তারা মায়ের মূর্তি বা ছবির মুখ কোন দিকে রাখা উচিত, এই প্রশ্নটি অগণিত ভক্তের মনে রয়েছে। বাস্তুশাস্ত্র, তন্ত্রশাস্ত্র এবং প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তারা মায়ের (বিশেষত উগ্র তারা) মূর্তি বা ছবির মুখ স্থাপনের জন্য উত্তর দিককে সর্বাধিক শুভ এবং শক্তিশালী বলে মনে করা হয়। এর প্রধান কারণ হলো, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে অবস্থিত মা তারার প্রধান শক্তিপীঠ, তারাপীঠ মন্দিরে, মায়ের মূল বিগ্রহ উত্তরমুখী। শাস্ত্র মতে, উত্তর দিক হলো মোক্ষ (মুক্তি), জ্ঞান এবং কুবেরের (ধন-সম্পদের দেবতা) দিক। তাই, গৃহস্থের বাড়িতে পূজার জন্য উত্তর দিককেই প্রথম এবং প্রধান বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়। যদি উত্তর দিকে স্থান সংকুলান না হয়, তবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ বিকল্প হিসেবে পূর্ব দিক (উদীয়মান সূর্যের দিক, যা জ্ঞান ও শক্তির প্রতীক) বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কোনোক্রমেই মায়ের মুখ দক্ষিণ দিকে রাখা উচিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন।
মা তারা: এক মহাজাগতিক শক্তির স্বরূপ
তারা মা হিন্দুধর্মের, বিশেষত শাক্তধর্মের এবং তান্ত্রিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান দেবী। তিনি দশমহাবিদ্যার (জ্ঞানের দশটি মহান রূপ) দ্বিতীয় মহাবিদ্যা হিসেবে পূজিত হন। “তারা” শব্দটির সংস্কৃত অর্থ “ত্রাণকর্ত্রী” বা “যিনি পার করান”। তিনি ভক্তদের এই সংসার সমুদ্র (জন্ম-মৃত্যুর চক্র) থেকে পার করে মোক্ষে পৌঁছে দেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
পৌরাণিক ও তান্ত্রিক তাৎপর্য
মা তারার উৎপত্তির একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সর্বাধিক প্রচলিত কাহিনীটি সমুদ্র মন্থনের সাথে জড়িত। যখন দেবতা ও অসুররা অমরত্বের জন্য সমুদ্র মন্থন করছিলেন, তখন প্রথমে হলাহল বা কালকূট বিষ উঠে আসে, যা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। সৃষ্টির রক্ষার্থে ভগবান শিব সেই বিষ পান করেন। বিষের তীব্র জ্বালায় তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়লে, দেবী দুর্গা ‘তারা’ রূপ ধারণ করে শিবকে নিজের কোলে তুলে নেন এবং তাকে নিজের স্তন্যপান করিয়ে বিষের জ্বালা থেকে মুক্ত করেন। তাঁর এই রূপ মাতৃত্ব, করুণা এবং রক্ষাকর্ত্রীর প্রতীক।
তন্ত্রশাস্ত্রে, মা তারা ‘উগ্রতারা’ নামেও পরিচিতা। তিনি দেবী কালীর মতোই শক্তিধর, তবে তাঁর রূপ কালীর থেকেও কিছুটা ভিন্ন। তিনি শ্মশানবাসিনী, মুক্তকেশী এবং ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা। তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্রে তিনি সাধককে জ্ঞান, বাক্ শক্তি (কথা বলার ক্ষমতা) এবং অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
দশমহাবিদ্যা এবং মা তারার স্থান
দশমহাবিদ্যা হলো দেবীর দশটি বিশেষ রূপ, যা মহাবিশ্বের জ্ঞান ও শক্তির প্রতীক। এই দশটি রূপ হলো: কালী, তারা, ষোড়শী (ত্রিপুরা সুন্দরী), ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী এবং কমলা। এই দশমহাবিদ্যার মধ্যে মা কালীর পরেই মা তারার স্থান। তিনি মূলত শব্দ শক্তি বা জ্ঞানের দেবী হিসেবে পরিচিত।
তারাপীঠ: এক জীবন্ত শক্তিপীঠ
মা তারার উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু হলো পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠ মন্দির। এটি ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। কিংবদন্তি অনুসারে, এখানে সতীর চোখের মণি বা ‘তারা’ পড়েছিল। এই মন্দিরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে মা তারার মূল বিগ্রহটি উত্তরমুখী। এই মন্দিরের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম, এবং এটি তন্ত্র সাধনার এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সাধক বামাখ্যাপা এখানেই মা তারার পূজা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। যেহেতু মূল পীঠস্থানে দেবী উত্তরমুখী, তাই গৃহস্থের বাড়িতেও এই দিকটিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাস্তুশাস্ত্র এবং পূজার স্থান: দিকনির্দেশের গুরুত্ব
বাস্তুশাস্ত্র হলো স্থাপত্যের এক প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞান, যা একটি কাঠামো বা বাড়িকে প্রকৃতির পঞ্চভূত (পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু এবং আকাশ) এবং মহাজাগতিক শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার নির্দেশিকা প্রদান করে। বাড়িতে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং ইতিবাচক শক্তি বজায় রাখার জন্য বাস্তুশাস্ত্র দিকনির্দেশের উপর অপরিসীম গুরুত্ব আরোপ করে।
কেন দিকনির্দেশ এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী, প্রতিটি দিকের নিজস্ব দেবতা, উপাদান এবং শক্তির ধরন রয়েছে।
- পূর্ব (East): উদীয়মান সূর্যের দিক। এটি স্বাস্থ্য, জীবনীশক্তি এবং জ্ঞানের প্রতীক। এর অধিপতি দেবতা ইন্দ্র।
- উত্তর (North): ধন-সম্পদের দেবতা কুবের এবং জ্ঞানের দিক। এটি অর্থ, সমৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য শুভ।
- দক্ষিণ (South): মৃত্যুর দেবতা যমের দিক। বাস্তুশাস্ত্রে এই দিকটিকে সাধারণত অশুভ বা ভারী শক্তির দিক হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বাধার সৃষ্টি করতে পারে।
- পশ্চিম (West): বরুণের (জলের দেবতা) দিক। এটি স্থিতিশীলতা প্রদান করে, তবে পূজার জন্য পূর্ব বা উত্তরের মতো শুভ বলে গণ্য হয় না।
- ঈশান কোণ (Northeast – NE): এটি উত্তর এবং পূর্ব দিকের সংযোগস্থল। এটি ভগবান শিবের দিক এবং একে ‘ঈশ্বরের কোণ’ বলা হয়। বাস্তু মতে, বাড়ির এই কোণটি পূজার ঘর বা ঠাকুর ঘর স্থাপনের জন্য সর্বোত্তম স্থান।
পূজার ঘরের সাধারণ বাস্তু নিয়ম
বাড়িতে পূজার ঘর বা পূজার স্থান স্থাপনের সময় কিছু সাধারণ বাস্তু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়:
- স্থান: পূজার ঘর সর্বদা বাড়ির ঈশান কোণে (NE) হওয়া উচিত। এটি সবচেয়ে পবিত্র স্থান।
- পরিচ্ছন্নতা: পূজার স্থান সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখতে হবে।
- অবস্থান: পূজার ঘর বা স্থান বাথরুমের দেয়ালের সাথে সংলগ্ন বা সিঁড়ির নিচে হওয়া উচিত নয়।
- উপাসকের মুখ: পূজা করার সময় উপাসক বা ভক্তের মুখ পূর্ব বা উত্তর দিকে থাকা উচিত। এর অর্থ হলো, দেবতার মুখ পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে থাকবে (যদি উপাসক পূর্ব দিকে মুখ করে বসেন) অথবা দেবতার মুখ পূর্ব বা উত্তর দিকে থাকবে (যদি উপাসক নিজে সেই দিকে মুখ করে বসেন)।
এই সাধারণ নিয়মগুলি জানলে মা তারার স্থাপনের দিকটি বুঝতে সুবিধা হবে।
তারা মায়ের মুখ কোন দিকে রাখা উচিত? (বিশদ বিশ্লেষণ)
মা তারার মতো ‘উগ্র’ বা শক্তিশালী তান্ত্রিক দেবীর মূর্তি বা ছবি বাড়িতে স্থাপনের ক্ষেত্রে সাধারণ বাস্তু নিয়মের পাশাপাশি তান্ত্রিক ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দিতে হয়।
প্রথম এবং সর্বোত্তম দিক: উত্তর (North)
প্রায় সকল বাস্তু বিশেষজ্ঞ, তান্ত্রিক এবং পুরোহিত একমত যে, গৃহস্থের বাড়িতে মা তারার মুখ উত্তর দিকে রাখাই সর্বোত্তম।
- শাস্ত্রীয় কারণ (তারাপীঠ): এর প্রধান এবং সবচেয়ে জোরালো কারণ হলো তারাপীঠের মূল মন্দির। শক্তিপীঠে দেবীর যে অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত, তাকেই আদর্শ বা ‘জাগ্রত’ বলে মনে করা হয়। যেহেতু তারাপীঠে মা উত্তরমুখী, তাই বাড়িতেও সেই দিক অনুসরণ করা হয়।
- বাস্তুগত কারণ: উত্তর দিক হলো কুবেরের দিক। মা তারা শুধু মোক্ষদাত্রী নন, তিনি ঐশ্বর্যদাত্রীও বটে। উত্তর দিকে মুখ করে থাকলে তিনি গৃহের ধন-সম্পদ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করেন বলে বিশ্বাস।
- আধ্যাত্মিক কারণ: উত্তর দিককে হিমালয়ের দিক বা কৈলাসের দিক হিসেবেও দেখা হয়, যা তপস্যা, জ্ঞান এবং চূড়ান্ত মুক্তির (মোক্ষ) প্রতীক। মা তারা যেহেতু মোক্ষদাত্রী, তাই উত্তর দিকটি তাঁর স্থাপনের জন্য আধ্যাত্মিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
যখন মা উত্তরমুখী থাকেন, তখন পূজাকারীকে দক্ষিণ দিকে মুখ করে পূজা করতে হয়। তন্ত্র সাধনায় এটি একটি স্বীকৃত প্রথা।
দ্বিতীয় বিকল্প: পূর্ব (East)
যদি কোনো কারণে উত্তর দিকে মায়ের মুখ স্থাপন করা সম্ভব না হয় (যেমন, বাড়ির নকশা বা স্থানের অভাব), তবে পূর্ব দিককে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া যেতে পারে।
- সূর্যের দিক: পূর্ব দিক হলো উদীয়মান সূর্যের দিক। সূর্য হলো সকল শক্তির উৎস এবং জ্ঞানের প্রতীক। মা তারা ‘নীলসরস্বতী’ নামেও পরিচিত, যিনি জ্ঞানের দেবী। তাই পূর্ব দিকে তাঁর মুখ রাখলে তা গৃহের সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের সদস্যদের জ্ঞানের বিকাশে সহায়ক হয় বলে মনে করা হয়।
- সাধারণ শুভ দিক: বাস্তুশাস্ত্রে, ঈশান কোণ (NE) এবং পূর্ব দিককে যেকোনো শুভ কাজ বা দেব-দেবী স্থাপনের জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়।
যখন মা পূর্বমুখী থাকেন, তখন পূজাকারীকে পশ্চিম দিকে মুখ করে পূজা করতে হয়, যা পূজার একটি সাধারণ এবং স্বীকৃত ভঙ্গি।
দক্ষিণ দিক: কেন কঠোরভাবে এড়িয়ে চলা উচিত?
প্রায় সমস্ত শাস্ত্র এবং বাস্তু বিশেষজ্ঞ একমত যে, বাড়িতে কোনো দেব-দেবীর মুখ, বিশেষ করে মা তারার মতো উগ্র দেবীর মুখ, দক্ষিণ দিকে রাখা উচিত নয়।
- যমের দিক: হিন্দু শাস্ত্র মতে, দক্ষিণ দিক হলো মৃত্যুর দেবতা যম এবং পিতৃলোকের (পূর্বপুরুষদের) দিক। এই দিক থেকে নেতিবাচক বা ভারী শক্তি নির্গত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
- শক্তির সংঘাত: মা তারা হলেন জীবন, জ্ঞান এবং শক্তির উগ্র প্রতীক। তাঁকে দক্ষিণমুখী করে স্থাপন করলে তা গৃহের ইতিবাচক শক্তির সাথে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে, যা পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য, শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
- ব্যতিক্রম (তান্ত্রিক সাধনা): যদিও এটি উল্লেখ্য যে, কিছু বিশেষ তান্ত্রিক সাধনায় (যেমন শ্মশানে বা বিশেষ পীঠস্থানে) দেবীর দক্ষিণমুখী রূপ (যেমন ‘দক্ষিণা কালী’) পূজিত হয়, তবে তা গৃহস্থের জন্য প্রযোজ্য নয়। গৃহস্থের পূজা হয় মূলত শান্তি ও মঙ্গলের জন্য, উগ্র তান্ত্রিক সাধনার জন্য নয়।
গৃহস্থের পূজা বনাম তান্ত্রিক পূজা: একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
মা তারা মূলত একজন তান্ত্রিক দেবী। তাঁর পূজা দুটি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়: একটি হলো গৃহস্থের ‘সৌম্য’ বা শান্ত পূজা, এবং অন্যটি হলো তান্ত্রিকদের ‘উগ্র’ সাধনা। বাড়িতে দিকনির্দেশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উগ্র রূপ এবং শান্ত রূপ
মা তারার যে রূপ আমরা দেখি (শ্মশানবাসিনী, মুণ্ডমালা পরিহিতা) তা তাঁর ‘উগ্র’ রূপ। তান্ত্রিক সাধকরা এই উগ্র রূপের উপাসনা করেন দ্রুত সিদ্ধিলাভ বা অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য। এই ধরনের পূজা অত্যন্ত কঠোর নিয়ম-কানুন এবং গুরুর নির্দেশ মেনে করতে হয়।
অন্যদিকে, গৃহস্থের বাড়িতে যখন মা তারার পূজা করা হয়, তখন তাঁকে ‘মা’ বা ‘মাতৃরূপে’ পূজা করা হয়। এখানে ভক্তের মূল লক্ষ্য থাকে পরিবারের মঙ্গল, সন্তানদের রক্ষা এবং আধ্যাত্মিক শান্তি। তাই, বাড়িতে উগ্র রূপের বদলে মায়ের শান্ত বা আশীর্বাদরত মূর্তি বা ছবি রাখা বাঞ্ছনীয়।
গুরুর নির্দেশের গুরুত্ব
তন্ত্র একটি গুপ্ত এবং জটিল শাস্ত্র। যদি কোনো ব্যক্তি তান্ত্রিক মতে মা তারার সাধনা করতে চান, তবে দিকনির্দেশ সহ সকল নিয়ম অবশ্যই একজন সদগুরুর (যোগ্য শিক্ষক) কাছ থেকে গ্রহণ করা উচিত। গুরুর নির্দেশ ছাড়া তান্ত্রিক দেব-দেবীর পূজা করা বিপজ্জনক হতে পারে। তবে, সাধারণ ভক্তিমূলক পূজার (গৃহস্থের পূজা) জন্য উত্তর বা পূর্ব দিকনির্দেশের শাস্ত্রীয় নিয়মই যথেষ্ট।
মূর্তি বা ছবি স্থাপনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী
শুধু সঠিক দিকই নয়, মা তারার মূর্তি বা ছবি স্থাপনের সময় আরও কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। এই নিয়মগুলি পূজার স্থানটিকে আরও ইতিবাচক এবং শক্তিশালী করে তোলে।
| বিষয় (Topic) | করণীয় (Do’s) | বর্জনীয় (Don’ts) |
| স্থানের পবিত্রতা | পূজার স্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখুন। প্রতিদিন ধূপ-দীপ জ্বালান। | পূজার স্থান যেন অপরিচ্ছন্ন বা বিশৃঙ্খল না থাকে। |
| পূজার ঘরের অবস্থান | সম্ভব হলে বাড়ির ঈশান কোণে (NE) পূজার ঘর স্থাপন করুন। | বাথরুমের দেয়ালের সাথে বা সিঁড়ির নিচে পূজার স্থান করবেন না। |
| মূর্তির উচ্চতা | দেবীর মূর্তি বা ছবি এমন উচ্চতায় রাখুন যাতে তা আপনার হৃদয়ের স্তরে (Heart Level) বা চোখের স্তরে থাকে। | দেবীর মূর্তি বা ছবি সরাসরি মাটিতে রাখবেন না। একটি ছোট বেদি বা সিংহাসনে স্থাপন করুন। |
| মূর্তির সংখ্যা | একই দেবীর একাধিক মূর্তি বা ছবি একে অপরের মুখোমুখি রাখবেন না। | একটি পূজার ঘরে মা তারার একটি ছবি বা মূর্তিই যথেষ্ট। |
| পূজাকারীর মুখ | যদি মায়ের মুখ উত্তর দিকে থাকে, তবে আপনি দক্ষিণে মুখ করে পূজা করবেন। যদি মায়ের মুখ পূর্ব দিকে থাকে, তবে আপনি পশ্চিমে মুখ করে পূজা করবেন। | পূজা করার সময় আপনার মুখ যেন দক্ষিণ দিকে না হয় (যদি না মায়ের মুখ উত্তরে থাকে)। |
| অন্যান্য মূর্তি | মা তারার ছবির সাথে ভগবান শিব (তাঁর ভৈরব) এবং অন্যান্য দশমহাবিদ্যার ছবিও রাখা যেতে পারে। | এমন কোনো মূর্তি রাখবেন না যা ভেঙে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। |
আধ্যাত্মিকতা, বাস্তু এবং মানসিক স্বাস্থ্য: একটি আধুনিক দৃষ্টিকোণ
যদিও বাস্তুশাস্ত্র এবং ধর্মীয় আচারের সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (empirical evidence) খুঁজে পাওয়া কঠিন, তবে একটি সুশৃঙ্খল এবং ইতিবাচক পরিবেশ যে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে, তা মনোবিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত।
ধর্মীয় অনুশীলন এবং সুস্থতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুস্থতার সংজ্ঞায় মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। প্রার্থনা, ধ্যান বা একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালন করা মানসিক চাপ কমাতে এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে সহায়তা করে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) দ্বারা উল্লিখিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। যখন একজন ভক্ত বাস্তু মেনে, সঠিক দিকে মায়ের মূর্তি স্থাপন করেন, তখন তা তাঁর মনে এক ধরণের শৃঙ্খলা এবং বিশ্বাস তৈরি করে। এই বিশ্বাসই তাঁকে মানসিক শান্তি দেয়।
ভারতে পূজার স্থানের গুরুত্ব (তথ্য)
ভারতে ধর্মীয় অনুশীলন দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) একটি ২০২১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের অধিকাংশ মানুষই বাড়িতে একটি নির্দিষ্ট পূজার স্থান বা বেদি রাখেন। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, বাড়ির মধ্যে একটি পবিত্র স্থান (Sacred Space) তৈরি করা ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। বাস্তুশাস্ত্র এই পবিত্র স্থানটিকেই মহাজাগতিক শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করে।
সঠিক দিকে (যেমন উত্তর বা পূর্ব) মূর্তি স্থাপন করা, যা আলো এবং ইতিবাচক শক্তির প্রতীক, তা বাড়ির সামগ্রিক পরিবেশে একটি ‘প্লেসিবো’ (Placebo) প্রভাবের মতো কাজ করতে পারে, যা বাসিন্দাদের মধ্যে শান্তি এবং নিরাপত্তার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
বিশ্বাস এবং শাস্ত্রের ভারসাম্য
তারা মায়ের মুখ কোন দিকে রাখা উচিত, এই প্রশ্নের উত্তরে শাস্ত্র, ঐতিহ্য এবং বাস্তু—সবকিছুই উত্তর দিককে সর্বোত্তম হিসেবে নির্দেশ করে, যা তারাপীঠের মূল মন্দির দ্বারা সমর্থিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে পূর্ব দিক একটি শুভ বিকল্প।
তবে, দিকনির্দেশের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভক্তি এবং বিশ্বাস। মা তারা হলেন ‘করুণাময়ী’। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “ভাবগ্রাহী জনার্দন”—অর্থাৎ, ঈশ্বর বা দেবী বাহ্যিক আচারের চেয়ে ভক্তের ভেতরের ‘ভাব’ বা ভক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। যদি আপনার বাড়িতে উত্তর বা পূর্ব দিকে কোনোভাবেই স্থান না থাকে, তবে হতাশ হবেন না। আপনার বাড়ির যে স্থানটি সবচেয়ে পবিত্র, পরিষ্কার এবং শান্ত, সেখানেই মায়ের ছবি বা মূর্তি স্থাপন করে শুদ্ধ মনে তাঁর পূজা করুন। আপনার ভক্তি এবং বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি, যা দিকনির্দেশের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারে।











