রেবিস ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কতদিন থাকে? জলাতঙ্ক প্রতিরোধের গাইড

কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী কামড়ালে কিংবা আঁচড় দিলে আমাদের মনে সবচেয়ে বড় যে আতঙ্কটি কাজ করে, তা হলো জলাতঙ্ক বা রেবিস। এটি এমন একটি মরণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ,…

Debolina Roy

কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী কামড়ালে কিংবা আঁচড় দিলে আমাদের মনে সবচেয়ে বড় যে আতঙ্কটি কাজ করে, তা হলো জলাতঙ্ক বা রেবিস। এটি এমন একটি মরণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ, যার লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে রোগীর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত । তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদে সঠিক সময়ে টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগটি ১০০ শতাংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব । যারা ইতিমধ্যে এই টিকা নিয়েছেন বা নেওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের মনে প্রায়শই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—রেবিস ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কতদিন থাকে? কেউ ভাবেন এটি হয়তো কয়েক মাস কাজ করে, আবার কেউ মনে করেন একবার নিলে সারাজীবন আর টিকা নিতে হয় না। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা রেবিস ভ্যাকসিনের মেয়াদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইন, টিকার সঠিক ডোজ এবং পুনরায় কামড়ালে কী করতে হবে—সেসব বিষয়ে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানব।

রেবিস বা জলাতঙ্ক রোগ কী এবং কেন এই ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি?

জলাতঙ্ক বা রেবিস হলো একটি অত্যন্ত ভয়ংকর স্নায়ুবিক রোগ, যা মূলত রেবিস ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায় । যখন কোনো আক্রান্ত প্রাণী (যেমন—কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বানর বা বাদুড়) সুস্থ কোনো মানুষকে কামড়ায় বা আঁচড় দেয়, তখন প্রাণীর লালারসে থাকা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে । এই ভাইরাস ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং একবার মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটে গেলে রোগীকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে কামড় বা আঁচড়ের পরপরই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রেবিস ভ্যাকসিন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই ভ্যাকসিন মূলত ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, যা ভাইরাসটিকে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করে দেয় ।

জলাতঙ্ক কীভাবে ছড়ায় এবং কাদের ঝুঁকি বেশি?

সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালা যদি মানুষের শরীরের কোনো কাটা-ছেঁড়া বা ক্ষতের সংস্পর্শে আসে, তবেই এই রোগ ছড়ানোর সুযোগ থাকে। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণের শিকার হওয়া মানুষজন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন । এছাড়া যারা পশুচিকিৎসক (Veterinarian), বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেন অথবা ল্যাবরেটরিতে রেবিস ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তাই তাদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সচেতনতামূলক টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।​

আরও পড়ুনঃ জলাতঙ্ক: কুকুর কামড়ালে ২-৩ মাসের মধ্যেই প্রাণঘাতী রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে!

জলাতঙ্কের কারণ ও ঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্য:

বিষয় বিস্তারিত তথ্য
প্রধান বাহক কুকুর (প্রায় ৯৯% ক্ষেত্রে), বিড়াল, শিয়াল, বানর ও বাদুড়।
সংক্রমণের মাধ্যম আক্রান্ত প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা ক্ষতের ওপর লালা লাগলে।
ঝুঁকিপূর্ণ পেশা পশুচিকিৎসক, চিড়িয়াখানার কর্মী, বন বিভাগের কর্মী এবং ল্যাবরেটরি গবেষক।
ভ্যাকসিন নেওয়ার কারণ লক্ষণ প্রকাশের আগেই ভাইরাস ধ্বংস করে শতভাগ মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো।

রেবিস ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কতদিন থাকে?

মূল আলোচনায় আসা যাক। রেবিস ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কতদিন থাকে, তা মূলত নির্ভর করে আপনি কোন উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ভ্যাকসিনটি নিয়েছেন তার ওপর। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেবিস ভ্যাকসিন দেওয়ার দুটি প্রধান পদ্ধতি রয়েছে—কামড়ানোর আগে (PrEP) এবং কামড়ানোর পরে (PEP)। আধুনিক টিস্যু কালচার ভ্যাকসিনগুলো (যেমন HDCV বা PCECV) মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ স্মৃতি তৈরি করতে সক্ষম । একবার পূর্ণাঙ্গ কোর্স শেষ করার পর আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) রেবিস ভাইরাসকে চিনে রাখে এবং মেমোরি টি-সেল তৈরি করে। এর ফলে ভ্যাকসিনের প্রাথমিক অ্যান্টিবডি কয়েক বছর পর কমে গেলেও, শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করার একটি அடிப்படை প্রস্তুতি ধরে রাখে ।

প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (PrEP) এর কার্যকারিতা

যারা পেশাগত কারণে জলাতঙ্কের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের কামড় খাওয়ার আগেই সতর্কতামূলক যে টিকা দেওয়া হয় তাকে প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (PrEP) বলা হয়। সাধারণত এই টিকার ২ থেকে ৩টি ডোজ দেওয়া হয়। PrEP নেওয়ার পর শরীরে যে বেসলাইন ইমিউনিটি তৈরি হয়, তার কার্যকারিতা সাধারণত ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত শক্তিশালী থাকে । তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু আধুনিক ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা ১০ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে বজায় থাকতে পারে । উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি ৬ মাস থেকে ২ বছর অন্তর অ্যান্টিবডি টাইটার পরীক্ষা করে প্রয়োজনে বুস্টার ডোজ নিতে হয়।

পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (PEP) এর কার্যকারিতা

কুকুর বা বিড়াল কামড়ানোর পর যে টিকা দেওয়া হয়, তাকে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা PEP বলা হয়। কেউ যদি সঠিক নিয়মে PEP-এর পূর্ণাঙ্গ কোর্স (৪টি বা ৫টি ডোজ) শেষ করেন, তবে তার শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে যদি তাকে আবার কোনো প্রাণী কামড়ায়, তবে তাকে নতুন করে আর পুরো কোর্স নিতে হয় না । কারণ তার শরীরে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বা ‘প্রতিরক্ষা স্মৃতি’ বহু বছর এমনকি সারাজীবন রয়ে যায়। তখন শুধু প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জাগিয়ে তোলার জন্য ২ ডোজ বুস্টার ইনজেকশন নিলেই শরীর দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে ।

ভ্যাকসিনের ধরন অনুযায়ী কার্যকারিতার মেয়াদ:

ভ্যাকসিনের ধরন কার্যকারিতার সময়কাল ও প্রতিরোধ ক্ষমতা
PrEP (কামড়ানোর আগে টিকা) ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত শক্তিশালী বেসলাইন ইমিউনিটি থাকে; ক্ষেত্রবিশেষে ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে ।
PEP (কামড়ানোর পরে সম্পূর্ণ কোর্স) দীর্ঘমেয়াদি বা আজীবন ‘মেমোরি সেল’ তৈরি করে। পুনরায় কামড়ালে শুধু বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয় ।
বুস্টার ডোজের প্রভাব বুস্টার ডোজ দেওয়ার সাথে সাথেই শরীর খুব দ্রুত পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে।

কুকুর বা বিড়াল কামড়ানোর পর টিকার ডোজ ও সময়কাল (WHO গাইডলাইন)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য টিকার সুস্পষ্ট গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে কতদিনের মধ্যে টিকা নিতে হবে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কামড় বা আঁচড় লাগার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রথম ডোজ টিকা নেওয়া উচিত । দেরি করলে ভাইরাসের মস্তিষ্কে পৌঁছানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়। পূর্বে রেবিস ভ্যাকসিনের ৫টি ডোজের দীর্ঘ শিডিউল প্রচলিত থাকলেও, বর্তমানে আধুনিক গবেষণার ফলে ডোজের সংখ্যা অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে, যা রোগীদের জন্য সময় এবং অর্থ উভয়ই সাশ্রয় করে ।

সাধারণ ৫-ডোজ এবং ৪-ডোজ শিডিউল

বাংলাদেশে সাধারণত ইন্ট্রামাসকুলার (মাংসে) ইনজেকশনের ক্ষেত্রে ৫-ডোজের একটি শিডিউল খুব পরিচিত। এর নিয়ম হলো: প্রথম দিন (০ তম দিন) প্রথম ডোজ, এরপর ৩য়, ৭ম, ১৪তম এবং ২৮তম দিনে বাকি ডোজগুলো নিতে হয় । অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে ৪-ডোজের ‘জাগরেব শিডিউল’ (Zagreb regimen) অনুমোদন করেছে, যেখানে প্রথম দিন (০ তম দিন) দুই হাতে দুটি টিকা এবং ৭ম ও ২১তম দিনে একটি করে টিকা দেওয়া হয় । এর ফলে রোগী খুব দ্রুত ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়।

আধুনিক ৩-ডোজ শিডিউল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, এখন মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে রেবিস ভ্যাকসিনের কোর্স শেষ করা সম্ভব। এই নিয়মে মাত্র ৩টি ডোজ দেওয়া হয়—০, ৩ এবং ৭ তম দিনে । এটি সাধারণত ইন্ট্রাডার্মাল (চামড়ার নিচে) পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া ভারতে সম্প্রতি ‘থ্রাবিস’ (Thrabis) নামক একটি রিকম্বিন্যান্ট ন্যানোপার্টিকল-ভিত্তিক ভ্যাকসিন অনুমোদিত হয়েছে, যা মাংসে মাত্র ৩ ডোজে (০, ৩, ৭ দিনে) সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে সক্ষম । এই নতুন পদ্ধতিগুলো রেবিস ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কতদিন থাকে, সেই নিশ্চয়তা বজায় রেখেই রোগীদের হাসপাতাল পরিদর্শনের ঝামেলা কমিয়ে এনেছে।

রেবিস ভ্যাকসিনের বিভিন্ন শিডিউল ও ডোজের তালিকা:

শিডিউলের নাম ডোজ নেওয়ার নির্দিষ্ট দিনসমূহ টিকার পরিমাণ / পদ্ধতি
ঐতিহ্যবাহী এসেন শিডিউল ০, ৩, ৭, ১৪, এবং ২৮ তম দিন (মোট ৫টি ডোজ) ​ মাংসে (IM) ১টি করে ইনজেকশন
জাগরেব শিডিউল ০ (দুটি ডোজ), ৭ এবং ২১ তম দিন (মোট ৪টি ডোজ) ​ মাংসে (IM)
WHO ১-সপ্তাহের শিডিউল ০, ৩, এবং ৭ তম দিন (মোট ৩টি ভিজিট) ​ চামড়ার নিচে (ID) ২-সাইট ইনজেকশন
আধুনিক রিকম্বিন্যান্ট (যেমন Thrabis) ০, ৩, এবং ৭ তম দিন (মোট ৩টি ডোজ) ​ মাংসে (IM) ১টি করে ইনজেকশন

একবার পূর্ণ কোর্স নেওয়ার পর আবার কামড়ালে কী করণীয়?

অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন যে, একবার টিকার সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করার কয়েক মাস বা বছর পর যদি আবার কুকুর কামড়ায়, তবে কি পুনরায় ৫টি বা ৪টি ডোজ নিতে হবে? চিকিৎসাবিজ্ঞান এই প্রশ্নের খুব সহজ একটি সমাধান দিয়েছে। যেহেতু একবার পূর্ণ কোর্স নিলে শরীরে রেবিস ভ্যাকসিনের দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি তৈরি হয়ে যায়, তাই দ্বিতীয়বার আর সম্পূর্ণ কোর্স নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই । তবে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এবং দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি করার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে বুস্টার ডোজ নেওয়া বাধ্যতামূলক।​

বুস্টার ডোজ কখন এবং কেন প্রয়োজন?

আগে টিকা নেওয়া থাকলে নতুন করে কামড়ানোর পর সাধারণত ইমিউনোগ্লোবিউলিন (RIG) ইনজেকশনের প্রয়োজন হয় না, যা একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ক্ষেত্রবিশেষে দুষ্প্রাপ্য ওষুধ । আপনি যদি আগে সম্পূর্ণ কোর্স নিয়ে থাকেন এবং কামড়ানোর ঘটনাটি আগের টিকা নেওয়ার ৩ মাসের মধ্যে ঘটে থাকে, তবে কিছু চিকিৎসা গাইডলাইন অনুযায়ী নতুন করে কোনো ডোজ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তবে যদি ৩ মাস বা তার বেশি সময় পার হয়ে যায়, তখন আপনাকে মাত্র ২টি বুস্টার ডোজ নিতে হবে। এই বুস্টার ডোজ দুটি নিতে হয় কামড়ানোর প্রথম দিন (০ তম দিন) এবং ৩য় দিনে । এই দুটি ডোজই শরীরের মেমোরি সেলগুলোকে জাগিয়ে তুলে দ্রুত অ্যান্টিবডি লেভেল বাড়িয়ে দেয় এবং জলাতঙ্ক থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

পূর্ববর্তী ভ্যাকসিনের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান করণীয়:

পূর্ববর্তী টিকার অবস্থা পুনরায় কামড়ালে করণীয় ইমিউনোগ্লোবিউলিন (RIG) প্রয়োজন কি না
আগে কখনো টিকা নেননি সম্পূর্ণ কোর্স (৪ বা ৫ ডোজ) নিতে হবে ​। ক্ষত গভীর হলে (Category III) অবশ্যই নিতে হবে ​।
আগে পূর্ণ কোর্স নিয়েছেন (৩ মাসের মধ্যে) সাধারণত নতুন করে টিকার প্রয়োজন হয় না (তবে চিকিৎসকের পরামর্শ বাধ্যতামূলক)। প্রয়োজন নেই।
আগে পূর্ণ কোর্স নিয়েছেন (৩ মাসের বেশি বা কয়েক বছর পর) মাত্র ২টি বুস্টার ডোজ নিতে হবে (০ এবং ৩য় দিনে) ​। প্রয়োজন নেই ​।

রেবিস ভ্যাকসিনের সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সতর্কতা

যেকোনো টিকার মতোই অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিনেরও কিছু সাধারণ এবং মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তবে জলাতঙ্কের মতো ১০০% প্রাণঘাতী রোগের ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করলে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সম্পূর্ণ তুচ্ছ। অনেকেই ভ্যাকসিনের ব্যথার ভয়ে বা জ্বর আসার আতঙ্কে টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন, যা নিজের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি ডেকে আনতে পারে। মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় বা স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও রেবিস ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নিরাপদ।

টিকা নেওয়ার পর কী করবেন এবং কী করবেন না

ভ্যাকসিন নেওয়ার স্থানে সামান্য ব্যথা হওয়া, লাল হয়ে যাওয়া বা ফুলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এছাড়া অনেকের হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা, পেশিতে ব্যথা বা বমি বমি ভাব হতে পারে । চিকিৎসকরা জানান, এই লক্ষণগুলো সাধারণত ১ থেকে ২ দিনের মধ্যেই নিজে নিজে ঠিক হয়ে যায়। জ্বর বা ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। টিকা চলাকালীন সময়ে অতিরিক্ত ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকা ভালো এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। কোনোভাবেই ক্ষতের স্থানে সেলাই দেওয়া, অ্যাসিড বা ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক লাগানো উচিত নয়। শুধু প্রবহমান পরিষ্কার পানি এবং ক্ষারযুক্ত সাবান দিয়ে ক্ষতস্থানটি অন্তত ১৫ মিনিট ধোয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।

রেবিস ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা:

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন লক্ষণ ও প্রভাব সতর্কতা ও করণীয়
স্থানীয় (Local) ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা, লালভাব, চুলকানি বা ফুলে যাওয়া ​। বরফ বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যেতে পারে। চুলকানো বা ঘষা যাবে না।
সিস্টেমিক (Systemic) হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, বমি ভাব বা পেশিতে ব্যথা ​। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন।
গুরুতর (খুবই বিরল) শ্বাসকষ্ট, শরীরে র‍্যাশ বের হওয়া বা অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন। অবিলম্বে হাসপাতালে বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে চূড়ান্ত সতর্কতা

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সচেতনতাই হলো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যেকোনো ধরনের প্রাণী, বিশেষ করে কুকুর বা বিড়াল আঁচড় দিলে বা কামড়ালে এক মুহূর্তও দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এই আলোচনায় আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি রেবিস ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কতদিন থাকে এবং এটি কীভাবে আমাদের শরীরকে সুরক্ষা দেয়। একবার ভ্যাকসিনের পূর্ণাঙ্গ কোর্স সম্পন্ন করলে এটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা তৈরি করে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। পরবর্তীতে পুনরায় আক্রান্ত হলে শুধু বুস্টার ডোজের মাধ্যমেই এই সুরক্ষাকে আবার সক্রিয় করা সম্ভব। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখুন এবং সঠিক নিয়মে রেবিস ভ্যাকসিন গ্রহণ করে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে জলাতঙ্কের মতো ভয়াবহ রোগের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখুন।

About Author
Debolina Roy

দেবলীনা রায় একজন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, যিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা দেবলীনা তার লেখায় চিকিৎসা বিষয়ক জটিল তথ্যগুলি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং উপকারী। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এবং রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এবং প্রাঞ্জল লেখনী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেবলীনা রায়ের লক্ষ্য হল সঠিক ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।