Iran war global impact

ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে: তেলের দাম থেকে টাকার মান পর্যন্ত

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। নয় মাস পরেও যুদ্ধ চলছে। ২ নভেম্বর ২০২৬-এ ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৪ শতাংশ কমে ১১১.৮৪ ডলারে দাঁড়ায়, কারণ ইরান ও কাতারের মধ্যে টানা তিন দিন ধরে আলোচনা…

avatar
Written By : Ishita Ganguly
Updated Now: November 4, 2026 8:43 AM

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে।
নয় মাস পরেও যুদ্ধ চলছে। ২ নভেম্বর ২০২৬-এ ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৪
শতাংশ কমে ১১১.৮৪ ডলারে দাঁড়ায়, কারণ ইরান ও কাতারের মধ্যে টানা তিন দিন ধরে
আলোচনা চলছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী এখনও কার্যত বন্ধ।

হরমুজ প্রণালী কী? এটি ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যে একটি সরু জলপথ,
অথচ বিশ্বের সমুদ্রপথে চলা তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত গ্যাসের (এলএনজি)
প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই যায়। এশিয়ার বেশিরভাগ তেল আমদানিকারী দেশ এই
প্রণালীর উপর নির্ভরশীল, কারণ বিকল্প পথ প্রায় নেই।

এই যুদ্ধ শুধু একটি অঞ্চলের লড়াই নয়। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) এটিকে তেল
বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন বলেছে। এর প্রভাব জ্বালানি দাম,
মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

মূল বিষয়গুলো: – হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায়
বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সামুদ্রিক তেল সরবরাহ এখন আটকে গেছে। – ব্রেন্ট
অপরিশোধিত তেল মার্চ ২০২৬-এ ১২৬ ডলার ছুঁয়ে ২ নভেম্বর ২০২৬-এ ১১১.৮৪ ডলারে
দাঁড়িয়ে আছে। – ভারত তার তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ
আমদানি করে, তাই ঘাটতি বাড়ছে।

পটভূমি: ১৯৭৯ থেকে ২০২৬ — এই
যুদ্ধ এখানে কীভাবে এল

শিকড় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর তেহরান ও
ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ভেঙে যায়। এরপর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দশকের পর দশক
সন্দেহ, নিষেধাজ্ঞা আর আলোচনার চক্র চলতে থাকে।

২০১৫ সালে একটি বড় সূত্র তৈরি হয়েছিল। ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরান জেসিপিওএ
(JCPOA) নামে চুক্তি করে, যেখানে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বদলে নিষেধাজ্ঞা
প্রত্যাহারের কথা ছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং
নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনে। ইরানও তখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়াতে শুরু করে। কূটনীতির
ভিত এখানেই নড়ে যায়।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালায়; এই
বারো দিনের যুদ্ধ শেষ হয় যুদ্ধবিরতিতে। ২০২৬ সালের শুরুতে পরিস্থিতি আবার ঘোরালো
হয়। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক আক্রমণের পর সবচেয়ে বড়
মার্কিন সেনা সমাবেশ হয়।

অর্থাৎ যুদ্ধ হঠাৎ আসেনি। পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হওয়া, নিষেধাজ্ঞার চাপ আর
ধারাবাহিক সামরিক সংঘাত — এই তিনটি ধারা মিলেই ২৮ ফেব্রুয়ারি বিস্ফোরণ
ঘটায়।

হরমুজ বন্ধ হলেই সারা
বিশ্বে দাম বাড়ে — হিসাবটা যেভাবে কাজ করে

সরু এই জলপথটির গুরুত্ব বোঝার সহজ উপায় একটি ফানেলের কথা ভাবা। সৌদি আরব,
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও ইরান — এই ছয় দেশের তেল ও গ্যাস
রপ্তানির প্রধান পথ ওই একটি ফানেলই। ফানেলের মুখ বন্ধ হলে পাইপলাইনে জল থেমে
যায়; বিকল্প পথ প্রায় নেই।

শুধু দুটি দেশের কাছে হরমুজ এড়ানোর পাইপলাইন আছে — সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব
আমিরশাহি। তাদের মিলিত সক্ষমতা দিনে ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল। কিন্তু ২০২৫ সালে
প্রণালী দিয়ে দিনে প্রায় দুই কোটি ব্যারেলের বেশি তেল-গ্যাস যেত। অর্থাৎ বিকল্প পথ
সরবরাহের বড় অংশই ধরতে পারে না।

ফলটা সরাসরি। আইইএ-র হিসাবে, এই সংকটে বিশ্ব তেল সরবরাহ থেকে প্রায় ২০
শতাংশ বাদ পড়ে। সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে; দাম বাড়লে জাহাজ ভাড়া, বিমান ভাড়া,
সার, খাদ্য — সব খরচ বাড়ে। ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই মূল্য বৃদ্ধি কয়েক স্তর
পেরোয়।

ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর
২০২৬: যে পাঁচ ধাপে সংকট গভীর হল

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — যুদ্ধ শুরু: ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও
ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করে। ইরান জবাবে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে
ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে।

মার্চ ২০২৬ — দাম শিখরে: সরবরাহ আটকে যাওয়ায় ব্রেন্ট
তেলের দাম মার্চের শেষে ১২৬ ডলারে পৌঁছায়, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এপ্রিল ২০২৬ — যুদ্ধবিরতি ও ব্যর্থ আলোচনা: ৭ এপ্রিল দুই
সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। কিন্তু ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র
ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ বসায়।

জুন ২০২৬ — চুক্তির আশা ও ধস: ১৭ জুন দুই দেশের সমন্বয়
স্মারকলিপি স্বাক্ষরিত হয় এবং অবরোধ ওঠে। কিন্তু ৮ জুলাই ইরান হরমুজে বাণিজ্যিক
জাহাজে হামলা করলে চুক্তি ভেঙে পড়ে।

নভেম্বর ২০২৬ — আজকের অবস্থা: যুদ্ধ ২৪৯তম দিনে। ২ নভেম্বর
কাতার-মধ্যস্থতায় টানা তৃতীয় দিনের আলোচনা চলছিল, আর ব্রেন্ট ছিল ১১১.৮৪
ডলারে।

কে লাভবান, কে চাপে: তিন পক্ষের
হিসাব

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল: তাদের সরকারি অবস্থান, ইরানের
পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঠেকানো এই যুদ্ধের লক্ষ্য। ইসরায়েল জানিয়েছে যুদ্ধের
লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। নভেম্বরের মধ্যবর্তী
নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের প্রধান কারণ ছিল এই যুদ্ধ এবং তার ফলে বেড়ে যাওয়া
মূল্যস্ফীতি।

ইরান: তেহরান বারবার বলেছে তার পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নভেম্বরে বলেছেন, যুদ্ধ ফেরা কারও লাভ হবে
না। তবে ইরান হরমুজ খোলার শর্ত হিসেবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ ওঠানো
এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার দাবি করেছে।

ভারত ও অন্য জ্বালানি আমদানিকারক দেশ: ভারতের অবস্থান
সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ঝুঁকিতে। ভারত তার তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং গ্যাসের প্রায় ৫০
শতাংশ আমদানি করে। আইএমএফ বলছে, তেল আমদানিকারী দেশগুলোর উপর এই ধাক্কা আয়ের
উপর বড় করের মতো কাজ করে।

পক্ষ প্রকাশ্য দাবি আসল স্বার্থ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঠেকানো সামরিক লক্ষ্য পূরণ হলেও নিজ দেশে যুদ্ধ অজনপ্রিয়
ইরান পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, আত্মরক্ষার অধিকার নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ওঠানো, জব্দ সম্পদ ফেরত
ভারত ও অন্য আমদানিকারক জ্বালানি সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখা তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি নির্ভরতা

টাকার মান আর রান্নার গ্যাসে এর
প্রভাব

ভারতের চলতি হিসাব ঘাটতি চলতি অর্থবছরে জিডিপির ২.৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে,
যা আগের বছর ছিল ০.৯ শতাংশ। রিজার্ভ ব্যাংক ও সরকার সংকটকালীন ব্যবস্থা
নিয়েছে।

টাকার উপর চাপ সবচেয়ে দৃশ্যমান। রয়টার্স জানাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর টাকা ৫
শতাংশের বেশি দুর্বল হয়ে রেকর্ড নিচে নেমেছিল এবং এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ
পারফরম্যান্সকারী মুদ্রা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই সময়ে ভারতীয়
শেয়ারবাজার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তুলে নিয়েছেন।

সরাসরি প্রভাব পড়ে রোজকার খরচে। তেল আমদানি মহঙা হলে পেট্রোল, ডিজেল ও
রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ে। ভারত সরকার এখন জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছে
এবং সোনা-রুপোর আমদানি শুল্ক বাড়িয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষার জন্য।

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ পূর্বাভাস বলছে, বিশ্ব মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে বেড়ে ৪.৭
শতাংশ হবে। আর বিশ্ব প্রবৃদ্ধি কমে ৩.১ শতাংশে দাঁড়াবে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৩.৫
শতাংশ।

এরপর কী: যে তারিখ ও সিদ্ধান্ত
পরের ধাপ ঠিক করবে

সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তা পেরিয়ে গেছে কিনা তা নভেম্বরের মধ্যবর্তী
নির্বাচনের পর বোঝা যাবে, কারণ যুদ্ধবিরোধী মনোভাব সেই ভোটের ফলেই ধরা
পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধে বড় ধাক্কা খেয়েছে। আইএমএফের হিসাবে
২০২৬ সালে কাতারের অর্থনীতি ১৫.৬ শতাংশ, কুয়েতের ১৬.৭ শতাংশ এবং ইরাকের ১৬
শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। ফলে এই দেশগুলো দ্রুত শান্তি চাইবে, কারণ যুদ্ধের খরচ
তাদেরই সবচেয়ে বেশি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হরমুজ ঘিরে। আইএমএফ তাদের পূর্বাভাসে ধরে নিয়েছে প্রণালী
২০২৭ সালের মার্চে খুলবে এবং অক্টোবর ২০২৭-এ স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরবে। তারা
২০২৬ সালে গড় তেলের দাম ৯৬ ডলার এবং ২০২৭ সালে ৮৭ ডলার ধরেছে। কিন্তু যদি
সংঘাত আরও বাড়ে এবং তেল ১৩০ ডলারে পৌঁছায়, তবে প্রবৃদ্ধি আরও কমবে এবং মূল্যস্ফীতি
২০২৭ সালে ৫.২ শতাংশে উঠতে পারে।

এই একটি জলপথ কবে খোলে, তার উপরই নির্ভর করছে পুরো হিসাব।