তুলসীর মালা পরার নিয়ম: ৯টি মারাত্মক ভুল যা এড়িয়ে চলবেন | সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

rules-for-wearing-tulsi-mala: তুলসীর মালা ধারণ করা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় প্রতীক নয়, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক অঙ্গীকার। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি এবং আত্মসমর্পণের এক পবিত্র চিহ্ন।…

Pandit Subhas Sastri

 

rules-for-wearing-tulsi-mala: তুলসীর মালা ধারণ করা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় প্রতীক নয়, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক অঙ্গীকার। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি এবং আত্মসমর্পণের এক পবিত্র চিহ্ন। কিন্তু এই পবিত্র মালা ধারণ করার সাথে সাথে কিছু কঠোর নিয়ম-কানুন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন জড়িত। এই নিয়মগুলি পালন না করলে, বিশ্বাস করা হয় যে, মালার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং এটি ধারণের সুফলের পরিবর্তে অশুভ ফলদায়ক হতে পারে। তাই, তুলসীর মালা গলায় ধারণ করার আগে, এর সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি ‘করণীয়’ (Do’s) এবং ‘অকরণীয়’ (Don’ts) সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।

তুলসীর মালা কী এবং কেন এটি এত পবিত্র?

তুলসীর মালা হিন্দু ধর্মে, বিশেষত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে, অপরিমেয় পবিত্রতার প্রতীক। এটি পবিত্র তুলসী গাছের (Ocimum tenuiflorum বা Ocimum sanctum) কাণ্ড বা ডাল থেকে তৈরি করা হয়। তুলসীকে কেবল একটি উদ্ভিদ হিসেবে দেখা হয় না, তাকে ‘দেবী বৃন্দা’ বা ‘মহাপ্রসাদ জননী’ হিসেবে পূজা করা হয়। ভগবান বিষ্ণুর তিনি অত্যন্ত প্রিয়, এবং বিশ্বাস করা হয় যে তুলসী ছাড়া বিষ্ণুর পূজা অসম্পূর্ণ থাকে।

তুলসীর প্রকারভেদ ও মালার গঠন

প্রধানত দুই ধরনের তুলসীর কাঠ থেকে মালা তৈরি হয়:

১. শ্যামা তুলসী: এই গাছের ডালপালা এবং পাতাগুলি কিছুটা গাঢ় বা কৃষ্ণবর্ণের হয়। একে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় বলে মনে করা হয়।

২. রামা তুলসী: এই গাছের ডালপালা এবং পাতাগুলি হালকা সবুজ বা সাদাটে বর্ণের হয়।

গলায় ধারণ করার মালাকে বলা হয় ‘কণ্ঠী মালা’ (Kanthi Mala)। এটি সাধারণত ১০৮টি পুঁতির হয় না; এটি গলার মাপ অনুযায়ী বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের হতে পারে, প্রায়শই দুই বা তিন স্তরের। অন্যদিকে, জপ করার জন্য যে মালা ব্যবহার করা হয়, তাতে ১০৮+১ (মেরু) পুঁতি থাকে। এই নিবন্ধে আমরা প্রধানত ‘কণ্ঠী মালা’ ধারণের নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা করব।

তুলসীর বীজের চমৎকার উপকারিতা: গরমে শীতলতা থেকে ওজন কমানো সবই সম্ভব

তুলসীর মালার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: দেবী বৃন্দার আশীর্বাদ

তুলসীর মালার পবিত্রতার পেছনে রয়েছে এক গভীর পৌরাণিক কাহিনী। পদ্ম পুরাণ (Padma Purana) এবং অন্যান্য বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুসারে, তুলসী দেবী হলেন ‘বৃন্দা’র অবতার, যিনি ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর সতীত্বের শক্তির কারণে তাঁর অসুর স্বামী জলন্ধর প্রায় অজেয় হয়ে উঠেছিলেন। দেবতাদের রক্ষা করতে, ভগবান বিষ্ণুকে ছলনার আশ্রয় নিয়ে বৃন্দার সতীত্ব হরণ করতে হয়েছিল।

সত্যিটা জানার পর, বৃন্দা ভগবান বিষ্ণুকে শিলা (শালগ্রাম শিলা) হয়ে যাওয়ার অভিশাপ দেন এবং নিজে আগুনে আত্মাহুতি দেন। তাঁর সেই ভস্ম থেকেই পবিত্র তুলসী গাছের জন্ম হয়। ভগবান বিষ্ণু, তাঁর ভক্তের প্রতি এই অন্যায়ের প্রতিকার করতে, বৃন্দাকে বর দেন যে তিনি ‘তুলসী’ রূপে চিরকাল তাঁর সাথে পূজিত হবেন এবং তুলসীপত্র ছাড়া তাঁর পূজা গৃহীত হবে না।

এই কারণেই, তুলসীর মালা ধারণ করাকে সরাসরি ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ এবং দেবী বৃন্দার সুরক্ষা কবচ ধারণ করার সামিল বলে মনে করা হয়। এটি ভক্তকে আধ্যাত্মিক চেতনায় জাগিয়ে তোলে এবং মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস।

মালা ধারণের প্রস্তুতি: শুদ্ধিকরণ ও প্রাণ প্রতিষ্ঠা

বাজার থেকে একটি তুলসীর মালা কিনে এনেই তা সরাসরি গলায় পরে ফেলা অনুচিত। শাস্ত্র মতে, মালা ধারণের আগে সেটিকে শুদ্ধ এবং ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ করা প্রয়োজন।

১. শুদ্ধিকরণ: মালাটিকে প্রথমে গঙ্গা জল বা পঞ্চগব্য (দুধ, দই, ঘি, গোমূত্র, গোবর) দিয়ে স্নান করানো হয়।

২. পূজা: এরপর মালাটিকে ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের চরণে রেখে পূজা করা হয়। ধূপ, দীপ, চন্দন এবং ফুল দিয়ে মালার অর্চনা করা হয়।

৩. মন্ত্র জপ: পুরোহিত বা গুরুদেবের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মন্ত্র, যেমন বিষ্ণু গায়ত্রী বা “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” (Om Namo Bhagavate Vasudevaya) মন্ত্র, ১০৮ বার জপ করে মালায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৪. ধারণ: এরপর গুরু বা কোনো প্রবীণ বৈষ্ণবের হাত থেকে এই মালা গ্রহণ করে গলায় ধারণ করাই শ্রেষ্ঠ নিয়ম।

তুলসীর মালা পরার প্রধান নিয়মাবলী

তুলসীর মালা ধারণ করা একটি পবিত্র ব্রতের মতো। এটি পরিধানকারীকে একটি নির্দিষ্ট অনুশাসনের মধ্যে জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়।

সাত্ত্বিক আহার: প্রথম এবং প্রধান শর্ত

এটি তুলসীর মালা ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠোর নিয়ম। মালা ধারণকারীকে অবশ্যই সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করতে হবে।

  • আমিষ বর্জন: মাছ, মাংস, ডিম বা যেকোনো ধরনের প্রাণিজ আমিষ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এটি ‘অহিংসা’ ব্রতের অংশ।

  • পেঁয়াজ ও রসুন বর্জন: হিন্দু শাস্ত্র, বিশেষত বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, পেঁয়াজ (Rajasic) এবং রসুন (Tamasic) প্রকৃতির। এগুলি কামনা, ক্রোধ এবং মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করে বলে মনে করা হয়, যা ভক্তির পথের অন্তরায়। তাই এগুলি কঠোরভাবে বর্জনীয়।

  • মাদক দ্রব্য বর্জন: মদ, তামাক, গাঁজা বা যেকোনো ধরনের নেশাদ্রব্য গ্রহণ মহাপাপ বলে গণ্য হয়।

  • অন্যান্য: মসুর ডাল, কফি বা চায়ের মতো উত্তেজক পানীয়ও অনেক নিষ্ঠাবান ভক্ত এড়িয়ে চলেন। শুধুমাত্র ‘প্রসাদ’ বা ভগবানকে নিবেদন করা সাত্ত্বিক খাবারই গ্রহণ করা উচিত।

 শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধাচার

শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, দৈনন্দিন জীবনেও শুদ্ধাচার বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

  • দৈনিক স্নান: মালা ধারণকারীকে প্রতিদিন স্নান করে শরীর শুদ্ধ রাখতে হবে। অপবিত্র বা অশুদ্ধ শরীরে মালা স্পর্শ করা বা ধারণ করা অনুচিত।

  • সত্য ভাষণ: মিথ্যা কথা বলা বা ছলনার আশ্রয় নেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

  • অহিংসা: কায়মনোবাক্যে ‘অহিংসা’ পালন করতে হবে। কোনো প্রাণীকে হত্যা করা বা কষ্ট দেওয়া চলবে না।

  • ব্রহ্মচর্য: বিবাহিত জীবনে শাস্ত্রীয় নির্দেশিত সঙ্গম ছাড়া, ব্যভিচার বা অবৈধ যৌন সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মানসিক স্তরেও শুদ্ধতা বজায় রাখা জরুরি।

  • চৌর্যবৃত্তি ও পরনিন্দা বর্জন: চুরি করা, প্রতারণা করা বা অন্যের নিন্দা করা এই মালার পবিত্রতার পরিপন্থী।

 জপ ও উপাসনা

তুলসীর মালা ধারণের মূল উদ্দেশ্যই হলো ভক্তি বৃদ্ধি করা। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যকবার ইষ্টমন্ত্র (যেমন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র) জপ করা বাঞ্ছনীয়। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ISKCON) এর মতো সংস্থাগুলি তাদের অনুসারীদের প্রতিদিন অন্তত ১৬ মালা জপ করার নির্দেশ দেয়। এই মালা পরিধানকারীকে তার সেই নিত্যকর্মের কথা মনে করিয়ে দেয়।

দীর্ঘ সময় মাস্ক পরলে ত্বকের ক্ষতি: কারণ ও প্রতিকার

মালাকে সম্মান করা

এই মালা কোনো সাধারণ অলঙ্কার নয়।

  • এটি কখনওই পা বা জুতার কাছাকাছি আনা উচিত নয়।

  • যদি কোনো কারণে মালাটি খুলে রাখতে হয়, তবে তা ঠাকুরের আসনে বা কোনো পবিত্র স্থানে রাখা উচিত।

  • মালাটি নোংরা হলে তা সাবান বা কোনো রাসায়নিক দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে না। কেবল গঙ্গা জল বা চন্দন তেল দিয়ে পরিষ্কার করা যেতে পারে।

তুলসীর মালা পরার কঠোর নিষেধাজ্ঞা

এবার আসা যাক সেই ভুলগুলির কথায়, যা করলে তুলসীর মালা ধারণের পুণ্যফল নষ্ট হয়ে যায় এবং যা থেকে অকল্যাণ হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।

অশুদ্ধ অবস্থায় বা অশুদ্ধ স্থানে মালা ধারণ

১. শৌচকর্মের সময়: মল-মূত্র ত্যাগের সময় মালাটি কান বা অন্য কোথাও জড়িয়ে রাখা বা সম্ভব হলে শরীরের বাইরে রাখা উচিত, যাতে তা অপবিত্র না হয়।

২. যৌন মিলনের সময়: শারীরিক মিলনের সময় তুলসীর মালা অবশ্যই শরীর থেকে খুলে পবিত্র স্থানে রাখতে হবে। এই অবস্থায় মালা শরীরে থাকলে তা মালার প্রতি ঘোরতর অপমান বলে বিবেচিত হয়।

৩. স্নান করার সময়: অনেকে স্নানের সময় মালা গলায় রেখেই স্নান করেন। যদিও এতে মতভেদ আছে, তবে সাবান বা শ্যাম্পুর রাসায়নিক যাতে মালায় না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সবচেয়ে ভালো হয়, স্নানের সময় মালা খুলে রাখা।

৪. মৃত্যু বা অশৌচ: পরিবারের কারো মৃত্যু হলে বা অশৌচ চলাকালীন এই মালা ধারণ করা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে সাধারণত এই সময় মালা খুলে রাখা হয় এবং অশৌচ শেষ হলে শুদ্ধ হয়ে আবার ধারণ করা হয়।

খাদ্যাভ্যাসের বিচ্যুতি (সবচেয়ে বড় ভুল)

৫. নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণ: তুলসীর মালা গলায় রেখে পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস বা মদ গ্রহণ করাকে সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’ বা ‘বৈষ্ণব অপরাধ’ বলে মনে করা হয়। এটি তুলসী দেবী এবং ভগবান বিষ্ণুর প্রতি চরম অশ্রদ্ধা।

৬. এঁটো বা উচ্ছিষ্ট: এঁটো মুখে বা হাত না ধুয়ে মালা স্পর্শ করা উচিত নয়।

 অসংযমী আচরণ

৭. অসৎ সঙ্গ: মালা পরিধান করে অসৎ লোকের সাথে মেলামেশা, জুয়া খেলা বা কোনো অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ।

৮. মিথ্যাচার ও প্রতারণা: গলায় তুলসীর মালা অথচ মুখে মিথ্যা কথা বা ব্যবসায় প্রতারণা—এটি নিজের সাথে এবং ভগবানের সাথে প্রতারণার সামিল।

মালা নিয়ে ব্যবহারিক ভুল

৯. ভাঙা মালা ধারণ: যদি কোনো কারণে মালাটি ছিঁড়ে যায় বা পুঁতি ভেঙে যায়, তবে সেই মালা আর পরিধান করা উচিত নয়। সেটিকে কোনো পবিত্র নদীর জলে বা গাছের গোড়ায় বিসর্জন দেওয়া উচিত এবং নতুন মালা নিয়ম মেনে ধারণ করা উচিত।

গলায় সিঁদুর পরলে কী হয়? জানুন এর তাৎপর্য ও প্রভাব

নিয়ম না মানলে কী হয়? (বিশ্বাস ও শাস্ত্র)

শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তুলসীর মালা হলো একটি ‘সতর্ক সংকেত’। এটি পরিধানকারীকে মনে করিয়ে দেয় যে তিনি একটি শুদ্ধ জীবনযাপনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই নিয়মগুলি না মানলে:

  • আধ্যাত্মিক ক্ষতি: মালা ধারণের যে মূল উদ্দেশ্য—চিত্তশুদ্ধি এবং ভক্তি লাভ—তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

  • অপরাধ: একে ‘নাম অপরাধ’ বা ‘বৈষ্ণব অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, দেবীর পবিত্রতাকে অপমান করার ফলে জীবনে শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে এবং দুর্ভাগ্য আসতে পারে।

  • ভণ্ডামি: এটি সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক ভণ্ডামি হিসেবে পরিগণিত হয়, যা পাপ বলে বিবেচিত।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সারণি: করণীয় বনাম অকরণীয়

বৈশিষ্ট্য করণীয় (Do’s) অকরণীয় (Don’ts)
আহার সম্পূর্ণ নিরামিষ (সাত্ত্বিক) আমিষ, পেঁয়াজ, রসুন, মাদক
আচরণ সত্য কথা, অহিংসা, ব্রহ্মচর্য মিথ্যাচার, হিংসা, ব্যভিচার
পবিত্রতা প্রতিদিন স্নান, শুদ্ধ বস্ত্রে থাকা অপবিত্র শরীরে মালা স্পর্শ, শৌচকর্মের সময় অসতর্কতা
ক্রিয়াকলাপ নিত্য জপ ও পূজা যৌন মিলন বা অশৌচ অবস্থায় মালা ধারণ
মালার অবস্থা মালাকে সম্মান করা, পবিত্র স্থানে রাখা ভাঙা মালা পরা, পা লাগানো বা অপবিত্র স্থানে রাখা

তুলসীর মালা: আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ

ধর্মীয় তাৎপর্যের বাইরেও তুলসীর মালার কিছু বৈজ্ঞানিক ও আয়ুর্বেদিক গুরুত্ব রয়েছে।

  • আয়ুর্বেদিক গুরুত্ব: তুলসী (Ocimum sanctum) আয়ুর্বেদে “Queen of Herbs” নামে পরিচিত। ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (NCBI) এ প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণাপত্রে তুলসীর অ্যান্টি-স্ট্রেস (Adaptogen), অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

  • তড়িৎ প্রবাহ (Electrical Properties): তুলসীর কাঠে এক ধরনের মৃদু তড়িৎ চৌম্বকীয় শক্তি (Bio-electric energy) থাকে। বিশ্বাস করা হয়, এটি গলায় ধারণ করলে তা রক্তের প্রবাহকে ঠিক রাখতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

  • অ্যাকুপ্রেশার: গলায় বা কব্জিতে পরা মালা ত্বকের সংস্পর্শে থেকে কিছু স্নায়ুবিন্দুতে (Nerve points) মৃদু চাপ সৃষ্টি করে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং মানসিক শান্তিতে সহায়ক হতে পারে।

  • মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: যখন একজন ব্যক্তি এই মালা পরিধান করেন এবং নিয়মগুলি মানার চেষ্টা করেন, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই তার জীবনযাত্রায় একটি শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। এই শৃঙ্খলবদ্ধ জীবন (যেমন-সাত্ত্বিক আহার, নেশা বর্জন) বৈজ্ঞানিকভাবেই শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) এর মতে, ধ্রুবক জপ বা মন্ত্র পাঠ (যা মালা ধারণের অঙ্গ) মনকে শান্ত করে এবং ‘মাইন্ডফুলনেস’ বাড়ায়।

কারা তুলসীর মালা পরতে পারবেন?

তুলসীর মালা ধারণ করার অধিকার সকলের আছে—জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ বা বয়স নির্বিশেষে। তবে মূল শর্ত হলো, যিনি এই মালা ধারণ করবেন, তাকে অবশ্যই উপরোক্ত সাত্ত্বিক নিয়মগুলি পালন করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি কেউ এই নিয়মগুলি পালন করতে না পারেন, তবে তার জন্য মালা ধারণ না করাই শ্রেয়। এটি কোনো ফ্যাশন বা লোকদেখানো বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণ নিষ্ঠা ও ভক্তির বিষয়।

একটি আধ্যাত্মিক অঙ্গীকার

তুলসীর মালা পরিধান করা সহজ, কিন্তু এর মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন। এটি একটি পবিত্র অঙ্গীকার—নিজের প্রতি, গুরুর প্রতি এবং সর্বোপরি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি। এটি একটি ধ্রুবক স্মারক যে পরিধানকারী তার জীবনকে শুদ্ধ, সংযত এবং ভক্তিময় পথে পরিচালিত করতে সম্মত হয়েছেন। নিয়ম মেনে চললে এই মালা যেমন আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হতে পারে, তেমনই নিয়ম ভাঙলে তা হতে পারে পতনের কারণ। তাই, সম্পূর্ণ জেনে, বুঝে এবং নিষ্ঠার সাথে এই পবিত্র মালা ধারণ করাই বাঞ্ছনীয়

About Author
Pandit Subhas Sastri

পন্ডিত সুভাষ শাস্ত্রী একজন দিকপাল জ্যোতিষী। দীর্ঘ ৩০ বছর মানুষের সেবা করে আসছেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রে গোল্ড মেডেলিস্ট, এছাড়াও তিনি দেশ বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এবং তার গণনা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বেশ জনপ্রিয়। তিনি কলকাতা, হাওড়া, বীরভূম, শিলিগুড়ি, দুর্গাপুরে চেম্বার করেন।

আরও পড়ুন