১ নভেম্বর ২০২৬, রবিবার বিকেল। দিল্লির র্যামলীলা ময়দানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি নিশানা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রশ্ন — “ভ্যানিশ কুমার, আপনি কবে ভ্যানিশ হবেন?” মঞ্চে ছিলেন রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব ও ফারুক আবদুল্লাহ। সমাবেশে সারা দেশ থেকে বিরোধী দলগুলোর নেতা ও সমর্থকেরা এসেছিলেন।
ভ্যানিশ কুমার হলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া একটি কটাক্ষ, যা ইংরেজি ‘vanish’ শব্দ থেকে বানানো। এর অর্থ উধাও হয়ে যাওয়া। এই নাম ধরেই তিনি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন, শুধু ভোট নয়, গণনার প্রক্রিয়াও মুছে দেওয়া হয়েছে।
ভ্যানিশ কুমার হলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া একটি কটাক্ষ, যা ইংরেজি ‘vanish’ শব্দ থেকে বানানো। এর অর্থ উধাও হয়ে যাওয়া। এই নাম ধরেই তিনি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন এবং অভিযোগ করেছেন, শুধু ভোট নয়, গণনার প্রক্রিয়াও মুছে দেওয়া হয়েছে এবং বাংলার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মূল বিষয়গুলো এক নজরে
- মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ আখ্যা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
- মমতার দাবি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এক কোটিরও বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াইয়ের নেতৃত্ব যুব প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে বলেছেন, অভিভাবক হিসেবে তিনি পথ দেখাবেন।
SIR থেকে র্যামলীলা: বিতর্কটা কীভাবে শুরু হল
বিরোধীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংঘাত শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের মাঝামাঝি। ২৪ জুন কমিশন বিহারে প্রথম Special Intensive Revision বা SIR ঘোষণা করে। লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকা থেকে মৃত, চলে যাওয়া এবং নকল নাম সরানো।
কিন্তু বিহারের কাজ শেষ হওয়ার পরে হিসাব যেটা বেরোল, সেটাই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। ৭.৮৯ কোটি ভোটার থেকে তালিকা নেমে আসে ৭.৪২ কোটিতে। সূত্রের খবরে বলা হয়েছিল, কাটা পড়া নামের প্রায় ৯৯ শতাংশই ছিল মৃত্যু, স্থানান্তর ও ডুপ্লিকেশনের কারণে — বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে নয়।
এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে SIR শুরু হয়। এর মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। বাংলায় এই প্রক্রিয়ায় নাম কাটা পড়ে প্রায় ৯১ লাখ, যা রাজ্যের তালিকার প্রায় ১১ শতাংশ।
এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট SIR-এর বৈধতা বহাল রাখে। তবে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানে এই নয় যে ওই ব্যক্তি নাগরিক নন। ৬ অক্টোবর কমিশন নির্দেশ দেয়, বাদ পড়া যোগ্য ভোটাররা ফর্ম ৬ দিয়ে আবার নাম তুলতে পারবেন।
অক্টোবরের শেষে বিরোধীরা সাংকেতিক ‘জন ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচি শুরু করে। বৃষ্টির কারণে সেটি একদিন পিছিয়ে ৩১ অক্টোবরে খড়্গের বাসভবনে হয়, যেখানে ২৫০ জন সাংসদ অংশ নেন। পরদিনই র্যামলীলা ময়দানের মহাসমাবেশ।
মমতা কেন জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বললেন
নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করার সময় মমতা একটি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর কথায়, কমিশন শুধু ভোটার তালিকা থেকেই নাম কাটেনি, গণনার প্রক্রিয়াটাকেও অস্পষ্ট করে দিয়েছে।
তুলনা করে ধরলে বিষয়টা এমন। ধরুন একটি নির্বাচনে ভোট হয়েছে, কিন্তু গোনার খাতাটাই কেউ দেখতে দিল না। ভোটাররা ঢুকতে পেরেছেন, ভোট দিয়েছেন, কিন্তু ফল কীভাবে এল সেটা যাচাইয়ের উপায় নেই। হাইজ্যাকিংয়ের অভিযোগটা মমতা এখানেই আনছেন।
এই অভিযোগের জবাব কমিশনের দিক থেকে স্পষ্ট আসেনি। তবে ইটিভি ভারতে-র একটি প্রতিবেদনে কমিশন জানিয়েছে, ভুলবশত কোনও যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়লে তিনি আবার আবেদন করতে পারবেন।
মমতা SIR-এর পূর্ণ নাম নিয়েও কটাক্ষ করেন। তাঁর ভাষায় এর প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায় — “Special Intensive Relief to a Political Party like BJP.”
২০২৫ থেকে ২০২৬: যে পাঁচ ধাপে বিতর্ক এখানে এল
**জুন ২০২৫ — বিহারে SIR শুরু:** কমিশনের ঘোষণা ঘিরে প্রথম বিতর্ক ওঠে। ২৪ জুন থেকে বাড়ি বাড়ি জরিপ শুরু হয়।
**সেপ্টেম্বর ২০২৫ — বিহারের ফল:** ভোটার সংখ্যা ৭.৮৯ কোটি থেকে ৭.৪২ কোটিতে নামে। কমেছে প্রায় ৪৭ লাখ।
**মে ২০২৬ — সুপ্রিম কোর্টের রায়:** আদালত SIR বহাল রাখে, তবে নাগরিকত্বের প্রশ্নে কমিশনকে সীমাবদ্ধ রাখে।
**অক্টোবর ২০২৬ — পশ্চিমবঙ্গের হিসাব:** রাজ্যে প্রায় ৯১ লাখ নাম কাটা পড়ে। ৩৭ লাখের বেশি আপিল ট্রাইব্যুনালে ঝুলে থাকে।
**১ নভেম্বর ২০২৬ — র্যামলীলা ময়দান:** বিরোধীরা মহাসমাবেশ করে, একই দিনে বিজেপি পশ্চিম দিল্লিতে পাল্টা মিছিল বের করে।
চার পক্ষ: কে কী বলছে, আর কার কী লাভ-ক্ষতি
| পক্ষ | প্রকাশ্যে দাবি | আসলে যা জিতছে বা হারাচ্ছে |
|---|---|---|
| তৃণমূল ও মমতা | বাংলাকে SIR-এর লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, এক কোটিরও বেশি ভোটের নাম কাটা পড়েছে | বাংলায় নির্বাচনী আধিপত্য ফেরানো; তবে দলটি রাজ্যের ক্ষমতা হারানোর পর কেন্দ্রে আবার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজছে |
| নির্বাচন কমিশন | SIR সংবিধান ও আইন অনুযায়ী বৈধ, সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে | কাজ চালিয়ে যাওয়ার আইনি ভিত্তি; তবে বড় সংখ্যায় আপিল ও ট্রাইব্যুনালের ব্যাকলগ সামলাতে হচ্ছে |
| বিজেপি ও কেন্দ্র | বিরোধীরা ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির কেন্দ্রে আনছে | সরকারের সিদ্ধান্ত রক্ষা; তবে ১৭ নভেম্বরের ধনতেরাস-দিওয়ালির মরসুমে দিল্লির ব্যবসায়ীদের ক্ষতির প্রশ্ন এড়াতে হচ্ছে |
| যুব প্রজন্ম | তাঁদের হাতে লড়াইয়ের নেতৃত্ব | মঞ্চে সরাসরি ডাক পেয়েছেন; তবে সংগঠন ছাড়া এই ডাক কতদূর যায় সেটাই প্রশ্ন |
নাম কাটার প্রভাব: সংখ্যায় বাংলা, ট্রাইব্যুনাল ও রেশন
দলীয় হিসাব আলাদা রেখে কয়েকটি সংখ্যা দেখা দরকার।
মমতা বলেছেন বাংলায় এক কোটিরও বেশি নাম কাটা পড়েছে। সরকারি ও সাংবাদিকতার হিসাবে বাংলায় কাটা পড়া নাম প্রায় ৯১ লাখ, যা ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে রাজ্যের তালিকার ১১ শতাংশের কিছু বেশি।
ট্রাইব্যুনালের অবস্থা আরও স্পষ্ট। ৩৮ লাখের বেশি আপিল জমা পড়েছে, ৬ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লাখের কিছু বেশি। কারণ বাদ পড়া ভোটার পরের ভোটে ভোট দিতে পারেন না, ট্রাইব্যুনাল পরে রায় দিলেও।
আরও একটি দিক আছে। কলকাতা হাইকোর্টে টানা মামলা পড়ছে — চাকরি ও বিদেশযাত্রার উপর নাম কাটার প্রভাব নিয়ে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আদালত এক মহিলার রেশন সুবিধা ফেরান, কারণ তাঁর নাম SIR-এ কাটা পড়েছিল।
মমতা কী চাইলেন: যুব প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব, বিচারব্যবস্থার কাছে আর্জি
এই সমাবেশে মমতা একটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেন। তিনি সরাসরি যুব প্রজন্মকে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার ডাক দেন।
তাঁর কথায়, “যুব প্রজন্ম, আপনারা লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিন, আমরা গাইড করব।” তিনি জেন-জি, পড়ুয়া ও মহিলাদের পাশাপাশি CJP-রও একজোট হওয়ার আবেদন জানান।
লক্ষ্য করার মতো, এই ডাক এসেছে রাহুল গান্ধীকে পাশে বসিয়ে। সাংবাদিকদের একাংশের বিশ্লেষণ, INDIA জোটের নেতৃত্বে থাকতে চাইছেন মমতা, আর সেখানে তাঁর বড় প্রতিপক্ষ কংগ্রেস।
একই মঞ্চে তিনি সোনিয়া গান্ধীকে “আমার নেত্রী” এবং রাহুল গান্ধীকে “তরুণ নেতা” বলে সম্বোধন করেন।
এরপর কী: যেসব তারিখ ও সিদ্ধান্তে পরের ধাপ ঠিক হবে
সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়সীমা — বার্ষিক বিশেষ সংক্ষিপ্ত পুনর্মূল্যায়ন বা SSR-এর চূড়ান্ত তালিকা। সেটি প্রকাশিত হবে ৪ জানুয়ারি ২০২৭-এ।
এর মধ্যে কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগমের ভোট আসছে। বাদ পড়া ভোটাররা সেই ভোটে ভোট দিতে পারবেন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী কমিশনকে চার সপ্তাহের মধ্যে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বাদ পড়া মামলা সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। সেই কর্তৃপক্ষ পরবর্তী নির্বাচনের আগে সিদ্ধান্ত জানাবে।
পশ্চিমবঙ্গে ১৯টি SIR ট্রাইব্যুনালে ৩৭ লাখের বেশি আপিল ঝুলে আছে। কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক দীর্ঘ যাতায়াতের কারণ দেখিয়ে ছাড় চেয়েছেন।


