বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের রায় পড়া শুরু হয়েছে। গত বছরের ছাত্র আন্দোলনের সময়কার দমন-পীড়নের অভিযোগে তাঁকে অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার করা হচ্ছে। রায় পড়ার পূর্বেই শেখ হাসিনা একটি অডিও বার্তায় বলেন, “আমি এই রায়ের মাথায় রাখব না। আল্লাহ আমাকে জীবন দিয়েছেন, তিনিই নেবেন।” এই ঘটনা দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে, যখন ঢাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরমে উঠেছে।
শেখ হাসিনা গত আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ভারতে পালিয়ে যান। তাঁর পদত্যাগের পর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এই রায়ের মাধ্যমে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর সমাধান খুঁজছে, যা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে। আজকের এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার অকাতর বক্তব্য
শেখ হাসিনা তাঁর অডিও বার্তায় অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এই বার্তায় তিনি বলেন, “আমার সরকার ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়েছিল, কিন্তু তারপরও অরাজকতা ছড়ানো হয়েছে।” তিনি ইউনুস সরকারকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ এবং ‘অপরাধীদের আশ্রয়দাতা’ বলে অভিহিত করেন।
এই বার্তা শুনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত। একজন নেতা বলেন, “আমরা আমাদের নেত্রীর পাশে আছি। এই রায় আমাদের আন্দোলনকে থামাতে পারবে না।” শেখ হাসিনা আরও বলেন, “আমি জীবিত আছি, জীবিত থাকব এবং আবারও মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করব।” এই কথাগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
শেখ হাসিনার ভারতে গোপন অবস্থান: ১০০ দিন পর কী জানা গেল?
রায়ের পটভূমি এবং অভিযোগসমূহ
আইসিটির এই বিচার ২০২৫ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি মূল অভিযোগ আনা হয়েছে: হত্যা, হত্যা চেষ্টা, নির্যাতন এবং অমানবিক কাজ। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তাঁর একটি বক্তৃতায় ‘উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা ছাত্র আন্দোলনের সময় সহিংসতাকে প্ররোচিত করেছিল বলে দাবি করা হয়।
অন্যান্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশ প্রধান আব্দুল্লাহ আল মামুন। অভিযোগ অনুসারে, আন্দোলনের সময় প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আইসিটির বিচারকরা বলেন, “এই রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত দলিলের ভিত্তিতে প্রস্তুত।” এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে নজরদারি করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার ছেলে সাজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, “সম্ভবত মৃত্যুদণ্ড হবে।” এই মন্তব্য তাঁর এক সাক্ষাৎকারে পড়ে, যা আজকের রায়ের পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।” এই বক্তব্য আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শেখ হাসিনা এখন লুটিয়েন্স দিল্লির নিরাপদ আবাসে, জানুন এই অভিজাত ঠিকানায় কারা থাকেন
ঢাকায় উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা
আজ সকাল থেকেই ঢাকায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রায় পড়ার পূর্বে কয়েকটি কাঁচা বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সরকার ‘ষুট-অ্যাট-সাইট’ আদেশ জারি করেছে, যাতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫,০০০ পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে হাইকোর্ট এলাকায়।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শহরব্যাপী বন্ধ ডাকেন, যা অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে ব্যাহত করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ আপডেট ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটি শুধু রায় নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের লড়াই।” আরেকজন বলেছেন, “হাসিনা ফিরে আসবেন, এটি নিশ্চিত।” এই পোস্টগুলো হাজার হাজার লাইক পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই ঘটনাকে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষা’ বলে অভিহিত করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে বলা হয়েছে, “হাসিনার ভারতে আশ্রয়ের প্রসঙ্গও উঠতে পারে।” এই উত্তেজনা দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে, যেখানে শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
পূর্বের ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রেক্ষাপট
গত বছরের জুলাই মাসে ছাত্ররা চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, যা পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার সরকারের দমনমূলক নীতির ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়। এরপর তিনি পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান, যা দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ায়।
ইউনুস সরকার আওয়ামী লীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করেছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। শেখ হাসিনা তাঁর বার্তায় বলেন, “আমরা ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু অভিযোগ করা হয়েছে।” এই প্রেক্ষাপটে রায়টি শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক যুদ্ধেরও অংশ। আন্তর্জাতিক অধিকার সংস্থাগুলো বলছে, “এই বিচার নিরপেক্ষতার পরীক্ষা।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন। এক পোস্টে বলা হয়েছে, “আইসিটি ইউনুসের পুতুল, এটি ন্যায় নয়।” অন্যদিকে, ছাত্র নেতারা বলছেন, “এটি বিচারের জয়।” এই বিভাজন দেশের সমাজকে আরও খণ্ডিত করছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই রায়কে নিবিড়ভাবে দেখছে। জাতিসংঘের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।” ভারত সরকার এখনও কোনো অফিসিয়াল মন্তব্য করেনি, কিন্তু কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চলছে।
শেখ হাসিনার সমর্থকরা বিশ্বাস করছেন, এই রায় তাঁকে থামাতে পারবে না। তিনি বার্তায় বলেছেন, “আমরা জিতব।” এই রায়ের ফলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে, যা পরবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে নতুন মোড় দেয়। রায়ের পর যদি সহিংসতা বাড়ে, তাহলে দেশের অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে, শেখ হাসিনার এই অকাতরতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে রাজনৈতিক লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ভবিষ্যতে তাঁর প্রত্যাবর্তন বা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশকে নতুন পথ দেখাতে পারে।











