মাসিকের সময় শারীরিক মিলন: স্বস্তিদায়ক না ঝুঁকিপূর্ণ? জানুন সত্যিটা

 During Periods-Comforting or Risky?:"পিরিয়ড" বা "মাসিক" – এই শব্দটা শুনলেই আজও বহু মানুষের মনে দ্বিধা, সংকোচ আর অস্বস্তির মেঘ জমে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় শারীরিক মিলনের মতো একটি ব্যক্তিগত…

Debolina Roy

 

 During Periods-Comforting or Risky?:“পিরিয়ড” বা “মাসিক” – এই শব্দটা শুনলেই আজও বহু মানুষের মনে দ্বিধা, সংকোচ আর অস্বস্তির মেঘ জমে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় শারীরিক মিলনের মতো একটি ব্যক্তিগত বিষয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গভীর হয়। অনেকেই জানতে চান, পিরিয়ডের সময় মিলন করা কি আদৌ নিরাপদ? এর ফলে কি কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হতে পারে? নাকি এর কিছু সুবিধাও রয়েছে?

এই দ্বিধা আর কৌতূহল থেকেই জন্মায় নানা ভুল ধারণা। এই প্রতিবেদনে আমরা পিরিয়ডের সময় মিলন করলে কি হয়, তার প্রতিটি দিক—সুবিধা, অসুবিধা, ঝুঁকি এবং সুরক্ষার উপায়—খুব সহজ ভাষায় এবং বৈজ্ঞানিকভাবে আলোচনা করব, যাতে আপনি একটি সঠিক এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

পিরিয়ডের সময় মিলনের ইচ্ছা কেন বাড়ে বা কমে?

পিরিয়ডের সময় যৌন ইচ্ছার পরিবর্তন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এর পেছনে মূলত হরমোনের ওঠানামা এবং মানসিক অবস্থা দায়ী।

হরমোনের খেলা

পিরিয়ডের শুরুতে ইস্ট্রোজেন (Estrogen) এবং প্রোজেস্টেরন (Progesterone) হরমোনের মাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে, যা কারও কারও ক্ষেত্রে যৌন ইচ্ছা বাড়িয়ে তুলতে পারে। আবার, তলপেটে ব্যথা বা অস্বস্তির কারণে অনেকের মিলনের ইচ্ছাই চলে যায়। পুরোটাই ব্যক্তিবিশেষের শারীরিক গঠনের উপর নির্ভরশীল।

Period Pain: পিরিয়ডের সময় জয়েন্টে ব্যথা, কারণ ও প্রতিকার – বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

শারীরিক পরিবর্তন ও মানসিক প্রভাব

এই সময়ে শারীরিক অস্বস্তি, মেজাজ খিটখিটে থাকা বা ক্লান্তিবোধ হওয়া খুবই সাধারণ। এই কারণগুলো স্বাভাবিকভাবেই যৌন ইচ্ছাকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, কিছু মহিলা এই সময় আবেগগতভাবে বেশি কাছাকাছি আসতে চান এবং শারীরিক মিলনকে মানসিক আরামের একটি উপায় হিসেবে দেখেন।

পিরিয়ডের সময় মিলন করলে কি সুবিধা হতে পারে?

অনেকের কাছে অবাক লাগলেও, মাসিকের সময় মিলনের কিছু সম্ভাব্য শারীরিক ও মানসিক সুবিধাও রয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক।

মাসিকের ব্যথা থেকে মুক্তি

এটি সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি। অর্গ্যাজমের সময় শরীরে এন্ডোরফিন (Endorphin) নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। এটি মাসিকের সময় হওয়া তলপেটের ব্যথা বা ক্র্যাম্প কমাতে দারুণভাবে সাহায্য করে। অর্গ্যাজমের ফলে জরায়ুর পেশী সংকুচিত হয়, যা জরায়ুর ভেতরের অংশ দ্রুত বাইরে বের করে দিয়ে ব্যথা কমাতে পারে।

প্রাকৃতিক লুব্রিকেশনের সুবিধা

পিরিয়ডের সময় রক্তের প্রবাহ প্রাকৃতিক লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে, যার ফলে অতিরিক্ত লুব্রিকেন্টের প্রয়োজন নাও হতে পারে। এটি মিলনকে আরও আরামদায়ক করে তুলতে পারে, বিশেষ করে যাদের যোনিপথ শুষ্ক (Vaginal Dryness) থাকার সমস্যা রয়েছে।

অর্গ্যাজমের মাধ্যমে মানসিক শান্তি

শারীরিক মিলনের ফলে মানসিক চাপ কমে এবং মেজাজ ভালো থাকে। পিরিয়ডের সময় হরমোনের কারণে যে মুড সুইং বা মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়, অর্গ্যাজম তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করতে পারে।

পিরিয়ডের সময়কাল কমে যাওয়া

অর্গ্যাজমের সময় জরায়ুর পেশী সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এই প্রক্রিয়া জরায়ুর ভেতরের আস্তরণকে (Endometrium) দ্রুত শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে মাসিকের সময়কাল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কমে যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: পিরিয়ডের সময় মিলন করলে কি গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?

এটি একটি বহুল প্রচলিত প্রশ্ন এবং এর উত্তর নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা রয়েছে। সহজ উত্তর হলো – হ্যাঁ, সম্ভাবনা কম হলেও পিরিয়ডের সময় মিলন করলে গর্ভধারণের ঝুঁকি থাকে

ঝুঁকি কতটা এবং কেন?

সাধারণত, ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ওভুলেশন বলা হয়, যা মাসিকের প্রায় ১৪ দিন আগে ঘটে। কিন্তু সবার মাসিক চক্র একরকম হয় না।

  • শুক্রাণুর জীবনকাল: পুরুষের শুক্রাণু  মহিলার যোনিপথে প্রায় ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
  • অনিয়মিত পিরিয়ড: যাদের মাসিক চক্র ছোট (যেমন ২১-২৪ দিনের) বা অনিয়মিত, তাদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ওভুলেশন হয়ে যেতে পারে।
  • উদাহরণ: ধরুন, আপনার পিরিয়ডের চতুর্থ দিনে আপনি মিলন করলেন। শুক্রাণু আপনার শরীরে ৫ দিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে, অর্থাৎ নবম দিন পর্যন্ত। যদি আপনার ওভুলেশন তাড়াতাড়ি হয়, অর্থাৎ দশম বা একাদশ দিনে, তাহলে গর্ভধারণের একটি স্পষ্ট সম্ভাবনা থেকে যায়।

তাই, “পিরিয়ডের সময় মিলন করলে গর্ভধারণ হয় না” – এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও অসুবিধাগুলো কী কী?

সুবিধার পাশাপাশি, এই সময় মিলনের কিছু স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও বাস্তব অসুবিধাও রয়েছে, যা জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

যৌন রোগ (STI) সংক্রমণের আশঙ্কা

পিরিয়ডের সময় জরায়ুমুখ (Cervix) কিছুটা খোলা থাকে। এর ফলে এইচআইভি (HIV), হেপাটাইটিস-বি (Hepatitis B) এর মতো রক্তবাহিত যৌন রোগ  ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। রক্ত জীবাণুর জন্য একটি ভালো মাধ্যম হওয়ায়, সঙ্গী সংক্রামিত থাকলে আপনার এবং আপনি সংক্রামিত থাকলে আপনার সঙ্গীর সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

ইনফেকশনের ভয়

মাসিকের সময় যোনির স্বাভাবিক পিএইচ (pH) স্তরের পরিবর্তন হয়, যা ইস্ট ইনফেকশন (Yeast Infection) বা ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস  এর মতো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অপরিচ্ছন্নতা ও অস্বস্তি

রক্তপাতের কারণে বিছানার চাদর বা পোশাক নোংরা হতে পারে, যা অনেক দম্পতির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এটি কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি নয়, তবে এটি মানসিক এবং পরিবেশগত একটি বড় অসুবিধা।

সঙ্গীর মানসিকতা

শারীরিক মিলনের জন্য দুজনেরই সম্মতি এবং মানসিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। আপনার সঙ্গী যদি এই সময় মিলনে স্বচ্ছন্দ বোধ না করেন, তবে তাকে জোর করা উচিত নয়। এটি সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।পিরিয়ডের সময় নিরাপদ মিলনের জন্য কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?

আপনি যদি সব দিক বিবেচনা করে পিরিয়ডের সময় মিলনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে কিছু সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

  • খোলামেলা আলোচনা জরুরি: আপনার সঙ্গীর সাথে এই বিষয়ে খোলামেলা কথা বলুন। তার মতামত, স্বাচ্ছন্দ্য এবং অস্বস্তির জায়গাগুলো জানুন। आपसी বোঝাপড়াই সুস্থ সম্পর্কের চাবিকাঠি।
  • কনডম ব্যবহার বাধ্যতামূলক: এই সময়ে কনডম ব্যবহার করা প্রায় বাধ্যতামূলক। এটি শুধুমাত্র গর্ভধারণের ঝুঁকিই কমায় না, বরং এসটিআই (STI) সংক্রমণের আশঙ্কাও বহুলাংশে হ্রাস করে।
  • সঠিক পজিশন বেছে নিন: মিশনারি পজিশনের (যেখানে মহিলা নিচে থাকেন) মতো পজিশনগুলো রক্তপ্রবাহ কিছুটা কমাতে পারে এবং আরামদায়ক হতে পারে।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন: মিলনের আগে এবং পরে যৌনাঙ্গ পরিষ্কার রাখুন। বিছানায় একটি তোয়ালে ব্যবহার করতে পারেন যাতে দাগ লাগার চিন্তা না থাকে। শাওয়ারে মিলনও একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।

    পিরিয়ডের সময় যৌন মিলন: কী জানা প্রয়োজন?

প্রচলিত ভুল ধারণা এবং তার পেছনের সত্য

ভুল ধারণা ১: পিরিয়ডের রক্ত অপরিষ্কার

সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। পিরিয়ডের রক্ত অপরিষ্কার বা “অশুচি” নয়। এটি জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ, টিস্যু এবং রক্তের একটি স্বাভাবিক মিশ্রণ, যা গর্ভধারণ না হলে শরীর থেকে প্রতি মাসে বেরিয়ে আসে।

ভুল ধারণা ২: এই সময় মিলন করলে গর্ভধারণ অসম্ভব

সত্য: যেমনটা আগেই আলোচনা করা হয়েছে, এটিও একটি ভুল ধারণা। ঝুঁকি কম হলেও গর্ভধারণের সম্ভাবনা থেকেই যায়, বিশেষ করে যাদের মাসিক চক্র অনিয়মিত

পরিশেষে, পিরিয়ডের সময় মিলন করলে কি হয়, এই প্রশ্নের উত্তরটি হ্যাঁ বা না-তে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, যা একজন দম্পতির आपसी বোঝাপড়া, শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং সুরক্ষার উপর নির্ভর করে। এর যেমন কিছু সম্ভাব্য সুবিধা (যেমন ব্যথা মুক্তি) রয়েছে, তেমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও (যেমন সংক্রমণ ও গর্ভধারণ) রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সঠিক তথ্য জানা, সঙ্গীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করা এবং সুরক্ষার জন্য অবশ্যই কনডম ব্যবহার করা। আপনার শরীর আপনার, তাই তার প্রতি যত্নশীল হন এবং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না যা আপনার স্বাস্থ্য বা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।এই বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা বা কোনো প্রশ্ন থাকলে, আমাদের কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। সুস্থ থাকুন, সুরক্ষিত থাকুন।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।

আরও পড়ুন