১ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২টা। দিল্লির রামলীলা ময়দানে INDIA জোটের ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ সমাবেশে দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিলেন। তাঁর কথায় — “জ্ঞানেশ কুমারের পর, এবার তোমার পালা।”
Chalo Dilli র্যালি হল ১ নভেম্বর ২০২৬-এ দিল্লিতে INDIA জোটের আয়োজিত একটি পদযাত্রা ও সমাবেশ। এর মূল দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। কারণ হিসেবে বিরোধীরা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision বা SIR-এ বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
সরকার এই দাবি মানেনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা সমাবেশকে বলেছেন “মূর্খ নাটক”। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী এই র্যালির চারটি উদ্দেশ্য — শিখ ভাইদের ক্ষতস্থানে নুন ছড়ানো, দিল্লিতে দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করা, উৎসবের মরসুমে ব্যবসায়ীদের আয় বন্ধ করা, আর দেশের বদনাম করা।
মূল বিষয়গুলো এক নজরে
- রাহুল গান্ধী বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদ থেকে সরবেন এবং জেলে যাবেন, আর এরপর মোদি-শাহর পালা।
- Special Intensive Revision বা SIR-এ ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ ঘিরে এই সমাবেশ হয়েছে।
- বিজেপি পাল্টা মার্চ করেছে ১৯৮৪-র শিখ বিরোধী দাঙ্গার বার্ষিকীতে, ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অঙ্ক হাজার কোটি টাকায়।
এই র্যালিতে আসলে কী হয়েছে
রামলীলা ময়দান দিল্লির কেন্দ্রে একটি বড় খোলা মাঠ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর রাজনৈতিক সমাবেশ — দুটোর জন্যই জায়গাটি পরিচিত।
রবিবার সকাল থেকে INDIA জোটের দলগুলোর কর্মী ও সমর্থকেরা ভিড় করতে থাকেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের বাড়ি থেকে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি খোলা গাড়িতে করে মিন্টো রোড হয়ে ময়দানে পৌঁছন।
কেন এত আয়োজন? কারণ ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের দাবি সরাসরি ভোটাধিকারের প্রশ্নে গিয়ে ঠেকেছে। তাঁদের কথায় — যে নাম তালিকায় নেই, সে ভোট দিতে পারবে না।
তুলনা করে ধরলে বিষয়টা এমন। একটি বড় পরীক্ষায় হাজার পরীক্ষার্থীর নাম ভুল করে বাদ দেওয়া হলে, পরে তালিকা ঠিক হলেও ওই পরীক্ষার্থীরা ফল থেকে বাদ পড়ে যায়। ভোটার তালিকার ক্ষেত্রেও বিরোধীদের অভিযোগ একই।
সময়রেখা: কোন ঘটনা থেকে এখানে
**জুন ২০২৫ — বিহার থেকে SIR শুরু:** ২৪ জুন নির্বাচন কমিশন বিহারে প্রথম SIR ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল মৃত, চলে যাওয়া ও নকল নাম সরানো।
**সেপ্টেম্বর ২০২৫ — বিহারের চূড়ান্ত তালিকা:** ভোটার সংখ্যা ৭.৮৯ কোটি থেকে ৭.৪২ কোটিতে নামে। কমেছে প্রায় ৪৭ লাখ।
**মে ২০২৬ — সুপ্রিম কোর্টের রায়:** শীর্ষ আদালত SIR-এর বৈধতা বহাল রাখে। তবে স্পষ্ট করে — তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানে এই নয় যে তিনি নাগরিক নন।
**অক্টোবর ২০২৬ — সাংকেতিক ইমপিচমেন্ট:** বিরোধীরা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘জন ইমপিচমেন্ট’ বা সাংকেতিক অভিশংসন অনুষ্ঠান করে। বৃষ্টির কারণে সেটি একদিন পিছিয়ে ৩১ অক্টোবরে খড়্গের বাড়িতে হয়।
**১ নভেম্বর ২০২৬ — রামলীলা ময়দান:** Minto Road–কনট প্লেস মোড় থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
কে কী বলছে, আর কে কী পাচ্ছে
| পক্ষ | প্রকাশ্যে দাবি | আসলে যা জিতছে বা হারাচ্ছে |
|---|---|---|
| কংগ্রেস ও INDIA জোট | SIR গণতন্ত্র ধ্বংস করছে, ১৩.২ কোটি ভোটের নাম বেআইনিভাবে মুছেছে | সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা ও নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ; তবে সব অভিযোগের লিখিত প্রমাণ দিতে হবে |
| বিজেপি ও কেন্দ্র | SIR বৈধ ভোটার তালিকা তৈরি করছে, বিরোধীরা দাঙ্গা ও অরাজকতা চাইছে | সরকারের সিদ্ধান্ত রক্ষা; তবে ব্যবসায়ী ক্ষতি ও সময় বাছাই নিয়ে প্রশ্ন এড়াতে হচ্ছে |
| নির্বাচন কমিশন | SIR সংবিধান ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের অধীনে বৈধ, সুপ্রিম কোর্টও বহাল রেখেছে | কাজ চালিয়ে যাওয়ার আইনি ভিত্তি; তবে ট্রাইব্যুনালের বিপুল ব্যাকলগ সামলাতে হবে |
| দিল্লির ব্যবসায়ীরা | উৎসবের মরসুমে সমাবেশ সরানো হোক | সাধারণত উৎসবের আয়; ক্ষতি কাটাতে রাহুল স্থানীয় দোকান থেকে কেনার আবেদন করেছেন |
সত্যিই কত বড় লড়াই, আর কার পকেটে লাগছে
সমাবেশের আকার নিয়ে দুই পক্ষের হিসাবে ফারাক আছে। বিজেপি দাবি করেছে মাঠের ৪০ শতাংশ ফাঁকা ছিল। আয়োজকরা বলছেন, সারা দেশ থেকে মানুষ এসেছেন।
ব্যবসায়িক ক্ষতির অঙ্কটা এখানে বড় সংখ্যা। খড়্গ ও নাড্ডার বক্তব্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক প্রতিবাদে দিল্লির ব্যবসায়ীদের ক্ষতি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, আর এই সমাবেশে ক্ষতি হতে পারে ১০ হাজার কোটির বেশি।
দিল্লির ট্রেডার্স চেম্বার অনুরোধ করেছিল সমাবেশ ১০–১১ নভেম্বরের পরে সরাতে। কারণ ৬ নভেম্বর ধনতেরাস আর ৮ নভেম্বর দিওয়ালি। কিন্তু সমাবেশ হয়নি সরে।
ইমপিচমেন্ট দাবির ছয়টি অভিযোগ
খড়্গ, রাহুল, অখিলেশ ও মমতা — সবার উপস্থিতিতে বিরোধীরা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ তোলেন। মূল অভিযোগগুলো — শাসক BJP-র সঙ্গে মিলে নির্বাচন চুরি করা, SIR-এর মাধ্যমে ১৩.২ কোটি ভোটার মুছে ফেলা, এবং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইশারায় কাজ করা।
রাহুল আরও বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোই দেশকে সঠিক পথে ফেরানোর প্রথম ধাপ। তিনি আরও বলেন — “জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া তোমরা হতো না”।
বিজেপির পাল্টা যুক্তি ভিন্ন। নাড্ডা বলেছেন, ভারত কোনও ‘বনানা রিপাবলিক’ নয় যেখানে অরাজকতা ডেকে ‘রেজিম চেঞ্জ’ করা যাবে।
পরের ধাপ
বার্ষিক বিশেষ সংক্ষিপ্ত পুনর্মূল্যায়ন বা SSR-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে ৪ জানুয়ারি ২০২৭-এ। এর আগেই বাদ পড়া ভোটারদের পুনর্ভুক্তির কাজ শেষ করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে ৩৭ লাখের বেশি আপিল এখনও ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত সময়সীমায় কমিশনকে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত মামলা সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে।
কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগমের ভোট আসছে। বাদ পড়া ভোটাররা সেই ভোটে ভোট দিতে পারবেন কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
লোকে কী জানতে চায়
Chalo Dilli র্যালির মূল দাবি কী?
মূল দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। এর সঙ্গে ছিল দুটি দাবি — EVM-র বদলে কাগজের ব্যালট চালু করা এবং SIR-এ বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের ভোটার তালিকায় দ্রুত ফিরিয়ে আনা। INDIA জোটের সব দল এই দাবিতে একজোট হয়েছিল।
রাহুল গান্ধী কী বলেছেন?
রাহুল গান্ধী বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদ থেকে সরবেন এবং জেলে যাবেন। তিনি আরও বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের পর এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পালা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই কথা তিনি রামলীলা ময়দানের সমাবেশে বলেন।
SIR-এ কতজনের নাম বাদ পড়েছে?
বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী SIR-এ ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বাদ পড়া ব্যক্তিদের সংখ্যা আলাদা করে কর্তৃপক্ষভিত্তিক জানায়নি। কমিশনের বক্তব্য, বাদ পড়ার কারণ মৃত্যু, স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া, নকল নাম এবং বারবার খোঁজ করেও না পাওয়া।


