SIR ভোটার তালিকা

SIR ভোট তালিকা: খরচ কত, আর কেন বিতর্ক?

গত ১ নভেম্বর ২০২৬-এ জনপ্রিয় একটি সংবাদমাধ্যমে লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ পুনর্মূল্যায়ন বা SIR নিয়ে। প্রশ্নটা সরল — যে কাজে ১২ লাখ সরকারি কর্মী মাঠে নামানো হলো এবং ১৩ কোটি নাম তালিকা…

avatar
Written By : Riddhi Datta
Updated Now: November 1, 2026 6:54 PM

গত ১ নভেম্বর ২০২৬-এ জনপ্রিয় একটি সংবাদমাধ্যমে লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ পুনর্মূল্যায়ন বা SIR নিয়ে। প্রশ্নটা সরল — যে কাজে ১২ লাখ সরকারি কর্মী মাঠে নামানো হলো এবং ১৩ কোটি নাম তালিকা থেকে বাদ গেল, তার খরচ কে গোনে?

SIR বা Special Intensive Revision হল নির্বাচন কমিশনের এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে ভোটার তালিকা নতুন করে তৈরি করা হয়। বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম বিলি করেন, তালিকার খসড়া প্রকাশিত হয়, আপত্তির সময় দেওয়া হয়, তারপর চূড়ান্ত তালিকা বেরোয়।

সরকারি হিসেবে এই কাজের আলাদা খরচ নেই। অথচ মাঠের হিসাবে এর ব্যয় হাজার কোটি টাকার। এই ফাঁকটাই আজকের বিতর্কের কেন্দ্র।

মূল বিষয়গুলো এক নজরে

  • নির্বাচন কমিশনের ২০২৬-২৭ সালের বাজেট ৩৮২.২০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২৫.৩৩ শতাংশ বেশি।
  • SIR জুড়ে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
  • পশ্চিমবঙ্গে ৩৮ লাখের বেশি আপিল জমা পড়েছে, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১ লাখের কিছু বেশি।

SIR হলে কী হয় — ধাপে ধাপে

প্রক্রিয়াটা বোঝা দরকার, কারণ খরচের হিসাব এখানেই লুকিয়ে আছে। প্রথমে বুথ লেভেল অফিসার বা BLO ঘরে ঘরে যান এবং বিদ্যমান ভোটারকে এনুমারেশন ফর্ম দেন। ভোটার সেটি পূরণ করে নথি জমা দেন।

এরপর কমিশন খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। এই খসড়ায় যাঁদের নাম নেই, তাঁরা আপত্তি জানাতে পারেন। এক মাসের মতো সময় মেলে দাবি-আপত্তির। সব মিটে গেলে চূড়ান্ত তালিকা বেরোয়।

তুলনায় ধরলে বিষয়টা এমন। ধরুন একটি বড় শহরের ভোটার তালিকা একবার নতুন করে হাতে লিখে তৈরি করতে হবে — প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে, প্রতিটি নাম যাচাই করে, প্রতিটি আপত্তি শুনে। লোকবল, ছাপা, যাতায়াত, শুনানির ঘর — সব খরচ।

কিন্তু সরকারি বাজেটে এই খরচ দেখানো হয় না। কারণ কমিশনের নিজস্ব বাজেট আলাদা, আর মাঠের কর্মীদের অনেকেই অন্য দফতরের কর্মী।

সময়রেখা: জুন ২০২৫ থেকে নভেম্বর ২০২৬

**জুন ২০২৫ — বিহার থেকে শুরু:** নির্বাচন কমিশন ২৪ জুন বিহারে SIR ঘোষণা করে। লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকা থেকে মৃত, চলে যাওয়া এবং নকল নাম সরানো।

**আগস্ট ২০২৫ — সম্মানী দ্বিগুণ:** কমিশন বুথ লেভেল অফিসারদের বার্ষিক সম্মানী ৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করে। SIR-এর জন্য অতিরিক্ত ৬ হাজার টাকা বিশেষ ইনসেনটিভ ঘোষণা করা হয়।

**সেপ্টেম্বর ২০২৫ — বিহারে চূড়ান্ত তালিকা:** বিহারের ভোটার সংখ্যা ৭.৮৯ কোটি থেকে ৭.৪২ কোটিতে নেমে আসে। কমেছে প্রায় ৪৭ লাখ, অর্থাৎ ৬ শতাংশ।

**অক্টোবর ২০২৫ — দ্বিতীয় পর্যায়:** নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নতুন করে SIR শুরু হয়। এর মধ্যে আছে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশ।

**মে ২০২৬ — সুপ্রিম কোর্টের রায়:** শীর্ষ আদালত SIR-এর বৈধতা বহাল রাখে। তবে স্পষ্ট করে, তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি নাগরিক নন।

**নভেম্বর ২০২৬ — খরচের প্রশ্ন:** নাম বাদ পড়া নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদের মধ্যে খরচের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কে কী বলছে, আর কে কী পাচ্ছে

পক্ষ প্রকাশ্যে যাদের দাবি আসলে যা জিতছে বা হারাচ্ছে
নির্বাচন কমিশন SIR ভোটার তালিকা নির্ভুল করে, মৃত ও নকল নাম সরায়, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা হয়; তবে অভিযোগের মুখে ব্যাখ্যা দিতে হয় এবং আদালতে মামলা সামলাতে হয়
আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা SIR বৈধ ভোটারদের বাদ দিচ্ছে এবং বিপুল সরকারি অর্থ নষ্ট করছে নাম বাদ পড়া মানুষদের পুনর্ভুক্তি; তবে নিজেদের দাবির পক্ষে কমিশনের আলাদা খরচের হিসাব নেই
সরকারি মাঠকর্মীরা বাড়তি কাজের বাড়তি পারিশ্রমিক দরকার সম্মানী দ্বিগুণ হয়েছে, তবে সময়মতো না পাওয়ার অভিযোগও আছে
সাধারণ ভোটার নিজের নাম যেন না কাটে, এবং বাদ পড়লে দ্রুত ফিরে আসে তালিকায় নাম থাকলে ভোটাধিকার; বাদ পড়লে ভোট, আটকে যেতে পারে রেশন-সুবিধাও

যেখানে খরচটা সত্যিই ধরা পড়ে

প্রশ্নটা এখানেই আসে। কমিশনের মোট বাজেট ৩৮২.২০ কোটি টাকা। আগের বছরের বাজেট ছিল ৩০৪.৯৮ কোটি টাকা — অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ২৫.৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৬৭.৯৯ কোটি টাকা “নির্বাচন” খাতে নির্ধারিত।

অথচ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর হিসাবে, ১২ লাখ মাঠকর্মীকে নিয়ে এই চক্রাকার কাজের ব্যয় “হাজার কোটি টাকা” ছাড়িয়ে যায় — প্রতি চক্রে। অর্থাৎ কমিশনের পুরো বার্ষিক বাজেটও এক চক্রের ব্যয়ের সামান্য অংশ।

এই তালিকাভুক্ত বিরোধটা সহজে মেটে না। কারণ কমিশনের বাজেট শুধু তার নিজের দফতরের খরচ দেখায়। মাঠে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের বেতন আসে স্কুল, ব্লক ও জেলা প্রশাসনের নিজস্ব বাজেট থেকে। সেই খরচ যোগ করলে আসল সংখ্যাটা অনেক বড় হবে।

তেলেঙ্গানার উদাহরণটি দেখা যাক। সেখানে রাজ্য প্রশাসনের হিসাবে SIR-এর খরচ ২০০ কোটি টাকার বেশি হবে। এটা কেন্দ্রীয় কমিশনের খাতায় নেই — কারণ এই খরচ রাজ্য সরকারের ঘাড়ে।

মাঠকর্মীদের জন্য আরও একটা সমস্যা এখানেই। পশ্চিমবঙ্গে কমিশন রাজ্য সরকারকে অভিযুক্ত করেছে বাড়ানো সম্মানী না দেওয়ার জন্য। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী এটা “খুবই অদ্ভুত” — বাজেটে টাকা আছে, কিন্তু মাঠে পৌঁছচ্ছে না।

স্ক্রিনশট: The Wire-এর ১ নভেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন, যেখানে ECI-র ২০২৬-২৭ সালের বাজেট ৩৮২.২০ কোটি টাকা এবং ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার তথ্য দেওয়া আছে।
স্ক্রিনশট: The Wire-এর ১ নভেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন, যেখানে ECI-র ২০২৬-২৭ সালের বাজেট ৩৮২.২০ কোটি টাকা এবং ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার তথ্য দেওয়া আছে।

প্রশ্নটা আসলে কার

SIR বন্ধ হচ্ছে না। তৃতীয় পর্যায়ে ১৬টি রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কাজ চলছে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিত সময়সীমা সামনে। কমিশনকে চার সপ্তাহের মধ্যে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বাদ পড়া মামলা সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে বলেছে আদালত। এই কর্তৃপক্ষকে পরবর্তী নির্বাচনের আগে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে ৩৭ লাখের বেশি আপিল এখনও SIR ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে। নিষ্পত্তির হার ছয় মাসে মাত্র ৩ শতাংশ। ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরাও দীর্ঘ যাতায়াতের কারণ দেখিয়ে ছাড় নিতে চাইছেন।

আরও একটা সময়সীমা আছে। বার্ষিক বিশেষ সংক্ষিপ্ত পুনর্মূল্যায়ন বা SSR-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে ৪ জানুয়ারি ২০২৭-এ। তার আগে বাদ পড়া ভোটারদের পুনর্ভুক্তির কাজ শেষ করতে হবে।

লোকে কী জানতে চায়

SIR-এর খরচ কত?

কমিশনের নিজস্ব ঘোষণায় আলাদা কোনো SIR খরচ প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কমিশনের মোট বাজেট ৩৮২.২০ কোটি টাকা। তবে মাঠের কর্মী, ছাপা ও শুনানির ব্যয় ধরলে আসল খরচ অনেক বেশি বলে বিরোধীরা দাবি করছেন।

SIR-এ কতজনের নাম বাদ পড়েছে?

দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ কোটি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে বিহারে প্রায় ৪৭ লাখ এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯১ লাখ। মহারাষ্ট্রের খসড়া তালিকায় ২ কোটি ভোটার কমেছে।

নাম বাদ পড়লে কী করবেন?

ফর্ম ৬ দিয়ে আবার নাম যোগের আবেদন করা যায়। ECI-র ওয়েবসাইট ও জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে চেক করা যায় নাম আছে কি না। আপিল করা যায় ট্রাইব্যুনালে।