Amir Hamza Attack And Lashkar Internal Power Struggle: একটু ভাবুন তো, যে সংগঠন গত তিন দশক ধরে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সবচেয়ে ভরসাযোগ্য অস্ত্র, যে সংগঠনের হাতেই ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার মতো নৃশংসতার দায়, সেই সংগঠনের অন্যতম স্থপতিকে যখন নিজের দেশের মাটিতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয় — তখন সেটা কি শুধুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি এটা সেই সংগঠনের ভিতরকার পচনেরই বহিঃপ্রকাশ?
বিষয়টা হল, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, লাহোরের পিকো রোডে যখন দু’জন মোটরসাইকেল আরোহী অজ্ঞাত বন্দুকধারী লস্কর-ই-তৈবা (Lashkar-e-Taiba) বা লেট-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আমির হামজার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়, তখন আপাতদৃষ্টিতে এটা আরও একটা খবর — পাকিস্তানে বেনামী বন্দুকধারীদের হাতে এক জঙ্গি নেতার মৃত্যুপ্রায় অবস্থা। কিন্তু সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই ঘটনা শুধু একটা খবর নয়। এটা সেই জমাট বাঁধা অন্ধকারের উপর পড়া একটা তীব্র আলোর রেখা, যা প্রকাশ করছে লস্করের ভিতরে বয়ে চলা এক ভয়াবহ ঝড়ের পূর্বাভাস। আর এই ঝড়ের সবচেয়ে বড় আঁচ এসে লাগবে ভারতের গায়ে।
কে এই আমির হামজা? শুধু একটা নাম নয়, লস্করের ‘জীবন্ত ইতিহাস’
সত্যি বলতে, আমির হামজা কোনো সাধারণ সন্ত্রাসবাদী নন। লাহোরের কাছে গুজরানওয়ালার এক মাদ্রাসার ছাত্র থেকে উঠে আসা এই ৬৭ বছর বয়সী ব্যক্তি হলেন লস্করের আদি পুরুষদের একজন, সংগঠনটির ‘জীবন্ত ইতিহাস’ ও আদর্শগত স্থপতি। ১৯৮৫ সালে, লস্কর-ই-তৈবা গঠিত হওয়ারও অনেক আগে, জাকি-উর-রহমান লাখভি তাঁকে পাঞ্জাবের এক মাদ্রাসা থেকে তুলে আনেন এবং হাফিজ সইদের বাসভবনে নিয়ে যান। এই বৈঠকের সূত্র ধরেই গড়ে ওঠে লস্করের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো — মারকাজ দাওয়া-আল-ইরশাদ (Markaz Da’wa-al-Irshad)।
মজার ব্যাপার হল, হামজা কখনো রণাঙ্গনের সৈনিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন কলমের সৈনিক, অগ্নিঝরা বক্তা এবং প্রচারক। মারকাজ-এর প্রকাশনা বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি সম্পাদনা করতেন ‘মুজাল্লাহ আদ-দাওয়াহ’ এবং ‘আল জারার’ পত্রিকা। এই দুই মুখপত্রের উগ্র ধর্মীয় প্রচার এবং জিহাদি আহ্বান মাত্র তিন বছরেরও কম সময়ে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তাঁর অবস্থান ছিল প্রতিটি পাকিস্তানি নাগরিককে ‘প্রতীকী প্রতিরক্ষামন্ত্রী’ হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, “তাদের আত্মরক্ষার সম্মিলিত মুষ্টি যখন সন্ত্রাসবাদীদের উপর আছড়ে পড়বে, তখন আমরা মোদীকে বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখব।” অর্থাৎ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রকাশ্য ঘৃণা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ‘ইসলামের সেনা’ হিসেবে জাহির করাই ছিল তাঁর আজীবনের কাজ।
শুধু কথা নয়, কাজেও তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নে সালাফি গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে তিনি গিয়েছিলেন, পরে ইরানে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে সুন্নি প্রতিরোধ জোরদার করতেও ভূমিকা রেখেছিলেন। আফগান জিহাদের মূল কারিগরদের একজন হিসেবে তিনি আদি তালিবান ও মুজাহিদিন নেতৃত্বের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ২০০৫ সালে ব্যাঙ্গালোরের ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থা (Indian Institute of Science) বা আইআইএসসি-তে হামলার পেছনেও তাঁর মদত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এত কিছুর পরেও বোঝাই যাচ্ছে, আমির হামজাকে হারানো মানে লস্করের কাছে শুধু একজন নেতাকে হারানো নয়, বরং গোটা সংগঠনের আদর্শিক কম্পাস ও ইতিহাসের ধারককে হারানো।
গুলি কি শুধুই অন্তর্দ্বন্দ্ব? নাকি এর পেছনে আছে বড় কোনো খেলা?
এখন প্রশ্ন হল, কে বা কারা হামলা চালাল? পাঞ্জাব পুলিশ অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে জানিয়েছে যে মামলাটি ‘সিলগালা’ করে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। পাকিস্তানে যখনই কোনো স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্ত গোয়েন্দাদের হাতে চলে যায়, তখনই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
সহজ ভাষায় বললে, এই ঘটনা কোনো আকস্মিক নয়। গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের মাটিতে ভারত-বিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির একের পর এক শীর্ষ নেতা রহস্যজনকভাবে খুন হয়েছেন। জইশ-ই-মহম্মদের (Jaish-e-Mohammed) পাঠানকোট হামলার মূল পরিকল্পনাকারী শহিদ লতিফ ২০২৩ সালে শিয়ালকোটে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। লস্করেরই শীর্ষ অর্থসংগ্রাহক চৌধুরী বিলাল আরিফ সালাফি ২০২৬ সালের মার্চে ইদের নামাজের পরপরই লস্করের মুরিদকে সদর দপ্তরের ভিতরেই গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন। সালাফি খুনের ঘটনায় যে বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তা হল, এই হামলা চালিয়েছিলেন লস্করেরই এক প্রবীণ সদস্য গাজি উবায়দুল্লাহ খান এবং তাঁর স্ত্রী — প্রতিশোধ হিসেবে, কারণ সালাফি বছর চারেক আগে খানের জামাতাকে খুন করেও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।
একটা কথা বলি, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং সেনাবাহিনী এই গোষ্ঠীগুলিকে নিজেদের প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে। কিন্তু যখন এদেরকে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) বা বেলুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তখন গোষ্ঠীগুলির ভিতরে চরম অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। অনেক সদস্যের বক্তব্য, “আমরা ভারতের বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছিলাম, চিন ও আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে আসিনি।” আইএসআই যখন লস্কর ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স (ISKP)-এর মতো আদর্শগত শত্রুদেরও জোর করে জোট বাঁধাচ্ছে বেলুচ বিদ্রোহ দমনের জন্য, তখন ভিতরকার এই ক্ষোভ আরও বাড়ছে।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই আমির হামজার উপর দ্বিতীয় হামলা (এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসেও তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন) ইঙ্গিত দিচ্ছে যে লস্করের পুরনো প্রহরীরা আর নিরাপদ নন। হয় এটা নব্য নেতৃত্বের কাছে পুরনো প্রজন্ম বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, নয়তো পাকিস্তানের ‘গভীর রাষ্ট্র’ (Deep State) পুরনো সম্পদগুলিকে সরিয়ে নতুন, আরও নিয়ন্ত্রণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
‘পুরনো লস্কর’-এর মৃত্যু এবং ‘নতুন লস্কর’-এর জন্ম: ভারতের জন্য কেন বেশি বিপজ্জনক?
এখানে কিন্তু আসল বিপদটাই লুকিয়ে আছে। ধরুন, পুরনো নেতৃত্ব সরে গেল। তাহলে কি সংগঠন দুর্বল হবে? একদমই না। বরং ইতিহাস বলে, এ ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে উঠতি নেতারা নিজেদের ‘যোগ্যতা প্রমাণের’ জন্য আরও বেশি নৃশংস, আরও বেশি দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। লস্করের মতো একটি অত্যন্ত ধনী ও সুসংগঠিত গোষ্ঠীর শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে নতুন নেতাদের কাছে সবচেয়ে সোজা ও কার্যকরী পন্থা কী হতে পারে? ভারতের মাটিতে একটি বড় ধরনের, সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো হামলা চালানো।
এপ্রিল ২০২৬-এর ঘটনাবলীই সেদিকে ইঙ্গিত করছে। শুধু অমৃতসর বা কাশ্মীরই নয়, দিল্লি পুলিশ লস্করের একটি বড় মডিউলের পর্দাফাশ করেছে, যেখানে ধৃত আটজনের মধ্যে সাতজনই বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের লক্ষ্য ছিল রাজধানীর বিশিষ্ট স্থাপনা যেমন কালকাজি মন্দির ও লোটাস টেম্পল। তারণ তারণ থেকে একাধিক ড্রোন আটকানো হয়েছে। এবং একই সময়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রকাশ্যে কলকাতায় হামলার হুমকি দিচ্ছেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই হাফিজ সইদের ছেলে তালহা সইদের মতো লস্কর নেতাদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিচ্ছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তা দাবি করছেন। অর্থাৎ, সংগঠনটি রাজনৈতিক ও সামরিক স্তরে এক নতুন করে মদত পেতে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লস্করের মধ্যে এখন যে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন তরুণ প্রজন্মের তালহা সইদ এবং সইফুল্লা কাসুরির মতো আগ্রাসী নেতারা। এরা পুরনো কাশ্মীর-কেন্দ্রিক এজেন্ডার বাইরে গিয়ে সরাসরি ভারতের মূল ভূখণ্ডে হামলা, সমুদ্রপথে সন্ত্রাস এবং ইজরায়েল-বিরোধী প্রচারের মাধ্যমে বৈশ্বিক জিহাদি তহবিল ও সমর্থন আদায়ের কৌশল নিচ্ছে। লাহোরের শালিমার বাগে ইদের জমায়েতে তালহা সইদের উগ্র ভাষণ এবং কাসুরির “আমরা এবার আকাশ ও সমুদ্রের রাজা হব” ঘোষণা — এই সবই নতুন বিপদের ইঙ্গিত।
ভারতের জন্য করণীয়: প্রস্তুতি ও সতর্কতার সময় এখনই
একজন সচেতন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমাদের কী বোঝা উচিত? সোজা কথায়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বাড়তে থাকা অন্তর্দ্বন্দ্ব আমাদের জন্য সাময়িক স্বস্তির কারণ হতে পারে ঠিকই, কিন্তু এর পরিণতি যে আরও ভয়াবহ হতে পারে, তা আমাদের ভুললে চলবে না। পাকিস্তানের ‘গভীর রাষ্ট্র’ সব সময়ই চেষ্টা করে অভ্যন্তরীণ চাপ বাইরের দিকে সরিয়ে দিতে, অর্থাৎ ভারতের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ জোরদার করতে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও পাকিস্তানের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেও পাকিস্তানের প্রতি এক ধরনের নমনীয়তা দেখাচ্ছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির একদিকে সৌদি আরবকে খুশি রাখতে সেনা পাঠাচ্ছেন, অন্যদিকে তেহরানে গিয়ে ইরানকে শান্ত করছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী চক্রগুলি ভারতের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে এবং ভারতের প্রতিশোধ নেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা চাইতে পারে।
তাই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে এখন দ্বিগুণ সতর্ক থাকতে হবে। জম্মু ও কাশ্মীরে সক্রিয়তা বাড়ানো হয়েছে, আইজিপি কাশ্মীর ইতিমধ্যেই বর্ধিত নজরদারি ও তল্লাশি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। পর্যটন কেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু শুধু নিরাপত্তা বাহিনী নয়, সাধারণ নাগরিক হিসেবেও আমাদের সচেতন থাকা জরুরি — যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বা সন্দেহজনক কার্যকলাপের খবর স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো।
আমির হামজার উপর হামলা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে লস্কর-ই-তৈবা একটি সমজাতীয়, অটুট সংগঠন নয়; এটি ফাটল ধরেছে। কিন্তু এই ফাটল যেমন একদিকে সংগঠনের দুর্বলতা, তেমনই অন্যদিকে আরও বেশি উগ্র ও মরিয়া সদস্যদের উত্থানের কারণ হতে পারে। পাকিস্তানের নোংরা রাজনীতির বলি হয়ে এই দানবটি যখন নিজের ঘরেই ক্ষতবিক্ষত, তখন তার শেষ চিৎকারটা যাতে ভারতের বুকে এসে না লাগে, সেই প্রস্তুতিটাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ, একজনের মৃত্যু বা আঘাতপ্রাপ্তি দিয়ে শেষ নয় — এখানে শুরুটা মাত্র।
উপসংহার: এটা শেষ নয়, শুরু
আমির হামজার বুকে গেঁথে যাওয়া গুলিগুলো শুধু একজন জঙ্গি নেতাকে হাসপাতালে পাঠায়নি, তারা গিয়ে ঠেকেছে লস্কর-ই-তৈবার মতো এক ভয়াল সন্ত্রাসবাদী চক্রের ভিতরের পচনশীল কাঠামোয়। এই ঘটনা যেন এক অন্ধকার দর্পণ, যার প্রতিফলনে আমরা দেখতে পাই এক ভয়ংকর ঝড়ের পূর্বাভাস। পাকিস্তানের দ্বিচারী নীতির জেরে জন্ম নেওয়া এই দৈত্য যখন নিজের ঘরেই ক্ষতবিক্ষত, তখন তার আর্তনাদ যে আমাদের গায়ে এসে লাগবে, তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। পুরনো প্রহরীরা বিদায় নিচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের জায়গায় আসছে আরও উগ্র, আরও মরিয়া প্রজন্ম — যাদের হাতে ভারতের বিরুদ্ধে নতুন করে রক্তাক্ত ইতিহাস রচনার সব উপকরণ ও সুযোগ রয়েছে। এই সময়ে আত্মতুষ্টি নয়, প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সতর্কতা ও দৃঢ় প্রস্তুতির। কারণ, বাতাসে যে মেঘ জমেছে, তা বৃষ্টি ঝরিয়েই ছাড়বে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আমির হামজা কে এবং লস্কর-ই-তৈবায় তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
আমির হামজা হলেন নিষিদ্ধ পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবা (LeT)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং হাফিজ সইদের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি ছিলেন সংগঠনের প্রধান আদর্শবাদী, প্রচারক ও লেখক। মারকাজ দাওয়া-আল-ইরশাদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং তিনি লস্করের প্রকাশনা ও অর্থসংগ্রহ নেটওয়ার্কের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৫ সালের ব্যাঙ্গালোর আইআইএসসি হামলাসহ ভারতে একাধিক সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে তাঁর যোগসূত্র রয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রশ্ন ২: লাহোরে আমির হামজার উপর হামলার পেছনে কাদের সন্দেহ করা হচ্ছে?
সরকারিভাবে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। তবে, এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। লস্করের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, আন্তঃগোষ্ঠী কোন্দল, অথবা পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর ‘পুরনো সম্পদ সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরির কৌশল’ — এই সবকিছুই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে একই ধাঁচে একাধিক জঙ্গি নেতা রহস্যজনকভাবে খুন হয়েছেন।
প্রশ্ন ৩: এই হামলা লস্কর-ই-তৈবার ভবিষ্যৎ এবং ভারতের নিরাপত্তার জন্য কী ইঙ্গিত দেয়?
এই হামলা ইঙ্গিত দেয় যে লস্করের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে এবং ক্ষমতার পুনর্বণ্টন চলছে। পুরনো নেতৃত্বের বিদায় বা অপসারণ নতুন, আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আগ্রাসী নেতাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। নিজেদের ‘যোগ্যতা প্রমাণের’ জন্য এই নব্য নেতৃত্ব ভারতের বিরুদ্ধে আরও বড় এবং দুঃসাহসী হামলা চালাতে পারে। সম্প্রতি কলকাতায় হামলার হুমকি, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ এবং দেশজুড়ে লস্কর মডিউলের পর্দাফাশ এই ক্রমবর্ধমান হুমকিরই প্রমাণ।
প্রশ্ন ৪: লস্কর-ই-তৈবা এবং আইএসআইএস (ISKP)-এর মধ্যে সম্পর্ক কী?
সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের আইএসআই লস্কর-ই-তৈবা এবং ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স (ISKP)-এর মধ্যে একটি কৌশলগত জোট গড়ে তুলেছে। যদিও আদর্শগতভাবে এই দুই গোষ্ঠী পরস্পরবিরোধী, তবুও আইএসআই বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ দমন এবং আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের স্বার্থে এদের একত্রিত করেছে। এই জোট ভারতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এতে আইএসআইএস-এর বৈশ্বিক জিহাদি নেটওয়ার্ক ও লস্করের ভারত-কেন্দ্রিক লজিস্টিক্যাল দক্ষতা একীভূত হয়ে গেছে, যা কাশ্মীরসহ ভারতের অন্যান্য অংশে বড় হামলার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
প্রশ্ন ৫: একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমার কী করা উচিত?
সাধারণ নাগরিক হিসেবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকাই সবচেয়ে জরুরি। আপনার আশেপাশে কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি, পরিত্যক্ত ব্যাগ বা অস্বাভাবিক কার্যকলাপ দেখলে অবিলম্বে স্থানীয় পুলিশকে জানান। সামাজিক মাধ্যমে যাচাই না করা কোনো উস্কানিমূলক বা গুজবপূর্ণ তথ্য শেয়ার করবেন না। দেশের নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সার্বক্ষণিক সজাগ রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলায় তারা সক্ষম। জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতাই দেশের নিরাপত্তা বলয়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।



