এবিএস না সিবিএস— আপনার বাইকের জন্য কোনটি সেরা? নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও ব্যয়ের নিরিখে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ

মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ব্রেকিং সিস্টেম একটি বাইকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য। দ্রুত গতিতে চলা একটি বাইককে নিরাপদে থামানোর জন্য চালকের দক্ষতা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন আধুনিক এবং নির্ভরযোগ্য ব্রেকিং প্রযুক্তির।…

Tamal Kundu

 

মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ব্রেকিং সিস্টেম একটি বাইকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য। দ্রুত গতিতে চলা একটি বাইককে নিরাপদে থামানোর জন্য চালকের দক্ষতা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন আধুনিক এবং নির্ভরযোগ্য ব্রেকিং প্রযুক্তির। বর্তমানে বাজারে মূলত দুটি প্রধান ব্রেকিং সিস্টেম নিয়ে আলোচনা হয়: এবিএস (ABS – Anti-lock Braking System) এবং সিবিএস (CBS – Combined Braking System)। এই দুটি প্রযুক্তির মধ্যে কোনটি আপনার বাইকের জন্য সেরা, তা নির্ভর করে আপনার বাইকের ধরন, আপনার চালানোর অভ্যাস এবং অবশ্যই আপনার বাজেটের ওপর। তবে, একটি বিষয় পরিষ্কার: এবিএস প্রযুক্তি সিবিএস-এর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত এবং জরুরি পরিস্থিতিতে এটি চালককে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবিএস-যুক্ত মোটরসাইকেলগুলোতে মারাত্মক দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখা যায়।

বাইকের ব্রেকিং সিস্টেমের এই বিবর্তন কেবল প্রযুক্তির উন্নতি নয়, এটি বিশ্বজুড়ে সড়ক নিরাপত্তার প্রতি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতিফলন। একসময় বাইকে কেবল ড্রাম ব্রেক বা সাধারণ ডিস্ক ব্রেক ব্যবহৃত হতো, যেখানে জরুরি ব্রেকিং-এর সময় চাকা পুরোপুরি থেমে যাওয়ার বা ‘লক’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। এই ঝুঁকি কমাতে প্রথমে সিবিএস এবং পরে এবিএস-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আগমন ঘটে। সিবিএস ব্রেকিং ফোর্সকে উভয় চাকায় ভাগ করে দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে, অন্যদিকে এবিএস চাকা লক হওয়া পুরোপুরি প্রতিরোধ করে, যা চালককে ব্রেকিং-এর সময়ও বাইকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই নিবন্ধে আমরা এই দুটি সিস্টেমের কার্যপ্রণালী, সুবিধা-অসুবিধা, এবং বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে আপনার জন্য কোনটি সেরা, তার একটি সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরব।

এবিএস (ABS): আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও কার্যপ্রণালী

এবিএস বা অ্যান্টি-লক ব্রেকিং সিস্টেম হলো একটি অত্যাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি, যা মূলত চাকা লক হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। জরুরি পরিস্থিতিতে যখন চালক খুব জোরে ব্রেক চাপেন, তখন সাধারণ ব্রেকিং সিস্টেমে চাকা পুরোপুরি থেমে যায় বা ‘লক’ হয়ে যায়। এর ফলে বাইকটি রাস্তায় স্কিড করে বা পিছলে যায়, এবং চালক বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এবিএস এই পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করে। এই প্রযুক্তি বাইকের চাকা এবং রাস্তার মধ্যে সর্বোত্তম ঘর্ষণ (Traction) বজায় রেখে ব্রেকিং-এর সময় বাইকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

এবিএস-এর প্রযুক্তিগত কাঠামো ও জটিলতা

এবিএস সিস্টেমটি চারটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত, যা একটি জটিল ইলেকট্রনিক সার্কিটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়:
1.হুইল স্পিড সেন্সর (Wheel Speed Sensors): প্রতিটি চাকায় এই সেন্সরগুলি লাগানো থাকে, যা প্রতি মুহূর্তে চাকার ঘূর্ণন গতি পরিমাপ করে এবং ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট (ECU)-কে তথ্য পাঠায়। এই সেন্সরগুলো ম্যাগনেটিক বা হল-ইফেক্ট টাইপের হতে পারে এবং এরা প্রতি সেকেন্ডে শত শতবার চাকার গতি পর্যবেক্ষণ করে।
2.ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট (ECU): এটি এবিএস-এর মস্তিষ্ক। সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইসিইউ নির্ধারণ করে যে কোনো চাকা লক হওয়ার উপক্রম হচ্ছে কিনা। এটি চাকার গতি, ব্রেকিং-এর তীব্রতা এবং বাইকের গতিবেগের মধ্যে একটি গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। যখন ইসিইউ দেখে যে একটি চাকা অন্যটির তুলনায় দ্রুত গতি হারাচ্ছে, তখন এটি বুঝে নেয় যে চাকাটি লক হতে চলেছে।
3.হাইড্রোলিক মডুলেটর (Hydraulic Modulator): এটি ব্রেক লাইনে থাকা হাইড্রোলিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ইসিইউ-এর নির্দেশ অনুযায়ী এটি ব্রেক ফ্লুইডের চাপ দ্রুত বাড়ায়, কমায় বা ধরে রাখে। এই মডুলেটরটিই এবিএস-এর মূল কার্যকরী অংশ, যা ব্রেকিং ফোর্সকে সেকেন্ডে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ বার পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারে।
4.ব্রেক পাম্প (Brake Pump): এটি হাইড্রোলিক মডুলেটরের মাধ্যমে ব্রেক লাইনে চাপ প্রয়োগ করে। যখন ইসিইউ কোনো চাকার গতি হঠাৎ কমে যেতে দেখে (যা লক হওয়ার লক্ষণ), তখন এটি হাইড্রোলিক মডুলেটরকে নির্দেশ দেয়। মডুলেটর তখন সেকেন্ডে কয়েকবার ব্রেক চাপকে দ্রুত ছেড়ে দেয় এবং আবার প্রয়োগ করে (Pulse Braking)। এই দ্রুত পালসিং-এর ফলে চাকাটি লক হয় না, কিন্তু ব্রেকিং ফোর্স বজায় থাকে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, চালক ব্রেকিং-এর সময়ও বাইকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন এবং প্রয়োজনমতো দিক পরিবর্তন করতে পারেন। এই পালসিং-এর কারণে চালক ব্রেক লিভারে একটি কম্পন অনুভব করতে পারেন, যা এবিএস সক্রিয় হওয়ার একটি স্বাভাবিক লক্ষণ।

এবিএস-এর প্রকারভেদ: সিঙ্গেল চ্যানেল বনাম ডুয়াল চ্যানেল

এবিএস মূলত দুই ধরনের হয়, যা বাইকের নিরাপত্তা স্তরে ভিন্নতা আনে:

সিঙ্গেল চ্যানেল এবিএস (Single-Channel ABS): এই সিস্টেমে শুধুমাত্র সামনের চাকায় এবিএস প্রযুক্তি কাজ করে। যেহেতু বাইকের ব্রেকিং-এর প্রায় ৭০% চাপ সামনের চাকার ওপর পড়ে, তাই এটি একটি কার্যকর এবং সাশ্রয়ী সমাধান। তবে পিছনের চাকা লক হওয়ার ঝুঁকি এতে থেকেই যায়, বিশেষ করে পিচ্ছিল রাস্তায়।
ডুয়াল চ্যানেল এবিএস (Dual-Channel ABS): এই সিস্টেমে বাইকের সামনের এবং পিছনের উভয় চাকায় এবিএস প্রযুক্তি কাজ করে। এটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং উচ্চ সিসি ও পারফরম্যান্স বাইকগুলোর জন্য এটি অপরিহার্য। এটিই ব্রেকিং-এর সবচেয়ে নিরাপদ এবং উন্নত রূপ।

নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার পরিসংখ্যান

এবিএস প্রযুক্তি যে কেবল একটি বিলাসবহুল বৈশিষ্ট্য নয়, বরং একটি জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, তা আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত। ইন্সুরেন্স ইনস্টিটিউট ফর হাইওয়ে সেফটি (IIHS)-এর একটি বৃহৎ গবেষণা অনুযায়ী, এবিএস-যুক্ত মোটরসাইকেলগুলো এবিএস-বিহীন বাইকের তুলনায় মারাত্মক দুর্ঘটনায় ২২ শতাংশ কম জড়িত হয়।

অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, এবিএস-যুক্ত মোটরসাইকেলগুলোর সামগ্রিক দুর্ঘটনার হার প্রায় ৩০ শতাংশ কম (ScienceDirect)। বিশেষ করে ভেজা রাস্তা, পিচ্ছিল পৃষ্ঠ বা জরুরি ব্রেকিং-এর মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এবিএস তার কার্যকারিতা প্রমাণ করে। এবিএস থাকার কারণে চালক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জোরে ব্রেক করতে পারেন, যা ব্রেকিং দূরত্ব কমিয়ে আনে এবং সংঘর্ষ এড়াতে সাহায্য করে।

সিবিএস (CBS): ভারসাম্যপূর্ণ ব্রেকিং-এর সহজ সমাধান ও তার বিশ্লেষণ

সিবিএস বা কম্বাইন্ড ব্রেকিং সিস্টেম, যা লিঙ্কড ব্রেক নামেও পরিচিত, হলো একটি অপেক্ষাকৃত সরল প্রযুক্তি। এই সিস্টেমের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্রেকিং-এর সময় বাইকের ভারসাম্য বজায় রাখা। এটি সাধারণত কম সিসি-র কমিউটার বাইক এবং স্কুটারে বেশি দেখা যায়।

সিবিএস-এর কার্যপ্রণালী ও যান্ত্রিক লিঙ্কেজ

সিবিএস সিস্টেমে, যখন চালক একটি ব্রেক লিভার (সাধারণত পিছনের ব্রেক) প্রয়োগ করেন, তখন একটি যান্ত্রিক বা হাইড্রোলিক লিঙ্কেজের মাধ্যমে ব্রেকিং ফোর্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামনের এবং পিছনের উভয় চাকায় ভাগ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যখন পিছনের ব্রেক প্যাডেল চাপবেন, তখন ব্রেকিং ফোর্সের একটি অংশ (যেমন ৩০% থেকে ৪০%) স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামনের চাকায়ও প্রয়োগ হবে। এই প্রক্রিয়াটি কোনো ইলেকট্রনিক সেন্সর বা ইসিইউ ছাড়াই সম্পন্ন হয়, যা এর সরলতা এবং কম খরচের প্রধান কারণ।
এই সিস্টেমের সুবিধা হলো, এটি অনভিজ্ঞ চালকদের জন্য খুবই সহায়ক। অনেক নতুন চালক জরুরি পরিস্থিতিতে কেবল পিছনের ব্রেক ব্যবহার করেন, যা পিছনের চাকা লক করে স্কিডিং-এর ঝুঁকি বাড়ায়। আবার অনেকে কেবল সামনের ব্রেক ব্যবহার করেন, যা বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণ হতে পারে। সিবিএস এই ভুলগুলি এড়িয়ে ব্রেকিং ফোর্সকে উভয় চাকায় সমানভাবে বিতরণ করে, যার ফলে বাইকটি দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলভাবে থামে।

সিবিএস-এর সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা

সুবিধা:

সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য: এবিএস-এর তুলনায় সিবিএস প্রযুক্তি অনেক কম ব্যয়বহুল, তাই বাইকের দাম কম থাকে। এটি কম বাজেটের বাইক এবং স্কুটারের জন্য একটি আদর্শ সমাধান।
ভারসাম্যপূর্ণ ব্রেকিং: এটি ব্রেকিং-এর সময় বাইকের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, বিশেষ করে নতুন চালকদের জন্য, যারা ব্রেকিং ফোর্সের সঠিক অনুপাত বুঝতে পারেন না।
ব্যবহারের সহজতা: চালককে আলাদাভাবে দুটি ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে বেশি ভাবতে হয় না।

সীমাবদ্ধতা:

লক-আপ প্রতিরোধ করে না: সিবিএস চাকা লক হওয়া প্রতিরোধ করতে পারে না। যদি চালক খুব জোরে ব্রেক চাপেন, তবে চাকা লক হয়ে স্কিড করতে পারে। এটি সিবিএস-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা: অভিজ্ঞ চালকরা প্রায়শই স্বাধীনভাবে সামনের এবং পিছনের ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করেন। সিবিএস সেই স্বাধীনতাকে সীমিত করে। উদাহরণস্বরূপ, অফ-রোডে বা পিচ্ছিল রাস্তায় অভিজ্ঞ চালকরা পিছনের চাকা সামান্য লক করে বাইক স্লাইড করতে পারেন, যা সিবিএস সিস্টেমে কঠিন।
উচ্চ গতিতে অকার্যকর: উচ্চ গতিতে বা চরম পরিস্থিতিতে সিবিএস এবিএস-এর মতো নিরাপত্তা দিতে পারে না।

এবিএস বনাম সিবিএস: মূল পার্থক্য ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ

এবিএস এবং সিবিএস উভয়ই নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা হলেও, তাদের প্রযুক্তিগত ভিত্তি এবং কার্যকারিতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিচের সারণীতে তাদের মূল পার্থক্যগুলি তুলে ধরা হলো:
বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র
এবিএস (Anti-lock Braking System)
সিবিএস (Combined Braking System)
কার্যপ্রণালী
ইলেকট্রনিক সেন্সর ও ইসিইউ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পালস ব্রেকিং-এর মাধ্যমে চাকা লক হওয়া প্রতিরোধ করে।
যান্ত্রিক/হাইড্রোলিক লিঙ্কেজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একটি ব্রেক চাপলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য ব্রেকও প্রয়োগ হয়।
চাকা লক-আপ
সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করে। ব্রেকিং-এর সময়ও চাকার ঘূর্ণন বজায় থাকে।
প্রতিরোধ করে না। অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে চাকা লক হতে পারে।
নিরাপত্তা স্তর
সর্বোচ্চ। জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
মধ্যম। ভারসাম্য বজায় রাখে, কিন্তু স্কিডিং প্রতিরোধে সীমিত।
খরচ
তুলনামূলকভাবে বেশি। বাইকের দাম বাড়ায়।
তুলনামূলকভাবে কম। সাশ্রয়ী বাইকের জন্য উপযুক্ত।
উপযুক্ততা
উচ্চ সিসি, স্পোর্টস বাইক, হাইওয়ে রাইডিং, প্রতিকূল রাস্তা।
কম সিসি, কমিউটার বাইক, স্কুটার, নতুন চালক।
ব্রেকিং দূরত্ব
ভেজা বা পিচ্ছিল রাস্তায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
সাধারণ ব্রেকের চেয়ে ভালো, তবে এবিএস-এর চেয়ে বেশি।
চালকের নিয়ন্ত্রণ
সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে, দিক পরিবর্তন করা সম্ভব।
চালকের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ সীমিত।

আপনার বাইকের জন্য কোনটি সেরা? সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশিকা

এবিএস এবং সিবিএস-এর মধ্যে কোনটি আপনার জন্য সেরা, তা নির্ধারণ করার জন্য আপনাকে আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজন, বাইকের ধরন এবং বাজেটের মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে।

১. বাইকের সিসি এবং গতি:

আপনার বাইকের ইঞ্জিন ক্ষমতা যদি ১৫০ সিসি বা তার বেশি হয় এবং আপনি যদি নিয়মিত হাইওয়েতে বা উচ্চ গতিতে বাইক চালান, তবে এবিএস আপনার জন্য অপরিহার্য। উচ্চ গতিতে ব্রেকিং-এর সময় সামান্যতম চাকা লক-আপও মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এবিএস এই ঝুঁকিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। অন্যদিকে, যদি আপনার বাইকটি ১২৫ সিসি বা তার কম হয় এবং আপনি কেবল শহরের ভেতরে কম গতিতে যাতায়াত করেন, তবে সিবিএস একটি কার্যকর এবং যথেষ্ট নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।

২. চালকের অভিজ্ঞতা এবং রাইডিং স্টাইল:

আপনি যদি বাইক চালানোয় নতুন হন বা ব্রেকিং-এর সময় সঠিক ব্রেক প্রয়োগের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী না হন, তবে সিবিএস আপনার জন্য একটি ভালো শুরু হতে পারে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেকিং ফোর্সকে ভাগ করে দেওয়ায় ভুল ব্রেকিং-এর ঝুঁকি কমে। তবে, যদি আপনি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা চান এবং আপনার বাইকটি দ্রুতগতির হয়, তবে এবিএস-ই সেরা পছন্দ। এবিএস অভিজ্ঞ চালকদেরও জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল করার সুযোগ দেয় না। স্পোর্টস বাইক বা অ্যাডভেঞ্চার বাইকের মতো পারফরম্যান্স-ভিত্তিক বাইকগুলোর জন্য ডুয়াল-চ্যানেল এবিএস অপরিহার্য।

৩. বাজেট এবং রক্ষণাবেক্ষণ:

এবিএস-যুক্ত বাইকের দাম সিবিএস-যুক্ত বাইকের চেয়ে সাধারণত ৪০,০০০ থেকে ৬৫,০০০ টাকা (প্রায় $400-$600) পর্যন্ত বেশি হয়। এই অতিরিক্ত খরচটি অনেকের কাছে একটি বাধা হতে পারে। তবে, নিরাপত্তার জন্য এই অতিরিক্ত বিনিয়োগকে একটি জীবন রক্ষাকারী বীমা হিসেবে দেখা উচিত। এছাড়াও, এবিএস একটি জটিল ইলেকট্রনিক সিস্টেম হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং মেরামতের জটিলতা সিবিএস-এর তুলনায় বেশি। যদি আপনার বাজেট সীমিত হয় এবং আপনি সহজ রক্ষণাবেক্ষণ চান, তবে সিবিএস একটি ব্যবহারিক সমাধান।

৪. রাস্তার পরিস্থিতি:

আপনি যদি নিয়মিত ভেজা, পিচ্ছিল, বা খারাপ রাস্তায় বাইক চালান, তবে এবিএস-এর কোনো বিকল্প নেই। এই ধরনের পৃষ্ঠে এবিএস চাকা লক হওয়া প্রতিরোধ করে এবং বাইকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, যা সিবিএস বা সাধারণ ব্রেক দ্বারা সম্ভব নয়। ভেজা রাস্তায় এবিএস-এর ব্রেকিং দূরত্ব সিবিএস-এর তুলনায় অনেক কম হয়, যা সংঘর্ষ এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্রেকিং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা

মোটরসাইকেলের ব্রেকিং প্রযুক্তির বিবর্তন কেবল এবিএস বা সিবিএস-এ থেমে নেই। বিশ্বজুড়ে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য কঠোর নিয়মকানুন প্রণয়ন করছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধ্যবাধকতা:

অনেক দেশেই, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতে, নির্দিষ্ট সিসি-এর ওপরের বাইকগুলোতে এবিএস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয় (MoRTH) ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে বিক্রি হওয়া সমস্ত নতুন দ্বি-চাকার যানে, ইঞ্জিন ক্ষমতা নির্বিশেষে, অ্যান্টি-লক ব্রেকিং সিস্টেম (ABS) থাকা বাধ্যতামূলক হবে। এই ধরনের কঠোর নিয়ম বিশ্বজুড়ে এবিএস-এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বাধ্যবাধকতা মূলত এবিএস-এর প্রমাণিত নিরাপত্তা কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

আধুনিক এবিএস প্রযুক্তি:

বর্তমানে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বাইকগুলোতে আরও উন্নত প্রযুক্তি দেখা যায়, যেমন:
কর্নারিং এবিএস (Cornering ABS): এই সিস্টেমটি বাইকের লীন অ্যাঙ্গেল (Lean Angle) পরিমাপ করার জন্য একটি ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (IMU) ব্যবহার করে। এর ফলে বাইকটি বাঁক নেওয়ার সময়ও এবিএস কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, যা সাধারণ এবিএস-এর চেয়েও বেশি নিরাপত্তা দেয়। এই প্রযুক্তিটি মূলত রেসিং এবং অ্যাডভেঞ্চার বাইকগুলোতে ব্যবহৃত হয়।
কম্বাইন্ড এবিএস (ABS + CBS): কিছু বাইকে এবিএস এবং সিবিএস-এর সমন্বয় দেখা যায়। গবেষণা অনুযায়ী, যে বাইকগুলোতে এবিএস এবং সিবিএস উভয়ই রয়েছে, সেগুলোতে দুর্ঘটনার হার প্রায় ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় (Axiom Forensic)। এই সমন্বিত ব্যবস্থাটি ব্রেকিং-এর ভারসাম্য এবং চাকা লক-আপ প্রতিরোধ—উভয় সুবিধা প্রদান করে।

নিরাপত্তার অর্থনৈতিক প্রভাব:

এবিএস প্রযুক্তির কারণে দুর্ঘটনার হার কমে যাওয়ায় এর একটি অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। কম দুর্ঘটনা মানে কম চিকিৎসা খরচ, কম বীমা দাবি এবং রাস্তায় কম ট্র্যাফিক জ্যাম। গ্লোবাল মার্কেট অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, মোটরসাইকেল এবিএস-এর বাজার ২০২৪ সালে প্রায় ২২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা প্রায় ১৩৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে (GlobeNewswire)। এই বিপুল বাজার বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির চাহিদা এবং গুরুত্ব কতটা বাড়ছে। এই অর্থনৈতিক প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে এবিএস কেবল একটি ঐচ্ছিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এটি দ্রুত একটি শিল্প মানদণ্ডে পরিণত হচ্ছে।

এবিএস এবং সিবিএস—উভয় ব্রেকিং সিস্টেমই সাধারণ ব্রেকের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। তবে, যদি প্রশ্ন আসে “সেরা কোনটি?”, তবে উত্তরটি স্পষ্ট: এবিএস (Anti-lock Braking System)। এবিএস প্রযুক্তি জরুরি পরিস্থিতিতে চাকা লক হওয়া প্রতিরোধ করে, চালককে বাইকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে এটি মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, সিবিএস একটি সাশ্রয়ী, ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প, যা নতুন চালক এবং কম সিসি-র বাইকের জন্য উপযুক্ত। আপনার বাইক নির্বাচন করার সময়, যদি আপনার বাজেট অনুমতি দেয়, তবে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে ডুয়াল-চ্যানেল এবিএস-যুক্ত বাইকটিকেই বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মনে রাখবেন, রাস্তায় আপনার নিরাপত্তা অমূল্য, এবং একটি উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম সেই নিরাপত্তার প্রথম এবং প্রধান ভিত্তি।
About Author
Tamal Kundu

তমাল কুন্ডু একজন অভিজ্ঞ অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার, যিনি অটোমোটিভ শিল্পের নতুন প্রযুক্তি ও প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। তাঁর গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং শিল্পের অন্তর্দৃষ্টি তাঁকে অটোমোবাইল সংক্রান্ত বিষয়ে একজন মূল্যবান সংবাদদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নিয়মিতভাবে গাড়ির নতুন মডেল, উদীয়মান প্রযুক্তি, এবং শিল্পের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তথ্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রদান করে থাকেন, যা পাঠকদের অটোমোটিভ জগতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত রাখে।

আরও পড়ুন