের ভো ত্রাচ (Bo Trach) জেলায় অবস্থিত। এটি মূলত ইউনেস্কো (UNESCO) স্বীকৃত ‘ফং না-কে ব্যাং ন্যাশনাল পার্ক’ (Phong Nha-Ke Bang National Park)-এর কোর জোনে বা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবস্থান করছে । চারপাশের দুর্গম জঙ্গল এবং সুউচ্চ চুনাপাথরের পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন কার্স্ট (Karst) ল্যান্ডস্কেপ হিসেবে পরিচিত। ভিয়েতনামী ভাষায় ‘হ্যাং সন ডুং’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো “পাহাড়ের পেছনের নদীর গুহা” । ২০০৯ সালে পরিচালিত ব্রিটিশ এবং ভিয়েতনামী অভিযাত্রী দলের পুঙ্খানুপুঙ্খ জরিপ অনুযায়ী, এই গুহাটির মোট আয়তন প্রায় ৩.৮৫ কোটি (৩৮.৫ মিলিয়ন) ঘনমিটার ।
| বিবরণ | বৈজ্ঞানিক তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| গুহার নাম | হ্যাং সন ডুং (Hang Son Doong) |
| অবস্থান | ফং না-কে ব্যাং ন্যাশনাল পার্ক, কোয়াং বিন, ভিয়েতনাম |
| মোট আয়তন | ৩৮.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার (১.৩৬ বিলিয়ন ঘনফুট) |
| মোট দৈর্ঘ্য | প্রায় ৯ কিলোমিটারের বেশি (৫.৫ মাইল) |
| সর্বোচ্চ উচ্চতা ও প্রস্থ | ২০০ মিটার (উচ্চতা) ও ১৬০ মিটার (প্রস্থ) |
ফং না-কে ব্যাং ন্যাশনাল পার্কের ভৌগোলিক গুরুত্ব
ফং না-কে ব্যাং ন্যাশনাল পার্কের চুনাপাথরের পাহাড়গুলো এশিয়ার প্রাচীনতম কার্স্ট অঞ্চলগুলোর একটি, যার বয়স প্রায় ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) বছরেরও বেশি । তবে মজার বিষয় হলো, এই প্রাচীন পাহাড়ের বুকে গড়ে ওঠা সন ডুং গুহাটির গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তুলনামূলকভাবে অনেক পরে, আনুমানিক ২০ থেকে ৫০ লক্ষ (২-৫ মিলিয়ন) বছর আগে । ভূগর্ভস্থ খরস্রোতা নদী ‘রাও থুং’ (Rao Thuong) এবং ‘খে রি’ (Khe Ry) যখন এই প্রাচীন চুনাপাথরের স্তরের দুর্বল অংশ বা চ্যুতিরেখা (Fault lines) বরাবর ক্ষয় করতে শুরু করে, তখনই এই বিশালাকার সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয় । সময়ের সাথে সাথে নদীর জলের প্রবাহ চুনাপাথর গলিয়ে এই গুহাকে বর্তমানের বিশাল রূপ দান করেছে। ন্যাশনাল পার্কটি বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এবং এখানে প্রায় ৮০০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণী বসবাস করে ।
সন ডুং গুহা আবিষ্কারের পেছনের রোমাঞ্চকর ইতিহাস
যেকোনো বড় আবিষ্কারের পেছনেই থাকে কোনো না কোনো রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য গল্প। সন ডুং গুহার আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। যুগ যুগ ধরে গহীন জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বিশাল গুহাটি সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে মানুষের নজরে আসে। ১৯৯০ সালের আগে স্থানীয় মানুষ বা বিজ্ঞানীদের কাছে এই গুহার কোনো অস্তিত্বই জানা ছিল না। পরবর্তীতে কয়েক দশকের ধারাবাহিক চেষ্টায় এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এবং ভূ-তাত্ত্বিক আশ্চর্যে পরিণত হয়।
১৯৯০ সালে কাঠ সংগ্রহ এবং জীবিকার সন্ধানে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় হো খান (Ho Khanh) নামের এক স্থানীয় যুবক হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির মুখে পড়েন। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তিনি একটি চুনাপাথরের পাহাড়ের নিচে বিশাল এক গুহামুখ দেখতে পান। গুহার ভেতর থেকে নদীর প্রবল গর্জন এবং মেঘের মতো শীতল কুয়াশা বেরিয়ে আসতে দেখে তিনি ভয় পেয়ে ফিরে আসেন । এরপর জীবিকার তাগিদে তিনি কৃষিকাজে মন দেন এবং প্রায় ১৫ বছর গুহাটি পুনরায় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায় ।
| সাল / সময়কাল | আবিষ্কার ও অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক |
| ১৯৯০ | স্থানীয় কাঠুরে হো খান কর্তৃক কাকতালীয়ভাবে প্রথম গুহামুখ আবিষ্কার। |
| ২০০৯ | হো খানের সাহায্যে ব্রিটিশ-ভিয়েতনামী দলের প্রথম সফল জরিপ। |
| ২০১০ | ‘গ্রেট ওয়াল অফ ভিয়েতনাম’ নামক ৯০ মিটার দেয়াল অতিক্রম করে গুহার শেষ প্রান্ত আবিষ্কার। |
| ২০১৩ | পর্যটকদের জন্য গুহাটি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে (অক্সালিস অ্যাডভেঞ্চার দ্বারা) উন্মুক্ত করা হয়। |
| ২০১৯ | আন্ডারওয়াটার ডাইভিং দলের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী ‘হ্যাং থুং’ গুহার সাথে সংযোগ আবিষ্কার। |
ব্রিটিশ কেভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের যুগান্তকারী অভিযান
২০০৯ সালে ব্রিটিশ কেভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন (BCRA)-এর হাওয়ার্ড লিম্বার্ট (Howard Limbert)-এর নেতৃত্বাধীন এক অভিযাত্রী দল ভিয়েতনামে আসে গুহা অনুসন্ধানের জন্য। তারা স্থানীয়ভাবে হো খানের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাকে সেই পুরোনো গুহাটি খুঁজে বের করার অনুরোধ জানান। অনেক চেষ্টার পর ২০০৯ সালের ১০ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে তারা গুহাটিতে সফলভাবে প্রবেশ করেন এবং এর প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক জরিপ সম্পন্ন করেন । তবে সেবার গুহার প্রায় ৪ মাইল যাওয়ার পর ৯০ মিটার উঁচু একটি ক্যালসাইট পাথরের দেয়াল তাদের পথ আটকে দেয়। এই দেয়ালটির নাম দেওয়া হয় ‘গ্রেট ওয়াল অফ ভিয়েতনাম’ (The Great Wall of Vietnam) । ২০১০ সালের মার্চ মাসে সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যাধুনিক ক্লাইম্বিং গিয়ার নিয়ে তারা ফিরে আসেন এবং দেয়ালটি সফলভাবে টপকে গুহার শেষ প্রান্ত বা এক্সিট পয়েন্ট আবিষ্কার করেন । এই অভিযানের সাথে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটি দলও ছিল, যারা প্রথমবারের মতো এই গুহার প্রামাণ্যচিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে ।
ভূতত্ত্ব এবং সন ডুং গুহার অভ্যন্তরীণ গঠন বৈচিত্র্য
ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই গুহাটি পৃথিবীর বুকে এক অনন্য সাধারণ নিদর্শন। কার্স্ট (Karst) প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট এই গুহাটিতে ফ্লোস্টোন (Flowstone), স্ট্যালাকটাইট (Stalactite), স্ট্যালাগমাইট (Stalagmite) এবং গুহামুক্তা বা কেভ পার্ল (Cave Pearls)-এর মতো দুর্লভ সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্য রয়েছে। ছাদ চুইয়ে পড়া খনিজ মিশ্রিত পানি হাজার হাজার বছর ধরে জমে জমে এই অবিশ্বাস্য গঠনগুলো তৈরি করেছে।
গুহার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা আন্ডারগ্রাউন্ড রিভার বা ভূগর্ভস্থ নদীটি এর গঠনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। নদীটি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে বর্ষাকালে ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং গুহার অভ্যন্তরীণ ক্ষয়প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রেখেছে । অর্থাৎ, গুহাটির গঠন এখনো চলমান। এই ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর প্রাচীন জলবায়ু এবং খনিজ সঞ্চয়ন সম্পর্কে অমূল্য ধারণা প্রদান করে।
| অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক গঠন | বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য ও বর্ণনা |
| গ্রেট ওয়াল অফ ভিয়েতনাম | গুহার শেষ প্রান্তে অবস্থিত প্রায় ৯০ মিটার উঁচু ক্যালসাইট পাথরের দেয়াল। |
| হ্যান্ড অফ ডগ (Hand of Dog) | প্রায় ৮০ মিটার উঁচু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্ট্যালাগমাইট, যা দেখতে কুকুরের থাবার মতো। |
| কেভ পার্ল (Cave Pearls) | বেসবল আকৃতির প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম কার্বোনেট জমাট বাঁধা পাথর, যা সাধারণত মটরের দানার মতো হয়। |
| ফাইটোকাস্ট (Phytokarst) | আলোর দিকে মুখ করে বৃদ্ধি পাওয়া এক ধরনের বিশেষ পাথর ও খনিজের গঠন। |
| জীবাশ্ম প্যাসেজ (Fossil Passage) | কোটি কোটি বছর পুরোনো সামুদ্রিক প্রবালের জীবাশ্ম সমৃদ্ধ গুহার অংশ। |
গ্রেট ওয়াল অফ ভিয়েতনাম এবং বিশাল স্ট্যালাগমাইট
গুহার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘হ্যান্ড অফ ডগ’ (Hand of Dog)। এটি প্রায় ৮০ মিটার উঁচু একটি বিশাল স্ট্যালাগমাইট, যা গুহার ‘হোপ অ্যান্ড ভিশন’ (Hope and Vision) প্যাসেজ এবং ডোলিন-১ এর মাঝামাঝি অবস্থিত । এটি এতই উঁচু যে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো অতিকায় কুকুরের থাবা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। এর সৃষ্টি হয়েছে লাখ লাখ বছর ধরে একই স্থানে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট সমৃদ্ধ পানির ফোঁটা পড়ার কারণে । অন্যদিকে ‘গ্রেট ওয়াল অফ ভিয়েতনাম’ হলো একটি বিশাল ফ্লোস্টোন দেয়াল, যা গুহার পানি এবং কাদা আটকে রাখে। এছাড়া গুহার ভেতরের টেরেস বা ধাপগুলোতে পাওয়া গেছে অস্বাভাবিক বড় আকৃতির কেভ পার্ল। সাধারণত এই গুহামুক্তাগুলো ছোট মার্বেল বা মটরের দানার মতো হলেও, সন ডুং গুহায় এগুলো বেসবল আকৃতির হয়ে থাকে ।
ডোলিন এবং ভূগর্ভস্থ নিজস্ব আবহাওয়া মণ্ডলী
সন ডুং গুহার বিশাল আয়তনের কারণে এর ভেতরে সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি আবহাওয়া মণ্ডলী বা ক্লাইমেট সিস্টেম তৈরি হয়েছে। গুহার বাইরের তাপমাত্রার সাথে ভেতরের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে এখানে প্রতিনিয়ত মেঘের সৃষ্টি হয় । এই মেঘগুলো গুহার সুড়ঙ্গ ধরে ভেসে বেড়ায় এবং নির্দিষ্ট ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, যা দেখেই ১৯৯০ সালে হো খান প্রথম ভয় পেয়েছিলেন।
গুহার ছাদের কিছু দুর্বল অংশ হাজার হাজার বছর আগে ধসে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি করেছে, ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে ‘ডোলিন’ (Doline) বলা হয় । এই ডোলিনগুলো গুহার ভেতরে সূর্যের আলো, বাতাস এবং বৃষ্টির পানি প্রবেশের পথ তৈরি করে দিয়েছে। সন ডুং-এ মূলত দুটি বড় ডোলিন রয়েছে, যা গুহার অন্ধকার জগতে প্রাণের সঞ্চার করেছে। ডোলিনগুলোর কারণে গুহার ভেতরের তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে ২২-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে ।
| ডোলিনের নাম | বৈশিষ্ট্য ও দৃশ্যপট |
| ডোলিন-১ (Doline 1) | একে ‘ওয়াচ আউট ফর ডাইনোসর’ (Watch Out for Dinosaurs) বলা হয়। এখানে মাটি থেকে প্রায় ৪৫০ মিটার উঁচুতে ছাদ খোলা। |
| ডোলিন-২ (Doline 2) | একে ‘গার্ডেন অফ ইডাম’ (Garden of Edam) বলা হয়। এখানে ২০০ মিটার গভীরতায় আস্ত একটি বনভূমি গড়ে উঠেছে। |
| মেঘমালা ও কুয়াশা | তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার পার্থক্যের কারণে ডোলিনগুলোর আশেপাশে ঘন মেঘ তৈরি হয়। |
| সানবিম (Sunbeam) | নির্দিষ্ট মৌসুমে (জানুয়ারি-মার্চ) ডোলিন-১ দিয়ে সূর্যের আলো সরাসরি লেজার রশ্মির মতো গুহায় প্রবেশ করে। |
হোপ অ্যান্ড ভিশন প্যাসেজ থেকে ডোলিন এর বিস্তার
গুহার ভেতরে ‘হোপ অ্যান্ড ভিশন’ (Hope and Vision) নামের একটি প্যাসেজ রয়েছে, যা গুহার সবচেয়ে বড় অংশগুলোর একটি। এই প্যাসেজটি এতটাই বিশাল যে এর ভেতর দিয়ে অনায়াসেই একটি বড় বিমান উড়ে যেতে পারে । এই প্যাসেজ থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার দূর থেকেই ডোলিন-১ এর আলো দেখা যায়। ডোলিন-১ এর একটি বিশেষ অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়াচ আউট ফর ডাইনোসর’ (Watch Out for Dinosaurs)। প্রথম অভিযাত্রী দল যখন এই বিশাল গর্তের নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়েছিল, তখন তাদের মনে হয়েছিল যেন জুরাসিক পার্কের কোনো সেটে তারা দাঁড়িয়ে আছে এবং যেকোনো মুহূর্তে ডাইনোসর বেরিয়ে আসতে পারে । প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এই ডোলিন দিয়ে সূর্যের আলো সোজা গুহার নিচে এসে পড়ে, যা ফটোগ্রাফারদের জন্য এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য তৈরি করে ।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহা কোনটি: অন্যান্য বিখ্যাত গুহার সাথে বৈজ্ঞানিক তুলনা
অনেকেই যখন ইন্টারনেটে সার্চ করেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহা কোনটি, তখন তথ্যের ভিন্নতার কারণে মাঝে মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। গুহার পরিমাপ মূলত তিনটি মেট্রিক্সের ওপর নির্ভর করে—এর মোট দৈর্ঘ্য (Length), ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বা ফ্লোর এরিয়া (Area), এবং আয়তন বা ভলিউম (Volume) । বৈজ্ঞানিক মহলে আয়তনকেই একটি গুহার বিশালতা মাপার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, এবং সেই দিক থেকে সন ডুং সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যামথ কেভ’ (Mammoth Cave) হলো দৈর্ঘ্যের দিক থেকে পৃথিবীর দীর্ঘতম গুহা, যার মোট আবিষ্কৃত সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৮৫ কিলোমিটার । কিন্তু ম্যামথ কেভের সুড়ঙ্গগুলো খুবই সরু। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার ‘সারাওয়াক চেম্বার’ (Sarawak Chamber) হলো ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক গুহা-কক্ষ, যার ক্ষেত্রফল প্রায় ১,৬৪,৪৫৯ বর্গমিটার । আর চীনের ‘মিয়াও রুম’ (Miao Room) হলো আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক কক্ষ বা চেম্বার (১০.৭৮ মিলিয়ন ঘনমিটার) ।
| গুহার নাম | দেশ | মূল পরিমাপ ও বিশ্ব রেকর্ড |
| হ্যাং সন ডুং | ভিয়েতনাম | আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম গুহা (৩৮.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার)। |
| ম্যামথ কেভ | যুক্তরাষ্ট্র | বিশ্বের দীর্ঘতম গুহা সিস্টেম (প্রায় ৬৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ)। |
| মিয়াও রুম | চীন | আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম একক গুহা-কক্ষ (১০.৭৮ মিলিয়ন ঘনমিটার)। |
| সারাওয়াক চেম্বার | মালয়েশিয়া | ক্ষেত্রফলের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম একক গুহা-কক্ষ। |
| ডিয়ার কেভ | মালয়েশিয়া | সন ডুং আবিষ্কারের পূর্বে বিশ্বের বৃহত্তম গুহা হিসেবে পরিচিত ছিল (৯.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার)। |
ডিয়ার কেভ এবং ম্যামথ কেভের সাথে সন ডুং-এর পার্থক্য
সন ডুং আবিষ্কারের আগে মালয়েশিয়ার গুনুং মুলু ন্যাশনাল পার্কের ‘ডিয়ার কেভ’ (Deer Cave) বিশ্বের বৃহত্তম গুহা হিসেবে পরিচিত ছিল । ডিয়ার কেভের আয়তন প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার। কিন্তু ৩৮.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার আয়তনের সন ডুং গুহা আবিষ্কারের পর ডিয়ার কেভ তার মুকুট হারায়; সন ডুং এর চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বেশি বড় । অন্যদিকে, ম্যামথ কেভ দৈর্ঘ্যে অনেক বড় হলেও, এর সরু সুড়ঙ্গগুলোকে যদি সন ডুং-এর সবচেয়ে বড় চেম্বারের ভেতর পাশাপাশি রাখা হয়, তবে সেগুলো অনায়াসেই সন ডুং-এর পেটে জায়গা করে নেবে । অর্থাৎ, ম্যামথ কেভ দৈর্ঘ্যে বিজয়ী হলেও, আকার এবং আয়তনে সন ডুং-ই অবিসংবাদিত চ্যাম্পিয়ন।
হ্যাং সন ডুং এর অজানা ইকোসিস্টেম এবং জীববৈচিত্র্য
সন ডুং গুহার সবচেয়ে জাদুকরী দিকটি হলো এর ভেতরের জীববৈচিত্র্য। সাধারণত গুহা বলতে আমরা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এবং প্রাণহীন কোনো জায়গাকেই বুঝি। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহা কোনটি—এই প্রশ্নের উত্তরে সন ডুং-এর নাম আসার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর ভেতরে থাকা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত। ডোলিন-২ এর নিচে, মূল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার গভীরে গড়ে উঠেছে আস্ত একটি রেইনফরেস্ট, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘গার্ডেন অফ ইডাম’ (Garden of Edam) নাম দিয়েছেন । বাইবেলে উল্লেখিত স্বর্গের উদ্যান বা গার্ডেন অব ইডেন-এর নামানুসারে এই জঙ্গলের নামকরণ করা হয়েছে।
এই জঙ্গলে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ফার্ন জন্মে, যার মধ্যে কিছু গাছের উচ্চতা প্রায় ৩০ মিটার বা ১০০ ফুটেরও বেশি । এই জঙ্গলের গাছপালাগুলো গুহার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে; আলো কম থাকায় এদের পাতাগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয় এবং শিকড়গুলো পাথরের গভীরে প্রবেশ করে ।
| জীববৈচিত্র্যের ধরন | বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রজাতির নাম |
| উদ্ভিদজগত (Flora) | ২০০-এর বেশি প্রজাতির গাছপালা, অর্কিড, ফার্ন ও লতাপাতা। |
| নতুন আবিষ্কৃত প্রাণী | গুহার অন্ধকারের সাথে খাপ খাওয়ানো ৭টি নতুন দৃষ্টিহীন ও স্বচ্ছ প্রজাতি। |
| বাদুড়ের প্রজাতি | Hipposideros scutinares, Myotis pilosus সহ অন্তত ৬টি ভিন্ন প্রজাতি। |
| স্থলজ শামুক | Calybium plicatus sp. nov (সন ডুং কোন স্নেইল) নামক নতুন আবিষ্কৃত শামুক। |
| স্তন্যপায়ী প্রাণী | হাতিং ল্যাঙ্গুর (Hatinh langur), লাল-পায়ের ডুক ল্যাঙ্গুর এবং বন্য বানর। |
নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতি এবং ভূগর্ভস্থ প্রাণীজগত
অন্ধকার এই জগতে বিজ্ঞানীরা অন্তত ৭টি সম্পূর্ণ নতুন প্রাণীর প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিহীন এবং স্বচ্ছ শরীরের মাছ, মাকড়সা, বিছে (Scorpion) এবং কেন্নো (Millipede) । যুগ যুগ ধরে অন্ধকারের মধ্যে থাকার কারণে বিবর্তনের ধারায় এদের চোখ বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং শরীরের পিগমেন্ট বা রং হারিয়ে স্বচ্ছ হয়ে গেছে।
সম্প্রতি ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ নেচারের বিজ্ঞানীরা গুহার ভেতরে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির স্থলজ শামুক আবিষ্কার করেছেন, যার বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে Calybium plicatus sp. nov (যাকে ‘সন ডুং কোন স্নেইল’ বলা হয়) । এছাড়া ২০২২ সালে পরিচালিত একটি জরিপে গুহায় ৬ প্রজাতির বাদুড়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে Hipposideros scutinares এবং Myotis pilosus প্রজাতি দুটি আইইউসিএন (IUCN) রেড লিস্টে ‘বিপন্ন’ (Vulnerable) হিসেবে তালিকাভুক্ত । গুহার ডোলিন সংলগ্ন গাছপালায় বানর, কাঠবিড়ালি এবং বিভিন্ন পাখির অবাধ বিচরণ রয়েছে।
সন ডুং গুহায় পর্যটন: অক্সালিস অ্যাডভেঞ্চার এবং ট্যুর গাইডলাইন
এমন একটি বিস্ময়কর স্থানে ভ্রমণের স্বপ্ন অনেক অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীই দেখেন। গুহাটি আবিষ্কারের পর ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে প্রথমবারের মতো পর্যটকদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয় । তবে এটি কোনো সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র নয়। গুহার অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য ভিয়েতনাম সরকার এখানে পর্যটকদের প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। শুধুমাত্র শারীরিক এবং মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় ব্যক্তিরাই এই অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
সন ডুং গুহায় ভ্রমণের একমাত্র অফিশিয়াল অনুমোদন রয়েছে ‘অক্সালিস অ্যাডভেঞ্চার’ (Oxalis Adventure) নামের ট্যুর অপারেটরের কাছে । পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত মাত্র ১,০০০ জন পর্যটককে এখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় । আগস্ট মাসের পর ভারি বর্ষণে গুহার ভেতরের নদীর পানি বেড়ে যায় বলে এই সময় পর্যটন বন্ধ থাকে।
| পর্যটন ও বুকিং তথ্য | গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন |
| অফিশিয়াল ট্যুর অপারেটর | অক্সালিস অ্যাডভেঞ্চার (Oxalis Adventure – Exclusive Rights)। |
| বার্ষিক দর্শনার্থীর সীমা | প্রতি বছর সর্বোচ্চ ১,০০০ জন পর্যটক (জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত)। |
| অভিযানের সময়কাল | ৪ দিন ও ৩ রাত (গুহা ও জঙ্গলে ক্যাম্পিং), সর্বমোট ৬ দিন। |
| আনুমানিক ট্যুর খরচ | জনপ্রতি প্রায় ৩,০০০ মার্কিন ডলার (ভ্যাট ও ন্যাশনাল পার্ক ফি সহ)। |
| গ্রুপ সাইজ ও ক্রু মেম্বার | প্রতি গ্রুপে সর্বোচ্চ ১০ জন পর্যটক এবং ৩০ জন সাপোর্টিং স্টাফ। |
৪ দিন ও ৩ রাতের রোমাঞ্চকর ট্রেকিং আইটিনারি
সন ডুং অভিযানটি মূলত ৪ দিন এবং ৩ রাতের একটি কোর ট্রেকিং এক্সপেডিশন, যদিও ব্রিফিং এবং বিশ্রামের জন্য মোট ৬ দিনের প্যাকেজ সাজানো হয় ।
-
প্রথম দিন: পর্যটকদের ডং হোই (Dong Hoi) শহরে পৌঁছাতে হয়। সন্ধ্যায় অক্সালিস অফিসে সেফটি ব্রিফিং এবং সরঞ্জাম চেকিং করা হয় ।
-
দ্বিতীয় দিন: জঙ্গল এবং নদীর বুক চিরে পাহাড়ি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং শুরু হয়। বান ডুং গ্রাম হয়ে পর্যটকরা ‘হ্যাং এন’ (Hang En) গুহায় পৌঁছান এবং সেখানে প্রথম রাত ক্যাম্পিং করেন। মজার ব্যাপার হলো, হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা Peter Pan – Pan and Neverland এর কিছু অংশের শুটিং এই হ্যাং এন গুহাতেই হয়েছিল ।
-
তৃতীয় দিন: হ্যাং এন থেকে বের হয়ে ভূগর্ভস্থ নদী পার হয়ে মূল সন ডুং গুহার এন্ট্রান্সে পৌঁছাতে হয়। হারনেস লাগিয়ে গুহায় নেমে ‘হ্যান্ড অফ ডগ’ স্ট্যালাগমাইট পার হয়ে ডোলিন-১ এর কাছে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডস’ ক্যাম্পসাইটে রাত কাটাতে হয় ।
-
চতুর্থ দিন: এটি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং দিন। খাড়া পাথর এবং ফাটল গলে ডোলিন-১ এর ‘ওয়াচ আউট ফর ডাইনোসর’ হয়ে ডোলিন-২ এর ‘গার্ডেন অফ ইডাম’ জঙ্গলে প্রবেশ করতে হয়। এখানেই তৃতীয় রাতের ক্যাম্পিং করা হয় ।
-
পঞ্চম দিন: গুহার শেষ প্রান্তে থাকা ৯০ মিটার উঁচু ‘গ্রেট ওয়াল অফ ভিয়েতনাম’ ক্লাইম্বিং গিয়ার দিয়ে বেয়ে উঠে গুহা থেকে প্রস্থান করতে হয় এবং হোটেলে ফিরে আসা হয় ।
শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় ট্রেকিং সরঞ্জাম
সন ডুং গুহার ট্রেকিং সাধারণ কোনো হাইকিং বা জঙ্গল সাফারির মতো নয়। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটারের এই দুর্গম পথে খাড়া পাহাড় বেয়ে নামা, বুক সমান গভীর নদী পার হওয়া এবং কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পাথর টপকে এগোতে হয় । এর মধ্যে ‘প্যাসচেনডেল’ (Passchendaele) নামক প্রায় ৬০০ মিটারের একটি প্যাসেজ রয়েছে, যা কোমর সমান গভীর কাদায় পূর্ণ থাকে । তাই সঠিক সরঞ্জাম এবং শারীরিক সক্ষমতা ছাড়া এই অভিযানে অংশগ্রহণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এই ট্রেকে অংশ নিতে হলে বুকিংয়ের সময় অনলাইনে সঠিক স্বাস্থ্যগত তথ্য জমা দিতে হয়। “আমি মাঝে মাঝে জিমে যাই”—এমন সাধারণ উত্তরের পরিবর্তে সপ্তাহে কতক্ষণ এবং কী ধরনের ব্যায়াম করা হয়, তার বিস্তারিত জানাতে হয়। হৃদরোগ, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ বা শারীরিক দুর্বলতা থাকলে অক্সালিস কর্তৃপক্ষ সরাসরি আবেদন বাতিল করে দেয় ।
| প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও গিয়ার | কাদের দায়িত্বে সরবরাহ করা হয় |
| হেলমেট ও হেডল্যাম্প |
অক্সালিস কর্তৃপক্ষ (১৫০০ লুমেন ক্ষমতার বিশেষ স্পেলনকিং হেডল্যাম্প) । |
| সেফটি হারনেস ও ক্লাইম্বিং গিয়ার |
পাহাড় বাইতে অক্সালিস কর্তৃপক্ষ দেয় (অটো-লকিং ডিভাইস সহ) । |
| ট্রেকিং জুতো ও মোজা |
পর্যটককে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয় (নন-গোরটেক্স ট্রেইল রানিং জুতো) । |
| ড্রাই ব্যাগ (১৫ লিটার) |
ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় সামগ্রী গুছিয়ে রাখার জন্য অপারেটর থেকে দেওয়া হয় । |
| ফার্স্ট এইড কিট ও ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ |
পর্যটককে নিজস্ব কিট এবং ইলেকট্রনিক্স বাঁচানোর ব্যাগ নিতে হয় । |
অক্সালিস প্রদত্ত সেফটি গিয়ার এবং ব্যক্তিগত প্রস্তুতি
অক্সালিস কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য কোনো আপস করে না। প্রতি ১০ জন পর্যটকের জন্য ১ জন ব্রিটিশ গুহা বিশেষজ্ঞ, গাইড, শেফ এবং পোর্টারসহ প্রায় ৩০ জনের একটি বিশাল সাপোর্টিং দল থাকে । ফটোগ্রাফির সুবিধার জন্য তারা ৪৩,০০০ লুমেন ক্ষমতার বিশাল পোর্টেবল লাইট সাথে রাখে, যা অন্ধকার গুহার বিশালত্ব ক্যামেরায় বন্দি করতে সাহায্য করে । পর্যটকদের নিজেদের দ্রুত শুকায় এমন ফুলহাতা শার্ট, ট্রেইল জুতো, পরিবেশবান্ধব সাবান বা ওয়েট ওয়াইপস এবং ২০,০০০ এমএএইচ এর নিচে পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ গুহায় কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই ।
স্থানীয় সংস্কৃতি: বান ডুং গ্রাম এবং ব্রু-ভ্যান কিউ উপজাতি
সন ডুং গুহা অভিযান শুধু একটি রোমাঞ্চকর ট্রেকিং নয়, এটি স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ারও এক দারুণ সুযোগ। মূল গুহায় পৌঁছানোর আগে ট্রেকারদের গহীন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এই পথেই দেখা মেলে এক বিচ্ছিন্ন জনপদের, যা মূল সভ্যতার ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থান করছে।
ফং না-কে ব্যাং ন্যাশনাল পার্কের কোর জোনে অবস্থিত একমাত্র গ্রামটির নাম হলো ‘বান ডুং’ (Ban Doong Village) । এখানে ‘ব্রু-ভ্যান কিউ’ (Bru-Van Kieu) নামক উপজাতির বাস। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছোট্ট গ্রামটিতে বর্তমানে মাত্র ১০-১২টি পরিবার এবং প্রায় ৪২-৫২ জন মানুষ বসবাস করেন । এই জঙ্গলের আরেক প্রান্তে ‘রুক’ (Ruc) নামের আরেকটি রহস্যময় উপজাতির বাস রয়েছে, যাদের মাত্র ৫০ বছর আগে আবিষ্কার করা হয়েছিল এবং এরা বানরের মতো গাছে চড়তে পারে ।
| বান ডুং গ্রামের তথ্য | সাংস্কৃতিক ও জনতাত্ত্বিক বিবরণ |
| ভৌগোলিক অবস্থান |
ন্যাশনাল পার্কের কোর জোনের একেবারে কেন্দ্রস্থলে একটি সমতল উপত্যকায় । |
| উপজাতি গোষ্ঠী |
ব্রু-ভ্যান কিউ (Bru-Van Kieu) সম্প্রদায় । |
| জনসংখ্যা |
প্রায় ১০ থেকে ১২টি পরিবারের ৪২-৫২ জন বাসিন্দা । |
| পর্যটনে ভূমিকা | ট্রেকারদের বিশ্রামের স্থান এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে বিনিময়ের কেন্দ্র। |
| জীবনযাত্রা | সম্পূর্ণ প্রকৃতি নির্ভর, টেকসই কৃষি এবং পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। |
আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা এবং পর্যটনের প্রভাব
বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এই গ্রামের মানুষজন অত্যন্ত সহজ-সরল এবং অতিথিপরায়ণ। সন ডুং গুহায় যাওয়ার পথে দ্বিতীয় দিন পর্যটকরা এখানে দুপুরের খাবার খান এবং বিশ্রাম নেন । পর্যটনের কারণে এই গ্রামের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে ঠিকই, তবে অক্সালিস কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোরভাবে সাসটেইনেবল ট্যুরিজম বা টেকসই পর্যটন মেনে চলে। পর্যটকদের নির্দেশ দেওয়া হয় তারা যেন গ্রামের শিশুদের কোনো চকলেট বা টাকা পয়সা না দেন, যাতে তাদের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তির মতো বাজে অভ্যাসের জন্ম না হয় । গ্রামের শিশুরা হাসিমুখে পর্যটকদের স্বাগত জানায়, যা এই কঠিন ট্রেকিংয়ের পথের অন্যতম সুন্দর একটি মুহূর্ত।
হ্যাং থুং গুহার সাথে সংযোগ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
সন ডুং গুহা আবিষ্কারের এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, এর রহস্য উন্মোচন এখনো শেষ হয়নি। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই গুহা সিস্টেমের আরও অনেক কিছু জানার বাকি আছে। সেই উদ্দেশ্যেই ২০১৯ সালের মার্চ মাসে হাওয়ার্ড লিম্বার্টের নেতৃত্বে বিশ্বের সেরা কয়েকজন কেভ ডাইভার (যাদের মধ্যে জেসন ম্যালিনসন এবং রিক স্ট্যানটন ছিলেন, যারা থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহায় আটকে পড়া কিশোর ফুটবল দলকে উদ্ধার করেছিলেন) সন ডুং গুহায় একটি ডাইভিং অভিযান পরিচালনা করেন ।
তাদের লক্ষ্য ছিল সন ডুং গুহার আন্ডারগ্রাউন্ড নদীর সাথে প্রায় ৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত ‘হ্যাং থুং’ (Hang Thung) গুহার কোনো জলজ সংযোগ আছে কিনা তা খুঁজে বের করা।
| ২০১৯ ডাইভিং অভিযানের তথ্য | প্রাপ্ত ফলাফল ও রেকর্ড |
| ডাইভিং দলের সদস্য |
জেসন ম্যালিনসন, রিক স্ট্যানটন, ক্রিস জুয়েল, মার্টিন হলরয়েড । |
| অভিযানের লক্ষ্য | সন ডুং এবং হ্যাং থুং গুহার নদীর সংযোগস্থল খুঁজে বের করা। |
| অর্জিত গভীরতা |
পানির নিচে ৭৮ মিটার পর্যন্ত সফল ডাইভ (প্যাসেজের মোট গভীরতা ৯৩ মিটার অনুমান করা হয়েছে) । |
| বর্ধিত আয়তন |
সংযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সন ডুং এর আয়তন আরও ১.৬ মিলিয়ন ঘনমিটার বৃদ্ধি পায় । |
| ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা |
আরও উন্নত গ্যাস সিলিন্ডার ও প্রযুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গভীরে যাওয়ার পরিকল্পনা । |
আন্ডারওয়াটার ডাইভিং দলের অভাবনীয় সাফল্য
এই ডাইভিং অভিযানের সময় ডুবুরিরা পানির নিচে প্রায় ৭৮ মিটার গভীর পর্যন্ত একটি প্যাসেজ বা সুড়ঙ্গ খুঁজে পান । সাধারণ এয়ার সিলিন্ডার দিয়ে এর চেয়ে নিচে যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে তারা ফিরে আসেন। তবে তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে সন ডুং এবং হ্যাং থুং গুহার মধ্যে সংযোগ রয়েছে। এই আবিষ্কারের ফলে সন ডুং গুহার মোট আয়তনের সাথে আরও ১.৬ মিলিয়ন ঘনমিটার যুক্ত হয় । এর মানে হলো, সন ডুং গুহাটি পূর্বে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি বিশাল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পরবর্তীতে এই গুহার একটি ৩৬০ ডিগ্রি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) ট্যুর তৈরি করে, যার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ ফেসবুকের মাধ্যমে এই গুহার বিশালতা উপলব্ধি করতে পারে ।
শেষ কথা (Final Thoughts)
আমাদের চিরচেনা এই পৃথিবীর বুকেই যে এমন একটি অজানা, রহস্যময় এবং বিশাল ভূগর্ভস্থ জগত লুকিয়ে থাকতে পারে, তা সন ডুং আবিষ্কারের আগে মানব সভ্যতার কল্পনারও বাইরে ছিল। যখন কেউ কৌতূহলবশত প্রশ্ন করেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহা কোনটি, তখন শুধুমাত্র একটি শুষ্ক, অন্ধকার এবং পাথুরে সুরঙ্গের চিত্র মাথায় আনলে চলবে না। ভিয়েতনামের হ্যাং সন ডুং প্রমাণ করেছে যে, মাটির নিচেও মেঘ উড়তে পারে, নিজস্ব আবহাওয়া তৈরি হতে পারে এবং দৃষ্টিহীন আশ্চর্য সব প্রাণীদের এক সম্পূর্ণ আলাদা রেইনফরেস্ট ইকোসিস্টেম টিকে থাকতে পারে।
বিবিসি (BBC)-এর ‘প্ল্যানেট আর্থ ৩’ (Planet Earth III) এর মতো বিশ্বমানের প্রামাণ্যচিত্রে এই গুহার চিত্রায়ন একে বিশ্বজুড়ে আরও বেশি পরিচিতি এনে দিয়েছে, যা পরবর্তীতে এমি অ্যাওয়ার্ডের (Emmy Award) জন্যও মনোনয়ন পায় । বর্তমানে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং পরিবেশগত কঠোর বিধিনিষেধের মাধ্যমে ভিয়েতনাম সরকার এই অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে অত্যন্ত সফলভাবে রক্ষা করে চলেছে। ভবিষ্যতে যারা এই দুর্গম এবং রোমাঞ্চকর অভিযানে যুক্ত হতে চান, তাদের জন্য সন ডুং একটি জীবন বদলে দেওয়া অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব রূপে অক্ষত রেখে, কোনো রকম দূষণ না ছড়িয়ে টেকসই ভ্রমণের মানসিকতা ধারণ করাই হবে পৃথিবীর এই বৃহত্তম প্রাকৃতিক আশ্চর্যের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় সম্মান এবং দায়িত্ব।











