বেসরকারি চাকরিতে কি মিলবে যুবসাথীর ১৫০০ টাকা? জানুন নবান্নের নিয়ম

Banglar Yuva Sathi Eligibility for Private Employees: পশ্চিমবঙ্গে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য রাজ্য সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো 'বাংলার যুবসাথী' (Banglar Yuva Sathi) বা অনেকে যাকে সহজ কথায় 'যুবসাথী' প্রকল্প বলছেন।…

Ishita Ganguly

 

Banglar Yuva Sathi Eligibility for Private Employees: পশ্চিমবঙ্গে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য রাজ্য সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো ‘বাংলার যুবসাথী’ (Banglar Yuva Sathi) বা অনেকে যাকে সহজ কথায় ‘যুবসাথী’ প্রকল্প বলছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের বেকার তরুণ-তরুণীদের প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অনেকের মনেই একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—যারা ছোটখাটো কোনো বেসরকারি চাকরি (Private Job) করছেন, তাঁরা কি এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন?

নবান্নের নির্দেশিকা কী বলছে? চাকরি থাকলে কি আবেদন করা নিরাপদ? আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। আপনি যদি বেসরকারি কর্মী হন এবং এই ফর্ম ফিলাপ করার কথা ভাবছেন, তবে এই তথ্যটি আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বেসরকারি চাকুরীজীবীরা কি এই টাকা পাবেন?

সোজাসাপ্টা উত্তর হলো—না। আপনি যদি কোনো বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত থাকেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত বেতন পান, তবে আপনি ‘বাংলার যুবসাথী’ বা ‘যুবশ্রী’ কোনো প্রকল্পেরই টাকা পাওয়ার যোগ্য নন।

নবান্নের স্পষ্ট নির্দেশ

রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো সেই সব যুবক-যুবতীদের পাশে দাঁড়ানো, যারা পড়াশোনা শেষ করেও কোনো কাজ পাননি। নবান্নের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই ভাতা হলো ‘বেকার ভাতা’ (Unemployment Allowance)। অর্থাৎ, এই টাকা শুধুমাত্র তাদের জন্যই বরাদ্দ, যাদের কোনো আয়ের উৎস নেই।

সরকার পরিষ্কার জানিয়েছে যে, আবেদনকারীকে অবশ্যই ‘বেকার’ (Unemployed) হতে হবে। আপনি যদি কোনো প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করেন, তা ফুল-টাইম (Full-time) হোক বা পার্ট-টাইম (Part-time), এবং আপনার নামে যদি পিএফ (PF) বা ইএসআই (ESI) কাটা হয়, তবে আপনি সরকারি খাতায় ‘কর্মরত’ হিসেবে গণ্য হবেন। এমনকী, যদি পিএফ নাও থাকে কিন্তু আপনি নিয়মিত বেতন পান, তাহলেও নৈতিকভাবে এবং আইনত আপনি এই ভাতার যোগ্য নন।

আবেদনের যোগ্যতার দ্রুত তুলনা

আপনার বর্তমান অবস্থা আপনি কি ১৫০০ টাকা পাবেন?
সম্পূর্ণ বেকার (Unemployed) হ্যাঁ (শর্তসাপেক্ষে)
সরকারি চাকরিজীবী না
বেসরকারি চাকরিজীবী (PF/ESI আছে) না
বেসরকারি চাকরিজীবী (অসংগঠিত ক্ষেত্র) না (নিয়ম অনুযায়ী)
ছাত্রছাত্রী (যারা শুধু পড়াশোনা করছে) না (সাধারণত স্টুডেন্টদের জন্য আলাদা স্কিম থাকে)

যুবসাথী প্রকল্প আসলে কী?

‘বাংলার যুবসাথী’ হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি নতুন উদ্যোগ, যা রাজ্যের বেকার সমস্যার সুরাহা করার লক্ষ্যে আনা হয়েছে। এটি অনেকটা আগের ‘যুবশ্রী’ (Yuvasree) প্রকল্পের আদলে তৈরি, কিন্তু এর পরিধি এবং নিয়মকানুনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৬ সালের বাজেট ঘোষণায় এই প্রকল্পের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের সুবিধা ও টাকার পরিমাণ

এই প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত যোগ্য প্রার্থীরা প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে আর্থিক অনুদান পাবেন। এই টাকা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে (Direct Benefit Transfer – DBT) চলে যাবে। এই অর্থ দিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা তাদের পড়াশোনার খরচ, চাকরির পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের খরচ চালাতে পারবেন।

নতুন নিয়ম ও বয়সসীমা

আগের প্রকল্পের সাথে এর কিছুটা তফাত রয়েছে বয়সের ক্ষেত্রে। ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের জন্য সাধারণ বয়সসীমা ধরা হয়েছে ২১ থেকে ৪০ বছর। তবে সংরক্ষিত শ্রেণীর জন্য বয়সের কিছুটা ছাড় থাকতে পারে। মনে রাখবেন, এই টাকা আজীবন দেওয়া হবে না। আপনি যতক্ষণ না চাকরি পাচ্ছেন অথবা সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত—যেটা আগে হবে, ততদিনই এই সুবিধা পাওয়া যাবে।

কারা এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন?

সবাই চাইলেই এই ফর্মে আবেদন করতে পারবেন না। নবান্ন থেকে কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করলে ভবিষ্যতে আইনি সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

যোগ্যতার মাপকাঠি

আবেদন করার আগে নিচের যোগ্যতাগুলি মিলিয়ে নিন:

  • বাসিন্দা: আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।

  • শিক্ষাগত যোগ্যতা: ন্যূনতম মাধ্যমিক পাশ (Madhyamik Pass) বা সমতুল্য যোগ্যতা থাকতে হবে। উচ্চতর ডিগ্রি থাকলেও আবেদন করা যাবে।

  • কর্মসংস্থান: আবেদনকারীকে সম্পূর্ণভাবে বেকার হতে হবে। কোনো সরকারি বা বেসরকারি কাজে যুক্ত থাকা যাবে না।

  • অন্যান্য ভাতা: আপনি যদি রাজ্য সরকারের অন্য কোনো ভাতা (যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা বিধবা ভাতা) পান, তবে এই প্রকল্পের নিয়মাবলী ভালো করে দেখে নেওয়া উচিত, কারণ সাধারণত দ্বৈত ভাতার সুবিধা পাওয়া যায় না।

যোগ্যতা যাচাই টেবিল

মাপকাঠি আবশ্যিক শর্ত
বয়স ২১ – ৪০ বছর
শিক্ষা মাধ্যমিক পাশ (ন্যূনতম)
কাজের স্থিতি সম্পূর্ণ বেকার
ব্যাঙ্কের তথ্য নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট (আধার লিঙ্ক করা)

চাকরি পেলে কী করবেন?

অনেকেই আছেন যারা হয়তো বেকার অবস্থায় আবেদন করেছিলেন এবং টাকাও পাচ্ছেন, কিন্তু পরে বেসরকারি চাকরি পেয়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে কী করণীয়? এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনেই ধোঁয়াশা থাকে।

তথ্য গোপন করলে কী সমস্যা হতে পারে?

বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সরকারের কাছে তথ্য যাচাই করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। বিশেষ করে আপনার আধার কার্ডের সাথে যদি আপনার পিএফ (EPF) বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক করা থাকে, তবে সরকার সহজেই ধরে ফেলতে পারে যে আপনি কর্মরত।

যদি দেখা যায় আপনি চাকরি পাওয়া সত্ত্বেও ‘বেকার ভাতা’ নিচ্ছেন, তবে:

  1. আপনার ভাতা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।

  2. আপনাকে আগে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

  3. সরকারি তহবিল তছরুপের দায়ে আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

সঠিক পদক্ষেপ কী?

যদি আপনি বেসরকারি বা সরকারি কোনো চাকরি পেয়ে যান, তবে সততার সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে (Employment Exchange) গিয়ে আপনার নাম কাটিয়ে নেওয়া উচিত। যুবশ্রী প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেমন Annexure-III ফর্ম জমা দিয়ে জানাতে হয় যে আপনি আর বেকার নন, যুবসাথী প্রকল্পের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পোর্টালে বা অফিসে গিয়ে আপনার স্ট্যাটাস আপডেট করা বাঞ্ছনীয়।

আবেদন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নথি

আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনি এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য এবং কোনো বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত নন, তবে আপনি আবেদনের প্রস্তুতি নিতে পারেন। বর্তমানে দুয়ারে সরকার ক্যাম্প বা নির্দিষ্ট পোর্টালে গিয়ে আবেদন করা যাচ্ছে।

কী কী ডকুমেন্ট লাগবে?

আবেদন করার সময় হাতের কাছে নিচের ডকুমেন্টগুলি গুছিয়ে রাখুন। অসম্পূর্ণ আবেদনের কারণে অনেকের নাম বাতিল হয়ে যায়।

প্রয়োজনীয় নথির তালিকা:

  • পরিচয়পত্র: আধার কার্ড (Aadhaar Card) এবং ভোটার কার্ড।

  • শিক্ষাগত প্রমাণপত্র: মাধ্যমিকের মার্কশিট ও অ্যাডমিট কার্ড এবং সর্বোচ্চ ডিগ্রির সার্টিফিকেট।

  • বয়সের প্রমাণ: জন্ম শংসাপত্র বা মাধ্যমিকের অ্যাডমিট।

  • ব্যাঙ্ক ডিটেলস: ব্যাঙ্কের পাসবইয়ের প্রথম পাতা (যেখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড স্পষ্ট আছে)।

  • ছবি: সাম্প্রতিক রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি।

  • মোবাইল নম্বর: একটি সচল মোবাইল নম্বর (যা আধারের সাথে লিঙ্ক করা থাকলে ভালো)।

শেষ কথা

‘বাংলার যুবসাথী’ বা যুবশ্রী প্রকল্পের ১৫০০ টাকা বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য একটি বড় অবলম্বন। কিন্তু আপনি যদি বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত হন, তবে সামান্য কিছু টাকার লোভে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবেদন করবেন না। নবান্নের নির্দেশ এবং চেকিং পদ্ধতি এখন অনেক কড়া হয়েছে।

যাদের সত্যই প্রয়োজন, তাদের এই সুবিধা পেতে দিন। আপনি যদি বর্তমানে বেকার হন এবং চাকরির চেষ্টা করছেন, তবে দেরি না করে আপনার নিকটবর্তী ক্যাম্পে বা অনলাইনে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করুন। মনে রাখবেন, সততাই আপনার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় মূলধন।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন