হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগের শিকার হন। তবে একটি যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক গবেষণা, যা ইন্টারহার্ট স্টাডি (INTERHEART study) নামে পরিচিত, দেখিয়েছে যে বিশ্বব্যাপী ৯০ শতাংশেরও বেশি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি মাত্র নয়টি পরিবর্তনযোগ্য কারণের সাথে যুক্ত। এই গবেষণার তথ্য প্রায়ই সহজবোধ্য করে বলা হয় যে, প্রায় ৯৯% ঝুঁকিই আমাদের জীবনযাত্রার সাথে জড়িত, বিশেষ করে চারটি প্রধান কারণের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রবন্ধে, আমরা সেই প্রধান কারণগুলি এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞানকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে।
সত্যিটা হলো, হৃদরোগ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের জীবনযাত্রার ফল, যা আমাদের ধমনীর ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। সুখবর হলো, যেহেতু এই কারণগুলি ‘পরিবর্তনযোগ্য’ (modifiable), তাই সঠিক জ্ঞান এবং পদক্ষেপের মাধ্যমে বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাকই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই প্রবন্ধে আমরা সেই কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করব এবং জানাবো কীভাবে আপনি নিজের হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।
হার্ট অ্যাটাক: একটি নীরব ঘাতকের পরিচিতি
হার্ট অ্যাটাক (Myocardial Infarction) তখন ঘটে যখন হৃৎপিণ্ডের পেশীতে রক্ত সরবরাহকারী এক বা একাধিক করোনারি ধমনী ব্লক হয়ে যায়। এই ব্লকেজের কারণে হৃৎপিণ্ডের সেই অংশে রক্ত এবং অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, ফলে হৃদপেশীর কোষগুলি (cardiac cells) মারা যেতে শুরু করে।
হার্ট অ্যাটাক কেন হয়? (The Mechanism)
এই ব্লকেজের প্রধান কারণ হলো অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis)। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে ধমনীর ভেতরের দেয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য পদার্থ জমা হয়ে একটি ‘প্লাক’ (Plaque) তৈরি করে। বছরের পর বছর ধরে এই প্লাক বড় হতে থাকে এবং ধমনীকে সরু করে ফেলে।
হার্ট অ্যাটাক সাধারণত ঘটে যখন এই প্লাক ফেটে যায় (rupture)। প্লাক ফেটে গেলে, শরীর সেই স্থানটিকে ‘আহত’ বলে মনে করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া শুরু করে। একটি রক্তপিণ্ড (blood clot) তৈরি হয়, যা ধমনীর সরু পথটিকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলেই হৃৎপিণ্ডে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়।
ঝুঁকির কারণ: মডিফায়েবল বনাম নন-মডিফায়েবল
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির কারণগুলিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
১. নন-মডিফায়েবল (Non-modifiable): এগুলি আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। যেমন:
* বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঝুঁকি বাড়ে।
* লিঙ্গ: পুরুষদের ঝুঁকি মহিলাদের তুলনায় আগে শুরু হয়, তবে মেনোপজের পর মহিলাদের ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে থাকে।
* বংশগত ইতিহাস: পরিবারে (বাবা, মা, ভাই, বোন) অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি থাকে।
২. মডিফায়েবল (Modifiable): এগুলি আপনি নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করতে পারেন। এগুলিই আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
৯৯% ঝুঁকির ধারণা: ইন্টারহার্ট স্টাডি (INTERHEART Study)
২০০৪ সালে প্রখ্যাত মেডিকেল জার্নাল “দ্য ল্যানসেট” (The Lancet)-এ প্রকাশিত ইন্টারহার্ট স্টাডি হৃদরোগ গবেষণার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই গবেষণায় ৫২টি দেশের প্রায় ৩০,০০০ অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
গবেষণার প্রধান আবিষ্কার ছিল আশ্চর্যজনক: বিশ্বব্যাপী ৯০% (পুরুষদের ক্ষেত্রে) থেকে ৯৪% (মহিলাদের ক্ষেত্রে) হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি মাত্র নয়টি পরিবর্তনযোগ্য জীবনধারা এবং জৈবিক কারণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এই নয়টি কারণ হলো:
১. অস্বাভাবিক লিপিড (কোলেস্টেরল)
২. ধূমপান
৩. উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন)
৪. ডায়াবেটিস
৫. পেটের স্থূলতা (Abdominal Obesity)
৬. মানসিক চাপ (Psychosocial factors)
৭. ফল ও সবজি কম খাওয়া
৮. নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব
৯. অ্যালকোহল সেবন
যদিও গবেষণায় নয়টি কারণের কথা বলা হয়েছে, তবে প্রায়শই “৯৯%” কথাটি ব্যবহার করা হয় এটা বোঝাতে যে, প্রায় সম্পূর্ণ ঝুঁকিই এই কারণগুলির সাথে জড়িত। এর মধ্যে প্রথম চারটি কারণ—কোলেস্টেরল, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস—সবচেয়ে মারাত্মক এবং প্রভাবশালী। আসুন এই “প্রধান চার” সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।
প্রধান চারটি কারণ: বিস্তারিত বিশ্লেষণ
এই চারটি কারণকে প্রায়শই ‘মেটাবলিক সিন্ড্রোম’-এর অংশ হিসেবে দেখা হয় এবং এগুলি একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১. অস্বাভাবিক লিপিড (ডিকোড করা কোলেস্টেরল)
সাধারণ ভাষায় আমরা একে ‘হাই কোলেস্টেরল’ বলি। লিপিড বা চর্বি রক্তে পরিবাহিত হয় লাইপোপ্রোটিন নামক কণার মাধ্যমে।
সমস্যাটা কোথায়?
- LDL (Low-Density Lipoprotein): একে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বলা হয়। এর মাত্রা বেড়ে গেলে তা ধমনীর দেয়ালে জমা হয়ে প্লাক তৈরি করে (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস)।
- HDL (High-Density Lipoprotein): একে ‘ভালো কোলেস্টেরল’ বলা হয়। এটি ধমনী থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরিয়ে লিভারে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এর মাত্রা কমে যাওয়াটা ক্ষতিকর।
- ট্রাইগ্লিসারাইড (Triglycerides): এটি রক্তে থাকা আরেক ধরনের চর্বি। এর উচ্চ মাত্রাও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ইন্টারহার্ট স্টাডি একটি নির্দিষ্ট অনুপাতকে ঝুঁকির প্রধান সূচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে: ApoB/ApoA1 অনুপাত। ApoB হলো LDL-এর প্রধান প্রোটিন (খারাপ) এবং ApoA1 হলো HDL-এর প্রধান প্রোটিন (ভালো)। এই অনুপাত যত বেশি, ঝুঁকি তত বেশি।
কেন এটি এত বিপজ্জনক?
উচ্চ এলডিএল সরাসরি অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের প্রক্রিয়া শুরু করে। এটি ধমনীর ভেতরের আস্তরণ (endothelium)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা প্লাক তৈরির প্রথম ধাপ।
পরিসংখ্যান:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুসারে, বিশ্বব্যাপী হৃদরোগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য উচ্চ কোলেস্টেরল দায়ী। উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় দেশেই এটি একটি বড় সমস্যা।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
- খাদ্যাভ্যাস: স্যাচুরেটেড ফ্যাট (লাল মাংস, মাখন, পনির) এবং বিশেষ করে ট্রান্স ফ্যাট (ভাজা খাবার, বেকারি পণ্য) কমানো। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (সামুদ্রিক মাছ) এবং ফাইবার (ফল, সবজি, ওটস) বাড়ানো।
- ব্যায়াম: নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এইচডিএল (ভালো) কোলেস্টেরল বাড়াতে এবং এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
- ওষুধ: প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে স্ট্যাটিন (Statin) জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করতে হতে পারে, যা কোলেস্টেরল উৎপাদনে বাধা দেয়।
২. ধূমপান (সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়)
ইন্টারহার্ট স্টাডি দেখিয়েছে যে, ধূমপান হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি হার্ট অ্যাটাকের একক বৃহত্তম প্রতিরোধযোগ্য কারণগুলির মধ্যে অন্যতম।
সমস্যাটা কোথায়?
ধূমপান একাধিক উপায়ে হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি করে:
- ধমনীর ক্ষতি: সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক (যেমন নিকোটিন এবং কার্বন মনোক্সাইড) ধমনীর ভেতরের মসৃণ আস্তরণ (endothelium)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি প্লাক জমার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
- রক্ত জমাট বাঁধা: ধূমপান রক্তের প্লেটলেটগুলিকে (platelets) আরও ‘চটচটে’ করে তোলে, ফলে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণই হলো এই রক্ত জমাট বাঁধা।
- অক্সিজেন হ্রাস: কার্বন মনোক্সাইড রক্তের হিমোগ্লোবিনের সাথে মিশে গিয়ে অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে হৃৎপিণ্ডকে একই পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহের জন্য আরও বেশি কাজ করতে হয়।
- এইচডিএল কমানো: ধূমপান ভালো কোলেস্টেরল (HDL) এর মাত্রা কমিয়ে দেয়।
পরিসংখ্যান:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তামাক ব্যবহার প্রতি বছর ৮০ লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ। এর মধ্যে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ অধূমপায়ী, যারা শুধুমাত্র সেকেন্ড-হ্যান্ড ধোঁয়ার (নিষ্ক্রিয় ধূমপান) সংস্পর্শে আসার কারণে মারা যান। কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (CVD) জনিত মৃত্যুর প্রায় ১২% তামাক ব্যবহারের কারণে হয়।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
এর একটিই উপায়: ধূমপান ত্যাগ করা।
- ধূমপান ছাড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমতে শুরু করে।
- আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) এর মতে, ধূমপান ছাড়ার এক বছরের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি ধূমপায়ীদের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসে।
- নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (NRT) বা চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সাহায্য করতে পারে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ (নীরব ঘাতক)
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন (Hypertension) কে “সাইলেন্ট কিলার” বা “নীরব ঘাতক” বলা হয়, কারণ বেশিরভাগ সময় এর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে না, অথচ এটি নীরবে হৃৎপিণ্ড এবং ধমনীর মারাত্মক ক্ষতি করতে থাকে।
সমস্যাটা কোথায়?
রক্তচাপ হলো ধমনীর দেয়ালের ওপর রক্তের চাপ। এই চাপ যখন ক্রমাগত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে (সাধারণত ১৩০/৮০ mmHg বা তার বেশি), তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলে।
- ধমনীর ওপর চাপ: উচ্চ চাপ ধমনীর দেয়ালকে শক্ত (stiff) এবং দুর্বল করে তোলে। এটি অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
- হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ: উচ্চ চাপের বিরুদ্ধে রক্ত পাম্প করার জন্য হৃৎপিণ্ডকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। সময়ের সাথে সাথে, হৃৎপিণ্ডের পেশী মোটা হয়ে যায় (Left Ventricular Hypertrophy), যা হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকি বাড়ায় এবং হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক রক্ত সরবরাহে বাধা দেয়।
- প্লাক ফেটে যাওয়া: উচ্চ রক্তচাপ ধমনীতে থাকা প্লাকের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে প্লাক ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে।
পরিসংখ্যান:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১.২৮ বিলিয়ন (১২৮ কোটি) মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। উদ্বেগজনকভাবে, তাদের মধ্যে প্রায় ৪৬% জানেনই না যে তাদের এই সমস্যা আছে। উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
- নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: যেহেতু এর লক্ষণ নেই, তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা আবশ্যক।
- লবণ কমানো (সোডিয়াম): খাদ্যাভ্যাসে সোডিয়ামের (লবণ) পরিমাণ কমানো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান উপায়। WHO দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ (প্রায় এক চা চামচ) খাওয়ার পরামর্শ দেয়।
- DASH ডায়েট: (Dietary Approaches to Stop Hypertension) ডায়েট অনুসরণ করা, যাতে ফল, সবজি, কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার এবং গোটা শস্য বেশি থাকে।
- ওষুধ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ (যেমন ACE inhibitors, Beta-blockers) সেবন করা।
৪. ডায়াবেটিস মেলিটাস (রক্তে চিনির বিপদ)
ডায়াবেটিস বা রক্তে উচ্চ শর্করার মাত্রা হৃদরোগের ঝুঁকিকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে তোলে।
সমস্যাটা কোথায়?
ডায়াবেটিস রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি।
- রক্তনালীর ক্ষতি: রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ (চিনি) রক্তনালীর ভেতরের আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে (glycation)। এটি প্রদাহ বাড়ায় এবং অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসকে ত্বরান্বিত করে।
- কোলেস্টেরলের ধরন পরিবর্তন: ডায়াবেটিস প্রায়শই ‘ডায়াবেটিক ডিসলিপিডেমিয়া’ সৃষ্টি করে—অর্থাৎ, এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলের কণাগুলি আরও ছোট এবং ঘন হয়ে যায়, যা ধমনীর দেয়ালে সহজে প্রবেশ করতে পারে, এবং এইচডিএল (ভালো) কোলেস্টেরল কমে যায়।
- মেটাবলিক সিন্ড্রোম: ডায়াবেটিস প্রায়শই একা আসে না। এর সাথে উচ্চ রক্তচাপ, পেটের স্থূলতা এবং অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল (একসাথে ‘মেটাবলিক সিন্ড্রোম’ বলা হয়) থাকে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিসংখ্যান:
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF) এর ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৫৩৭ মিলিয়ন (৫৩.৭ কোটি) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ২০৪৫ সালের মধ্যে ৭৭৬ মিলিয়নে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। হৃদরোগজনিত জটিলতাই ডায়াবেটিস রোগীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
- রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: HbA1c (গত তিন মাসের গড় শর্করা) পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে রাখা (সাধারণত ৭% এর নিচে)।
- খাদ্যাভ্যাস: কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের ওপর নজর রাখা, ফাইবার জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়।
- ওষুধ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেটফর্মিন, ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধ গ্রহণ করা।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলি (The Other Five Factors)
যদিও প্রথম চারটি কারণ সবচেয়ে প্রভাবশালী, ইন্টারহার্ট স্টাডিতে উল্লিখিত বাকি পাঁচটি কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়শই এই চারটির সাথে একযোগে কাজ করে।
৫. পেটের স্থূলতা (Abdominal Obesity)
শরীরের কোথায় চর্বি জমছে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পেটে বা কোমরের চারপাশে চর্বি জমা (Apple-shape) নিতম্ব বা উরুতে চর্বি জমার (Pear-shape) চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। পেটের চর্বি (Visceral fat) মেটাবলিকভাবে সক্রিয় এবং এটি প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের কারণ হয়।
৬. মানসিক চাপ (Psychosocial Factors)
ইন্টারহার্ট স্টাডি দেখিয়েছে যে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। মানসিক চাপ কর্টিসল (Cortisol) হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে।
৭. ও ৮. খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
- খাদ্যাভ্যাস: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল এবং সবজি না খাওয়া একটি বড় ঝুঁকির কারণ। ফল ও সবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং পটাশিয়াম ধমনীকে রক্ষা করে এবং রক্তচাপ কমায়।
- ব্যায়ামের অভাব: শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং খারাপ কোলেস্টেরলের অন্যতম প্রধান কারণ। WHO সুপারিশ করে যে, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০-৩০০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত।
৯. অ্যালকোহল সেবন
যদিও কিছু গবেষণায় ‘মাঝারি’ অ্যালকোহল সেবনের কিছু সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তবে ইন্টারহার্ট স্টাডি দেখিয়েছে যে, অ্যালকোহল সেবন (বিশেষত অতিরিক্ত) সামগ্রিকভাবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি রক্তচাপ এবং ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়াতে পারে।
প্রতিরোধই সর্বোত্তম চিকিৎসা: ঝুঁকি কমানোর সমন্বিত পদক্ষেপ
এই সমস্ত তথ্য একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায়: আপনার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুলাংশে আপনার হাতেই রয়েছে। “৯৯ শতাংশ” হোক বা “৯০ শতাংশ”, মূল বার্তাটি হলো—জীবনযাত্রার পরিবর্তনই হৃদরোগ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) “Life’s Essential 8” বা জীবনের আটটি অপরিহার্য উপাদানের কথা বলে, যা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে। এগুলি হলো:
১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফল, সবজি, গোটা শস্য, প্রোটিন (মাছ, ডাল) এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি (অলিভ অয়েল, বাদাম) সমৃদ্ধ খাবার।
২. সক্রিয় থাকা: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম।
৩. ধূমপান ত্যাগ: যেকোনো প্রকার তামাক বর্জন করা।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতি রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ভালো ঘুম।
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্বাস্থ্যকর ওজন (BMI) এবং কোমরের মাপ বজায় রাখা।
৬. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৭. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা।
৮. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ঝুঁকি পরিমাপে সারণী (Risk Factor Overview)
| ঝুঁকির কারণ (Risk Factor) | কীভাবে ক্ষতি করে (Mechanism of Damage) | নিয়ন্ত্রণের উপায় (Management) |
| ১. অস্বাভাবিক লিপিড | ধমনীতে প্লাক তৈরি (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস)। | স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ব্যায়াম, স্ট্যাটিন ওষুধ। |
| ২. ধূমপান | ধমনীর আস্তরণ নষ্ট করে, রক্ত জমাট বাঁধায়। | ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করা (NRT)। |
| ৩. উচ্চ রক্তচাপ | ধমনীর দেয়াল দুর্বল করে, হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ বাড়ায়। | লবণ কমানো, DASH ডায়েট, ব্যায়াম, ওষুধ। |
| ৪. ডায়াবেটিস | রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কোলেস্টেরলের ধরন খারাপ করে। | শর্করা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ। |
| ৫. পেটের স্থূলতা | প্রদাহ বাড়ায়, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে। | ওজন কমানো, ব্যায়াম, ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ। |
| ৬. মানসিক চাপ | হরমোনের মাধ্যমে রক্তচাপ ও শর্করা বাড়ায়। | রিলাক্সেশন, ব্যায়াম, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং। |
| ৭. ফল ও সবজি কম খাওয়া | অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবারের অভাব। | প্রতিদিন ৪-৫ সার্ভিং ফল ও সবজি খাওয়া। |
| ৮. ব্যায়ামের অভাব | স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। | সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম। |
| ৯. অ্যালকোহল | রক্তচাপ ও ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়াতে পারে। | সেবন সীমিত করা বা বর্জন করা। |
ইন্টারহার্ট স্টাডি এবং পরবর্তী গবেষণাগুলি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে, হার্ট অ্যাটাক কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি মূলত আমাদের জীবনযাত্রার দীর্ঘমেয়াদী ফল। যদিও “৯৯ শতাংশ” কথাটি একটি সরলীকরণ হতে পারে, তবে এর পেছনের বার্তাটি—যে ৯০%-এরও বেশি ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য—অত্যন্ত শক্তিশালী।
চারটি প্রধান কারণ—অস্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরল, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস—এই ঝুঁকির সিংহভাগ বহন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রতিটি কারণ একে অপরের সাথে জড়িত। ধূমপান রক্তচাপ বাড়ায়, ডায়াবেটিস কোলেস্টেরলের সমস্যা বাড়ায়, এবং স্থূলতা এগুলির সবকটিকেই প্রভাবিত করে।
তাই আংশিক সমাধান না খুঁজে, একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য, শারীরিক পরিশ্রম এবং তামাক বর্জন—এই সাধারণ পদক্ষেপগুলিই আপনার হৃদযন্ত্রকে আগামী বহু বছর সুস্থ রাখতে পারে এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।











