ভারতের তেল মজুত কতদিনের? মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম খুলল নয়া দিল্লি

মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলছে। ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষ এখন এমন একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সারা বিশ্বের শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত হুমকির মুখে পড়েছে। পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ গলিপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে…

Avatar

মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলছে। ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষ এখন এমন একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সারা বিশ্বের শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত হুমকির মুখে পড়েছে। পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ গলিপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে বলে ইরান জানিয়ে দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং এলএনজি সরবরাহ হয়। ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি আরও বেশি চিন্তার কারণ, কারণ দেশের মোট গ্যাস ও তেল সরবরাহের প্রায় ৫০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়েই আসে।

এই আবহে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা উঠে এসেছে — ভারতের তেল মজুত আর কতদিনের? দেশে কি জ্বালানির অভাব পড়তে চলেছে? পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস — সব কিছু কি অনিশ্চয়তার মুখে? এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই নড়েচড়ে বসল নয়া দিল্লি। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক রাতারাতি ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করল। তেলের মজুত থেকে শুরু করে সরবরাহ পথ — সবকিছুই এখন সার্বক্ষণিক নজরদারিতে।​

হরমুজ প্রণালী বন্ধ: কী ঘটল মধ্যপ্রাচ্যে?

সংঘর্ষের সূচনা এবং বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে পরিস্থিতি এমন একটি মোড় নিল যা বিশ্বের শক্তি বাজারকে কার্যত থামিয়ে দিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আকবরজাদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী এখন ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নৌবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যে কোনো জাহাজ এই পথ দিয়ে যেতে চাইলে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার শিকার হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।​

২ মার্চ ২০২৬, সোমবার — ইরানের ড্রোন হামলার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ করে দিল কাতার। এর সঙ্গে সৌদি আরব এবং ইরাকের একাধিক রিফাইনারিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বীমা কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলের জন্য কভারেজ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় পণ্যবাহী জাহাজগুলো রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের দামে।​

বিশ্বের তেল উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যের অবদান

বিশ্বের শীর্ষ দশটি তেল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে পাঁচটি — সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ইরাক, ইরান এবং কুয়েত — মধ্যপ্রাচ্যেই অবস্থিত। ২০২৪ সালে এই অঞ্চল বিশ্বের মোট তেলের ৩১ শতাংশ উৎপাদন করেছে এবং বৈশ্বিক রপ্তানির ৩৮ শতাংশ এখান থেকেই গেছে। তাই এই সংঘাত শুধু ভারতের নয়, সমস্ত তেল আমদানিকারক দেশের জন্যই বিপদের সংকেত।​

বিষয় তথ্য
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহ প্রায় ২০%
ভারতের তেল সরবরাহে হরমুজের অবদান প্রায় ৫০%
মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্ব তেল উৎপাদনে অংশ ৩১% (২০২৪)
কাতারের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ ২ মার্চ ২০২৬ থেকে
সৌদি আরবের এলপিজি পাইপলাইনে হামলা হয়েছে


ভারতের তেল মজুত: এখন কতদিনের মজুদ আছে?

সরকারি সূত্র কী জানাচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যখন ঘোলা হচ্ছিল, তখন ভারতের তেল মজুত নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছিল। কেন্দ্র সরকার বিষয়টি পরিষ্কার করতে এগিয়ে আসে। একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের ভাণ্ডারে এখন ২৫ দিনের অপরিশোধিত তেল (crude oil) এবং পাশাপাশি ২৫ দিনের পরিশোধিত জ্বালানি (petrol, diesel, LPG) মজুত রয়েছে। তবে এর মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) অর্থাৎ জরুরি মজুত ধরা হয়নি। সেটি হিসাবে ধরলে মোট মজুত আরও বেশি।​

মাত্র এক সপ্তাহে কীভাবে কমল ৭৪ থেকে ২৫ দিনে?

এটি অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলেছে। মাত্র সপ্তাহখানেক আগেও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী রাজ্যসভায় জানিয়েছিলেন, ভারতের কাছে ৭৪ দিনের তেলের মজুত রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ সেটা ২৫ দিনে নেমে আসার কারণ হলো হিসাবের পার্থক্য। ৭৪ দিনের হিসাবে স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ, ট্রানজিটে থাকা তেল এবং পাইপলাইনে থাকা তেল সব ধরা হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর যে মজুত নতুন সরবরাহ ছাড়াই কাজে লাগানো যাবে, সেটাই এখন ২৫ দিনের।​

স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ আলাদাভাবে কতটা?

ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ লিমিটেড (ISPRL) দেশের জরুরি তেল মজুত পরিচালনা করে। এই মুহূর্তে তিনটি ভূগর্ভস্থ গুহায় মোট ৫.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন (প্রায় ৩৯.১ মিলিয়ন ব্যারেল) অপরিশোধিত তেল সংরক্ষিত রয়েছে। এই মজুত জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য আলাদা রাখা আছে এবং সাধারণ দৈনিক সরবরাহের মধ্যে এটি ধরা হয় না।​

মজুতের ধরন সময়কাল
অপরিশোধিত তেল (সরবরাহ বন্ধ থাকলে) ২৫ দিন
পরিশোধিত জ্বালানি (petrol/diesel/LPG) ২৫ দিন
স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ সহ (সামগ্রিক) ৭৪ দিন পর্যন্ত
আইইএ-র লক্ষ্যমাত্রা ৯০ দিন
ভারতের বর্তমান লক্ষ্য (ISPRL CEO) ৯০ দিন


২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম: কী উদ্দেশ্যে, কোথায়?

কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক (MoPNG) তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নেয়। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী ৩ মার্চ ২০২৬ সালে গণমাধ্যমকে জানান যে, সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। এই কন্ট্রোল রুম দেশের প্রতিটি কোণে জ্বালানির সরবরাহ, মজুতের পরিমাণ এবং লজিস্টিক্স রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করবে।​

কন্ট্রোল রুমের কাজ কী কী?

  • দেশে কতটা তেল সরবরাহ হচ্ছে, তার সার্বক্ষণিক নজরদারি
  • পেট্রোল, ডিজেল এবং এলপিজির মজুত পরিমাণ প্রতিদিন আপডেট করা
  • সরবরাহ চেইনে কোনো বাধা তৈরি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া
  • বিকল্প আমদানি পথ এবং উৎস খোঁজার জন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয় করা
  • ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে ধাপে ধাপে সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া​

বিদেশ মন্ত্রণালয়ের পৃথক কন্ট্রোল রুম

শুধু তেল সরবরাহ নয়, বিদেশ মন্ত্রণালয়ও আলাদা কন্ট্রোল রুম খুলেছে। এই কন্ট্রোল রুম মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করবে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই কন্ট্রোল রুম সক্রিয় থাকবে। এর জন্য বেশ কয়েকটি টোল-ফ্রি ও সরাসরি ফোন নম্বরও ঘোষণা করা হয়েছে।​

টোল-ফ্রি নম্বর: ১৮০০১১৮৭৯৭
সরাসরি নম্বর: ৯১-১১-২৩০১২১১৩ | ৯১-১১-২৩০১৪১০৪ | ৯১-১১-২৩০১৭৯০৫ ​

বাহরাইন, ইরান, ইরাক, ইজরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কন্ট্রোল রুমের ধরন উদ্দেশ্য সময়সীমা
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের কন্ট্রোল রুম তেল সরবরাহ ও মজুত পর্যবেক্ষণ ২৪×৭
বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুম ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা সকাল ৯টা – রাত ৯টা


ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ: কোথায় আছে মজুত?

তিনটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ গুহায় সংরক্ষণ

ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ প্রোগ্রামের প্রথম পর্যায়ে তিনটি স্থানে ভূগর্ভস্থ শিলাগুহায় তেল সংরক্ষণ করা হয়। এই স্থানগুলো হলো — অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম (১.৩৩ MMT), কর্ণাটকের মঙ্গলুরু (১.৫ MMT) এবং কর্ণাটকের পাডুর (২.৫ MMT)। তিনটি স্থানে মিলিয়ে মোট ধারণ ক্ষমতা ৫.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা প্রায় ৩৯.১ মিলিয়ন ব্যারেলের সমান।​

কেন ভূগর্ভস্থ গুহায় রাখা হয়?

মাটির নিচে গভীর শিলাগুহায় তেল রাখার অনেক সুবিধা। পরিবেশগত প্রভাব কম, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কম এবং নিরাপত্তা অনেক বেশি। ভারতে হার্ড রক কেভার্ন পদ্ধতিতে এই গুহাগুলো তৈরি করা হয়েছে — পাথর খুঁড়ে বের করে তার মধ্যে তেল রাখা হয়। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সল্ট কেভার্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে, যেখানে লবণ গলিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা হয় — এই পদ্ধতি আরও দ্রুত তেল ভরা ও বের করার কাজে সহায়ক।​

দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা

২০২১ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্র সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ওড়িশার চন্দিখোলে ৪ MMT এবং কর্ণাটকের পাডুরে আরও ২.৫ MMT ক্ষমতার দুটি নতুন রিজার্ভ তৈরি হবে। এগুলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে পরিচালিত হবে। এর বাইরে রাজস্থানের বিকানেরে লবণ গুহায় ৫.২-৫.৩ MMT ক্ষমতার আরও একটি রিজার্ভ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।​

স্থান রাজ্য ধারণ ক্ষমতা পর্যায়
বিশাখাপত্তনম অন্ধ্রপ্রদেশ ১.৩৩ MMT প্রথম
মঙ্গলুরু কর্ণাটক ১.৫ MMT প্রথম
পাডুর কর্ণাটক ২.৫ MMT প্রথম + দ্বিতীয়
চন্দিখোল ওড়িশা ৪ MMT দ্বিতীয়
বিকানের রাজস্থান ৫.২-৫.৩ MMT তৃতীয় (পরিকল্পনাধীন)


ভারতের তেল আমদানি: নির্ভরতা কতটা গভীর?

৮০ শতাংশ তেলই বাইরে থেকে আসে

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এবং ভোক্তা দেশ। দেশের মোট তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে নিজস্ব উৎপাদন যৎসামান্য, তাই বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে কোনো ধাক্কা লাগলে তার সরাসরি প্রভাব ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় পড়ে।

সৌদি আরব এবং রাশিয়া: দুই মূল উৎস

রান্নার গ্যাস বা এলপিজির জন্য ভারতকে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে হয় সৌদি আরবের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি আরবের এলপিজি পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে। অপরদিকে, রাশিয়া সম্প্রতি ভারতের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। পুতিনের দেশ জানিয়েছে, যে কোনো পরিস্থিতিতে ভারতকে তেল সরবরাহ করতে রাশিয়া প্রস্তুত। তবে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির পর থেকে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কিছুটা কমিয়ে এনেছিল।​

নরওয়ে এবং আমেরিকাও বিকল্প হিসেবে

ভারত নরওয়ে ও আমেরিকা থেকেও কিছুটা রান্নার গ্যাস কেনে। এখন এই দুই দেশ থেকে কেনার পরিমাণ বাড়ানো হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত এখন নয়া দিল্লিতে আলোচনা হচ্ছে। এর পাশাপাশি পশ্চিম আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকা থেকেও বেশি পরিমাণ তেল আনার বিষয়ে ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলো সক্রিয় হয়েছে।​

তেল উৎস বর্তমান অবস্থা
সৌদি আরব (এলপিজি) পাইপলাইনে হামলা, সরবরাহ বিপদে
কাতার (এলএনজি) ড্রোন হামলার পর উৎপাদন বন্ধ
রাশিয়া (ক্রুড অয়েল) সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে
আমেরিকা ও নরওয়ে পরিমাণ বাড়ানোর বিষয় আলোচনায়
পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা বিকল্প উৎস হিসেবে খোঁজা হচ্ছে


ভারতের বিকল্প পরিকল্পনা: কী ভাবছে নয়া দিল্লি?

কেপ অফ গুড হোপ রুট: দীর্ঘ কিন্তু নিরাপদ

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে আসতে পারে। একটি সরকারি সূত্র মানিকন্ট্রোলকে জানিয়েছে, এই বিকল্প পথে বিমা ও মালবাহী খরচ বাড়বে, কিন্তু সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে। তবে দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সময়ও অনেক বেশি লাগবে — এটি দ্রুত সমাধান হিসেবে আদর্শ নয়।​

রাশিয়ার ভাসমান মজুত

আরবি সাগর এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাংকারে বেশ কিছু তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ভারত চাইলে এই মজুত দ্রুত কিনে নিতে পারে। এটি একটি তুলনামূলক সহজ বিকল্প, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির কারণে ভারতকে এই সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক চাপও বিবেচনায় নিতে হবে।​

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশ্বাস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেছেন, তিনি ইউএস ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে উপসাগর দিয়ে যাওয়া সমস্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য, বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারগুলিকে এসকোর্ট করবে।​

এলএনজি সংকট: ভারতের জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত করা কঠিন কেন?

ক্রুড অয়েলের তুলনায় এলএনজি মজুত করা অনেক জটিল এবং ব্যয়বহুল। বিশেষ কম তাপমাত্রার ট্যাংকে রাখতে হয়, তাই এলএনজির ক্ষেত্রে ভারতের সুরক্ষা কবচ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কাতার ভারতের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী, এবং সেদেশে উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় ভারতের রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্প কারখানা পর্যন্ত চাপ বাড়তে পারে।​

কতদিন ধরে চলবে এই সমস্যা?

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, সরকার মনে করছে না এলএনজি সরবরাহে কোনো বড় বাধা আসবে। তবে বন্ধ অবস্থা যদি এক সপ্তাহ বা দশ দিনের বেশি চলে, তাহলে স্থানীয় স্তরে পরিবর্তন করতে হতে পারে। ভারতীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই বিকল্প বাজার থেকে বাড়তি এলএনজি কার্গো খোঁজা শুরু করেছে।​

স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভে ২০২৫-২৬ সালে বিনিয়োগ

বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ

কেন্দ্র সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে তেল কেনার জন্য ৫৫.৯৭ বিলিয়ন রুপি (৬৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বরাদ্দ রেখেছে। এর পাশাপাশি রিজার্ভগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১.৮ বিলিয়ন রুপি এবং নতুন গুহা নির্মাণ ও জমি কেনার জন্য ৩.৩৫ বিলিয়ন রুপি বরাদ্দ রয়েছে।​

৯০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা

ISPRL-এর সিইও এল আর জৈন স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য হলো ৯০ দিনের ভোগমাত্রার সমান তেল মজুত রাখা। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA)-র সদস্যদের জন্যও এই একই ৯০ দিনের মানদণ্ড রাখা হয়েছে। ভারত এখনো IEA-র পূর্ণ সদস্য নয়, তবে দেশটি এই মানদণ্ড পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।​

বরাদ্দের ধরন পরিমাণ
তেল কেনা (SPR পূর্ণ করতে) ₹৫৫,৯৭০ কোটি ($৬৪৭ মিলিয়ন)
রক্ষণাবেক্ষণ ₹১,৮০০ কোটি
নতুন গুহা নির্মাণ ও ভূমি ক্রয় ₹৩,৩৫০ কোটি
IEA লক্ষ্যমাত্রা ৯০ দিনের মজুত


বিশ্বের অন্যান্য দেশ কীভাবে এই সংকট সামলাচ্ছে?

আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ: সবচেয়ে বড়

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি তেলের ভাণ্ডার রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। লুইজিয়ানা এবং টেক্সাসের উপসাগরীয় তটরেখায় লবণ গুহায় প্রায় ৪১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে, এবং গুহাগুলোর সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা ৭১৪ মিলিয়ন ব্যারেল। ট্রাম্প প্রশাসন এই মজুত বিক্রির কথা এখনই ভাবছে না, তবে প্রয়োজনে তা কাজে লাগানো যাবে।​

আমেরিকা অতীতে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়, ২০১৯ সালে সৌদি আরবে হুতি হামলার পর এবং ২০১১ সালে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়ও এই রিজার্ভ ব্যবহার করেছে।​

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা

ভারত তার এসপিআর নীতি পুনর্গঠন করতে গিয়ে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করছে। এই দেশগুলো বেসরকারি সংস্থাগুলিকে তাদের মজুত ব্যবহার ও ব্যবসার সুযোগ দেয়, যার ফলে পরিচালন খরচ কমে এবং ক্ষমতা আরও বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। ভারতও ADNOC-এর মতো বিদেশি কোম্পানিকে তার কিছু ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ ইতিমধ্যেই দিয়েছে।​

ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কী করতে হবে?

আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ

সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, এই মুহূর্তে পেট্রোল, ডিজেল বা রান্নার গ্যাসের কোনো তীব্র সংকট হবে না। যা হবে, তা ধাপে ধাপে বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে সামলানো হবে। সরকারের অগ্রাধিকার হলো জ্বালানির প্রাপ্যতা এবং মূল্য উভয়ই যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।​

কী কী বিষয় নজর রাখতে হবে

  • পেট্রোল পাম্পে অযথা অতিরিক্ত পরিমাণে তেল না ভরানো
  • গ্যাস সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের বাইরে মজুত না করা
  • সরকারি ঘোষণার জন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদ উৎসে নজর রাখা
  • মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত ভারতীয়রা দূতাবাস বা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ রাখা​

ভারতের শক্তি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ পথ

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ

এই সংকট ভারতকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, দেশীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো কতটা জরুরি। সরকারের ‘ড্রিল বেবি ড্রিল’ নীতির আওতায় দেশের ভিতরে অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কাজ চলছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের বার্ষিক পর্যালোচনায়ও এই দিকটি গুরুত্ব পেয়েছিল।​

নবায়নযোগ্য শক্তি: দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং সবুজ হাইড্রোজেনে বিনিয়োগ বাড়ানোই হলো তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পথ। ভারত ইতিমধ্যেই নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তবে তেল থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।

শেষ কথা: সতর্ক ভারত, কিন্তু আতঙ্কের কারণ নেই

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। ভারতের তেল মজুত এই মুহূর্তে ২৫ দিনের মধ্যে নেমে এলেও, স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ এবং বিকল্প সরবরাহ পথ মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি এখনো সামাল দেওয়ার মতো। নয়া দিল্লির ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম এই সংকটকে পেশাদারভাবে মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সরকারের তরফে স্পষ্ট বার্তা এসেছে — জ্বালানির প্রাপ্যতা এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পাশাপাশি, এই সংকট ভারতকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, রিজার্ভ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদে ভারতের শক্তি নিরাপত্তার আসল রক্ষাকবচ। ভারতের তেল মজুত যত বাড়বে, বৈশ্বিক অস্থিরতায় দেশকে ততই কম হোঁচট খেতে হবে।

 

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম