পুরুষদের শরীরে অন্ডকোষ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। অনেক সময় পুরুষরা লক্ষ্য করেন যে তাদের অন্ডকোষ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বড় দেখাচ্ছে বা নিচের দিকে বেশি ঝুলে পড়েছে। এই পরিস্থিতি দেখলে মনে ভয় বা দুশ্চিন্তা আসাটা খুব স্বাভাবিক। তখন অনেকের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে, হার্নিয়া হলে কি অন্ডকোষ ঝুলে যায়? হ্যাঁ, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে নির্দিষ্ট কিছু হার্নিয়ার কারণে অন্ডকোষের আকার বড় হতে পারে এবং তা নিচের দিকে ঝুলে যেতে পারে। কুঁচকি বা তলপেটের দুর্বল পেশি ভেদ করে যখন পেটের ভেতরের অংশ অন্ডকোষের থলিতে নেমে আসে, তখন এই সমস্যা তৈরি হয়। আজকের এই লেখায় আমরা হার্নিয়ার সঙ্গে অন্ডকোষের সম্পর্ক, এর পেছনের কারণ এবং সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হার্নিয়া এবং অন্ডকোষের সম্পর্ক
হার্নিয়া বলতে মূলত শরীরের কোনো অভ্যন্তরীণ অঙ্গের দেয়াল বা পেশি দুর্বল হয়ে তার ভেতরের অংশ বাইরের দিকে বেরিয়ে আসাকে বোঝায় । পুরুষদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে হার্নিয়া দেখা যায়, তাকে ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia) বলা হয় । আমাদের তলপেট এবং কুঁচকির সংযোগস্থলে একটি ছোট নালী থাকে, যাকে ইনগুইনাল ক্যানাল বলে। কোনো কারণে পেটের পেশি দুর্বল হয়ে গেলে পেটের ভেতরের চর্বি বা নাড়িভুঁড়ি (Intestine) এই নালী দিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে । যেহেতু এই নালীটি সরাসরি অন্ডকোষের থলির (Scrotum) সাথে যুক্ত, তাই বেরিয়ে আসা অংশটি সোজা অন্ডকোষে গিয়ে জমা হতে পারে । এর ফলেই অন্ডকোষ ফুলে যায় এবং ভারিকেন্দ্র নিচের দিকে চলে যাওয়ায় অন্ডকোষ ঝুলে পড়ে।
ইনগুইনাল হার্নিয়া কীভাবে অন্ডকোষে পৌঁছায়?
পুরুষের জন্মের আগে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অন্ডকোষ তলপেটে তৈরি হয় এবং জন্মের ঠিক আগে তা ইনগুইনাল ক্যানাল দিয়ে নিচে অন্ডকোষের থলিতে নেমে আসে। নিচে নামার পর এই নালী প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা । কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে এই নালীটি পুরোপুরি বন্ধ হয় না বা পরবর্তী জীবনে অতিরিক্ত চাপের কারণে তা আবার খুলে যায় । তখন কাশি দিলে, ভারী জিনিস তুললে বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে পেটে চাপ পড়লে পেটের নাড়িভুঁড়ি সেই ফাঁকা জায়গা দিয়ে অন্ডকোষে প্রবেশ করে । ফলে অন্ডকোষ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বড় এবং ভারী হয়ে যায়।
| বিষয়ের নাম | সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
| ইনগুইনাল হার্নিয়া কী? | পেটের পেশি দুর্বল হয়ে নাড়িভুঁড়ি কুঁচকি দিয়ে নিচে নেমে আসা। |
| অন্ডকোষে কীভাবে যায়? | ইনগুইনাল ক্যানাল বা নালীর মাধ্যমে পেটের অংশ অন্ডকোষের থলিতে পৌঁছায়। |
| প্রধান কারণ | পেশির দুর্বলতা, ভারী কাজ, দীর্ঘমেয়াদী কাশি বা কোষ্ঠকাঠিন্য। |
| প্রাথমিক লক্ষণ | কুঁচকি বা অন্ডকোষ এলাকায় ফোলাভাব এবং চাপ অনুভব করা। |
হার্নিয়া হলে কি অন্ডকোষ ঝুলে যায়?
অনেকেই সরাসরি জানতে চান যে, হার্নিয়া হলে কি অন্ডকোষ ঝুলে যায়? এর সহজ উত্তর হলো, হ্যাঁ। তবে এটি সব ধরনের হার্নিয়ার ক্ষেত্রে ঘটে না। প্রধানত ‘ইনগুইনাল’ বা ‘স্ক্রোটাল’ হার্নিয়া হলেই অন্ডকোষ ঝুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয় । যখন পেটের নাড়িভুঁড়ি অন্ডকোষের থলিতে এসে জমা হয়, তখন থলির ভেতরের ওজন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। অন্ডকোষের বাইরের ত্বক বা চামড়া (Scrotum skin) অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক (Elastic) প্রকৃতির হয় । অতিরিক্ত ওজনের কারণে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে এই ত্বক নিচের দিকে প্রসারিত হতে থাকে। ফলে বাইরে থেকে দেখে মনে হয় অন্ডকোষ অনেক বেশি ঝুলে গেছে।
অন্ডকোষ ঝুলে যাওয়ার পেছনের মূল বিজ্ঞান
অন্ডকোষের থলি মূলত তৈরি হয়েছে পেশি এবং ত্বক দিয়ে, যার কাজ হলো অন্ডকোষকে শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা ঠান্ডা রাখা । যখন হার্নিয়ার কারণে পেটের ভেতরের অঙ্গাণু অন্ডকোষে প্রবেশ করে, তখন অন্ডকোষের নিজস্ব ওজনের সাথে নাড়িভুঁড়ির ওজন যুক্ত হয়। এই বাড়তি ভার বহন করার ক্ষমতা অন্ডকোষের থলির থাকে না। তাছাড়া পেটের ভেতরের উষ্ণ অঙ্গাণু নিচে নেমে আসার কারণে অন্ডকোষের আশপাশের তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবেই তাপমাত্রা বাড়লে অন্ডকোষের পেশি প্রসারিত হয় এবং থলি নিচের দিকে ঝুলে পড়ে । তাই হার্নিয়ার কারণে অন্ডকোষ ঝুলে যাওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া।
| কারণ বা প্রভাব | বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা |
| ওজন বৃদ্ধি | পেটের নাড়িভুঁড়ি থলিতে প্রবেশ করায় অন্ডকোষের ওজন বেড়ে যায়। |
| মাধ্যাকর্ষণ টান | অতিরিক্ত ওজনের কারণে মাধ্যাকর্ষণ থলিকে নিচের দিকে টানে। |
| ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা | অন্ডকোষের চামড়া সহজে প্রসারিত হতে পারে, তাই ভারী হলে ঝুলে যায়। |
| তাপমাত্রার প্রভাব | শরীরের ভেতরের উষ্ণ অংশ নিচে আসায় পেশি শিথিল হয়ে যায়। |
অন্ডকোষ ঝুলে যাওয়ার অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ
শুধু যে হার্নিয়ার কারণেই অন্ডকোষ ঝুলে যায়, বিষয়টি এমন নয় । অনেক সময় পুরুষরা অন্ডকোষের পরিবর্তন দেখে প্রথমেই হার্নিয়া ভেবে ভয় পান। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী এর পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া একটি বড় কারণ । তাছাড়া পরিবেশের তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীর অন্ডকোষকে ঠান্ডা রাখার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যার ফলে তা ঝুলে থাকে । অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত রোগের কারণেও এই পরিবর্তন দেখা দিতে পারে ।
হাইড্রোসিল ও ভেরিকোসিলের প্রভাব
হার্নিয়া ছাড়াও হাইড্রোসিল (Hydrocele) এবং ভেরিকোসিল (Varicocele) হলো অন্ডকোষ ফুলে বা ঝুলে যাওয়ার অন্যতম দুটি প্রধান কারণ । হাইড্রোসিল হলো অন্ডকোষের চারপাশে পানি বা তরল জমা হওয়া । এর ফলেও অন্ডকোষ ভারী হয়ে যায় এবং নিচের দিকে ঝুলে পড়ে । অন্যদিকে ভেরিকোসিল হলো অন্ডকোষের ভেতরের শিরাগুলো ফুলে মোটা হয়ে যাওয়া । ভেরিকোসিল হলে অন্ডকোষের একটি দিক (সাধারণত বাঁ দিক) বেশি ঝুলে যায় এবং সেখানে ব্যথার সৃষ্টি হয় । তাই অন্ডকোষ ঝুলে গেলেই তা হার্নিয়া নয়, সঠিক কারণ জানতে ডাক্তারি পরীক্ষা জরুরি।
| রোগের নাম | লক্ষণ ও কারণ | পার্থক্য (হার্নিয়া থেকে) |
| হাইড্রোসিল | অন্ডকোষে তরল জমে ফুলে যাওয়া ও ব্যথা হওয়া। | এতে পানি জমে, নাড়িভুঁড়ি নিচে নামে না। আলো ফেললে থলি স্বচ্ছ দেখায়। |
| ভেরিকোসিল | অন্ডকোষের রক্তনালী বা শিরা ফুলে মোটা হয়ে যাওয়া। | ত্বকের নিচে পেঁচানো শিরার মতো মনে হয়। |
| বয়স ও তাপমাত্রা | গরমে বা বয়স বাড়লে পেশি শিথিল হয়ে ঝুলে যায়। | এটি কোনো রোগ নয়, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। ফোলাভাব থাকে না। |
হার্নিয়া জনিত অন্ডকোষের সমস্যার প্রধান লক্ষণগুলো
হার্নিয়ার কারণে অন্ডকোষ ঝুলে গেলে শরীরে বেশ কিছু স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রথমদিকে হয়তো কোনো ব্যথা থাকে না, শুধু মনে হয় কুঁচকি বা অন্ডকোষের একটি দিক ভারী হয়ে আছে। কিন্তু সময় বাড়ার সাথে সাথে এই ফোলাভাব বাড়তে থাকে । বিশেষ করে যখন রোগী একটানা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন, ভারী কোনো কাজ করেন বা জোরে কাশি দেন, তখন ফোলা অংশটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তবে মজার ব্যাপার হলো, রাতে ঘুমানোর সময় বা বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়লে এই ফোলাভাব অনেক সময় আপনাআপনি কমে যায় বা পেটের দিকে ফিরে যায়।
কখন বুঝবেন সমস্যাটি গুরুতর?
সাধারণত ইনগুইনাল হার্নিয়া প্রাণঘাতী নয়, তবে এর জটিলতা মারাত্মক হতে পারে। যদি অন্ডকোষে নেমে আসা নাড়িভুঁড়িটি আটকে যায় (Incarcerated Hernia) এবং পেটে ফিরে যেতে না পারে, তখন রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একে বলা হয় স্ট্র্যাংগুলেটেড হার্নিয়া (Strangulated Hernia)। এ অবস্থায় অন্ডকোষে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়, বমি বমি ভাব থাকে, জ্বর আসতে পারে এবং ফোলা অংশটি লাল বা কালচে বর্ণ ধারণ করে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে, কারণ এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি।
| লক্ষণের ধরন | বিস্তারিত বিবরণ | সতর্কতা মাত্রা |
| প্রাথমিক লক্ষণ | অন্ডকোষ বা কুঁচকিতে ফোলাভাব, ভারী অনুভব হওয়া। শুয়ে পড়লে কমে যায়। | সাধারণ (ডাক্তারের পরামর্শ নিন)। |
| মাঝারি লক্ষণ | কাশি দিলে বা ভারী জিনিস তুললে ব্যথা হওয়া। | সতর্কতামূলক (চিকিৎসা শুরু করা উচিত)। |
| গুরুতর লক্ষণ | প্রচণ্ড ব্যথা, বমি ভাব, ফোলা অংশ লাল বা কালচে হয়ে যাওয়া। রক্ত চলাচল বন্ধের সংকেত। | জরুরি (অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে)। |
হার্নিয়া ও অন্ডকোষের সমস্যার আধুনিক চিকিৎসা
অনেকেই মনে করেন ওষুধ বা মালিশের মাধ্যমে হার্নিয়া পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, শারীরিক কাঠামোগত ত্রুটি বা পেশির ছিদ্র কখনোই শুধু ওষুধ দিয়ে ঠিক করা যায় না । প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু होम्योपैथी (হোমিওপ্যাথি) বা অ্যালোপ্যাথি ওষুধ ব্যথার উপশম দিতে পারে বা সাময়িক আরাম দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য সার্জারি বা অপারেশনই হলো একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে, তাই হার্নিয়া অপারেশন নিয়ে আগের মতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
সার্জারি এবং ঔষধের ভূমিকা
বর্তমানে হার্নিয়ার চিকিৎসার জন্য দুই ধরনের সার্জারি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। একটি হলো ওপেন সার্জারি এবং অন্যটি হলো ল্যাপারোস্কোপিক (Laparoscopic) সার্জারি। ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে পেট বা কুঁচকিতে খুব ছোট ফুটো করে আধুনিক ক্যামেরার সাহায্যে অপারেশন করা হয়। এতে রোগীর ব্যথা অনেক কম হয়, রক্তপাত হয় না বললেই চলে এবং রোগী খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে দৈনন্দিন কাজে ফিরতে পারেন। অপারেশনের সময় দুর্বল পেশির ওপর একটি কৃত্রিম জালিকা (Mesh) বসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে পেটের ভেতরের অংশ আর অন্ডকোষের দিকে নামতে না পারে। সাময়িক ব্যথা বা ফোলাভাব কমানোর জন্য চিকিৎসকরা পেইনকিলার বা সাপোর্টিভ ওষুধ দিতে পারেন।
| চিকিৎসার ধরন | পদ্ধতি ও সুবিধা | ফলাফল |
| ওপেন সার্জারি | নির্দিষ্ট অংশ কেটে নাড়িভুঁড়ি যথাস্থানে পাঠানো হয় এবং মেশ (Mesh) বসানো হয়। | দীর্ঘমেয়াদী সমাধান, তবে শুকাতে সময় লাগে। |
| ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি | ছোট ছিদ্র করে লেজারের বা ক্যামেরার সাহায্যে মেশ বসানো হয়। | দ্রুত আরোগ্য, দাগ কম হয়, ব্যথা প্রায় থাকে না। |
| ওষুধ / ড্রপস | হোমিওপ্যাথিক বা ব্যথানাশক ওষুধ শুধু লক্ষণ কমায়। | সাময়িক আরাম দেয়, ছিদ্র বন্ধ করতে পারে না। |
ঘরোয়া উপায়ে অন্ডকোষের যত্ন ও সতর্কতা
যেহেতু হার্নিয়ার মূল চিকিৎসা সার্জারি, তাই ঘরোয়া টোটকা দিয়ে এটি পুরোপুরি সারানো সম্ভব নয়। তবে আপনার যদি হার্নিয়া ধরা পড়ে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অপারেশনের জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়, তখন ঘরোয়া কিছু সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক যত্নের অভাবে হার্নিয়ার আকার বেড়ে যেতে পারে এবং অন্ডকোষের ফোলাভাব যন্ত্রণাদায়ক রূপ নিতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন আনলে অন্ডকোষের এই ঝুলে যাওয়া এবং ব্যথা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
জীবনযাত্রায় কী কী পরিবর্তন আনা জরুরি?
প্রথমত, অন্ডকোষকে অতিরিক্ত ঝুলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে ভালো মানের সাপোর্টার বা টাইট আন্ডারওয়্যার (Briefs) পরিধান করা উচিত। এতে অন্ডকোষ নিচ থেকে সাপোর্ট পায় এবং মাধ্যাকর্ষণের টান কম লাগে । ভারী ওজন তোলা, অতিরিক্ত জিমন্যাস্টিকস করা বা পেটে চাপ পড়ে এমন যেকোনো কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য হার্নিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই খাবারে প্রচুর ফাইবার বা আঁশযুক্ত শাকসবজি এবং ফলমূল রাখতে হবে, যাতে মলত্যাগের সময় পেটে চাপ দিতে না হয়। দীর্ঘমেয়াদী কাশি থাকলে দ্রুত তার চিকিৎসা করাতে হবে।
| যত্নের উপায় | কীভাবে কাজ করে | সতর্কতা |
| যত্নের উপায় | কীভাবে কাজ করে | সতর্কতা |
| সাপোর্টার ব্যবহার | অন্ডকোষকে নিচ থেকে ধরে রাখে, ব্যথা ও ঝুলে যাওয়া কমায়। | অতিরিক্ত টাইট পরা যাবে না, রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে। |
| কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ | ফাইবারযুক্ত খাবার ও বেশি পানি খেলে মলত্যাগে চাপ পড়ে না। | পেটে চাপ পড়লে হার্নিয়া দ্রুত বাড়ে। |
| ভারী কাজ এড়ানো | ওজন তুললে পেটের পেশিতে টান পড়ে এবং নাড়িভুঁড়ি নিচে নামে। | ব্যায়াম বা জিম করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। |
| বরফের সেঁক | ফোলা বা ব্যথা থাকলে কাপড়ে পেঁচিয়ে বরফ লাগালে আরাম মেলে। | সরাসরি বরফ ত্বকে লাগানো যাবে না। |
শেষ কথা
উপরের বিস্তারিত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, হার্নিয়া হলে কি অন্ডকোষ ঝুলে যায়—এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। ইনগুইনাল বা কুঁচকির হার্নিয়া হলে পেটের ভেতরের অংশ অন্ডকোষে নেমে আসে, যার ফলে অন্ডকোষ ফুলে যায় এবং অতিরিক্ত ওজনে নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। এটি কোনো সাধারণ সমস্যা নয় যে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে এবং আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে খুব সহজেই এই সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যদি আপনি আপনার অন্ডকোষে কোনো অস্বাভাবিক ফোলাভাব, ব্যথা বা ঝুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখতে পান, তবে লোকলজ্জা বা ভয় দূরে সরিয়ে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের (Urologist বা General Surgeon) পরামর্শ নিন। সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য নিজের শরীরের প্রতি সচেতন হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।
জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে কত টাকা খরচ হয়?
ল্যাপারোস্কোপিক হার্নিয়া সার্জারির খরচ মূলত হাসপাতাল, সার্জনের অভিজ্ঞতা এবং শহরের ওপর নির্ভর করে । ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায়, এই অপারেশনের খরচ গড়ে প্রায় ২৫,০০০ টাকা থেকে ১,২০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে । তবে শুধুমাত্র ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতির (Laparoscopic Hernia Repair) জন্য সাধারণত ৯০,০০০ টাকা থেকে ১,১০,০০০ টাকার মতো খরচ পড়তে পারে । এই খরচের মধ্যে সার্জনের ফি, হাসপাতালের বেড ভাড়া, অ্যানেসথেসিয়া, অপারেশন থিয়েটারের চার্জ এবং মেশের (Mesh) দাম অন্তর্ভুক্ত থাকে । অপারেশনের আগে কিছু ডায়াগনস্টিক টেস্ট যেমন আল্ট্রাসাউন্ড বা এক্স-রে করতে হয়, যার জন্য অতিরিক্ত কিছু খরচ হতে পারে । তাছাড়া রোগীর অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকলে বা উন্নত মানের বিদেশি মেশ ব্যবহার করলে এই খরচ কিছুটা বাড়তে পারে । সব মিলিয়ে একটি ভালো মানের হাসপাতালে এই সার্জারি করাতে মোটামুটি প্রায় ১ লাখ টাকার কাছাকাছি বাজেট রাখা বুদ্ধিমানের কাজ ।
হার্নিয়া অপারেশনের পর কতদিন বিশ্রাম নিতে হয়?
হার্নিয়া অপারেশনের পর রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে । ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি হলে রোগী অপারেশনের দিন বা পরের দিনই বাড়ি ফিরে যেতে পারেন । প্রথম ১ থেকে ২ সপ্তাহ সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই সময়ে সেলাইয়ের স্থানে ব্যথা বা অস্বস্তি থাকতে পারে । প্রথম সপ্তাহের পর থেকে রোগী হালকা হাঁটাচলা এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ শুরু করতে পারেন । ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর যারা ডেস্কে বসে কাজ করেন, তারা অফিসে যোগ দিতে পারেন । তবে ভারী জিনিস তোলা, জিমে যাওয়া বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কাজ অন্তত দেড় থেকে দুই মাস (৬ সপ্তাহ) পর্যন্ত পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে । সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা প্রয়োজন ।
হাইড্রোসিল ও হার্নিয়া কি একসাথে হতে পারে?
হ্যাঁ, একজন পুরুষের শরীরে হাইড্রোসিল এবং ইনগুইনাল হার্নিয়া একই সাথে হতে পারে । চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এই দুটি রোগের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শারীরবৃত্তীয় সম্পর্ক রয়েছে । যখন ইনগুইনাল ক্যানাল বা তলপেটের নালীটি পুরোপুরি বন্ধ হয় না, তখন সেই ফাঁকা জায়গা দিয়ে পেটের ভেতরের তরল (Fluid) অন্ডকোষে এসে জমা হলে হাইড্রোসিল তৈরি হয় । আবার একই নালী দিয়ে যখন পেটের নাড়িভুঁড়ি (Intestine) নিচে নেমে আসে, তখন তাকে হার্নিয়া বলা হয় । শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটির কারণে প্রায়শই এই দুটি সমস্যা একসাথে দেখা যায় । বয়স্কদের ক্ষেত্রেও দুর্বল পেশির কারণে একই সাথে অন্ডকোষে পানি জমা এবং নাড়িভুঁড়ি নেমে আসার ঘটনা ঘটতে পারে । এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত একটিমাত্র সার্জারির মাধ্যমেই ডাক্তাররা একই সাথে হার্নিয়া মেরামত এবং হাইড্রোসিলের তরল বের করে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেন ।











