রসুন ফ্রিজে রাখলে যে বিপদ হতে পারে! জানলে অবাক হবেন

রসুন ফ্রিজে রাখলে তা দ্রুত অঙ্কুরিত হতে শুরু করে এবং মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যেতে পারে । ফ্রিজের ঠান্ডা তাপমাত্রা রসুনের স্বাভাবিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে এবং…

Soumya Chatterjee

 

রসুন ফ্রিজে রাখলে তা দ্রুত অঙ্কুরিত হতে শুরু করে এবং মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যেতে পারে । ফ্রিজের ঠান্ডা তাপমাত্রা রসুনের স্বাভাবিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে এবং এর স্বাদ, গুণমান ও পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয় । বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ রসুনের কোয়া ঘরের তাপমাত্রায় ৬০-৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১৫-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা সবচেয়ে ভালো, যেখানে ভালো বায়ু চলাচল থাকে ।

রসুন ফ্রিজে রাখলে কী কী সমস্যা হয়

দ্রুত অঙ্কুরোদগম ও তিক্ত স্বাদ

ফ্রিজে রাখা রসুন সাধারণ তাপমাত্রায় রাখা রসুনের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত অঙ্কুরিত হয় । ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনের জীববিজ্ঞানী সারিত রোহকিন শালোমের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঠান্ডায় সংরক্ষিত রসুন থেকে দ্রুত অঙ্কুর বের হয় এবং এটি রসুনের পাতার স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে । অঙ্কুরিত রসুন খাওয়া যদিও নিরাপদ, তবে এর স্বাদ তিক্ত ও তীব্র হয়ে যায়, যা রান্নায় ব্যবহারের জন্য আদর্শ নয় ।

ফ্রিজ থেকে বের করার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঠান্ডা রসুন অঙ্কুরিত হতে শুরু করে । এই অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়া রসুনের অপরিহার্য তেল এবং স্বাদকে কমিয়ে দেয়, যার ফলে রান্নায় এর কার্যকারিতা হ্রাস পায় ।

ছত্রাক ও বিষাক্ত পদার্থের ঝুঁকি

ফ্রিজে রসুন সংরক্ষণ করলে ছত্রাক বা মোল্ড হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে । বিশেষত খোসা ছাড়ানো রসুন ফ্রিজে রাখলে তা খুব দ্রুত ছত্রাক ধরে । রসুনে জন্মানো ছত্রাক মাইকোটক্সিন নামক বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং ক্যান্সারের সাথে সংযুক্ত হতে পারে

ফ্রিজের আর্দ্র পরিবেশ ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে । এমনকি ছোট ছত্রাকের দাগ দেখলেও পুরো রসুন ফেলে দেওয়া উচিত, কারণ বিষাক্ত পদার্থ অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং রান্না করলেও সব বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট হয় না ।

বটুলিজম ব্যাকটেরিয়ার বিপদ

তেলে ডুবিয়ে রসুন সংরক্ষণ করলে এবং ঠিকমতো ফ্রিজে না রাখলে বটুলিজম ব্যাকটেরিয়া (ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম) বৃদ্ধি পেতে পারে, যা মারাত্মক খাদ্যবিষক্রিয়া ঘটাতে পারে । তেল অক্সিজেন বন্ধ করে দেয় এবং আর্দ্র পরিবেশ তৈরি করে, যা বটুলিজম ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত ।

তেলে রসুন সংরক্ষণ করলে অবশ্যই ফ্রিজে রাখতে হবে এবং চার দিনের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে । খোসা ছাড়ানো রসুন ফ্রিজে সর্বোচ্চ ৩-৭ দিন সংরক্ষণ করা যেতে পারে, তার বেশি নয় ।

ঘুমানোর আগে রসুন খাওয়ার ৭টি অবাক করা উপকারিতা

রসুনের আদর্শ সংরক্ষণ পদ্ধতি

সম্পূর্ণ রসুনের কোয়া সংরক্ষণ

সম্পূর্ণ রসুনের কোয়া সংরক্ষণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একে ঘরের তাপমাত্রায় শুষ্ক, অন্ধকার স্থানে রাখা যেখানে ভালো বায়ু চলাচল আছে । প্যান্ট্রি বা রান্নাঘরের আলমারিতে রাখা যেতে পারে, তবে চুলার কাছে বা সরাসরি সূর্যালোকে নয় ।

রসুন সংরক্ষণের জন্য জাল ব্যাগ, তারের ঝুড়ি বা বাতাস চলাচলযুক্ত পাত্র ব্যবহার করা উচিত । প্লাস্টিকের ব্যাগ বা বায়ুরোধী পাত্র ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এতে আর্দ্রতা আটকে থাকে এবং রসুন দ্রুত নষ্ট হয় । রসুন নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আর্দ্রতা নিঃসরণ করে, তাই শ্বাস নিতে পারে এমন পরিবেশ প্রয়োজন ।

এছাড়া, রসুন এমন ফল ও সবজি থেকে দূরে রাখা উচিত যেগুলো পাকার সময় বেশি গ্যাস নিঃসরণ করে, যেমন আপেল ও কলা । সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে সম্পূর্ণ রসুনের কোয়া ৬ মাস পর্যন্ত তাজা থাকতে পারে ।

খোসা ছাড়ানো বা কাটা রসুন সংরক্ষণ

খোসা ছাড়ানো বা কাটা রসুনের ক্ষেত্রে ফ্রিজে সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি । একটি বায়ুরোধী পাত্রে রেখে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে তা প্রায় এক সপ্তাহ তাজা থাকতে পারে । এটি রসুনের তাজা ভাব ধরে রাখে এবং পুরো ফ্রিজে রসুনের গন্ধ ছড়ানো থেকে রক্ষা করে ।

খোসা ছাড়ানো রসুন অলিভ অয়েলে ডুবিয়ে ফ্রিজে রাখা যেতে পারে, যা রসুনকে সংরক্ষণ করে এবং তেলে সুন্দর রসুনের স্বাদ যোগ করে । তবে বটুলিজমের ঝুঁকি এড়াতে অবশ্যই এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে এবং ফ্রিজে (৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে) রাখতে হবে ।

হিমায়িত রসুন সংরক্ষণ

হিমায়িত করা রসুন সংরক্ষণের আরেকটি বিকল্প, যদিও কিছু মানুষ মনে করেন যে হিমায়িত রসুন তাজা রসুনের মতো সুস্বাদু নয় । রসুন হিমায়িত করার সহজ উপায় হলো খোসা ছাড়িয়ে কুচি করে সামান্য পানি বা ঝোল যোগ করে বরফের ট্রেতে হিমায়িত করা ।

হিমায়িত রসুনের কিউব বায়ুরোধী পাত্রে ফ্রিজারে রাখলে এক মাস পর্যন্ত স্বাদ না হারিয়ে থাকতে পারে । তবে হিমায়িত খোসা ছাড়া রসুন গলানোর পর নরম হয়ে যেতে পারে এবং এর রন্ধনসম্পর্কীয় গুণমান কমে যায় ।

ঘিয়ের সঙ্গে রসুন মিশিয়ে খেলে কী হয়?

রসুন সংরক্ষণের তাপমাত্রা ও সময়সীমা

সংরক্ষণ পদ্ধতি তাপমাত্রা সময়কাল বিশেষ সতর্কতা
সম্পূর্ণ রসুন (ঘরের তাপমাত্রা) ৬০-৬৫°F (১৫-১৮°C) ৬ মাস পর্যন্ত বায়ু চলাচলযুক্ত পাত্রে রাখুন
ভাঙা রসুনের কোয়া (ঘরের তাপমাত্রা) ৬০-৬৫°F (১৫-১৮°C) ১০-১৪ দিন শুষ্ক ও অন্ধকার স্থানে রাখুন
খোসা ছাড়া রসুন (ফ্রিজ) ৩৫-৪০°F (২-৪°C) ৩-৭ দিন বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন
কাটা রসুন (ফ্রিজ) ৩৫-৪০°F (২-৪°C) ৭ দিন বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন
তেলে রসুন (ফ্রিজ) ৩৫-৪০°F (২-৪°C) ৪-৭ দিন বটুলিজম এড়াতে দ্রুত ব্যবহার করুন
হিমায়িত রসুন (ফ্রিজার) ০°F (-১৮°C) ১ মাস বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন

কখন রসুন ফেলে দেওয়া উচিত

বিপজ্জনক লক্ষণ

যদি রসুনে দৃশ্যমান ছত্রাক, পিচ্ছিল গঠন বা অস্বাভাবিক গন্ধ থাকে তবে তা তৎক্ষণাৎ ফেলে দেওয়া উচিত । সামান্য অঙ্কুরোদগম বা কাগজের মতো খোসা সাধারণত নিরাপদ এবং খোসা ছাড়িয়ে ব্যবহার করা যায়, তবে যেকোনো ছত্রাক (এমনকি ছোট দাগও) বা ভিনেগারের মতো গন্ধ থাকলে তা অবিলম্বে ফেলে দিতে হবে ।

নষ্ট রসুনে ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা বমি বমি ভাব বা আরও মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে । ছত্রাকযুক্ত বা টক গন্ধযুক্ত রসুন অবশ্যই ফেলে দিতে হবে, কারণ রান্না করলেও সব বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট হয় না ।

নিরাপদ ব্যবহারের লক্ষণ

হালকা অঙ্কুরোদগম সাধারণত নিরাপদ, যদিও স্বাদ কিছুটা তিক্ত হতে পারে । যদি রসুন শক্ত থাকে, কোনো নরম দাগ না থাকে এবং স্বাভাবিক গন্ধ থাকে, তবে এটি ব্যবহার করা নিরাপদ ।

রসুন যদি শুধুমাত্র সামান্য হলুদ হয়ে যায় বা খোসা শুকিয়ে যায়, তবে খোসা ছাড়িয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে । তবে সন্দেহ থাকলে ফেলে দেওয়াই ভালো, কারণ স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয় ।

রসুনের পুষ্টিগুণ ও সংরক্ষণ

সংরক্ষণে পুষ্টিগুণের পরিবর্তন

সঠিক সংরক্ষণ রসুনের জৈব-রাসায়নিক গুণাবলী বজায় রাখতে সাহায্য করে । একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ৬ মাস পর সালফার যৌগে হ্রাস পরিলক্ষিত হয়, যা জৈব সক্রিয় প্রভাব কমিয়ে দেয় । তবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগের সংখ্যা সংরক্ষণ সময়কালে স্থিতিশীল থাকে, যা দেখায় যে ফ্রিজের তাপমাত্রা রসুনের শেল্ফ লাইফ বজায় রাখতে ভালো প্রভাব ফেলে ।

ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে রসুনের অপরিহার্য তেল কমে যেতে পারে, যার ফলে স্বাদ হ্রাস পায় । এছাড়া, ঠান্ডায় সংরক্ষিত রসুন গলানোর পর নরম হয়ে যায়, যা এর রন্ধনসম্পর্কীয় গুণমান নষ্ট করে ।

দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের কৌশল

শিল্পক্ষেত্রে ৫, ১০, ১৫, ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৭০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করা হয় । ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এবং ৭০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় রসুনের গুঁড়ো বিভিন্ন প্যাকেজিংয়ে ১.৩২ থেকে ৭.২৮ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে ।

ঘরোয়া সংরক্ষণের জন্য (৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা) রসুনের শেল্ফ লাইফ ন্যূনতম থাকে । তাই ঠান্ডা, শুষ্ক এবং বায়ু চলাচলযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে ভালো ।

রসুন সংরক্ষণে সাধারণ ভুল

ভুল ১: ফ্রিজে সম্পূর্ণ রসুন রাখা

অনেকেই মনে করেন যে ফ্রিজ সব ধরনের খাবার সংরক্ষণের জন্য আদর্শ স্থান, কিন্তু সম্পূর্ণ রসুনের জন্য এটি সত্য নয় । ফ্রিজের ঠান্ডা তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা রসুনের অঙ্কুরোদগম ত্বরান্বিত করে এবং ছত্রাক বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে ।

সম্পূর্ণ রসুন ফ্রিজের পরিবর্তে প্যান্ট্রিতে জাল ব্যাগে রাখুন । এতে রসুন ৬ মাস পর্যন্ত তাজা থাকবে ।

ভুল ২: বায়ুরোধী পাত্রে রসুন রাখা

প্লাস্টিকের ব্যাগ বা সম্পূর্ণ বন্ধ পাত্রে রসুন রাখলে আর্দ্রতা আটকে থাকে এবং ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায় । রসুনের শ্বাস নেওয়ার জন্য জায়গা দরকার, কারণ এটি নিজস্ব গ্যাস এবং আর্দ্রতা নিঃসরণ করে ।

জাল ব্যাগ, তারের ঝুড়ি বা ছিদ্রযুক্ত পাত্র ব্যবহার করুন যাতে বায়ু সঠিকভাবে চলাচল করতে পারে ।

ভুল ৩: তেলে রসুন ঘরের তাপমাত্রায় রাখা

তেলে রসুন ডুবিয়ে ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে বটুলিজম ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়, যা মারাত্মক নিউরোটক্সিন তৈরি করতে পারে । তেল অক্সিজেন বন্ধ করে দেয় এবং আর্দ্র পরিবেশ প্রদান করে যা ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ।

তেলে রসুন তৈরি করলে অবশ্যই ফ্রিজে রাখুন এবং ৭ দিনের মধ্যে ব্যবহার করুন । নিরাপত্তার জন্য ভিনেগার বা লেবুর রস যোগ করুন যাতে পিএইচ লেভেল ৪.৬-এর নিচে থাকে ।

ভুল ৪: ফ্রিজে দীর্ঘ সময় রাখা

খোসা ছাড়ানো রসুন ফ্রিজে ৩-১৪ দিন সংরক্ষণ করা নিরাপদ বলে মনে করা হলেও, নিরাপত্তার জন্য ৩ দিনের মধ্যে ব্যবহার করা উচিত । ঠান্ডা তাপমাত্রা রসুনে প্রারম্ভিক অঙ্কুরোদগম ঘটায় যা তিক্ত স্বাদ তৈরি করে ​।

দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য খোসা ছাড়ানো রসুন ফ্রিজারে রাখুন এবং ফ্রিজে সংরক্ষণের সময় ৩ দিনে সীমাবদ্ধ রাখুন ।

বিভিন্ন ধরনের রসুন সংরক্ষণ

তাজা সম্পূর্ণ রসুন

তাজা সম্পূর্ণ রসুন সংরক্ষণের সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর পদ্ধতি হলো শুষ্ক, অন্ধকার এবং বায়ু চলাচলযুক্ত স্থানে রাখা । জুলাই মাসে কাটা রসুনের জন্য আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ৫০-৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট এবং ৪০-৬০% আর্দ্রতায় এবং অক্টোবর-বসন্তের শুরুতে ৩৫-৫৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট এবং ৪০-৬০% আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করা উচিত ।

রসুনের কোয়া ভাঙার পর এর আয়ুষ্কাল কমে যায় এবং সাধারণত ১০ দিন স্থায়ী হয় । তাই সম্পূর্ণ কোয়া রাখাই সবচেয়ে ভালো ।

রোস্টেড রসুন

রোস্ট করা রসুন বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায় । রান্না করার পর কোয়া ও বাল্বের মাথা কেটে নরম রসুন বের করে বায়ুরোধী ফ্রিজার পাত্রে রাখুন । রোস্ট করা রসুন ফ্রিজে ১ সপ্তাহ পর্যন্ত বা ফ্রিজারে অনির্দিষ্টকালের জন্য সংরক্ষণ করা যায় ।

তেলে রোস্ট করলে রসুন সম্পূর্ণভাবে জমে না, যার ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সহজেই ব্যবহার করা যায় ।

কিমা করা রসুন

কিমা করা রসুন ফ্রিজারে সংরক্ষণ করার সহজ উপায় হলো সামান্য পানি বা ঝোল যোগ করে বরফের ট্রেতে জমাট বাঁধানো । এই রসুন বরফের কিউব বায়ুরোধী পাত্রে ফ্রিজারে রাখলে এক মাস পর্যন্ত স্বাদ না হারিয়ে সংরক্ষণ করা যায় ।

তবে মনে রাখতে হবে যে, ক্রয়ের তারিখ থেকে জমাতে হবে এবং ফ্রিজে খোসা ছাড়া রসুন সর্বোচ্চ ৩ দিন রাখা উচিত ।

রসুন সংরক্ষণের আঞ্চলিক পার্থক্য

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে সংরক্ষণ

ভারত সহ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে যেখানে তাপমাত্রা বেশি থাকে, সেখানে রসুন দ্রুত নষ্ট হয় । ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় ঘরোয়া সংরক্ষণে রসুনের শেল্ফ লাইফ মাত্র ০.৮ থেকে ৭.০২ মাস, প্যাকেজিংয়ের উপর নির্ভর করে ।

এ ধরনের জলবায়ুতে রসুন ছায়াযুক্ত, ঠান্ডা এবং শুষ্ক স্থানে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । রান্নাঘরে চুলা বা জানালার কাছে না রেখে নিচু তাপমাত্রার জায়গায় রাখুন ।

শীতপ্রধান অঞ্চলে সংরক্ষণ

শীতপ্রধান অঞ্চলে যেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে, সেখানে রসুন দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সহজ । তবে খুব বেশি ঠান্ডা পরিবেশ এড়ানো উচিত, কারণ এটি অঙ্কুরোদগম ত্বরান্বিত করতে পারে ।

আদর্শ তাপমাত্রা ১৩-১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৬০-৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বজায় রাখা উচিত । বেসমেন্ট বা ঠান্ডা প্যান্ট্রি এ ধরনের সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ।

রসুন সংরক্ষণে খাদ্য নিরাপত্তা

খাদ্যবিষক্রিয়ার ঝুঁকি

নষ্ট রসুন খাদ্যবিষক্রিয়ার একটি সাধারণ কারণ । ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া বমি বমি ভাব বা আরও মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে । ছত্রাকযুক্ত বা টক গন্ধযুক্ত রসুন অবশ্যই ফেলে দিতে হবে, কারণ রান্না করলেও সব বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট হয় না ।

খাদ্য নিরাপত্তায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, “শুধু একটু” ছত্রাক থেকে মানুষ অসুস্থ হয়েছে । সন্দেহ থাকলে ফেলে দেওয়াই ভালো ।

নিরাপদ সংরক্ষণ নির্দেশিকা

CDC এবং FDA-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, তেলে রসুনের মিশ্রণ অবিলম্বে ফ্রিজে রাখতে হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে । বাণিজ্যিক পণ্যে অ্যাসিডিফিকেশন, রেফ্রিজারেশন এবং প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, যা ঘরে সাধারণত করা হয় না ।

তাজা রসুন তেলে ডুবিয়ে কাউন্টারে রাখলে বটুলিজমের জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয় । নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য তেলে অ্যাসিড যোগ করুন (প্রতি কাপ তেলে ১ টেবিল চামচ ভিনেগার বা লেবুর রস) এবং বায়ুরোধী পাত্রে ফ্রিজে (≤৪০°F/৪°C) রাখুন ।

রসুন সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা

বিভিন্ন সংরক্ষণ অবস্থায় রসুনের ফাইটোকেমিক্যাল গঠন এবং জৈবিক প্রভাবের উপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, অর্গানোসালফার যৌগ, মোট ঘনীভূত ট্যানিন, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ফেনোলিক যৌগে সংরক্ষণকালে পরিবর্তন হয় । ৬ মাস পর সালফার যৌগ কমে যায়, যা জৈব সক্রিয় প্রভাবের হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত ।

তবে সংরক্ষণকালে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৈাগের সংখ্যা স্থিতিশীল ছিল, যা দেখায় যে রেফ্রিজারেটেড তাপমাত্রা রসুনের বাল্বের শেল্ফ লাইফ বজায় রাখতে ভালো প্রভাব ফেলে । এই গবেষণা স্তন ক্যান্সার কোষ লাইন এবং ম্যাক্রোফেজ RAW 264.7 কোষে পরিচালিত হয়েছিল ।

রসুন ফ্রিজে রাখার বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা উচিত। সম্পূর্ণ রসুনের কোয়া ফ্রিজে রাখা উচিত নয়, কারণ এতে দ্রুত অঙ্কুরোদগম, ছত্রাক বৃদ্ধি এবং স্বাদের অবনতি ঘটে। রসুন সবচেয়ে ভালো থাকে শুষ্ক, অন্ধকার এবং বায়ু চলাচলযুক্ত স্থানে ঘরের তাপমাত্রায়, যেখানে এটি ৬ মাস পর্যন্ত তাজা থাকতে পারে। তবে খোসা ছাড়ানো বা কাটা রসুনের ক্ষেত্রে ফ্রিজে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত এবং ৩-৭ দিনের মধ্যে ব্যবহার করা উচিত। তেলে রসুন সংরক্ষণ করলে বটুলিজমের ঝুঁকি এড়াতে অবশ্যই ফ্রিজে রাখতে হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। ছত্রাকযুক্ত, টক গন্ধযুক্ত বা পিচ্ছিল রসুন কখনও ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এটি স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করে রসুনের পুষ্টিগুণ, স্বাদ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

About Author
Soumya Chatterjee

সৌম্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং প্রযুক্তি বিষয়ক লেখালিখিতে বিশেষ আগ্রহী। তিনি একজন উদ্যমী লেখক, যিনি প্রযুক্তির জটিল ধারণাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে দক্ষ। তার লেখার মূল ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, গ্যাজেট রিভিউ, সফটওয়্যার গাইড, এবং উদীয়মান টেক প্রবণতা। সৌম্যর প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান এবং অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তাকে পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। টেক জগতে চলমান পরিবর্তনগুলির সাথে তাল মিলিয়ে সৌম্য সর্বদা নতুন ও তথ্যসমৃদ্ধ বিষয়বস্তু নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আরও পড়ুন