Mahashivratri 2026 Rituals: মহাশিবরাত্রি হলো হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র উৎসব, যা দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনায় উৎসর্গীকৃত। ২০২৬ সালে এই মহাপুণ্যলগ্ন পালিত হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে এই ব্রত পালন করা হয়, যেখানে ভক্তরা দিনরাত উপবাস রেখে চার প্রহরে শিবপূজা করেন এবং রাত্রিজাগরণ করেন। ব্রতকালীন নির্জলা বা ফলাহারী উপবাস পালন করা শুভ ফলদায়ক, তবে অন্ন-ভোজন, তামসিক খাদ্য, ঘুম এবং ক্রোধের মতো কাজগুলি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই ব্রত পাপমোচন, মনের শান্তি এবং শিবের আশীর্বাদ লাভের অন্যতম উপায় বলে শাস্ত্রে বর্ণিত।
মহাশিবরাত্রির পৌরাণিক উৎপত্তি ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে মহাশিবরাত্রি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। শিবপুরাণ এবং অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, এই রাতেই ভগবান শিব এবং দেবী পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। দেবী সতী পার্বতী রূপে জন্মগ্রহণ করে কঠোর তপস্যার মাধ্যমে শিবকে স্বামী রূপে লাভ করেন। এছাড়া সমুদ্রমন্থনের সময় কালকূট বিষ পান করে শিব বিশ্বকে রক্ষা করেন, এবং এই রাতেই তিনি লিঙ্গরূপে প্রথম প্রকাশিত হন।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই রাত্রি শিবতত্ত্বের জাগরণের প্রতীক। শিব হলেন পুরুষ (চৈতন্য) এবং শক্তি (প্রকৃতি)-র মিলনের প্রতীক। এই রাতে ধ্যান, জপ এবং উপবাসের মাধ্যমে ভক্তরা নিজের অন্তরের শিবত্বকে জাগ্রত করতে পারেন। শাস্ত্র মতে, এই ব্রত পালনে বহু জন্মের পাপ ধ্বংস হয় এবং মোক্ষলাভের পথ প্রশস্ত হয়।
২০২৬ সালের মহাশিবরাত্রির তিথি ও শুভ সময়সূচি
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে ২০২৬ সালে চতুর্দশী তিথি শুরু হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫:০৪ মিনিট থেকে এবং শেষ হবে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে। নিশীথকাল পূজার শুভ সময় রাত ১২:০৯ থেকে ১:০১ মিনিট (১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত্রি)।
শিবরাত্রির পূজা চার প্রহরে বিভক্ত:
- প্রথম প্রহর: সন্ধ্যা ৬:০০ থেকে রাত ৯:০০
- দ্বিতীয় প্রহর: রাত ৯:০০ থেকে মধ্যরাত ১২:০০
- তৃতীয় প্রহর: মধ্যরাত ১২:০০ থেকে ভোর ৩:০০
- চতুর্থ প্রহর: ভোর ৩:০০ থেকে সকাল ৬:০০
পারণ করতে হবে ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে চতুর্দশী শেষ হওয়ার পর।
মহাশিবরাত্রি ব্রত পালনের সঠিক নিয়মাবলী
মহাশিবরাত্রির ব্রত পালন অত্যন্ত পুণ্যদায়ক। শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুসারে এই ব্রতের প্রধান অঙ্গগুলি নিম্নরূপ:
১. প্রস্তুতি: ব্রতের আগের দিন (ত্রয়োদশী) সংযমী ভোজন করুন। আমিষ, পেঁয়াজ-রসুন এড়িয়ে আতপ চালের ভাত খান।
২. স্নান ও সংকল্প: সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন। শিবলিঙ্গের সামনে সংকল্প করুন যে দিনরাত উপবাস করে পূজা করবেন।
৩. পূজা বিধি: ঘরে বা মন্দিরে শিবলিঙ্গ স্থাপন করুন। গণেশ মূর্তি রাখুন। প্রতি প্রহরে জল, দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি দিয়ে অভিষেক করুন। বেলপাতা, ধুতুরা, আকন্দ, ফল, মিষ্টি নিবেদন করুন। “ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্র জপ করুন।
৪. রাত্রিজাগরণ: সারারাত জেগে শিবকথা শ্রবণ, ভজন-কীর্তন বা ধ্যান করুন।
৫. পারণ: পরদিন সকালে পূজা করে ফলাহার বা হবিষ্যান্ন দিয়ে ব্রতভঙ্গ করুন।
ব্রতকালীন খাদ্য তালিকা: কী খাবেন, কী খাবেন না
মহাশিবরাত্রির উপবাসে সাত্ত্বিক খাদ্য গ্রহণ করা যায়। নিম্নলিখিত তালিকায় স্পষ্টভাবে দেখানো হলো:
| অনুমোদিত খাদ্য | নিষিদ্ধ খাদ্য |
|---|---|
| ফল (কলা, আপেল, আঙ্গুর) | অন্ন (চাল, গম, রুটি) |
| দুধ, দই, মাখন | আমিষ (মাছ-মাংস-ডিম) |
| মিষ্টি আলু, সিঙ্গাড়া আটা | পেঁয়াজ-রসুন |
| সাবুদানা, মাখানা | লবণ (সাধারণ, শুধু সেন্ধা নমক যদি গ্রহণ করেন) |
| শুষ্ক ফল (কিশমিশ, খেজুর) | তামসিক খাদ্য (মদ্য, তামাক) |
| চা-কফি (দুধ ছাড়া) | হলুদ, জিরা মশলা (কিছু মতে) |
তিথিকালীন নিষিদ্ধ কাজসমূহ: ভুলেও করবেন না
শাস্ত্র মতে মহাশিবরাত্রি তিথিতে কিছু কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এগুলি করলে শিব রুষ্ট হন এবং ব্রতের ফল নষ্ট হয়।
- তামসিক খাদ্য গ্রহণ: আমিষ, পেঁয়াজ-রসুন, মদ্যপান।
- অন্ন ভোজন: চাল-গমের খাবার।
- রাতে ঘুম: জাগরণ না করলে ব্রত অসম্পূর্ণ।
- ক্রোধ ও অশ্লীল কথা: মন শুদ্ধ রাখুন।
- তুলসী পত্র দিয়ে পূজা: শিবপূজায় তুলসী নিষিদ্ধ।
- কালো বস্ত্র পরিধান: শুভ রঙ (সাদা, হলুদ) পরুন।
- অন্যায় কাজ: মিথ্যা, চুরি, পরনিন্দা।
এই নিয়মগুলি পালন করলে শিবের কৃপা লাভ হয়।
মহাশিবরাত্রি উপবাসের বিজ্ঞানসম্মত উপকারিতা
আধুনিক বিজ্ঞানও মহাশিবরাত্রির উপবাসের উপকারিতা স্বীকার করে। দীর্ঘ উপবাসে শরীর ডিটক্সিফাই হয়, পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায়, লিভার-কিডনি শুদ্ধ হয়। রাত্রিজাগরণ মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে মানসিক চাপ কমায়। ধ্যান ও জপ মস্তিষ্কের সেরোটোনিন বাড়ায়, যা ডিপ্রেশন কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে অন্তর্বর্তী উপবাস (intermittent fasting) ওজন নিয়ন্ত্রণ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এই রাতে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন মানসিক স্থিরতা বাড়ায় বলে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন।
উপসংহার
মহাশিবরাত্রি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ। ২০২৬ সালের এই মহাপুণ্যলগ্নে সঠিক নিয়মে ব্রত পালন করে শিবের কৃপা লাভ করুন। এই রাতে ধ্যান করলে মনের অন্ধকার দূর হয়, জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে। শিব হলেন ভোলেনাথ—তাঁর ভক্তির মাধ্যমে সকল দুঃখ দূর করা যায়। সকলে মিলে এই পবিত্র রাত্রি পালন করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করুন। ওঁ নমঃ শিবায়।











